বিকেলের নরম রোদ। এই সময়টা নিবেদিতার প্রিয় সময়। হাঁটতে বেরিয়েছেন। সঙ্গে জগদীশচন্দ্র। বেশ ঠান্ডা। নিবেদিতা লং কোট পরেছেন তাঁর চিরপরিচিত গাউনের উপর। সিল্কের স্কার্ফ জোর করে বেঁধে দিয়েছেন অবলা। মাথায় হ্যাট। পায়ে চামড়ার জুতো। জগদীশচন্দ্র সোয়েটারের উপর পরেছেন লং কোট। মাথায় কান-ঢাকা টুপি। গলায় বড় মাফলার জড়ানো। আস্তে আস্তে হাঁটছেন দু’জনে। তাড়াহুড়ো নেই। কোথাও যাবার নেই। কোথাও কথা দেওয়া নেই। দু’জনে কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে অলস হাঁটছেন। পাইনের লম্বা লম্বা ছায়া পড়েছে রাস্তায়। কখনও-সখনও সোনালি রোদের ঝলক পড়ছে ওঁদের শরীরে। একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন। হেসে উঠছেন। হেসে উঠছে ঝকঝকে নীল আকাশ। হেসে উঠছে হালকা পাতাঝরানো বাতাস। হেসে উঠছে রোদ। ফেব্রুয়ারি মাসের আজ ২২ তারিখ। সাল ১৯০১। দু’জনেই নিজেদের ক্লান্তি দূর করতে, কিছুটা হালকা হতেই বেরিয়েছেন। গতকাল গভীর রাত অবধি জেগে কাজ করেছেন দু’জনে। জগদীশচন্দ্রের নতুন নতুন ভাবনার সুসজ্জিত ভাষা-রূপ দিচ্ছে নিবেদিতার কলম।
‘তাহলে Response শব্দটির ব্যবহার ঠিক করলে শেষ পর্যন্ত?’ জগদীশচন্দ্র নিবেদিতার দিকে না তাকিয়েই বললেন।
‘হ্যাঁ! কাল রাতেই তো ঠিক হল পেপারটির টাইটেল হবে The Response of Inorganic Matter to Mechanical and Electrical Stimulus. তুমি কি অন্য রকম কিছু ভাবছ বেয়ার্ন?’ নিবেদিতা আড়চোখে জগদীশচন্দ্রের চোখ খুঁজলেন।
‘সত্যি বলতে কী যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় জড় পদার্থের সাড়ার রেখাচিত্রের সঙ্গে উদ্ভিদ ও প্রাণীর রেখাচিত্রের মৌলিক সাদৃশ্য প্রমাণ করাই আমার উদ্দেশ্য! আমার বক্তৃতার মূল বিষয় তো তা-ই, মার্গারেট!’ জগদীশচন্দ্র উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।
‘অবশ্যই, বেয়ার্ন!’
‘আমি সাক্ষ্য প্রমাণ দিয়ে দেখাতে চাই, যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় জড় ও জীব যে সাড়া দেয়, তা এক রকম। উত্তেজনায় সাড়া দান যে-কোন‌ও প্রাণের ধর্ম। এটাই তো বিজ্ঞানী ওয়ালারেরা প্রচার করছেন। আর যদি যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় জড় ও জীবের সাড়া একই রকম প্রমাণ করতে পারি, তবে তো ওঁরা মেনে নিতে বাধ্য যে, প্রাণ সর্বত্র বিরাজমান! এই সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠিত করতে আমাকে যথেষ্ট প্রমাণ সহ গবেষণাপত্র পেশ করতে হবে। সুন্দর করে যুক্তি সহ।’
‘অবশ্যই তা সম্ভব, বেয়ার্ন! আর তার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছ তুমি।’
‘যন্ত্রের মাধ্যমে সূক্ষ্ম সাড়াগুলির রেখাচিত্র দেখাতে হবে! সরু সরু সুচের ডগায় রেখায় রেখায় চিত্রিত হবে ওই রেসপন্সের গ্রাফ। দেখেছ তো তুমি টিনের পাত ও উদ্ভিদের উত্তেজনায় সাড়া দেবার রেখাচিত্র এক।”
জগদীশচন্দ্র বলতে বলতে হঠাৎ হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।—‘দাঁড়াও দাঁড়াও মার্গারেট, আমি ওই যন্ত্রপাতির দোকানে একটু যাই। তুমিও আসতে পারো। আমার ভাল লাগবে তুমি এলে।’
বলেই জগদীশচন্দ্র হন হন করে এগিয়ে গেলেন। নিবেদিতা পায়ে পায়ে এগোলেন ধীরে।
পুরনো যন্ত্রপাতির দোকানে জগদীশচন্দ্র একটি ছোট্ট যন্ত্র নিয়ে আত্মভোলা হলেন। নিবেদিতা বুঝলেন জগদীশচন্দ্রের মাথায় ঘুরছে কোনও যন্ত্র তৈরির চিন্তা। তিনি আস্তে আস্তে পাশে এসে দাঁড়ালেন। জগদীশচন্দ্র হাতে একটা ছোট্ট যন্ত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন।
‘আমি একটি ছোট্ট ডিটেক্টর তৈরি করতে চাই এটা দিয়ে, যেটাকে তুমি ছোট্ট ব্রেইন বলতে পারো!’
‘মানে তুমি বলতে চাইছ, ওই উত্তেজনায় যে রেসপন্স করবে তা সংরক্ষণ করবে! মানে দেখাতে পারবে! এমন যন্ত্র!’
নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রের চোখে দেখতে পেলেন দূরতম এক জ্যোতিষ্কের ছটা!
‘ঠিকই বলেছ মার্গারেট! at a singling winding, take automatically a series of uninterrupted observations, about 5000 or more; the whole apparatus could be carried in one’s pocket. Do I sleep? Do I dream?’ চলো চলো এক্ষুনি আমাকে একজন দক্ষ মেকানিকের কাছে যেতে হবে।’
জগদীশচন্দ্র দ্রুত ওই পুরনো ছোট্ট ভাঙা যন্ত্রটির দাম দিয়ে বেরিয়ে এসে পাগলের মতো ছুটলেন। নিবেদিতা পিছনে পিছনে। আবার এক নতুন যন্ত্র আবিষ্কারের সন্ধানে জগদীশচন্দ্র। পাশে সবসময়ের জন্য নিবেদিতা।
জগদীশচন্দ্র যেন এখন আকাশচারী এক অতিমানব। একের পর এক যন্ত্র তৈরি করছেন। ভাবনায় নতুন নতুন পথের সন্ধান পাচ্ছেন। নতুন এক যন্ত্র তৈরি করেছেন Strain Cell নামে। এই যন্ত্রটির সাহায্যে যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় জড়, উদ্ভিদ ও প্রাণীর সাড়া বা রেসপন্সের রেখাচিত্র আঁকা যাচ্ছে। রেখাচিত্রগুলি বা সাড়া-লিপিগুলি জড়, উদ্ভিদ ও প্রাণীর ক্ষেত্রে একই। রাত কেটে যায়। দিন কেটে যায়। ঘরময় বিভিন্ন মাপের তার ও যন্ত্রাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আর অজস্র রেখাচিত্র। নিবেদিতার টেবিলের উপর প্রচুর কাগজের স্তূপ। গবেষণাপত্রের খসড়া। সাজিয়ে রাখছেন, সংশোধন করছেন নিবেদিতা। সাহিত্য রসাস্বাদনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করছেন কঠিন বিজ্ঞানের যুক্তিবাদ। বহু-র মধ্যে একত্বের সন্ধান পেয়েছেন জগদীশচন্দ্র। সমস্ত কিছুর মধ্যেই চৈতন্য।


