
পোষ্যর সঙ্গে সংলাপ
লক্ষ্য করেছি বাড়ির পোষা কুকুরের সঙ্গে তার প্রভু সবসময় ইংরেজী বলেন । কলাই ডাল আর পোস্ত ছাড়া ভাত খেতে পারেননা যে পাতি বাঙালী তিনিও যদি কুকুর পোষেন তাকে সব নির্দেশ দেন ইংরেজিতে যেমন ‘no no, come here, sit down’ ইত্যাদি ।কথাগুলো উচ্চারণের সময় গলাটা
গম্ভীর , একটু ধমকের মতো শোনালেও আসলে সেটা আদর । যদি কেউ রাস্তা থেকে তুলে আনা দিশি কুকুর পোষেন তার নাম দেন ‘ লালু , ভুলু ‘ এইসব, কিন্তু জার্মান শেপার্ড বা এ্যলশেসিয়ান হলে কদাচ এইরকম আটপৌরে বাঙ্গালী নাম নয় । তাদের নাম ‘ জিমি’, ‘টম্’ ইত্যাদি । দুএকজন যে ব্যতিক্রম নেই তা নয় যেমন এইমূহুর্তে মনে পড়ছে শান্তিনিকেতনের নীলুদার কথা । নীলুদা অর্থাৎ নীলাংশু আচার্যর সঙ্গে আমার একটা লতায়-পাতায় পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেও সেটা রিতিমত গবেষণার বিষয়। ঐসব কচকচানি বাদ দিয়ে এককথায় নীলুদা ছিলেন আমার আবেগতুতো দাদা ।
অনেক বছর আগের কথা । আমাদের মেয়ে পাঠভবনে ভর্তি হবার পর আমরা প্রায়ই শান্তিনিকেতন যেতাম । সেখানে পূর্বপল্লীতে ওনার নতুন বাড়িতে যাবো ঠিক করে একদিন রওনা দিলাম । কাছাকাছি পৌঁছতেই একটা বিরাট গর্জন কানে এলো । আমাদের সঙ্গে ছিলেন পাঠভবনের অধ্যাপক সুবীরদা অর্থাৎ সুবীর মজুমদার। রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন শ্রীশ চন্দ্র মজুমদার, তাঁরই নাতি। কলকাতায় ভবানীপুর অঞ্চলে তাঁদের পারিবারিক বিশাল বাড়ি এবং কলকাতায় লোভনীয় চাকরি না নিয়ে শান্তিনিকেতনকে ভালোবেসে পাঠভবনে যোগ দিলেন এবং সেখানেই কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছিলেন। থাকতেন কাছেই সেবাপল্লীতে নিজেদের বাড়িতে। সুবীরদার মতন সদাহাস্যময় উদার মনের মানুষ খুব কমই দেখা যায়। সেই সুবীরদা হঠাৎ আমাকে তখন বললেন ,”নীলুদার বাড়িতে বাঘের মতো একটি এ্যালশেসিয়ান আছে।” আমি মনে মনে যতই ভয় পেয়ে থাকিনা কেন ফিরে যাওয়া সম্ভব ছিলনা কারণ নীলুদা আমাকে
দেখে ফেলেছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন , “চলে এসো ব্রাদার” । সামনের গেট খুলে একটু এগোতেই সুবীরদার বর্ণনা মতো একটি বিশালাকার আ্যলসেশিয়ান ছুটে এলো । আমি ভয়ে কাঁটা ।নীলুদা খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন , ” মাস্তান ,আমার ভাই আর তার বৌ এসেছে, সঙ্গে সুবীরদা । একটুও বিরক্ত করবেনা ।” কুকুরের নাম ‘মাস্তান’ হতে পারে ধারণা ছিলনা। শুধু তাই নয় বাংলা ভাষায় আস্তে কথা বললেও সে বুঝতে পারে জানতাম না। মনে আছে আমরা ঘন্টাখানেকের বেশি ছিলাম । মাস্তান সবসময়ই চুপ করে বসে রইলো ও একটুও মাস্তানি করেনি।
শোনা যায় আগের দিনে অনেক জমিদার তাদের বাড়ির পুকুরে অনেক বড়ো বড়ো মাছের একটি করে নাম দিতেন যেমন ‘কার্তিক’ , ‘গণেশ’ ইত্যাদি। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে খাবার দেবার জন্য তাদের নাম ধরে ডাকলে সেই বিশেষ মাছটি নাকি সামনে হাজির হতো।
