(জাতীয় পতাকা)

স্বাধীনতা দিবস সামনেই। কাঠের বসার ঘরের দেয়ালে অনেকগুলো ফ্রেমে বাঁধানো ছবি ঝুলছে। বাড়িতে তিনটে পাকা ঘর। বাইরের দেয়ালে ন্যাংটো ইঁট। হা করে হাভাতের মতো সর্বক্ষণ তাকিয়ে থাকে, যেন বহুকাল খেতে পায়নি। ইঁটের গাঁথনিতে বালি-সিমেন্টের প্লাস্টার করা মানেই বাজে খরচ। ঘরের ভিতরকার দেয়ালে অবশ্য প্লাস্টার, উপরে মোটা দাগের চুনকাম করা। অনেকটা বড় উঠোন, দূরে রান্নাঘর। আরও দূরে গাছগাছালি পার করে অন্তত পঞ্চাশ পা হাঁটলে শৌচাগার। কত গাছ। ঐ শেষ প্রান্তে একটা পিটকিলা গাছ। অনেক উঁচু আর মোটকা। রাতে ওটায় পেঁচা এসে বসে আর ঘুত ঘুত করে ডাকে। রাতে কোনো কারণে তলপেট মুচড়ে উঠলে এক হাতে হ্যারিকেন আর কমন্ডলুর মত দেখতে বড় বদনা অন্য হাতে নিয়ে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়। আম,কাঁঠাল, নিম, জামরুল, লটকা, কামরাঙা, পেয়ারা, জাম্বুরা, ভেরেন্ডা, কলা আর বাসক গাছ। ডালগুলো পাতায় ভরা। রাতে গা ছমছম করে। ওগুলোকে ডাইনে-বাঁয়ে রেখে বাড়ির শেষ প্রান্তে যেতে কী ভয় লাগে!

কালোদিদা বলে, পেঁচা ডাকলে জোরে জোরে বলবি ; গৌরাঙ্গ আইলে কয়ে দিব।

বলি তো। তবুও কিছুতেই বুঝে পাই না কালোদিদার শেখানো কথা যত বলি, পেঁচার ঘুত ঘুত ডাক তত বেড়ে যায় কেন! ছোট্ট ভাই এই বয়সেই বেশ সাহসী। দাদা যাতে ভয় না পায় সেজন্য সে সিঁড়িতে এসে দাঁড়ায়। আর কাঁপা কাঁপা গলায়, ঢোক গিলে গিলে বলতে থাকে ; “গৌরাঙ্গ আইলে কয়ে দিব”। ঐটুকু ছেলের গলার আওয়াজ এই উচ্চগ্রামে তো এই খাদে। পিটকিলা গাছটায় লক্ষ্মীর বাহন এসে যেই না ঘুত করল , অমনি ভাইয়ের গলার আওয়াজ দ্রুত আন্টিক্লাইন আর সিনক্লাইনে যাতায়াত করতে আরম্ভ করলো। এজন্যই হয়ত বাবা-মা ভাইকে হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছিল।

আমার জুটল তবলা। বাড়ির লক্ষ্মীকে কী করে শব্দকল্পদ্রুমে তাড়াতে হয়— ধরাম ধরাম করে বেতালা বাজিয়ে কান ঝালাপালা করে দিতাম। অথচ, সত্যি বলছি, আমার গান শেখার ইচ্ছে ছিল। তবলা পেটাতে ভালো লাগতো না। তারচেয়ে, বাড়ির উঠোনে জাম্বুরা পেটাতে বেশি ভালো লাগে। একদিন অসাবধানে জোরে লাথ মারতেই কী করে যেন বড় ঘরের খোলা দরজার সোজাসুজি কাচের আলমারির নিচের কাচ ঝন-ঝনাত্ করে চুরচুর হ’ল। ঠাকুর্দা পা থেকে গব্বর সিং জুতো হাতে নিয়ে পিঠে দিলেন ঘা কতক। কালোদিদা চেঁচাতে আরম্ভ করলেন ; পোলাডারে বাবু মাইর‍্যা ফেলাইলো গো বৌমা..! ঐ আলমারিটার একদম উপরের তাকে আছে ঠাকুর্দার সিগারেটের বাক্স আর সেই সোনাব্যাঙটা ! দুপুরে সবাই যখন ঘুমাতো আমি অনেকদিন চুপচুপ করে সিগারেটের বাক্স খুলে গন্ধ শুঁকতাম। কী ঝাঁঝ!