এই চূড়ান্ত ব্যস্ততার মাঝেও একটু অবসর পেলেই চিঠি লিখছেন নিবেদিতা। ছড়িয়ে দিচ্ছেন মনের কথা অক্ষরে অক্ষরে ভবিষ্যতের গর্ভে। ১৫ মার্চ ১৯০১ তারিখে ২১এ, হাইস্ট্রিট উইম্বলডনের বাড়িতে বসে তাঁর প্রিয় য়ুম অর্থাৎ জোসেফাইন ম্যাকলয়েডকে জানালেন জগদীশচন্দ্রের আবিষ্কারের অগ্রগতির কথা।
“Dr. Bose is like one who walks on air. Discovery succeeds discovery, one instrument follows another, and the brilliant intention becomes the measured fact. It is breathless awe with which one watches.How can Mother pour out Her spirit so abundantly?”
মা যেন শক্তির প্রাচুর্যে পূর্ণ করে দিয়েছেন জগদীশচন্দ্রকে। নিবেদিতা বিস্মিত। তিনি তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে জগদীশচন্দ্রের আবিষ্কারের নেপথ্যচারী হয়ে উঠছেন। জগদীশচন্দ্র সারা বুল এবং নিবেদিতার তীক্ষ্ণ নজরদারিতে নিজের কাজ আপন খেয়ালে করে চলেছেন। জগদীশচন্দ্রের রোজকার লেখা ও ভাবনার সম্পূর্ণ খেয়াল রাখতে রাখতে এবং তাকে ভাষার সুষমায় সাজিয়ে তুলতে তুলতে এক আশ্চর্য নির্ভরতার অবস্থানে এসে পড়েন নিবেদিতা। জগদীশচন্দ্র নিজের ভার যেন সঁপে দিয়েছেন নিবেদিতার উপর। স্নেহ ও সহানুভূতি নিয়ে জগদীশচন্দ্রের মানসিক দৃঢ়তা তৈরির সহায়তামূলক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন নিবেদিতা।
বসন্ত এসে পড়েছে আকাশে, বাতাসে, গাছে গাছে, ফুলে ফুলে। এপ্রিল মাসের ঝলমলে রোদে ঝলমল করে ওঠেন জগদীশচন্দ্র, নিবেদিতা, অবলা ও সারা বুল। পাইন বনের ধারে আজ চড়ুইভাতি। জগদীশচন্দ্রের সমস্ত কাজ আপাতত শেষ। রয়্যাল ইন্সটিটিউটে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি শেষ হয়েছে কয়েকদিন আগেই। এখন কিছুদিন বিশ্রাম। বক্তৃতার শিরোনাম The Response of Inorganic Matter to Mechanical and Electrical Stimulus । শিরোনামে শুধু মাত্র জড় পদার্থের উল্লেখ থাকলেও তাঁর আবিষ্কৃত ‘স্ট্রেইন সেল’ যন্ত্রের সাহায্যে যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় জড়, উদ্ভিদ ও প্রাণীর রেখাচিত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব যে উত্তেজনায় সাড়া দেওয়ায় সাদৃশ্য বর্তমান। আলাদা রকম রেখাচিত্র দেখা যায় না।
ইংল্যান্ডে বসন্তকালে দিনমানের স্থায়িত্ব অনেকটাই বেড়ে যায়। দিনের আলো থেকে যায় কমবেশি রাত দশটা অবধি। যদিও এখন বিকাল। জগদীশচন্দ্র ও নিবেদিতা দ্রুত চলেছেন স্যার মাইকেল ফস্টারের বাড়ি। মাইকেল ফস্টার ছিলেন কেমব্রিজের বিখ্যাত শারীরবিজ্ঞানী এবং তিনি এই সময়ে রয়্যাল সোসাইটির সেক্রেটারির পদে আসীন। জগদীশচন্দ্র বেশ কিছুদিন ধরেই চাইছিলেন স্যার ফস্টারের সঙ্গে একবার কথা বলতে। আজ সময় হয়েছে। দ্রুত চলেছেন। নিবেদিতার হাতে একটি ফুলের স্তবক। রোদে ঝলমল করছে ফুলগুলো। নিবেদিতাও ঝলমল করছেন উচ্ছ্বাসে, যদিও তার প্রকাশ খুব শান্ত ও নিরুচ্চার।
ধূমায়িত কফির কাপ ধীরে ধীরে সমস্ত ধোঁয়া নির্গত করে শীতলতায় ঢলে পড়েছে। জগদীশচন্দ্র টেবিলের উপর একটি একটি করে কাগজগুলো রাখছেন। কাগজে একের পর এক একই রকম রেখাচিত্র আঁকা। সাদা কাগজের উপর কালো ভুষো কালির আঁচড়ে আঁচড়ে প্রাণের পরশ। নিবেদিতা তাকালেন মাইকেল ফস্টারের চোখের দিকে। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। চোখ দু’টি আরও কুঁচকে গেছে। দুই চোখের দুই প্রান্তে অজস্র কাটাকুটি। এখন তিনি মগ্ন। রেখাচিত্রগুলির দিকে তাকিয়ে আছেন স্থির।

‘আমি তো কোনও অভিনবত্ব দেখতে পেলাম না। অন্তত যেটুকু দেখেছি। প্রাণীর পেশির উত্তেজনায় দেওয়া সাড়ার রেখাচিত্র মাত্র।’ — মাইকেল ফস্টার বললেন।
জগদীশচন্দ্র চমকে উঠলেন, ‘স্যার! কী বলছেন! আপনার কথায় আমিই অবাক হয়ে যাচ্ছি! সত্যিই স্যার আপনার মনে হচ্ছে এই রেখাচিত্রগুলি প্রাণীর?’
‘হ্যাঁ। তাই তো মনে হচ্ছে!’ স্যার ফস্টার জগদীশচন্দ্রের দিকে তাকালেন।
‘আপনি স্যার আমার পরীক্ষাকে সত্য প্রমাণ করলেন। আপনাকে জানাই যে এই রেখাচিত্রগুলি এক টুকরো টিনের যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় সাড়া দেওয়ার সাড়ালিপি!’ উত্তেজনায় জগদীশচন্দ্রের গলার স্বর অন্যরকম শোনাচ্ছে। নিবেদিতা তাকিয়ে ছিলেন স্যার ফস্টারের দিকে। এবারে তাকালেন জগদীশচন্দ্রের দিকে।
‘কী বলছ, ড. বোস!’ বিস্মিত স্যার ফস্টার।
‘হ্যাঁ স্যার! প্রাণীর সাড়ালিপি, জড়ের সাড়ালিপি একইরকম সাদৃশ্যপূর্ণ। আমি প্রমাণ পেয়েছি। আমি প্রমাণ সহ দেখাতে পারব!’
বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক মাইকেল ফস্টার আনন্দের আতিশয্যে জড়িয়ে ধরলেন জগদীশচন্দ্রকে, ‘ইউ আর দ্য জিনিয়াস! মার্ভেলাস ওয়ার্ক ইউ হ্যাভ ডান! বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত খুলে দিলে ড. বোস! থ্যাঙ্কিউ থ্যাঙ্কিউ! তুমি এই আবিষ্কারের ফলাফল সম্পর্কিত অংশটি রয়্যাল সোসাইটির কাছে জমা দাও। আমি তো থাকছিই!’
‘রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে আমি বক্তৃতা দেব ১০ মে। তার আগে বলছেন?’ জগদীশচন্দ্র নিবেদিতার দিকে তাকালেন। নিবেদিতা তাকালেন জগদীশচন্দ্রের চোখের দিকে।
জগদীশচন্দ্র বললেন, ‘আচ্ছা আমি ৭ মে একটি সিনোপসিস জমা দেব, যেখানে ফলাফলটি দেখানো যাবে!’
নিবেদিতা সম্মতি দেন ঘাড় নেড়ে। স্যার ফস্টার রাজি হলেন।

