অঙ্গারেওয়ালি রসিদ জাহান

মূক

সিদ্দিকা বেগমের বিয়ে দেওয়াটাই এক কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে একজন খাঁটি নীল সৈয়েদানি। তার পিতা হামিদ জাহানের অবস্থাও খুব ভালো। অধিকন্তু, সৌন্দর্যের দিক থেকে সে হাজারজনের মধ্যে একজন। তথাপি, সিদ্দিকার এখনও বিয়ে হয়নি এবং তার বয়স তেইশ। তার কথা ভেবে ভেবে রাতে ঘুমোতে পারেন না তার মা আহমেদি বেগম। ভাইবোনদের মধ্যে সিদ্দিকা সর্বকনিষ্ঠ। দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেছে এবং তাদের বিয়েতে পাত্র পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি। বড়দিদির বিয়ে হয়েছিল সতের বছর বয়সে। তখন মধ্যম বোনের বয়স পনেরো ছুঁয়েছে। সিদ্দিকা বেগম মেজ দিদির থেকে বারো বছরের ছোট। সেই কারণে তার শৈশব অতিবাহিত হওয়ার সময় মনে হয়েছে সেই একমাত্র কন্যা।

যখন সিদ্দিকা বেগমের বিয়ের বয়স হল, তখন নিকট সম্পর্কের মধ্যে কোন পাত্র খুঁজে পাওয়া গেল না। আর যারাও বা বিবাহযোগ্য ছিল তারা এমন দরিদ্র ছিল যে তাদের কথা ভাবা যায়নি। দুয়েকজন সঙ্গতিপূর্ণ পরিবারের ছেলে হলেও তাদের চরিত্র ভাল ছিল না। আর যারা শিক্ষিত ছিল তারা পরিবারের বাইরে বিয়ে করতে চেয়েছিল।

পরিবারের বাইরে থেকে আসা প্রস্তাবগুলি ভালো ছিল না। হয় পাত্র পিতা-মাতা উভয় তরফে খাঁটি সৈয়দ নয় বা পাত্র খুব বয়স্ক বা ইতিমধ্যে পুত্রকন্যাসহ বিবাহিত। যাদের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য মনে হল তারা নিজেদের মত শর্ত আরোপ করেছিল। কয়েক জায়গা থেকে বলা হল যে চূড়ান্ত প্রস্তাব দেওয়ার আগে পাত্রপক্ষ প্রথমে কনেকে দেখবে। কয়েক ক্ষেত্রে, সিদ্দিকার শিক্ষার অভাবের কারণে প্রস্তাব বেশিদূর এগোয়নি। সংক্ষেপে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে কোনো না কোনো বাধা দেখা দিয়েছিল। চারিদিকে তাকালেই দেখা যাচ্ছে কত ছেলে আর মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তথাপি সিদ্দিকা বেগম অবিবাহিত থেকে গেছে।

দিল্লি শহরের কোনায় কোনায় এক ঢেউ বয়ে যাচ্ছে, তথাপি আপনি এমন ঘর দেখতে পাবেন যেখানে কোনো ঝড়ের মেঘ জমেনি বা ভূমিকম্প হয়নি। সেই যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক ঐতিহ্য, একই রকমের বাড়ির বাইরের দিকে পুরুষদের মহল যেখানে প্রতি সন্ধ্যায় এক জমায়েত ঘটে আর সেই একই রীতি মেয়েদের অন্দরমহলে আটকে রাখা। হামিদ হাসানের মত মানুষদের বাড়িতে মেয়েদের স্কুল শিক্ষা সম্ভব ছিল না। এমনকি ছেলেদেরও শুধুমাত্র ধর্মীয় নির্দেশ পড়তে দেওয়া হত। হামিদ হাসানের জ্যেষ্ঠপুত্র প্রথমে পবিত্র কোরান মুখস্থ করেন, তারপরে পার্সি ভাষা এবং আর একটু বড় হলে একজন আলিম অর্থাৎ প্রাজ্ঞ মানুষ হওয়ার জন্য দেওবন্দের সেমিনারিতে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে আসেন এবং সমস্ত পরিবার ও সম্পত্তির ভার গ্রহণ করেন। এক বিত্তশালী ভালো পরিবারে তাঁর বিয়ে হয়েছিল এবং ঈশ্বরের কৃপায় চার সন্তানের জন্ম দেন। হামিদ হাসান একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর পরিবারকে সমাজের মধ্যে উপরের শ্রেণীতে স্থান দেওয়া হত। তবুও তাঁর কন্যা সিদ্দিকা বেগম এতদিন অবিবাহিত রয়ে গেছে।