মহাত্মা গান্ধী

বসার ঘরের ছবিগুলোতে মালা ঝুলছে। ছোটোপিসি বলেছে চরকা কাটছে লোকটার নাম মহাত্মা গান্ধী। তাঁর একপাশে বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ, অন্যপাশে নেতাজী। নেতাজীর আবার দুটো ছবি। একটায় জলপাই রঙের পোশাক, কোমরে মোটা বেল্ট, মাথায় তেরছা টুপি। অন্যটায় ধুতি পাঞ্জাবি, পা’য় নাগরাই জুতো। জলপাই রঙের টুপি পরা ছবিটাই বেশি ভালো। বুকের কাছে হাত ভাঁজ করা স্বামী বিবেকানন্দ। পাশেই মা কালীকে প্রসাদ খাওয়াচ্ছে রামকৃষ্ণ ঠাকুর। অন্য দেয়ালে ঘোড়ার পিঠে কোমরে তলোয়ার, লোকটা শিবাজি। শিবাজির মুকুট-টা মাথায় পরতে ইচ্ছে করে। যাত্রাপালায় যে রাজা সাজে, তাকেও দেখেছি অমন মুকুট পরতে। মাঝেমধ্যেই কোমর থেকে তলোয়ার বের করে শত্রুর সাথে তলোয়ারের লড়াই করে। ঝনঝন করে কী শব্দ হয়! ঐ যে সারদা মা। সরু পাকানো গোঁফওয়ালা লোকটা ভগৎ সিং— সব নাম বলেছিল ছোটোপিসি।

কাচের আলমারিতে জাতীয় পতাকা ভাঁজ করে রাখা আছে। ওটায় যখন-তখন হাত দেওয়া যাবে না— বড়রা বলেছে জাতীয় পতাকাকে সম্মান আর মর্যাদা দিতে হয়। বসার ঘরের বাইরে রাস্তার দিকের দেয়ালে একটা গোল আংটা সারাবছর লাগানো থাকে। স্বাধীনতা দিবসে আর প্রজাতন্ত্র দিবসে ওটায় সরু পাইপ ঢুকিয়ে দেয় কাকুমণি, পাইপের মাথায় জাতীয় পতাকা উড়তে থাকে। সব বাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ে। পাড়ায় যে বাড়ি যত উঁচু, সেই বাড়ির পতাকা বাতাসে কী সুন্দর দুলতে থাকে। সন্ধ্যা হবার আগেই পতাকা নামিয়ে ভাঁজ করে আলমারিতে গুছিয়ে রাখতে হয়। বড় রাস্তার ধারেই খাদি দোকান। ওখান থেকেই বাবা পতাকা কেনে কয়েকবছর পরপর। আমি প্রতি বছর নতুন পতাকা লাগবে বলে বায়না ধরি। পুরনো ভাঁজ করা পতাকা কেমন জানি মলিন হয়ে যায়। ভাঁজে ভাঁজে খটখটে দাগ আর সোদা গন্ধ করে। পতাকার গেরুয়া রঙটাও অত চকচক করে না। কেমন জানি ম্যাটম্যাট করা রঙ। আমার ভালো লাগে না। শান্তুদের বাড়ির পতাকাটা কত বড়, কী চকচকে! স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন পাড়ায় হৈ হৈ পড়ে যায়। স্কুলে কত গল্প হয়। স্যারেরা বাঘা যতীনের গল্প বলেন। মাস্টারদা সূর্য সেন-এর কথা বলেন। বন্ধুরাও আনন্দে আর উত্তেজনায় টগবগ করতে থাকে। এই দুইদিন আমাদের প্রাইমারি স্কুলে ছুটি। আমি রাতে ঘুমাতে যাবার আগে চোখ বুজে কত কী কল্পনা করি। ইংরেজদের নাকি নেতাজীর সৈন্যরা খুব গুলি করেছে। নেতাজীর ভয়েই নাকি ইংরেজরা আমাদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। গান্ধীজীর গল্পও শুনি। অমন বুড়ো হাড়-জিরজিরে লোকটার এক ডাকে নাকি দেশের সবাই উপোস করতো। সোনাগয়না দিয়ে দিত! আমার তো একবেলা খেতে দেরি হলেই পেট গুলাতে থাকে। দেশের সবাই কী করে সারাদিন না খেয়ে থাকতো! সূর্যগ্রহণের দিন সকাল-সকাল খেয়ে দরজা জানলা বন্ধ করে সবাই ঘরের ভিতর। বড়রা রেডিও শুনছে। মা-পিসির হাতে উল-কাঁটা, কুরুশ কাঁটা। গ্রহণ ছাড়লে তারপর রান্না হবে।

অতক্ষণ না খেয়ে থাকা যায়! শুনেছি মাতঙ্গিনী হাজরা ইংরেজের গুলি খেয়ে মাটিতে ঝুপ করে পড়ে গিয়েও হাতের পতাকাকে মাটিতে পড়তে দেননি! ইংরেজরা হা করে দেখছিল চরকার ছবিওয়ালা পতাকার লাঠিটা সোজাভাবে ধরে আছেন মাতঙ্গিনী, পতাকা তখনও উড়ছে— উথাল-পাতাল বাতাসে পত পত করে !

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, নভেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]