মনের কথা বলা সহজ নয়।বাইরে থেকে আমরা মানুষের যতটা দেখি অথবা শুনি, সেসবের বেশিরভাগটাই তো মেপেজুকে, আঁতের কথা আর কতটুকু? মানুষ যখন চাপের মধ্যে , অস্থিরতার মধ্যে থাকে, অসহায় বোধ করে তখন তার আচরণে ভেতরের কিছু কিছু প্রকাশ পায় বটে, তবে সে আর কতক্ষণ!
ডাক্তারীর প্রাথমিক পাঠক্রম পেরিয়ে যখন বিশেষ কিছু শিখব বলে এন্তাম করছি তখনই মনের মেরামতির বিষয়ে আগ্রহ জাগল । সাথে সাথেই মাস্টারমশাইরা হাঁ হাঁ করে উঠলেন, ওরে বাবা, শেষে নিজেই পাগল হয়ে যাবি যে!
সাধারণ চিকিৎসক মহলের সাইকিয়াট্রি বিষয়ে ধারণা তখনও যেমন ছিল আজও তা মোটামুটি একই রকম। মেডিক্যাল মডেলে মানুষের মন বরাবরই অবহেলিত, নিতান্তই এটা পাগলের ডাক্তারী! আমি যেচে এই রাস্তার খোঁজখবর নিতেই তাঁদের ভ্রুকুঞ্চন হ’ল, কেন, তুই তো অনায়াসেই মেডিসিন কিম্বা সার্জারি পেয়ে যাবি!

সেদিন তাঁদের কথা আমি শুনেও শুনিনি– তবে আরও একটু এগোতেই বুঝলাম, কবির সতর্কবাণী মিছে নয়,নইলে আর লিখবেন কেন —
মন নিয়ে কেউ বাঁচে নাকো, মন ব’লে যা পায় রে/ কোনো জন্মে মন সেটা নয়/ জানে না কেউ হায় রে! ওটা কেবল কথার কথা, মন কি কেহ চিনিস? আছে কারো আপন হাতে/ মন ব’লে এক জিনিস?
চলেন তিনি গোপন চালে/ স্বাধীন তাঁহার ইচ্ছে–/ কেই বা তাঁরে দিচ্ছে এবং/কেই বা তাঁরে নিচ্ছে!
আমাদের আড্ডার সুরসিক পীযূষদা রসিকতা করে বলতেন, আমি বড় বলে করলা, তুমি ছোট তাই উচ্ছে!

পাত্তা না দিলেও কবির বাদবাকি কথাটাও জরুরি ছিল বৈকি –কে যাবে ভাই, মনের মধ্যে/ মনের কথা ধরতে? কীটের খোঁজে কে দেবে হাত কেউটে সাপের গর্তে?
অতএব ঝাঁপিয়ে পড়লাম অ-দৃষ্টের সাগরে, যা ধরা যায়না, দেখা যায়না সেই আনচার্টেড সমুদ্রে ভেলা ভাসিয়ে। কম্পাস বলতে কেবল ক’টা মহাজনবাক্য ! সাইকো- অ্যানালিসিস পর্বের প্রায় শেষলগ্ন সেটা, মনের রোগের শতেক বায়োলজিকাল সাবুদ খোঁজা শুরু হয়েছে মাত্র ! সেই থেকে আজ পর্যন্ত যা শিখেছি এবং পুরোনো ধারণা মুছে ফেলে নতুন করে যা যা ভাবতে বাধ্য হয়েছি, সেসব শিখতে বাধ্য করেছেন সেই সব হতভাগার দল, সমাজ যাঁদের দেগে দিয়েছে “অস্বাভাবিক” বলে, আশ্চর্য হলেও এঁরাই আমার প্রকৃত শিক্ষক। এঁদের কথাই বলি তবে!
শেষ তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর জুড়ে দেখেই চলেছি। রোজ-ই কেউ না কেউ আসেন। আজ যেমন প্রলয় এলো। অনেক বছর ধরেই সে আসে। গেল বছর অবদি মায়ের সঙ্গে আসত। মায়ের বয়স হয়েছে, অসুস্থ তিনিও, তাই প্রলয় এখন একাই আসে।
একাধিক যানবাহন বদল করে আসতে হয় ওকে। পিঠে একটা ধুলোভরা ব্যাগ। তার থেকে বেরিয়ে আসে সবুজরঙা একটা কাভার ফাইল, দড়িবাঁধা– এটা ওর রুটিন কাজ।
আজ দেখলাম ঘামছে বেশ। একমুখ এলোমেলো দাড়ি। পোশাক যথেষ্ট মলিন। অবিন্যস্ত সার্টের নিচের অংশটা প্যান্টের মধ্যে আধগোঁজা। আগের থেকেও রোগা হয়েছে প্রলয়। এতটাই যে ওর জামাকাপড় ঢলঢল করছে। ফাইলটা এহাত ওহাত করতে করতে সামনে রাখা চেয়ারে অবশেষে বসে পড়ে সে। হাত বাড়িয়ে একটা ভাঁজকরা কাগজের টুকরো বাড়িয়ে দেয় আমায়, এটা ওর মায়ের লেখা চিঠি। আমি যতক্ষণ সেটা পড়ি মোটা ফ্রেমের চশমার মধ্যে দিয়ে একজোড়া উজ্জ্বল চোখ আমায় দেখে। মুখে বলে, ডাক্তারবাবু, ভাল আছেন তো?
ওর মায়ের চিঠিতে লেখা আছে, প্রলয় আজকাল বাড়ি থেকেই বেরোতে চায় না। বাইরের কেউ এলে ভেতরের ঘরে লুকিয়ে পড়ে। ক’দিন আগে ইলেকট্রিক মিটারের রিডিং নিতে এসেছিলেন যিনি তাঁকে বাড়িতেই ঢুকতে দেয়নি, রাগারাগি করেছে সাংঘাতিক। এরকমটা আগে কক্ষনও করেনি ও।