হামিদ হাসান কঠোরভাবে মেয়েদের শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। সিদ্দিকা বেগম পবিত্র কোরান এবং দুয়েকটি ধর্মীয় পুস্তিকা পড়েছেন। এর চেয়ে কিছু অধিক তাঁর পিতার কাছে অভিসম্পাত ছিল। পূর্বপুরুষদের জন্য জীবন দিতে পারেন এমন মানুষদের মধ্যে একজন হিসেবে তিনি সেই ঐতিহ্য এমন ভাবে পালন করতেন যেভাবে একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান বাহাদুরের নির্দেশ মেনে চলতেন। যেখানে ধর্মের পরিসর শেষ হয় এবং ঐতিহ্য শুরু হয়—তিনি কখনও এই ধূসর এলাকা নিয়ে অনুসন্ধান করতে মাথা ঘামাননি, না কখনও ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ‘শরাফত’-এর মান বা তাঁর পূর্বপুরুষদের নির্ধারিত সভ্য ব্যবহার ছিল সেই মানদণ্ড যা দিয়ে তিনি সমস্ত কিছুর পরিমাপ করেছেন। চারিদিকে বুদবুদের মত ফেনিয়ে ওঠা নতুন ধারণা থেকে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর জগতের সঙ্গী ছিলেন সমমনোভাবাপন্ন কিছু বন্ধু। এরা মিলিত হতেন, হুকা পান করতে করতে পুরাতন স্বর্ণযুগের কথা বলতেন এবং বর্তমান যুগের পাপাচারের জন্যে দুয়েক ফোঁটা অশ্রুপাত করতেন।

হামিদ হাসান একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর স্ত্রী স্বামীর ধর্মীয় বিশ্বাসের ভাগীদার ছিলেন। তিনি ১৮৫৭ সালের জীবন্ত, চলন্ত, ভাষণদাত্রী প্রতিমূর্তি ছিলেন। তিনি নয় বছরের কোনো ছেলেকে জেনানাতে প্রবেশ করতে দিতেন না। বস্তুত, সব মহিলাও প্রবেশাধিকার পেতেন না। তিনি মনে করতেন সামাজিকীকরণ এবং সব শ্রেণীর মানুষের বাড়ি যাওয়া এক খারাপ অভ্যাস।

তিনি তাঁর ভাইয়ের বিরোধিতা করতেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন মেয়েদের এমনকি গৃহেও পাঠদান অনুচিত। এই কারণে তিনি তাঁর পুত্রের সঙ্গে তাঁর ভাইঝির বিয়ে নাকচ করে দিয়েছিলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন মেয়েদের ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া উচিত নয়। মোটের উপর গৃহে এক পুত্রবধু আসবে, মেমসাহেব নয়!