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিলেন নিবেদিতা বেলুড় মঠের দিকে। অস্থায়ী ঘাটটি দেখা যাচ্ছে। ফাঁকাই থাকে ঘাট। আজ মনে হচ্ছে কয়েকটি নৌকা বাঁধা আছে! তাহলে কি অনেকেই এসে পড়েছেন? স্বামীজির শরীর খারাপ ছিল বেশ কিছুদিন। এই তো গত পরশু মানে ৩ জুলাই স্বামীজি নিজের হাতে পাউরুটি তৈরি করে পাঠিয়েছিলেন বাগবাজারে তাঁর কাছে। কপালে ঠেকিয়ে সেই পাউরুটির প্রতিটি টুকরো নিবেদিতা পরম প্রসাদ মনে করে ‘সেবা’ করেছেন। খুশিতে ভরে উঠেছিল তাঁর মন। আকাশের সব মেঘ যেন পুষ্পবৃষ্টি হয়ে নেমে এসেছিল বাগবাজারের বাড়িতে। উঠোনে ঝরঝর ভিজেছিলেন নিবেদিতা। তার আগের দিনের ঘটনায় যে মেঘভার জমেছিল মনের গভীরে, তা গলে গলে জল হয়ে নেমে আসছিল এই ভেবে যে, স্বামীজি নিজের হাতে তৈরি করেছেন পাউরুটি আর তা পাঠিয়ে দিয়েছেন প্রিয় শিষ্যার কাছে। তার মানে তো তাঁর শরীর ভাল আছে। তবে তার আগের দিন, মানে ২ জুলাই, অমন আচরণ করলেন কেন? মঠে এসেছিলেন নিবেদিতা সেদিন। স্বামীজি ডেকেছেন। দুপুরে ভাত, আলুসেদ্ধ, কাঁঠাল-বীজ সেদ্ধ এবং দুধ খেতে দেওয়া হয়েছে নিবেদিতাকে। স্বামীজি সামনে বসে খাওয়াচ্ছেন তাঁর প্রিয় শিষ্যাকে। কথা বলছেন নানা প্রসঙ্গে। নিবেদিতার খাওয়া শেষ হল। ঘটিতে জল নিয়ে উঠে গেলেন বারান্দার ধারে। হাত ধোবেন। স্বামীজি এগিয়ে এসে জলের ঘটিটি নিবেদিতার হাত থেকে নিলেন। তারপর ঝুঁকে জল ঢাললেন নিবেদিতার হাতে। আঁজলা করে জল নিয়ে নিবেদিতা মুখ ধুলেন। কিন্তু বিস্মিত তিনি। স্বামীজির এমন আচরণ তো দেখেননি আগে! তারপর স্বামীজি নিবেদিতাকে অবাক করে দিয়ে গামছা এনে হাত মুছিয়ে দিলেন। স্বাভাবিকভাবেই নিবেদিতা আপত্তি তুলেছিলেন, ‘স্বামীজি, এসব তো আপনার জন্য আমার করা উচিত, আমার জন্য আপনার করা উচিত নয়!’

স্বামীজির গম্ভীর উত্তর, ‘যীশু তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন।’
নিবেদিতা চমকে উঠলেন। ‘সে তো শেষ সময়ে!’—কথাটা মনে এলেও তিনি উচ্চারণ করলেন না। তাকালেন স্বামীজির দিকে। শান্ত উদ্ভাসিত তাঁর চোখ। চোখের নীচে শ্রান্তির কালিমা। বিষাদ-গম্ভীর। ধীরে ধীরে নিবেদিতার ভেজা হাত দু’টি মুছিয়ে দিলেন তিনি যত্নে। সকালে এসেছেন নিবেদিতা। ঘণ্টা তিনেক হবে। এবার চলে যাবেন। পাছে তাঁর মানসিক উত্তেজনা তৈরি হয়, তাই শরীর নিয়ে কোনও কথা নিবেদিতা উত্থাপন করেননি। এই তো গত বুধবারের কথা। মাঝে বৃহস্পতিবার। শুক্রবার ৪ জুলাই স্বামীজি সকালে সংবাদ পাঠালেন নিবেদিতার কাছে যে, তিনি ভাল আছেন। আর রাতেই…?
আজ ৫ জুলাই সকালে নিবেদিতা পেলেন সেই নিদারুণ সংবাদ। একটি ছোট্ট চিঠি। সত্তা-লোপকারী কয়েকটি বাক্য। মুহূর্তের জন্য অন্ধকার ঝাপসা করে দিয়েছিল নিজস্ব জগৎ। সঙ্গে সঙ্গে শোকঘোরে রওনা হয়েছেন মঠের দিকে বাগবাজার থেকে নৌকায়।

সন্ধ্যা ন’টা। আজ ১০ মে শুক্রবার ১৯০১। এই সময়ে ইংল্যান্ডে সূর্য অস্তমিত হতে হতে রাত দশটা বাজিয়ে দেয়। মানে সন্ধ্যা দশটায় সূর্য অস্ত যায়। রয়্যাল ইন্সটিটিউটে সান্ধ্য বক্তৃতার সভা। দর্শকাসন আর ফাঁকা নেই একটিও। নিবেদিতা, সারা বুল এবং জোসেফাইন ম্যাকলয়েড এসে বসেছেন সামনের সারিতেই। এসেছেন পিটার ক্রপটকিন। প্রায় সমস্ত গণ্যমান্য বৈজ্ঞানিকেরা এসেছেন। কিছুক্ষণ বাদেই সভাপতি এবং রয়্যাল সোসাইটির কর্মকর্তারা প্রবেশ করলেন, সঙ্গে জগদীশচন্দ্র এবং অবলা বসু। অবলা বসু পরেছেন সুন্দর সোনালি সুতোয় কাজ করা মসলিন জামদানি শাড়ি। ভারতীয় গহনায় সুন্দর লাগছে তাঁকে। কপালে সিঁদুরের টিপ। সিঁথিতে সিঁদুর উজ্জ্বল। মাথায় ঘোমটা দিয়ে ধীর পায়ে প্রবেশ করলেন সভাগৃহে। সবার পেছনে খুব সহজ শান্ত ভঙ্গিতে ঢুকলেন জগদীশচন্দ্র বসু। জগদীশচন্দ্র সম্পর্কে প্রারম্ভিক পরিচয় দেওয়ার পর ঘোষক তাঁকে ডেকে নিলেন মঞ্চে। মঞ্চের পিছনে বড় বড় কাগজে বিভিন্ন রেখাচিত্র টাঙানো পটের মতন। তার সামনে জগদীশচন্দ্র দাঁড়িয়ে। জগদীশচন্দ্রের সামনে টেবিলের উপর তাঁর তৈরি যন্ত্রাদি। জগদীশচন্দ্র শান্ত ভঙ্গিতে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন একবার। তাকালেন অবলার দিকে, নিবেদিতা, সারা বুল, ম্যাকলয়েডের দিকে। নিবেদিতা মৃদু ঘাড় নাড়লেন। যেন বললেন, জয়যাত্রায় যাও।
নিবেদিতা জানতেন জগদীশচন্দ্র বাগ্মী নন। তাঁর বক্তৃতায় থাকে আবেগ ও সাধনার ভাষা। বাক্য রচনায় খামতি দেখা যায় কোনও কোনও ক্ষেত্রে। কিন্তু আজ কোথায় তাঁর বাক্য গঠনের বাধা! নিবেদিতা দেখছেন এক অন্য জগদীশকে।
“এত সহজে তাঁহাকে বলিতে শুনি নাই। মাঝে মাঝে তাঁহার পদবিন্যাস গাম্ভীর্যে ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতে লাগিল। এবং মাঝে মাঝে তিনি সহাস্যে সুনিপুণ পরিহাস সহকারে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ অথচ সরলভাবে বৈজ্ঞানিক ব্যূহের মধ্যে অস্ত্রের পর অস্ত্র নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। তিনি রসায়ন, পদার্থতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা-প্রশাখার মধ্যে বিভেদ যেন অত্যন্ত সহজ ভাবে মিটাইয়া দিলেন।”