আমি মুখ তুলে তাকাতেই প্রলয় চোখ নামিয়ে নেয়। জিগ্যেস করি,
মিটার দেখতে দিলে না কেন? এরপর তো ঝঞ্ঝাট হবে!

প্রলয় কিছু সময় একেবারে চুপ ,তার পর ধীরে সুস্থে বলে,
ঢুকতে দিলে আর আজ আসতে হ’ত না স্যার! এরা সব থানার বড়বাবুর লোক! মিটার দেখার নাম করে চিপ-টা বদলাতে আসে!

চিপ? কি ব্যাপার বলো তো ?

প্রলয়ের চোখদুটো আরেকটু চঞ্চল হয়ে ওঠে,একটু ইতস্তত করে টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলে,
আপনাকে বলেছিলাম তো! অসীম সরখেল, লোকাল থানার ওসি — উনিই এইসব মতলব করছেন ডাক্তারবাবু! থানা থেকে আমায় কন্ট্রোল করবেন বলে মিটার বক্সে ছোট্ট একটা চিপ লাগিয়ে দিয়েছেন।

অদ্ভুত ব্যাপার তো? কবে থেকে এসব চলছে? এগজ্যাক্টলি কি হয় বলো তো তোমার?
আমায় শুনতেই হয়।

যাই-ই করতে যাচ্ছি, মনের মধ্যে কেউ বারণ করে,না শুনলে হবে না — হাত পা মাথা, কিছুর ওপর আমার কন্ট্রোল নেই যেন!
আমি যা করছি অনবরত সেসবের ডেসক্রিপশন দিয়ে যাচ্ছে কেউ! প্রথম প্রথম রাগ হতো, এখন বুঝে গেছি আর কিছু হবে না, সবই মেনে নিতে হবে আমায়… মা বাবাকে বললে বিশ্বাস করেনা, কতবার বলেছি ঐ সরখেল ওসির ওপরের স্যার কে একটা দরখাস্ত দিতে, শোনেনি…আমাকে হ্যালুসিনেট করায় ডাক্তারবাবু প্ল্যান করে!

খুবই হতাশ লাগে প্রলয়কে । সহানুভূতি প্রকাশ করি —
ব্যাপারটা মোটেও ভালো নয়, তবে একটা বিষয়ে আমার সামান্য খটকা লাগছে… তোমার ওপর থানার বড়বাবুর এতো রাগ কেন? তুমি কি কোনো অন্যায় করেছ কখনও? তোমায় দেখে তো আমার তা মনে হচ্ছে না!

কয়েক মিনিট আর কথা নেই। আকাশ পাতাল কী সব ভেবে চলে প্রলয়।

কি হলো? বলো কিছু, প্রলয়!

না, তেমন কিছু না! কারণটা আমি ঠিক বুঝতেও পারিনা! কিন্তু আমি একদম সিওর স্যার, উনিই সব করান!

এরপর আর কিছুই বলার থাকে না, তবু বলি —
তোমার সঙ্গে ওনার দেখাই বা হলো কি করে?