তাঁর বিশ্বাস এমন একগুঁয়ে এবং গর্ব এমন ছিল যে পনেরো বছরের মধ্যে তিনি তাঁর একমাত্র ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেননি। অতএব বিস্ময়ের কোনো কারণ নেই যে আহমেদি বেগম সিদ্দিকা বেগমকে দুর্গসম আবাসে বড় করেছিলেন। তাঁর নিজের ঘনিষ্ঠ কোনো কোনো আত্মীয় মেয়ের মুখ পর্যন্ত সে দেখেনি। নিজের পরিচিত মহিলাদের থেকেও সিদ্দিকা বেগমকে পর্দার আড়ালে থাকতে হতো। তিনি জেদ করতেন যে তিনি যেমন ভাবে নিজের তরুণ বয়স কাটিয়েছেন সিদ্দিকাও সেইভাবে অতিবাহিত করবেন। অবিবাহিত অবস্থায় তিনি বিনুনি ছাড়া চুল বাঁধতেন। আতর ব্যবহার করা তো দূরের কথা। তিনি ফুলও স্পর্শ করতে পারতেন না। তিনি যাতে শিশুর মত থাকেন তার জন্যে যথাসম্ভব চেষ্টা করা হত। সিদ্দিকা বেগম কাউকে বন্ধু করতে পারত না, কারো সঙ্গে দেখা করতে পারত না বা বাইরে যেতে পর্যন্ত না। নীরস ভাবে তার দিন কাটতো। কখনো কখনো সে সেলাই করতো, এইটিই ছিল তার একমাত্র কাজ। তার বোনেরা বয়সে অনেক বড় এবং অনেক দূর শহর হায়দরাবাদে বিবাহিত। তার থেকে বয়সে ছোট এক ভাইঝি আছে, কিন্তু সে ইতিমধ্যে বিবাহিত এবং সেই কারণে সে বয়স্ক মহিলাদের সঙ্গে মুক্তভাবে বসতে পারে। সে ভীষণভাবে তাদের স্বাধীনতা নিয়ে ঈর্ষা করতো, তার খাঁচার গরাদে সে মাথা কুটতো। সিদ্দিকা বেগম প্রার্থনা করত, ‘আয় খুদা, আমার বাঁধন ছিঁড়ে দাও, আমাকে মুক্ত করো।’

মাঝেমধ্যে এ্ক দুর-সম্পর্কের কাকি, রাজিয়া বেগম যখন আসতেন তখন সিদ্দিকা যারপরনাই ভয় পেতেন। ‘যদি আমারও ওর মত অবস্থা হয়?’ এই ভয়ে সিদ্দিকা কাঁপত। রাজিয়া বেগম ষাট বছর বয়সেও অবিবাহিত। তাঁর বয়স সত্ত্বেও তাঁর একটি বিশ্রী ব্যাপার আছে। তাঁকে দেখে মেয়েরা এবং নববিবাহিতারা ফিসফাস করতো এবং হাসতো। নিজের এই একক দুর্ভাগ্যের বিষয়ে রাজিয়া বেগম সচেতন ছিলেন এবং তাই বাইরে বেশি বেরোতেন না। যদি বেরোতেন, তিনি এমন এক গোপন জায়গা খুঁজতেন যেখানে তাঁকে কেউ দেখতে পাবে না।

অন্য সময়ে, সিদ্দিকা বেগম আর একজন কাকির কথা ভাবতেন। তিনি হলেন জাকিয়া খাতুন, যিনি বিয়ের একমাসের মধ্যে বিধবা হয়েছিলেন। তিনি অকুতোভয়ে ঘুরে বেড়াতেন এবং যা ইচ্ছা হত তাই বলতেন। তিনি দুর্ভাগা ছিলেন বটে, কিন্তু যতবার সিদ্দিকা বেগম এই দুই কাকির মধ্যে তুলনা করতো, সে অবিবাহিত কাকির চেয়ে এই বিধবা কাকিকে বেশি পছন্দ করত।