নিবেদিতা দীর্ঘ চিঠিতে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা জানিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। সে চিঠিটি পাওয়া যায় না। কিন্তু আষাঢ় ১৩০৮ সংখ্যার ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ‘আচার্য জগদীশের জয়বার্তা’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধটি মূলত নিবেদিতার ওই চিঠির উপর ভিত্তি করেই লেখা। এমনকী কিছু কিছু অংশ নিবেদিতার পাঠানো ইংরেজিতে লেখা থেকেই উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই দীর্ঘ প্রবন্ধটির কোথাও নিবেদিতার প্রতি ঋণ স্বীকারের জন্য একটি শব্দও ব্যবহার করেননি। প্রবন্ধটিতে জানিয়েছেন, “এই সভায় উপস্থিত কোন বিদূষী ইংরেজ মহিলা, সভার যে বিবরণ আমাদের নিকট পাঠাইয়াছেন, নিম্নে তাহা হইতে স্থানে স্থানে অনুবাদ করিয়া দিলাম।”
নিবেদিতা সেই ইংরেজ বিদূষী মহিলা। নিজের হৃদয় উজাড় করে জগদীশচন্দ্রের সাফল্যের উচ্ছ্বাস জানিয়েছেন কবিবন্ধুকে।
“তাহার পরে জীব ও অজীবের মধ্যে যে সকল ভেদ-নিরূপক সংজ্ঞা ছিল, তাহা তিনি মাকড়সার জালের মতো ঝাড়িয়া ফেলিলেন। যাহার মৃত্যু সম্ভব, তাহাকেই তো জীবিত বলে। অধ্যাপক বসু একখণ্ড টিনকে মৃত্যুর পথে আমাদিগকে তাহার মরণাক্ষেপ দেখাইতে প্রস্তুত আছেন এবং বিষপ্রয়োগে যখন তাহার অন্তিম দশা উপস্থিত হয়, তখন ঔষধ প্রয়োগে পুনরায় তাহাকে সুস্থ করিয়া তুলিতে পারেন।
অবশেষে অধ্যাপক তাঁহার স্বনির্মিত কৃত্রিম চক্ষু সবার সম্মুখে উপস্থিত করিলেন এবং দেখাইলেন যে, আমাদের চক্ষু অপেক্ষা তাহার শক্তি অধিক, তখন সকলের বিস্ময়ের অন্ত রহিল না।
ভারতবর্ষ যুগে যুগে যে মহৎ ঐক্য অকুণ্ঠিতচিত্তে ঘোষণা করিয়া আসিয়াছে, আজ যখন সেই ঐক্যসংবাদ আধুনিককালের ভাষায় উচ্চারিত হইল, তখন আমাদের কীরূপ পুলক সঞ্চার হইল, তাহা আমি বর্ণনা করিতে পারি না। মনে হইল, যেন বক্তা নিজস্ব আবরণ পরিত্যাগ করিলেন, যেন তিনি অন্ধকারের মধ্যে অন্তর্নিহিত হইলেন — কেবল তাঁহার দেশ এবং তাঁহার জাতি আমাদের সম্মুখে উত্থিত হইল এবং বক্তার নিম্নলিখিত উপসংহারভাগ যেন সেই তাহারই উক্তি!”
নিবেদিতার বক্তব্য রবীন্দ্রনাথ বঙ্গানুবাদ করে দিয়েছেন তাঁর প্রবন্ধে।
“বৈজ্ঞানিকদের মনে উৎসাহ ও সমাজের অগ্রণীদের মধ্যে শ্রদ্ধা পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। সভাস্থ দুই-একজন সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী ধীরে ধীরে আচার্যের নিকট উপস্থিত হইলেন এবং তাঁহার উচ্চারিত বচনের জন্য ভক্তি ও বিস্ময় স্বীকার করিলেন।”
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই ‘আচার্য জগদীশের জয়বার্তা’ প্রবন্ধে সরাসরি নিবেদিতার ভাষাই তুলে দিয়েছেন। অনুবাদ করেননি। “I have shown you this evening the autographic record of the history of stress and strain in both the living and nonliving. How similar are the two sets of writings, so similar indeed that you can not tell them one from the other! They show you the waxing and waning pulsations of life – the climax due to stimulants, the gradual decline of fatigue, the rapid setting in of death-rigor from the toxic effect of poison.”
“…আলোক-তরঙ্গে ভাসমান ধূলিকণা, এই পৃথিবীতে জীবনের উচ্ছ্বাস ও মহাশূন্যে অসংখ্য ভাস্বর সূর্যের মধ্যে এক বিরাট ঐক্য কখন ধরা পড়ল, জানি না। আমার পূর্বপুরুষগণ ত্রিশ শতাব্দী আগে ভাগীরথী তীরে যে বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, সেদিন প্রথম আমি তার আংশিক মর্ম উপলব্ধি করলাম।” “…it was then that for the first time I understood the message proclaimed by my ancestors on the banks of the Ganges thirty centuries ago… They who behold the One, in all the changing manifoldness of the universe, unto them belongs eternal truth, unto none else, unto none else.” বিশ্বের নিয়ত পরিবর্তনশীল বৈচিত্র্যের মধ্যে যাঁরা ঐক্য দেখতে পান চিরন্তন সত্য তাঁদের কাছেই ধরা পড়ে। আর কারও কাছে নয়।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সেই জয়বার্তা শেষ করেন এক প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে — “… এতদিন পর ভারতবর্ষ শিষ্যভাবেও নহে, সমকক্ষভাবেও নহে, গুরুভাবে পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক সভায় উত্থিত হইয়া আপনার জ্ঞানশ্রেষ্ঠতা সপ্রমাণ করিল — পদার্থতত্ত্বসন্ধানী ও ব্রহ্মজ্ঞানীর মধ্যে যে প্রভেদ, তাহা পরিস্ফুট করিয়া দিল।”
নিবেদিতা তৃপ্ত। তৃপ্ত রবীন্দ্রনাথ। জগদীশচন্দ্র বিজ্ঞানের সাপেক্ষে প্রমাণ করেছেন ব্রহ্মজ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব। অভিজ্ঞতা সঞ্চিত দর্শনের সপক্ষে কিছু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলে ধরেছেন।

“আমি সারা জীবন ধাতুর প্রকৃতি নিরূপণের কাজ করেছি। সে ধাতুর প্রাণ আছে জেনে‌ আমি আজ গভীর আনন্দ লাভ করেছি।” স্যার রবার্ট অস্টেন ধাতুবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ এবং ব্রিটিশ মিন্ট-এর অধিকর্তা এইটুকু বলেই থামলেন না। এগিয়ে এসে জগদীশচন্দ্রের হাতটি ধরে বললেন, “আপনি নির্বিকারভাবে যে তথ্য প্রকাশ করলেন ওইরকম এক অস্পষ্ট ধারণা অনেকদিন আগে আমার মধ্যে জেগেছিল। আমি একবার এই বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে বিজ্ঞানী মহলে বেশ অপ্রতিভ হয়েছিলাম। আপনি যেরূপ সাহসের সঙ্গে ও অকাট্য প্রমাণ সহ যে তথ্য প্রকাশ করেছেন তাতে আমার সমস্ত দ্বিধা দূর হয়ে গেল। অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।”
জগদীশচন্দ্র মাথা নিচু করে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “ধন্যবাদ। ধন্যবাদ মি. অস্টেন।”