আমতা আমতা করে প্রলয়।
দেখা মানে, দেখা ঠিক হয়নি — তবে উনি আমার খোঁজ খবর নিয়েছিলেন এখানে আসার পরেই!

কেন বলো তো?

উনি আসলে নিজের ছেলেকে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য টিচার খুঁজছিলেন..আমি টিউশনি করতাম, কেউ হয়ত বলেছে…তবে আমি রাজি হইনি..পুলিশে আমার ভয় ছিল..ঐ যে নারাজ হলাম, তার পর থেকেই তো….

তুমি ওনাকে দ্যাখোইনি ? তার মানে উনিও তোমায় চেনেন না! মিটে গেল!

পুলিশে ছুঁলে কি হয় আপনি তো জানেন স্যার! ঐ সময় বাড়িতে নতুন মিটার বসছে, ব্যস্, হয়ে গেল!
আমাদের বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট সাইনবোর্ডে আমার নাম লেখা ছিল, কদিন পর দেখি বোর্ডটা উল্টে পড়েছে–এসব কি আর এমনি এমনি হয় ডাক্তারবাবু?

আর কিছুই বলি না। এবার আমায় প্রলয়ের রক্তের রিপোর্ট দেখতে হবে, প্রেসার চেক করতে হবে। ও যে ওষুধটা খায় তাতে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করাতে হয়।
প্রেসক্রিপসন লিখতে লিখতেই জিগ্যেস করি—
আচ্ছা প্রলয়,ওষুধটা খাও তো এখনও?

প্রলয়ের চোখে সামান্য হাসির আভাস–খাই ডাক্তারবাবু..মনের মধ্যে সবসময় কথা চলছে ‘যাসনা ডাক্তারের কাছে’, ‘ওষুধ খাসনা একদম’! এটা আমি শুনিনা, আপনি এত বড় মানুষ, মা বলেছে, আপনার দেওয়া ওষুধ খেলে, তবেই নাকি ওসি সাহেব ওই চিপ-টা তুলে নেবেন। ডাক্তারবাবু, আপনি সরখেল দারোগাকে একটু বলে দেবেন যাতে আমাকে আর ডিসটার্ব না করেন?

চুপ করে থাকি। প্রলয়কে দেখছি অন্তত দশ বছর, এরকমই বলে ও। যা হয়না, যা নেই, তা নিয়েই ও চলেছে। ওর নিজস্ব জগতে থানা পুলিশ দোকান বাজার,ভয় ভাবনা সবই আছে। এম এ পাশ ছেলে, সেভাবে কিছুই করেনা, গুরুত্বহীন, প্রায় অস্তিত্ব বিহীন একটা মানুষ যেন। চিকিৎসকের ভাষায় ওর সিজোফ্রেনিয়া হয়েছে। শুরুতে বাড়ির লোকে বোঝেনি, রোগটা ওর জীবনে স্থায়ী হয়ে গেঁড়ে বসেছে। ঠিকমত চিকিৎসা শুরু হলে এ রোগেও বহু মানুষই দিব্যি থাকেন আজকাল। তবে হ্যাঁ, অন্তত এক তৃতীয়াংশ মানুষের বেলায় এ নিয়ম খাটেনা..চিকিৎসাতে ততটা সাড়া দেয়না তাদের রোগ লক্ষণ গুলো। প্রলয়ের তেমনটাই হয়েছে। তবে এই যে আজ একা একা অত দূর থেকে সে এলো, আবার ফিরবেও, সেটা এখন পারে। ওর কল্পনার জগতটাকে দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করে ও। মনের ডাক্তারীতে এ হ’ল প্যারানোইয়া, মনের সমান্তরাল পথে তার বিকাশ। এও এক সারভাইভাল বটে! সে কথায় আজ আর যাব না। ক’দিন আগেই নিরীহ ট্যুরিস্টদের ওপর যে ঘটনা ঘটেছে তা নিয়েই দেশ উত্তাল এখন। ধর্মের দ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে, কেউ আর কাউকে বিশ্বাস করছে না, সর্বত্র বিষ।
প্রলয় নিতান্ত অসহায়,সে কারও ক্ষতি করেনি, করতে পারেও না। অবশ্যই ওর ভ্রম, সন্দেহ, সংশয় সবই আছে।
ওর জন্য ওষুধ রইল, কিন্তু আমাদের জন্য?
আছে নাকি তেমন কোনও ওষুধ?

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মে ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Ivy Chattopadhyay
Ivy Chattopadhyay
1 year ago

অসাধারণ লেখা l এত সহজ ভাষায় কঠিন কথা লেখা l খুব ভালো লাগলো l