যখনই সে পিতামাতার মধ্যে নীচুস্বরে আলাপ শুনতো বা মা এবং বৌদির মধ্যে কথাবার্তার ঝলক শুনতে পেত তখনই সিদ্দিকা বেগম বুঝতে পারত কিছু ঘটতে যাচ্ছে। যখনই এই প্রকার ফিসফিসানি বন্ধ হতো, সে আন্দাজ করতে পারত যে প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেছে। এই সব সময়গুলিতে সে মায়ের বিরুদ্ধে খুব রাগ করতো! তার অবিবাহিত কাকির দুঃখী এবং ক্ষমাপ্রার্থীসুলভ মুখ তার চোখে ভেসে উঠতো। সে নিজেকে জিজ্ঞেস করতো কেন, হায় কেন, তার মা তার বিয়ের বিষয়ে এত সব শর্ত আরোপ করেন? কখনো পণের অর্থ নিয়ে বিতর্ক হতো, কখনো আবার বিনোদনের জন্য কত অর্থ খরচ হবে তা নিয়ে। কোন সময়ে পাত্রের পিতামাতার কোনো খুঁত পাওয়া যেত; আবার কখনো পাত্রের পিতামহীর বংশের কোনো আবিলতা। কিন্তু কার সঙ্গে সিদ্দিকা বেগম তার অনুভূতি ভাগ করে নেবে? মা তো সর্বোপরি এক মা, তিনি তো বন্ধু নন। আর সে যমের মতো পিতাকে ভয় করতো। ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল আলগা এবং বৌদি তো যেন পরিবারের কেউ নন। গৃহ-পরিচারিকারা সবাই প্রাচীন কাল থেকে বংশপরম্পরায় কাজ করে আসছে। কার কাছে সে মনের কথা বলবে? কাকে বিশ্বাস করবে? সে কী করতে পারে?

আর এক বার, সিদ্দিকা বেগমকে তার বিড়ালকে নিয়ে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল, কান পেতে সে শোনবার চেষ্টা করছে মা এবং সুঘ্রা বেগমের মধ্যে কী কথা হচ্ছে।

সুঘ্রা বেগম এক দরিদ্র কিন্তু ভদ্র পরিবারের বিধবা। দারিদ্রের মুখে অসহায়, সে ধীরে ধীরে ঘটকীর কাজকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। যেহেতু সে এক শরিফ পরিবার থেকে এসেছে, এক সম্মানিত পরিবার থেকে অন্য পরিবারে যাবার স্বাধীনতা তার আছে। আর এই সুবিধা তার পেশায় সাহায্য করে।

সিদ্দিকা বেগমের ক্রোধ চরমে উঠলো যখন সে মায়ের কণ্ঠস্বর শুনল। আহমেদি বেগম অবজ্ঞার সুরে বলছেন, ‘হায়, বিবি, এ এক হাল-ফ্যাশান হয়েছে যে পাত্রপক্ষ পাত্রীকে দেখতে আসে! আমরা এই রীতি মানি না। আমার বিয়ের সময় কেউ আমাকে ‘দেখতে’ আসেনি। ঈশ্বর আমার সহায় হোন, আমার বড় দুই মেয়ের বেলাতেও তা হয়নি। আমার বৌমাকে বাড়িতে নিয়ে আসার আগে আমিও তাকে দেখতে যাইনি। দেশ থেকে কী শরিফ পরিবার উবে গেছে? যাও, পাত্রের মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো সে কি সব লজ্জা–সম্মানের কথা ভুলে গেছে? ইচ্ছা হলে সে তার মেয়েকে প্যারেড করাতে পারে, পাকা কথা বলতে পারে এবং দর—কষাকষিও। আমার মেয়ের মুখে বসন্তের দাগ থাকতে পারে এবং সে ট্যাঁরা হতে পারে, কিন্তু সে তবুও হামিদ হাসানের কন্যা এবং আমজাদ হুসেনের পৌত্রী। এই শহরে আমাদের পরিবার চোদ্দ প্রজন্ম ধরে বাস করছে। আমরা তেমন কোনো নিম্নস্তরের মানুষ এখনও হইনি যে লোকেরা আমাদের বিষয়ে প্রথমে জানতে আসবে। আমাদের মত পরিবারের পাত্রী তারা কোথায় পাবে? আমাদের বাড়ির চৌকাঠ মাড়াতে পারে তেমন ভাগ্যবান খুব কমই আছে। নিজেদের নাম নিয়ে আমাদের গর্ব হয়… হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি সব জানি। আমি পাত্রকে দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি…, সে একমাত্র পুত্র। সে ভাড়া হিসেবে চারশ’ টাকা পায়। এর উপরে বেতন পায় আড়াইশ’ টাকা। সে এক ভালো পরিবারের ছেলে, সে সম্মানিত…। আমি এই সবই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু, প্রস্তাব দেওয়ার আগে তারা আমাদের মেয়েকে দেখতে আসবে এই শর্তে আমি কী করে রাজি হতে পারি? ধরো ওদের মহিলারা এখানে এল এবং বলল আমাদের পাত্রীকে পছন্দ হয়নি… তখন কী হবে? তাদের তো কিছু হবে না; তারা তো পাত্রপক্ষ। কিন্তু, আমি তো কোথাও মুখ দেখাতে পারবো না। আমি আমার মেয়েকে সারাজীবন অবিবাহিত অবস্থায় রাখতে রাজী আছি কিন্তু আমি এই শর্ত মানতে পারবো না।’