সমস্ত বিজ্ঞানী ও শ্রোতারা একে একে এসে অভিবাদন জানিয়ে যাচ্ছেন। অবলাকে অনেকেই ঘিরে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। অবলা হাতজোড় করেই আছেন। মুখে মৃদু হাসি। জগদীশচন্দ্রও ভেসে যাচ্ছেন শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনে।
নিবেদিতা উত্তেজনায় একবার সারা বুলের হাত ধরছেন চেপে, আরেকবার ম্যাকলয়েডকে জড়িয়ে ধরছেন। ক্রপটকিন শুভেচ্ছা জানালেন নিবেদিতাকে, ভারতের জয় হোক। অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা সংগ্রামের পর এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় ছিলেন নিবেদিতা। চোখের জল বাধা মানছে না। সংযত রেখেছেন নিজেকে। দীর্ঘ চিঠিতে তাঁর সেই উচ্ছ্বাস জানিয়েছেন তাঁর প্রিয় কবিবন্ধুকে। আজ তো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সহ প্রতিষ্ঠিত হল — সর্বত্র চৈতন্য বিরাজমান। উপনিষদের সেই অমোঘ উচ্চারণ — যদিদং কিঞ্চ জগৎ প্রাণ এজতি নিঃসৃত। যা কিছু জগৎ তা প্রাণ থেকে নিঃসৃত হয়ে প্রাণেই কম্পমান। ভারতীয় দর্শনের বৈজ্ঞানিক সততা আজ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের দরবারে। স্বামীজির দর্শন, আদর্শ ও বিশ্বাসের বিজ্ঞানভিত্তিক সত্যতা আজ প্রমাণিত। নিবেদিতা বারবার খুব গোপনে খুব নিভৃতে প্রণাম করছেন তাঁর দীক্ষাদাতা তাঁর পিতা স্বামীজির পায়ে, প্রণাম করছেন মহাশক্তির পায়ে।
কিন্তু উজ্জ্বল আকাশের কোণে দেখা গেছে কালো মেঘের ভ্রূকুটি। জগদীশচন্দ্রের দার্শনিক বক্তব্যের মুগ্ধতা কেটে যাবার পরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে শারীরবিজ্ঞানীরা জগদীশ বসুর সিদ্ধান্ত নাকচ করার লক্ষ্যে প্রস্তুত হতে শুরু করলেন। ড. ওয়ালারের অনুসারী বিজ্ঞানীরা বিরোধাভাস ভাসিয়ে দিল বাতাসে। ড. ওয়ালার এবং তাঁর অনুগামী গবেষকরা একটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যে, জীবন তথা প্রাণের নির্ভরযোগ্য অন্যতম লক্ষণ বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় সাড়া দেবার ক্ষমতা। জগদীশচন্দ্র বসু নামে অন্ধকারাচ্ছন্ন ব্রিটিশ শাসনে থাকা ভারতীয় এক বিজ্ঞানী ব্রিটিশ শারীরতাত্ত্বিকদের প্রতিষ্ঠিত ধারণা এক ধাক্কায় ভুল প্রমাণ করে দিলেন। সেই প্যারিস কংগ্রেস থেকে তিনি এই রয়্যাল ইন্সটিটিউটে বক্তৃতা অবধি হাতেকলমে পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করে দিলেন — বৈদ্যুতিক উত্তেজনায় সাড়া দেওয়াই যদি জীবন বা প্রাণের মূল লক্ষণ হয়, তবে সেই লক্ষণ জড় পদার্থের মধ্যেও আছে। ব্রিটিশ শারীরতত্ত্ববিদের মূল বিশ্বাস ধরে টান দিয়েছেন জগদীশচন্দ্র। এই বিরুদ্ধতা ঝড় হয়ে দেখা দিল রয়্যাল সোসাইটির বক্তৃতার পর।
নিবেদিতা নিজের জন্য সময় বার করতে পারছেন না। ক্লান্তি আসছে। একদিকে জগদীশচন্দ্রের আবিষ্কার ও ভাবনাকে ছন্দময় গদ্যে প্রকাশ, তাঁর দিকে ধেয়ে আসা আক্রমণকে প্রতিহত করা, অর্থের চিন্তা ইত্যাদি ইত্যাদি। অপরদিকে নিজের লেখার কাজের সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের যে ছবি পেলেন তার চিন্তা তাঁকে এক নতুন পথের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একটু একা হওয়া প্রয়োজন। নিজের সঙ্গে নিজের সময় কাটানো দরকার। চিন্তা-ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে তোলা দরকার। লেখালেখির কাজও গুছোনোর জন্য সময় বের করে নেওয়া প্রয়োজন।
আর ঠিক এই সময় সারা বুল পাশে এসে দাঁড়ালেন। ১৭ মে নরওয়ের বার্গেন শহরে সারা বুলের স্বামী ওলি বুলের জন্মদিন উপলক্ষে পাথরের মূর্তি বসবে। ১৯০১ সাল।
“চলো মার্গারেট আমার সঙ্গে নরওয়ে। আমার বাড়িতে আর কেউ নেই থাকার মতো। নির্জনে থাকবে ক’দিন!” সারা বুলের এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন নিবেদিতা। সমস্ত ভাবনা-চিন্তাগুলো এক জায়গায় গেঁথে ফেলার জন্য নির্জনতা চাইছে তাঁর মন। ক্ষতবিক্ষত মনের শুশ্রূষা দিতে পারে একার সঙ্গে একার কালযাপন। জগদীশচন্দ্র এবং অবলা বসুও সায় দিলেন। অবলা লক্ষ করেছেন রাতের পর রাত জেগে জেগে লেখার ফলে নিবেদিতার শরীর ভাঙছে। চোখের নীচে কালো গভীর ক্লান্তি-ছাপ।
“মার্গারেট, আশা করি রয়্যাল সোসাইটির বক্তৃতার দিন তুমি ও সারা দু’জনেই উপস্থিত থাকবে!”
জগদীশের দিকে তাকালেন নিবেদিতা।
“অবশ্যই বেয়ার্ন। তুমি, তোমরা শরীরের যত্ন নিয়ো।”
২১ মে নিবেদিতা রওনা হলেন উইম্বলডন থেকে নরওয়ের বার্গেন শহরে। সমুদ্রের ধারে তাঁবু বানিয়ে থাকলেন নিবেদিতা। সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে সুন্দর এক থাকার জায়গা। নীল আকাশ দূরে ছুঁয়ে আছে নীল সমুদ্রের রেখা। সবুজ পাহাড় যেন হেলান দিয়ে আছে নীল আকাশের গায়ে। সমুদ্রের তীরে সবুজের সমারোহ। বনানী ঘিরে আছে। সরল বৃক্ষের সারি। হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে আসছে মিষ্টি এক বুনো গন্ধ। চোখ ও মনের অপার আরাম। নিবেদিতার নিজের অরণ্য-বাসভূমি। নিজের ভেতরে নিজে থাকার জিরানিয়া।
রমেশচন্দ্র দত্ত এসেছেন বার্গেন শহরে সারা বুলের অতিথি হয়ে। তাঁর সঙ্গে এসেছেন মি. জন ল্যান্ড নামে পার্লামেন্টের এক উদারনৈতিক সদস্য। নিবেদিতার সঙ্গে চলল দীর্ঘ আলোচনা। একজন ভারতীয় বিজ্ঞানীকে পদে পদে বাধাদান যদি ব্রিটিশ সরকারের কাজ হয়, তবে সে সরকার কখনও ভারতের জন্য হিতকর কিছু করতে পারে না — নিবেদিতার অভিজ্ঞতা এই উপসংহারে নিয়ে গেছে তাঁর মনকে। মি. ল্যান্ড সেই গুটিকয়েক উদারনৈতিক নেতাদের একজন যাঁরা ভারতবর্ষের প্রতি ব্রিটিশদের অত্যাচার ও বিমাতৃসুলভ আচরণের কথা পার্লামেন্টের নজরে আনেন।
“আপনার মানসিক অবস্থা আমি জানি। কিন্তু ভারতবাসীর ভেতরে রাষ্ট্রচেতনার বিকাশ না ঘটলে রাষ্ট্রশক্তি করায়ত্ত করার দিকে অগ্রসর হওয়া কঠিন। আর এই কাজটি যতদিন না হচ্ছে ততদিন ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থা চেপে বসবে এই ঔপনিবেশিক দেশগুলোর উপর। সম্পদ সংগ্রহের জন্য যতটুকু স্বাচ্ছন্দ্য দেবার, ততটুকুই দেওয়া হবে।” মি. ল্যান্ড কথাগুলো বলে রমেশচন্দ্রের দিকে তাকালেন।
নিবেদিতা চায়ের কাপ তুলে নিলেন হাতে, “এটা আমি বুঝতে পারছি মি. ল্যান্ড। আমি ভারতবর্ষে খুব শীঘ্রই ফিরে যাব। আমার কাজ হবে ভারতবাসীর মনে রাষ্ট্রচেতনা জাগ্রত করা। আশা করি আমার পিতা স্বামীজি নিশ্চয়ই আমার এই কাজে বাধা দেবেন না। তিনিও চান ভারতবর্ষের বিবেক জাগ্রত হোক।”
মি. ল্যান্ড চায়ে লম্বা চুমুক দিলেন, “রাজনৈতিক দল ছাড়া অবস্থান ছাড়া রাষ্ট্রচেতনা গড়ে তোলা সম্ভব?”
“আমি ঠিক করেছি প্রয়োজনে আমি কংগ্রেস দলেও যোগ দিতে পারি।” নিবেদিতা বললেন।
রমেশচন্দ্র নিবেদিতার কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন, “আমাদের এই মুহূর্তে জগদীশচন্দ্রের জয়কে ভারতের জয় বলে চিহ্নিত করা এবং তাঁর গবেষণার বিষয়টি নিরুদ্বেগে সম্পাদনা করার ক্ষেত্র তৈরিতে বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।”
“সত্যিই মি. দত্ত। আমি আমার স্বদেশবাসীর এই রকম ঘৃণ্য বাধাদানের জন্য খুব লজ্জিত বোধ করি। প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে এত নীচতা!”
“আমি যা বুঝতে পারছি মিস নোবেল। মি. বোসকে নিজের খরচে এখানে থেকেই গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে হবে শেষ পর্যন্ত। সেক্ষেত্রে আমাদের ফান্ড রেইজিং নিয়ে ভাবতে হবে। সেটা করতে হবে বাৎসরিক হিসেবে। বছরে কত টাকা লাগতে পারে বলে আপনার মনে হয়?”
“আমি কিছু অর্থ তুলতে পারব। বেলুড় মঠের জন্যও আমি সফল হয়েছি। কিন্তু যেভাবে মি. বোসের গবেষণার প্রতি পদক্ষেপে বাধা তৈরি করা হচ্ছে, এমনকী তাঁকে তাঁর গবেষণা চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্য… মরমে মরে যাচ্ছি মি. দত্ত!”
“বুঝতে পারছি মিস নোবেল। তবে রয়্যাল সোসাইটির বক্তৃতার উপর অনেকটাই নির্ভর করা যায়। সামনেই তো?”
“হ্যাঁ, ৬ জুন। আপনি কতটা জানেন আমি জানি না, বিজ্ঞানী ওয়ালার এবং তাঁর দলবল বাধা সৃষ্টি করবেন‌ই। তীব্র বাধা। কারণ ড. বোসের গবেষণার ফলে এখানকার শারীরবিজ্ঞানীদের গবেষণার অন্তঃসারশূন্যতা প্রকাশ হয়ে পড়ছে।” নিবেদিতা গুছিয়ে নেন নিজেকে।
“বুঝতে পারছি। সব খবরাখবর আমি রাখি মিস নোবেল! আমি অপেক্ষা করছি রয়্যাল সোসাইটির বক্তৃতার জন্য। আর অপেক্ষা করছি আপনার নতুন তৈরি আস্তানাটা দেখার জন্য‌ও!”
দু’জনেই হেসে ওঠেন।
“ওহ্ হ্যাঁ। সত্যিই সুন্দর একটি জায়গা বেছে দিয়েছেন সারা বুল। তবে শহর থেকে একটু দূরে। চলুন তবে!”
“চলুন, যাওয়া যাক। মি. ল্যান্ড যাবেন তো?” রমেশচন্দ্র ল্যান্ডকে সঙ্গে নিতে চান।
“চলুন!”
সমুদ্রের ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে বনভূমির ভেতর দিয়ে উন্মত্ত বাতাস মেখে তিনজন উপস্থিত হলেন নিবেদিতার তাঁবুর আস্তানার সামনে। নিবেদিতার নির্জনাবাস।