সত্তরের দশকে বেশ কিছুদিন গুজরাটের বরোদা শহরে কর্মসূত্রে ছিলাম। সেখানে একটি সংরক্ষিত বিশাল জলাশয়ে অনেক পোষা কুমীর থাকতো যাদের প্রত্যেকের একটি করে নাম ছিল। রোজ একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাদের খাবার নিয়ে একজন আসতো এবং নাম ধরে ধরে একে একে ডেকে তাদের মুখগহ্বরে খাবার ছুঁড়ে দিতো। এই দৃশ্য আমি নিজেই দেখেছি।

পাখিরাও কথা বলে তবে সেটা শেখানো। যেটুকু শুনবে ঠিক সেটাই বলে যাবে। একটি বিখ্যাত গান আছে -“ময়না বলো তুমি কৃষ্ণরাধে” ইত্যাদি। গানটি যতই শ্রুতিমধুর হোক, সেই ময়না শেষপর্যন্ত কৃষ্ণরাধে বলেছিল কিনা জানিনা কিন্তু পূর্ব বাংলায় আমার মামার বাড়ি সিরাজগঞ্জের (অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্গত) বাড়িতে একটা পোষা টিয়া কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর বলতো -“রাধা কৃষ্ণ কও।” ভাষার আঞ্চলিক উচ্চারণে সেও অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলো।
বিহারের পাত্রাতুতে কর্মসূত্রে কয়েকবার গিয়েছিলাম। সেখানে ভূমিপুত্র রাজীব সিং আমাকে তার বাড়ি একদিন অনেক অনুরোধ করে নিয়ে গিয়েছিলো চা খাওয়াবার জন্য। চা খাওয়ানোটা উপলক্ষ্য, আসল উদ্দেশ্য ছিল বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সে একটা প্রায় কুড়িফুট লম্বা অজগর সাপ পুষেছিল সেটা দেখানো। দেখলাম দুপাশে এক্সপ্যান্ডেড মেটাল লাগানো একটা লম্বা কাঠের খাঁচার ভেতর চুপচাপ শুয়ে থাকা একটি আপাতনিরীহ অজগর। তার সঙ্গে কোনো ভাষায় কথা নয়, শুধু খাবার দেবার সময় বিশেষ একটি আওয়াজ করলেই সে নাকি ঠিক বুঝতে পারে যে এবার খাবার ঘন্টা পড়ে গেছে।
কুকুরদের আবার শ্রেণীচেতনা খুব বেশি । রাস্তায় কেউ যদি নিজের পোষা ডালমেশিয়ান , শেপার্ড বা আ্যলসেশিয়ান অথবা ঐরকম উচ্চবর্ণের সভ্রান্তদের নিয়ে বেরোন তখন রাস্তায় রাস্তায় বিশ্ববখাটে চরে খাওয়া অবহেলিত দলিত সম্প্রদায়ের সারমেয়রা দল বেঁধে চিৎকার করে যায়, অবশ্যই নিরাপদ দূরত্ব থেকে।
বেড়ালের ব্যাপারটা কিন্তু অন্যরকম । যদিও শুনেছি সে নাকি বাঘের মাসী কিন্তু তার বোনপো বা বোনঝিদের সঙ্গে তার স্বভাবের কোনো মিল নেই । সে নিতান্তই নিরীহ, ছোটোখাটো এবং বাংলা ভাষা বোঝে ।
এখানকার এক বিশিষ্ট কবির বাড়িতে দোতলায় কবিতাপাঠের আসর বসেছিলো । এমন সময় তার পোষা বিড়ালটি সিঁড়ি দিয়ে গুটিগুটি সেখানে চলে এলো । আমার অনুজপ্রতিম সেই কবিবন্ধু ভীষণ অমায়িক আর সবসময় আস্তে কথা বলেন । তিনি বিড়ালটিকে কোমলস্বরে বললেন , ” তুমি আবার এখানে এলে কেন? এখানে এখন কবিতা পাঠ হবে । তুমিতো কবিতা বুঝবেনা । তাই নীচে যাও । “
দেখলাম সঙ্গে সঙ্গে তার দুচোখে ভীষণ একটা আতঙ্কের ছায়া নেমে এলো। তারপর সে বেচারি ভয়ে ভয়ে একবার তার প্রভুর দিকে তাকালো । তারপর খুব ধীরে ধীরে নীচে চলে গেলো ।
শৃঙ্খলাবোধ নাকি আধুনিক বাংলা কবিতা শোনার ভয়ে জানিনা ।