‘আয়, হায়, বেগম, তুমি শুনতে চাইছ না…’
‘শোনার আর কী আছে?’ আহমদি বেগম ঘটকীকে থামিয়ে দিলেন, ‘আমি আফসার জাহানের মত নির্লজ্জ হতে পারবো না। সে আমার আত্মীয় কিন্তু তার ব্যবহার নিয়ে যত কম বলা যায় তাই ভালো। আমার বিশ্বাস তার মধ্যম কন্যাকে বিয়ে ঠিক হবার আগে চার বা পাঁচ বার পাত্রপক্ষকে দেখিয়েছে। না, বুয়া, আমি তা করতে পারবো না। আমি আমার মেয়েকে ছেলের মা বা বোনদের কাছে দেখাতে পারবো না।’

এক পরিচারিকার দেখা মিলল। সে জানালো পালকি চড়ে যাত্রীরা এসেছে এবং বেহারারা পরদা ঝোলাবে কিনা জানতে চাইছে। সে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে দুটো চাদর তুলে নিয়ে বাড়ির বাইরের মহলের দিকে এগিয়ে গেল। ইতিমধ্যে, আহমেদি বেগমও সোজা হয়ে বসলেন এবং সুঘ্রাকে বললেন, ‘রোদে কি আমার চুল পেকেছে?’

চারজন মহিলা উঠোন পেরিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে এলেনঃ দুইজন মাঝবয়সী, যাদের বোন বলে মনে হল, তাদের সঙ্গে আরও দুইজন কমবয়সী এগিয়ে এলেন। তাঁরা নিজেদের আলিঙ্গন করলেন এবং ফরাসের ওপর বসলেন। বসতে বসতে তাঁদের একজন বললেন, ‘শুক্রবারে মিলাদে আপনি কেন এলেন না?’

‘আমার নাতির শরীর খুব খারাপ ছিল আর তার দেখভাল করে যে মুঘলানজী সে আসছে না। এক মাসের বেশি হল সে গেছে, মনে হয় ভাইপোর বিয়েতে, সেই থেকে তার আর দেখা নেই। সিদ্দিকারও আবহাওয়া সহ্য হচ্ছে না, তার মাথা ব্যথা, তাই সে শুয়ে আছে…আই হাসমত, তুমি কেন দিন দিন রোগা হয়ে যাচ্ছো? সবে তো তোমার বিয়ে হল… এখন তো সুখী থাকার সময়।’

‘আচ্ছা, সুঘ্রা দিদি, তুমি কেন এখানে এসেছো? তুমি কি সিদ্দিকার জন্যে সম্বন্ধ নিয়ে এসেছো?’ হাসমতের বড়বোন মুসারত জিজ্ঞেস করলেন।