লেডি অবলা বসু

গঙ্গার বুকে আজ বাতাস আটকে আছে। নৌকা চলেছে স্রোতের বিপরীতে, তবুও হাওয়া আজ নেই। দমবন্ধ লাগছে। তরুণ সন্ন্যাসী ও গোপালের মা ঘন ঘন বেলুড় মঠের দিকে তাকাচ্ছেন। বেশ কিছু মানুষের ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে এখান থেকেই। নিবেদিতার চিন্তার জগতে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাঁর মনোজগতে এখন পরাধীন ভারতের যন্ত্রণা। ভারত, হে ভারত, আমার স্বজাতি তোমার যে মর্মান্তিক ক্ষতি করেছে, কে তার পূরণ করবে? এখনই দরকার আকূল আহ্বান, জনতার উন্মাদনা, আর প্রাণ বিসর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এখনই যথার্থ সময়! কর্মে অবতীর্ণ হবার প্রকৃষ্ট সময়। জেগে উঠতে হবে ভারতবর্ষকে। জাগ্রত হবে ভারতবর্ষের বিবেক। আর ঠিক এই সময়ে তিনি চলে গেলেন! ওই দূরে তীরভূমে তাঁর শায়িত নিষ্প্রাণ দেহ! নিবেদিতার যে কাজ ভারতবর্ষের জন্য বাকি থেকে গেছে, তার সম্পাদনায় স্বামীজির আশীর্বাদ চাই যে! স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন নিয়ে ফিরে এসেছেন নিবেদিতা। স্বামীজির আশীর্বাদ চাই যে! পিতার আশীর্বাদ। যে দেশের কাজের জন্য নিবেদিত তিনি যাঁর হাত ধরে, সেই হাতটি সরে গেছে। একা। একা নিবেদিতা। থেকে গেছে এক পরম বিশ্বাস — ভারতবর্ষের জন্য তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাবেন তিনি। নৌকা চলেছে তাঁকে নিয়ে গঙ্গার তীরের দিকে যেখানে নিথর শুয়ে আছেন তাঁর পথপ্রদর্শক। আশীর্বাদ নেবেন তিনি। জেগে থাকবেন তাঁর কাজের মধ্যে।

১৯০১ সালের ৬ জুন রয়্যাল সোসাইটিতে বক্তৃতার পরেই জগদীশচন্দ্রের আবিষ্কারের দিকে ধেয়ে এল ঝড়। এখানে জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতার বিষয় ছিল — On the Electrical Response of Inorganic Substances’. অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শারীরতত্ত্ববিদ বিজ্ঞানী স্যার বার্ডেন স্যান্ডারসন এসেছেন বক্তৃতা শুনতে। স্যার স্যান্ডারসন হলেন ডা. ওয়ালারের সিনিয়র। ড. ওয়ালার তো তাঁর অনুগামীদের নিয়ে উপস্থিত আছেনই।
রয়্যাল সোসাইটি আগেই একটি শর্ত দিয়েছিল জগদীশচন্দ্রকে— বক্তৃতার প্রতিক্রিয়ায় যদি শারীরবিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে আপত্তি উত্থাপিত হয় তবে তাঁদের জার্নালে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করা যাবে না।
জগদীশচন্দ্রের বক্তৃতার পরেই উচ্ছ্বসিত করতালি শ্রোতাদের। করতালি থামল এক সময়। প্রশংসাসূচক সম্বোধনও থামল একসময়। স্যার বার্ডেন স্যান্ডারসন প্রথম সারির আসনে বসে ছিলেন। উঠলেন।

“ড. বোসের আজকের এই গবেষণা-লব্ধ প্রদর্শন ও ব্যাখ্যা পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে উৎসাহের বিষয় হলেও শারীরবিজ্ঞানীদের কাছে ততোধিক অবান্তর বলে মনে হয়েছে।”
সবাই নিশ্চুপ। হলে কোনও শব্দ নেই। জগদীশচন্দ্র চুপ। শুনছেন।
স্যার স্যান্ডারসন উত্তেজিত, “কেন ড. বোস রেসপন্স শব্দটি বারবার ব্যবহার করেছেন! Prof. Bose applied physiological terms in describing his physical effects on metals. Though his paper is not printed yet we hope he will revise it and use physical terms and not use our physiological expressions in describing phenomena of dead matter.”
জগদীশচন্দ্র শান্ত উত্তর দিলেন, “scientific terms কখনও কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ের একার ব্যবহার্য নয়। বিভিন্ন ভাবে তার বহুত্ব পরিলক্ষিত হয়।”
আপত্তি উঠল ড. ওয়ালারের পক্ষ থেকে — “ফিজিক্স ও ফিজিয়োলজি মিশিয়ে ফেলছেন ড. বসু। শারীরবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এই গবেষণায় নতুনত্ব কিছু নেই। পদার্থবিদদের কাছে এই গবেষণার গুরুত্ব থাকতে পারে।”
তাঁর সহ-বৈজ্ঞানিকরা সমর্থন করল হ‌ই হ‌ই করে। জগদীশচন্দ্র বুঝলেন তাঁর শত্রুপক্ষ তৈরি হয়ে গেছে শুধু নয়, তীব্র আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। সেই সময়ের ইংল্যান্ডের বিজ্ঞান আকাশে ফিজিক্স এবং ফিজিয়োলজি শাখার বিজ্ঞানীদের মধ্যে সংঘাত প্রবল। সেই আবহে জগদীশচন্দ্র জড় ও জীবের মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণ করছেন। মিলিয়ে দিচ্ছেন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ভেদরেখা। আক্রমণ অনিবার্য। অগ্রগণ্য শারীরবিজ্ঞানী স্যার স্যান্ডারসনের মত প্রণিধানযোগ্য এবং তাঁর আপত্তির কারণসমূহ সোসাইটির কাছে প্রাধান্য পাবে। ফলস্বরূপ জগদীশচন্দ্র বসুর এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করা রয়্যাল সোসাইটির পক্ষে সম্ভব হল না। অমনোনীত হল। আর্কাইভ করে রাখা হল। জগদীশচন্দ্রের পর পর পাঁচটি পেপার অমনোনীত করা হল এবং আর্কাইভে রাখা হল নিয়মমতো।

বিকেলের ম্লান আলো ওক গাছের পাতার জঙ্গল দিয়ে চুঁইয়ে পড়েছে চায়ের টেবিলে। বাগানে চায়ের টেবিলে বসেছেন নিবেদিতা ও জগদীশচন্দ্র। নরম রোদের সোনালি আলো ওঁদের শরীর ছুঁয়ে নেমেছে ঘাসে।
জগদীশ কয়েকদিন ধরে মুহ্যমান। রয়্যাল সোসাইটি তাঁর পাঁচটি পেপার গ্রহণযোগ্য মনে করেনি শুধু মাত্র কয়েকজন শারীরবিজ্ঞানীদের আপত্তির কারণে।
“এইভাবে ভেঙে পড়ার কোনও কারণ নেই, বেয়ার্ন। চা ঠান্ডা হয়ে গেল। তোমাকে বুঝতে হবে, ‘বো’ কতখানি আপসেট হয়ে আছে। কিন্তু এখানেই তো শেষ নয়।” নিবেদিতা কাপে চা ঢালেন।
“মার্গট, তুমি জানো আমার ছুটির এক্সটেনশনের দরখাস্ত নাকচ হয়েছে। ভারতীয় ব্রিটিশ সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কাছে রয়্যাল সোসাইটির পরিত্যক্ত গবেষণার খবরটিই পৌঁছেছে। গবেষণা ব্যর্থ হবার খবর পেয়ে গেছে কলকাতার ব্রিটিশ পুঙ্গবরা! সুতরাং চলো ফিরে যাই!” জগদীশচন্দ্র কাপ তুলে নেন হাতে।