‘আই, বিবি, যে বাড়িতে জাম গাছ আছে সেই বাড়িতে তো ঢিল পড়বে,’ তৎপরতার সঙ্গে উত্তর দিল সুঘ্রা বেগম।
‘তাহলে, খালা জান, আপনি কী সিদ্ধান্ত নিলেন? আমরা সিদ্দিকির বিয়ে চাইছি,’ মুসারত বলল।
‘বিয়ে ঠাট্টার বিষয় নয়, বিশেষ করে এযুগে। একদিকে, প্রাচীন পরিবারেরা আর আগের মত নেই, সব জায়গায় কিছু না কিছু দোষ বা খুঁত আছে। না, বোন, আমি কোন বিশেষ কাউকে নিয়ে বলছি না। এই দিল্লি শহরে, এক নতুন রোগ সৃষ্টি হয়েছেঃ পাত্রীকে দেখানো। যাই হোক, আমাদেরও তো বিয়ে হয়েছিল। এখন মানুষ বলছে,–এমনকি সুঘ্রা বেগমও মানছে—তোমার মেয়েকে হবু আত্মীয়দের কাছে দেখাতে কোনো দোষ নেই। দোষ? আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করছি! আমরা কী আমাদের শতবর্ষব্যাপী সম্মানকে এখনও ধরে রেখেছি? এখনকার দিনে, পরিবার বা ঐতিহ্যের প্রতি কোন সম্মান নেই। মানুষ শুধু অর্থ চায় আর এই হাল-ফ্যাশানের চাহিদা। যাই হোক, আমার বোন হাসমতকে দেখাতে রাজী হয়েছিল; কিন্তু হাসমত কি এর জন্য বেশি সুখী?’

হাসমত-এর স্বামীর দোষ কী? সে যদি সুখী না হয়, সেটা তার দোষ। তার কীসের অভাব? তার স্বামী তাকে ভালোবাসে, তার যত্ন নেয় এবং ধনীও। সে আর কী চায়? সে আমাকে বলে ওর কথা আলোচনা না করতে। সে বলে, আমি যা করার তা করেছি। সে বলে, দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে বাস করা কী তা আমি জানি না। তার স্বামী বলে, সে তার প্রথম স্ত্রীর দিকে তাকাতেও পর্যন্ত চায় না। হাসমতই শুদু ভাবে সে খারাপ অবস্থায় আছে। বোন, তুমি এমন অদ্ভূত কথা শুনেছো?’ মুসরতের মা বললেন।

‘আম্মা, আমরা যেখানেই যাই তুমি কেন আমার কথা বল? কাকী সিদ্দিকার সম্বন্ধের কথা বলো।’

‘এখনও কিছু ঠিক হয়নি। যখনই কোন উপযুক্ত ছেলে আসে, দেখা আর দেখানোর প্রশ্ন ওঠে। এর চেয়ে খারাপ হল, ওরা বলে ওরা প্রথমে দেখবে আর তারপরই সম্বন্ধের কথা তুলবে।’

‘আই, বোন, হাসমতকে দেখানোর জন্যে তুমি আমার দিকে আঙুল তুলছো। কমসে কম, আমি তো একমাত্র বিচক্ষণতার সঙ্গে পাত্রপক্ষের মহিলাদের দেখিয়েছি। আর যারা পুরুষদের সামনে মেয়েদের দেখায়?’