লেডি অবলা বসু এবং আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু

“বেয়ার্ন, একটি কথা বলতে চাই — আমাদের জার্নি শুরু হল। এখানে শেষ নয়, এটাই শুরু। সংগ্রাম, যুদ্ধ। আগামীকাল কেমব্রিজের অধ্যাপকদের আসার কথা নয়?” নিবেদিতা নিজের চোখ থেকে হতাশার আকাশ সরিয়ে দিয়ে তাকালেন জগদীশচন্দ্রের দিকে।
“হ্যাঁ, অধ্যাপক ভাইনস আসবেন। সঙ্গে আনবেন বিশিষ্ট উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের। লিনিয়ান সোসাইটির প্রেসিডেন্ট এই বিজ্ঞানী ভাইনস। সঙ্গে সোসাইটির সেক্রেটারি অধ্যাপক হাইয়েস থাকবেন বলেছেন। আসুক। আমি দেখাব। কী অন্যায়ভাবে আমাকে ওরা নাকচ করেছে। আসলে রয়্যাল সোসাইটি যদি আমার গবেষণাপত্র প্রকাশ করে তাহলে ওয়ালারের থিয়োরি ভেঙে পড়বে! আমি জানি।”
“বেয়ার্ন, আমরা কি প্রস্তুত কালকে লিনিয়ান সোসাইটির সভাপতি সম্পাদকের জন্য?” নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রকে কাজে ফেরাতে চাইছেন।
“হ্যাঁ, ওই রয়্যাল সোসাইটির পরীক্ষা ও পেপারের কথাই বলব তো! তার সঙ্গে দেখাব Electric Response in ordinary Plants under Mechanical Stimulus.’”
“বাহ্। তুমি উদ্ভিদের মধ্যে প্রাণের অস্তিত্বের বিষয়টিও বলবে?”
“বলব, মার্গারেট! আমার ভেতরে এক বিস্ময়কর বিস্ফোরণের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। জড়, উদ্ভিদ ও জীবের মধ্যে অনন্ত প্রাণের স্পন্দন সবাইকে স্বীকার করতেই হবে। এটাই শেষ সুযোগ! না হলে? আমি জানি না! আমি সত্যিই জানি না এই সংগ্রামের শেষ কোথায়?”
নিবেদিতা তাঁর গাউনের পকেট থেকে একটি কাগজ বার করে পড়তে থাকলেন, “ধন্যোহং কৃতকৃত্যোহং! তোমাদের চিঠি পাইয়া আমি প্রাতঃকাল হইতে নূতন লোকে বিচরণ করিতেছি। যে ঈশ্বর তোমার দ্বারা ভারতের লজ্জা নিবারণ করিয়াছেন তাঁহার চরণে আমার হৃদয়কে অবনত করিয়া রাখিয়াছি। কোন্ দিক দিয়া তিনি আমাদের দেশকে গৌরবান্বিত করিবেন অদ্য আমি তাহার অরুণাভমণ্ডিত পথ দেখিতেছি। তোমার নিকট পূজা প্রেরণ করিবার জন্য আমার অন্তঃকরণ উন্মুখ হইয়া আছে — বন্ধু আমার পূজা গ্রহণ করো! তোমার জয় হোউক্। তোমাতে আমার দেশ জয়ী হউক্! নব্য ভারতের প্রথম ঋষিরূপে জ্ঞানের আলোকশিখায় নূতন হোমাগ্নি প্রজ্জ্বলিত করো।”
জগদীশচন্দ্র এতক্ষণ মাথা নিচু করে শুনছিলেন। হঠাৎ হেসে উঠলেন, “কী আশ্চর্য, এই চিঠি তো রবিবাবু যখন লিখেছেন ৪ জুন তখনও পর্যন্ত রয়্যাল সোসাইটির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু তুমি এই চিঠি পকেটে করে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন?”
“তোমাকে মাঝে মাঝে শোনানোর জন্য। ভারতবর্ষ তোমার দিকে কোন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! ওঠো, তৈরি হতে হবে আগামী কালের জন্য। যোদ্ধা যুদ্ধে নামে শুধু মাত্র জেতার লক্ষ্য নিয়ে।”
কখন অবলা এসে দাঁড়িয়েছেন। কেউ খেয়াল করেননি।
“মার্গারেট কিন্তু সঠিক বলেছে। তুমি কি ভেবেছিলে খুব সহজেই কেউ তার প্রতিষ্ঠিত সত্য ভ্রান্ত বলে মেনে নেবে? ওঁরা তো মানবেনই না একজন পরাধীন দেশের বৈজ্ঞানিকের আবিষ্কার! লড়াই তোমাকে একাই লড়তে হবে। তবে তোমার ওই বন্ধু বৈজ্ঞানিক ওয়ালারকে আমার প্রথম দিন থেকেই পছন্দ হয়নি। রবিবাবুর চিঠিগুলি সত্যিই উৎসাহব্যঞ্জক শুধু নয়, একজন প্রকৃত বন্ধু হিসেবে পাশে আছেন তিনি।”
অবলা একটু থামলেন, “আমি কেক তৈরি করেছি। এখানেই আনব, না ঘরে আসবে তোমরা?”
“চলো বো। যাচ্ছি!”
নিবেদিতা বুঝতে পারছেন জগদীশচন্দ্রের যুদ্ধটা একার যুদ্ধ হয়ে উঠছে। কঠিন ও ক্লান্তিকর সে যুদ্ধ। রবিবাবুর চেষ্টায় ত্রিপুরার রাজা সাহায্যের হাত বাড়ালেও সামগ্রিকভাবে একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা জরুরি। রমেশচন্দ্র দত্তের সঙ্গে দিনের পর দিন আলোচনা করেছেন নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রের আড়ালেই। রমেশচন্দ্র দত্তের পরামর্শেই ফার্লোর জন্য দরখাস্ত করেছেন জগদীশ। সে ছুটি গ্রাহ্য হয়েছে। সুতরাং আরও কিছুদিন কাজ করা যাবে এখানে বসে, নিবেদিতার কাছে এটাই মূল বিষয়। সামনে লিনিয়ন সোসাইটির বক্তৃতা। বিষয়বস্তু একই। জড় ও জীবের মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব। ভয়ংকর এক শূন্যতার মাঝে এক টুকরো আলোর রেখা। যদি গবেষণার পেপার প্রকাশ করা যায়!