‘আই, বোন, এমন মানুষ কারা?’ আতঙ্কের সঙ্গে আহমেদি বেগম জিজ্ঞাসা করলেন।

‘ওরা কারা? তুমি কি সফদার জাহানকে চেন না? সে এমনকি মেয়েকে হবু পাত্রের কাছে দেখিয়েছে। দরজার ফাঁক দিয়ে সে মেয়েকে দেখতে দিয়েছে।’

‘সত্যি? সত্যি?’ আর এই কথা বলে আহমদি বেগম বুকে মুষ্ট্যাঘাত করেন আর বলেন, ‘মাটি কি ফাঁক হয়ে যায়নি ওকে গ্রাস করার জন্য? আমি কখনও এমন করতে পারতাম না; আমি বরং দু’পয়সা দিয়ে আরসেনিক কিনে সিদ্দিকাকে চিরতরে ঘুম পারিয়ে দিতাম…। আই, ওরা কী মুখোমুখি বসতে দিয়েছে? নির্লজ্জতার কি কোন শেষ নেই! মেয়েকে ঘরে বসিয়ে রাখা যেন দরজার ফাঁক দিয়ে পাত্র যাতে তাকে দেখতে পারে। এটা ভালো কথা যে পাত্র বিয়েতে রাজি হয়েছে, কিন্তু যদি সে রাজী না হত, তাহলে কি ওরা মেয়েকে অন্যদের দিয়ে দেখাতো, দুই বার, তিন বার? একথা শুনতে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। তওবা, তওবা!’

‘আর হায়, বেগম, তুমি কোন পৃথিবীতে বাস করছো? আমাকে এমন একটি ঘর দেখাও যেখানে মেয়েকে দেখানো হচ্ছে না? হাজারটা লোক যা করছে, সফদার জাহান তাই করেছেন। তুমি জানোনা ঘুর পথে এই প্রথা আজকাল সবাই মানছে বিয়ে ঠিক করার জন্য। মাহমুদ খানের ছেলের সম্বন্ধের কথা কোন একটি পরিবারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ছেলে একবগগা যে সে মেয়ে না দেখে বিয়ে করবে না। পাত্রীপক্ষ ভাবলো বাড়িতে ছেলেকে ডেকে আনা ঠিক হবে না। তাই তারা একটি ইংরেজি-কেতার হোটেলে নিয়ে গিয়ে মেয়েকে দেখায়,’ সুঘ্রা এই কাহিনি শোনালো।

‘আর সেই নচ্ছার বেটি তার মুখ দেখালো?’ আহমেদি বেগম অসন্তোষের সঙ্গে প্রত্যুত্তর দিলেন। ‘হ্যাঁ, বোন, যাহোক, কেন দেখাবে না? যখন তার মা কোন লজ্জা অনুভব করে না মেয়েকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে দেখাতে, আর মেয়ে তো শিক্ষিত। যদি তাই হয়, বোন, তাহলে মেমরা আর কি অন্যায় করে? তারা তো ছেলেদের হাতে হাত ধরে ঘুরে বেড়ায়। ঈশ্বর যদি অসীম করুণা দেখান, তাহলে আমাদের এখানেও তা হবে।’

‘আই, তুমি কি শুনেছো কী নির্লজ্জভাবে ওরা মেজ মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছে?’
‘তাদের ব্যবহারে আমি আর বিস্মিত হইনা। বাড়ি থেকে অনেক দূরে ছেলেদের মত মেয়েদের স্কুলে পড়াতে…তাদের সাইকেল চড়তে দিতে। এমন মেয়ে কি আমাদের বাড়িতে টিকবে? এই কারণেই আমি আমার ভাইয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখিনা। কিন্তু, আমাকে বল বিয়ে কিভাবে সম্পন্ন হল।’

‘মেয়ের ইচ্ছা অনুযায়ী সব কিছু ঘটেছে। সে জানিয়ে দিয়েছে যে সে একমাত্র সেই ছেলেকে বিয়ে করবে। মা আর বাবাও সুখী। আমি শুনেছি যে ছেলে নাকি মেয়ের বাড়িতে আগে থেকেই আসতো। বিয়ে হয়েছে ঠিক হওয়ার পুরো এক বছর পরে।’

‘বোন, আমাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আমি বলব যে এই ভাবেই বিয়ে হওয়া উচিত,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসমত বললেন।