ড. ওয়ালার

রাত গভীর। ঘুম নেই জগদীশচন্দ্রের চোখে। হয় তাকে প্রেসিডেন্সি কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখানেই থেকে যেতে হবে গবেষণার কাজ শেষ করার জন্য, নয়তো গবেষণা অসমাপ্ত রেখে পরাজয় স্বীকার করে ফিরে যেতে হবে দেশে। কী করবেন? একদিকে সমস্ত বিরোধিতার বাধাকে অতিক্রম করে নিজের আবিষ্কৃত মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করার সংকল্প, অন্যদিকে এতদিনের সাধনার ব্যর্থতা মেনে নিয়ে জন্মভূমিতে ফেরার ব্যাকুলতা। দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত জগদীশচন্দ্র অপলক তাকিয়ে থাকেন রাতের আকাশের দিকে।
এই গভীর রাতে দূর নক্ষত্রের মতো একটি মুখাবয়ব রাতের আকাশে ভেসে উঠছে। তাঁর ঢেউ খেলানো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, উড়ছে তাঁর সুন্দর দাড়ি, উড়ছে জোব্বা। এই ঘন কালো রাতে দূর ভারতবর্ষের এক অন্ধকার শহরের ততোধিক অন্ধকার গলিতে বিশালাকায় বাড়ির বড় বড় শার্সির জানালার ধারে লেখার টেবিল থেকে উড়ে উড়ে আসছে অক্ষরমালা। কবির হাতের কলমের আঁচড়ে আঁচড়ে জীবনদায়ী শব্দবন্ধ ভেসে আসছে একাকী বিজ্ঞানীর কাছে। “পৃথিবীতে সর্বত্র চিমটি কাটার উপায় যে তুমি বের করেছ, সেইটে পড়ে গর্ব অনুভব করা গেল। এতদিন জড় পদার্থ আমাদের বিধিমতে পীড়ন করে আসছিলেন এবারে তোমার কল্যাণে তাদের উপর প্রতিশোধ নিতে পারব।”
এমন পরিস্থিতিতে কবিবন্ধুর চিঠির রসিকতায় হালকা বোধ হয়। তার পরেই প্রকৃত বন্ধুর হাত বাড়িয়ে ধরার প্রতিশ্রুতি।—“যদি পাঁচ ছ বৎসর বিলাতে থাকতে হয় তুমি তারই জন্য প্রস্তুত হয়ো, অনর্থক ভারতবর্ষের ঝঞ্ঝাটের মধ্যে এসে কাজ নষ্ট কোরো না। তুমি আমাকে একটু বিস্তারিত করে লিখো এই ৫/৬ বৎসর সেখানে থাকতে গেলে ঠিক কী পরিমাণ সাহায্য তোমার দরকার হবে। আমার কাছে লেশমাত্র সঙ্কোচ কোরো না। বৎসরে তোমাকে কত পরিমাণে দিলে তুমি বিনা বেতনে দীর্ঘ ছুটি নিতে পারো আমাকে লিখো। যাতে তুমি স্বচ্ছন্দে ও নিশ্চিন্ত চিত্তে সেখানে থেকে তোমার কাজ করতে পারো আমি বোধহয় তার ব্যবস্থা করে দিতে পারব। তুমি আমাকে খোলসা করে লিখো।”( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি ২১ মে ১৯০১)।
জগদীশচন্দ্রের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে বন্ধুর এমন কথায়। গবেষণার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের জয়ধ্বজা ওড়ানোই বন্ধুঋণ শোধ করার একমাত্র পথ।
“তোমাকে বারবার মিনতি করিতেছি — অসময়ে ভারতে আসিবার চেষ্টা করিও না। তুমি তোমার তপস্যা শেষ করো —দৈত্যের সহিত লড়াই করিয়া অশোকবন হইতে সীতা-উদ্ধার তুমিই করিবে। আমি যদি কিঞ্চিৎ টাকা আহরণ করিয়া সেতু বাঁধিয়া দিতে পারি তবে আমিও ফাঁকি দিয়া স্বদেশের কৃতজ্ঞতা অর্জ্জন করিব।” ( রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ৪ জুন ১৯০১ তারিখে)
নিঃসীম অনন্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন জগদীশচন্দ্র। প্রাণের পরশ ভেসে আসে যেন দূর গোলার্ধ থেকে। এক কবির হাত ওই মহাশূন্য থেকে ভেসে আসছে এক বিজ্ঞানীর দিকে। সাঁকো গড়ে তুলছেন রুদ্রাক্ষের মালা পরে ব্রহ্মচারিণী নিবেদিতা। মিলিয়ে দিচ্ছেন তিনি অদ্বৈতবাদী এক পরিব্রাজক সন্ন্যাসীর দর্শনের সঙ্গে এক বিজ্ঞানীর অনুসন্ধানী আবিষ্কার এবং আর এক কবির উপনিষদীয় বিশ্বাস। জগদীশচন্দ্র উঠে দাঁড়ালেন। অতিরিক্ত ছুটি মঞ্জুর হয়নি। কিন্তু গবেষণা চালিয়ে যাবার জন্য ফার্লো মঞ্জুর হয়েছে। অর্থাৎ গবেষণার কাজ বিদেশে বসে আরও কিছুদিন করা যাবে। কিন্তু আর্থিক সমস্যা তো প্রবল। সংসার চালানোই বড় দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার উপরে গবেষণার খরচ খরচা। নিবেদিতা ও রমেশচন্দ্র দত্ত এসে আলোচনা করে উপায় তৈরি করেছেন। রবীন্দ্রনাথ চিঠির পর চিঠিতে জানিয়েছেন তাঁর সহযোগিতার কথা। ত্রিপুরার রাজা মহিমচন্দ্র দেববর্মা আশ্বাস দিয়েছেন। জানালায় গিয়ে দাঁড়ালেন জগদীশ। শান্ত গাছের সারি। রাস্তা পড়ে আছে ভেজা। পৃথিবী বিশ্রাম নিচ্ছে উঠে দাঁড়াবে বলেই। এই সামনের গাছটি আজ মহীরুহ কিন্তু এই প্রকাণ্ড শক্তি লুকিয়ে ছিল ছোট্ট একটি বীজ দানার ভেতরে। মাটিচাপা বীজদানা মাটি ফাটিয়ে উঠে এসেছিল। ক্রমাগত আছড়ে পড়া ঝড়-ঝঞ্ঝা অতিক্রম করেই আজ সে মহীরুহ। উঠে দাঁড়ানোই, জেগে ওঠাই প্রাণের মূল ধর্ম। টেবিলের উপর পড়ে থাকা সাদা কাগজে খসখস করে লিখলেন — “যদি কোন‌ওদিন বৈজ্ঞানিক অন্বেষণের এই নতুন পথ থেকে সরে দাঁড়াই, তবে সেটা হবে আমার খুশি অনুযায়ী, পারিপার্শ্বিক ঘটনার চাপে পড়ে নয়। ভবিষ্যতের কর্মপথ এখনও স্পষ্ট দেখতে পাই না। একক মানুষ তার অটুট সংকল্প ও অদম্য মানসিক শক্তি নিয়ে কী করে সংঘবদ্ধ বিরোধিতার সামনে দাঁড়াতে পারে, সেটা দেখাবার জন্যেই আমি এই অন্বেষণের পথে ফিরে আসব। নিষ্ক্রিয় হয়ে আমি বসে থাকব না। আমি মিরাকেল বিশ্বাস করি না। সেই মিরাকল হয়তো এবার ঘটবে, কারণ আমি যে সংগ্রাম করে চলেছি, তা সত্যের প্রতিষ্ঠার জন্য।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের অন্য রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুন ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
7 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
শিপ্রা ভৌমিক
শিপ্রা ভৌমিক
1 year ago

জগদীশচন্দ্র,নিবেদিতা ও রবীন্দ্রনাথ এই তিন বাহুবিশিষ্ট ত্রিভুজের ভেতরে প্রবেশ করে বেশ গর্ব হচ্ছে!একদিকে পরাধীনতা অপরদিকে বিজ্ঞানচর্চা!এই লড়াইয়ের কথা কজন বাঙালি জানে!সমৃদ্ধ হচ্ছি!’সাঁকোটা’ দুলে উঠুক!

Rajat Chakraborti
Rajat Chakraborti
1 year ago

ভালো লাগছে আপনারা সঙ্গে আছেন। মন্তব্য দরকার হয়। সঙ্গে থাকুন। আজও পাঠক পাঠিকা আছেন এটাই প্রমাণ করে এখনও প্রাণ বিরাজিছে।

Rajat Chakraborti
Rajat Chakraborti
1 year ago

খুব ভালো লাগছে আপনারা পড়ছেন। রেসপন্স দরকার। বোঝা যায় আজও প্রাণ বিরাজিছে।

Sudipta Pal
Sudipta Pal
1 year ago

সাঁকো দুলছে …নিবেদিতাকে বাঙ্গালী শুধু জানে বিবেকানন্দের আড়ালে। বঙ্গদেশের গর্ব জগদীশ চন্দ্র বসুকে এগিয়ে যেতে নিবেদিতার এই ভূমিকা প্রকাশিত হওয়ায় লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞ।

Rajat Chakraborti
Rajat Chakraborti
1 year ago
Reply to  Sudipta Pal

সঙ্গে থাকুন। সাঁকো দুলে উঠুক। সাঁকো গড়ে উঠুক।

Piyali Mukherjee
Piyali Mukherjee
1 year ago

পড়তে পড়তে বিস্মিত হচ্ছি,উত্তেজিত হচ্ছি,এবং আরো আগ্রহ জাগছে,তারপর কি হল! লেখককে অন্থাইন অভিনন্দন ,কলম এগিয়ে চলুক

RAJAT KANTI CHAKRABORTI
RAJAT KANTI CHAKRABORTI
1 year ago

ভালো লাগলো। থাকুন সঙ্গে। অনেক ধন্যবাদ।