‘মেয়েকে প্যারেড করার অনুমতি দিয়ে? ওদের কি কোন লজ্জা নেই? আমার সিদ্দিকার সামনে এমন কথা কখনো বলবে না। অবাক হয়ো না, আমি চাই না ও বিবাহিত মহিলাদের সঙ্গে কথা বলুক…। আর, বোন, আমি যখন এমন কাহিনি শুনি, আমার হৃদয়ে বেদনা অনুভব করি। আমার বেচারা বাবার আত্মা কীভাবে তাঁর পৌত্রীর অপকর্মে কষ্ট পাবে! আমি জানি আমার ভায়ের বৌ শুরু থেকেই কি করত, ষোল বছর হয়ে গেল আমি তাদের মুখ দেখি না আর ঈশ্বর যেন যতদিন বেঁচে আছি ওদের মুখ না দেখান! ওদের অপকর্মের কথা শুনে আমি নিজেকে সামলাতে পারি না। আমার বাবা বেঁচে থাকলে, ওরা কি এমন ব্যবহার করার সাহস পেত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার ভাইঝিরা মুখ না ঢেকে ঘুরে বেড়ায়। ছেলেমেয়েদের আর দোষ কী? ওরা যেমন ভাবে বড় হয়েছে তেমনই তো করবে…। আমার সন্তানদের দেখ…। তারা তাদের বাবার সামনে টু শব্দ করার সাহস পাবে না। আর সিদ্দিকা…ওকে বসতে বললে বসেই থাকবে, ওকে যা খেতে দাও তাই খাবে।’

আহমেদি বেগম প্রত্যেকের জন্য পান বানালেন আর আলোচনা চালিয়ে গেলেন, ‘এখনকার দিনে, মানুষ মেয়ের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে থাকে যেন মেয়ে বাড়ির আবর্জনা। আমাদের কালে, পিতামাতারা পাত্রপক্ষকে বছরের পর বছর হা পিত্যেস করে অপেক্ষা করিয়েছে, মেয়েকে অবশেষে বিয়ে দেওয়ার আগে। আর, বোন, এখন মেয়েকে দেওয়ার সঙ্গে পণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথাও এক রীতিতে পরিণত হয়েছে।

‘হ্যাঁ, বোন, তুমি ঠিক। হাফিজ জালালুদ্দিনের বিধবা স্ত্রী আমাদের বাড়ির কাছে থাকতে এসেছে। সে কমসে কম কুড়িটি মেয়ে দেখেছে আর প্রত্যেকের মধ্যেই সে কোন না কোন দোষ খুঁজে পেয়েছে।’

‘কোন হাফিজ জালালুদ্দিন?’ সিদ্দিকার শঙ্কিত মা জিজ্ঞেস করলেন।

‘ওরা সৈয়দ। পরিবারটি ভালোও। ছেলেটিও মন্দ নয়। কিন্তু মা সবার থেকে আলাদা। আর আমাদের সুঘ্রা দিদি তাদের ছয় থেকে সাতটি মেয়ে দেখিয়ে ফেলেছে।’

‘উই, বোন সুঘ্রা! আর তুমি ওদের সম্বন্ধ আমার বাড়িতে এনেছো? তোমার সাহস আছে!’ ক্রোধ আর অবিশ্বাস মেশানো এক ভঙ্গিতে সিদ্দিকা বেগমের মা ভর্তসনা করলেন।

‘আই হায়, বেগম, তুমি সব কথা বিশ্বাস করো…।’

আর সিদ্দিকা বেগম দরজার কান লাগিয়ে প্রতিটি কথা শুনছিল। সে মায়ের স্বরের ভঙ্গি শুনলো আর সব বুঝতে পারলো। সে উঠে পড়ল আর বিছানায় নিজের শরীর ছুঁড়ে ফেলে করুণভাবে কাঁদতে থাকলো।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুন ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]