ইতিহাসে আমরা যাদের স্মরণ করি, তারা সব সময় জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে নির্বাচিত হয় না। অনেকে আছেন যাদের জনপ্রিয়তা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রচারে নির্বাচিত হয়।তাদের মুখ পোস্টারে পোস্টার হয়ে ওঠে । তখন তাদের সাফল্য আমাদের রোজকার সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। কিন্তু আবার এমনও আছেন, যাদের ভূমিকা ছিল আরও গভীরে আরও মৌলিক—তবু তাঁরা থেকেছেন প্রান্তিক, বিস্মৃতির আড়ালে। ইলা মিত্র সেই দ্বিতীয় পরিসরের অন্তর্গত। তিনি একদিকে ছিলেন শিক্ষিতা মধ্যবিত্ত নারী, অন্যদিকে ছিলেন কৃষকের অধিকার রক্ষায় আপসহীন সংগ্রামী। তাঁর নাম হয়তো সুচিত্রা সেনের মতো সেলুলয়েড আলোয় ঝলমল করেননি, ইন্দিরা গান্ধীর মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মঞ্চে বাজেনি, লতা মঙ্গেশকরের মতো সুরের আবেশে ঢেউ তোলে নি—কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ নদীতে ইলা মিত্র দাঁড়িয়ে আছেন এক অবিচল প্রতীকের মতো।

শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। জন্ম কলকাতায় কিন্তু বড় হয়েছেন শান্তিনিকেতনের পরিবেশে, যেখানে শিক্ষার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল সংস্কৃতির স্বাদ। ক্রীড়াক্ষেত্রে রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন, সাঁতার, বাস্কেটবল, ব্যাডমিন্টনে পারদর্শী ইলা মিত্র ছিলেন মঞ্চেও সমান উজ্জ্বল। গান, অভিনয়, আবৃত্তি তাঁকে গড়ে তুলেছিল এক পূর্ণাঙ্গ মানবী । কলেজে নাটকে অভিনয় তাঁর ভেতরে তৈরি করেছিল আত্মবিশ্বাসের সেই আগুন যা পরে তাঁকে কৃষকের মাঠে, আন্দোলনের ভিড়ে, হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা কথা বলতে আন্দোলনকে প্রসারিত করতে শক্তি যুগিয়েছে

ইলা মিত্র

কিন্তু এই বহুমুখী প্রতিভার থেকেও বড় ছিল তাঁর সাহস। সচ্ছল শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে হয়েও তিনি শহরের আরামের জীবন বেছে নেননি। দাঁড়িয়ে ছিলেন কৃষকের পাশে, ক্ষুধার্ত গ্রামীণ নারীর পাশে, শস্য-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মঞ্চে। তৎকালীন যুগে নারীর প্রচলিত ভূমিকা যেখানে সীমাবদ্ধ ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতির মধ্যে, সেখানে ইলা মিত্র তা ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন সংগ্রামের ময়দানে।

তেভাগা আন্দোলনের দিনগুলো তাঁর জীবনকে এক দগ্ধ ইতিহাসে পরিণত করে। ফসলের দুইভাগ কৃষকের ঘরে রাখার দাবিতে কৃষক-নারী-পুরুষ একসাথে রাস্তায় নামে। ইলা মিত্র হয়ে ওঠেন জনতার আস্থার প্রতীক। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিশোধ ছিল ভয়ঙ্কর। পাকিস্তানি পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। তাঁর শরীর ভেঙে দেওয়া হয়,কিন্তু তাঁর মন ভাঙা যায়নি। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন নারীর প্রতিরোধের প্রতীক—তিনি বুঝিয়েছিলেন শরীর ক্ষতবিক্ষত হতে পারে, কিন্তু আত্মা নয়।

প্রসঙ্গত ইলা মিত্রকে বুঝতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়েছিল। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। জমিদারের খাজনা, মহাজনের সুদ, পুলিশের দমননীতি কৃষকদের জীবনকে শ্বাসরোধ করে রেখেছিল। এই পরিস্থিতিতে প্রজাদের দাবি—“তেভাগা চাই”—শুধু অর্থনৈতিক নয়, ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন। সেই সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ইলা মিত্র হয়ে উঠেছিলেন কৃষকসমাজের মাতৃমূর্তি। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অন্যান্য নেতৃবৃন্দও, কিন্তু একজন নারী হয়ে এই আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা ছিল সেইসময়ের নিরিখে একেবারেই নতুন দৃষ্টান্ত।

আজকের দিনে এই দৃঢ়তার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় তীব্র বৈপরীত্য। আজকের দিনের রাজনীতিতে নারীদের ভূমিকা অনেকাংশে বেড়েছে—প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রীসভা থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনেও নারীরা দৃশ্যমান। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশের রাজনৈতিক যাত্রাপথ নির্ধারিত হয় ক্ষমতার কূটনীতি, দলীয় আনুগত্য কিংবা পারিবারিক প্রভাবের মাধ্যমে। জনতার সঙ্গে মাটির টান, নিজের শরীর দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস সেখানে বিরল। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে আমাদের ইলা মিত্র কোনও রাজনৈতিক বংশপরম্পরার উত্তরাধিকারী ছিলেন না, কোনও রাষ্ট্রশক্তির সমর্থনও পাননি। তিনি নেতৃত্বের শক্তি পেয়েছিলেন জনতার কাছ থেকে। বর্তমান সময়ে নারী রাজনীতিবিদরা হয়তো ক্ষমতার শিখরে বসেন, কিন্তু ইলা মিত্র ক্ষমতার নয়, প্রতিরোধের আইকন। এখানেই তাঁর আলাদা উচ্চতা।

নারীবাদী দর্শনের আলোকে তাঁর সংগ্রাম আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফরাসি দার্শনিক Simone de Beauvoir লিখেছিলেন, “One is not born, but rather becomes, a woman.”—“নারী হয়ে জন্ম নেওয়া হয় না, বরং সমাজের ভেতরে সংগ্রামের পথে নারী হয়ে ওঠা হয়।” ইলা মিত্রের জীবন এই উক্তিরই প্রতিফলন। আবার Virginia Woolf তাঁর “A Room of One’s Own”-এ দেখিয়েছিলেন, স্বাধীন চিন্তার জন্য নারীর দরকার নিজস্ব জায়গা। ইলা মিত্র সেই জায়গা খুঁজে পেয়েছিলেন গ্রামীণ বাংলার মাঠে, কৃষকের পাশে দাঁড়িয়ে। আর ভারতীয় প্রেক্ষাপটে মহাশ্বেতা দেবী যেমন তাঁর সাহিত্যে জনজাতির সংগ্রামী নারীকে কেন্দ্র করে তুলেছিলেন, ইলা মিত্র ছিলেন সেই বাস্তব প্রতিমূর্তি।

Gayatri Spivak তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “Can the Subaltern Speak?”-এ প্রশ্ন তুলেছিলেন, প্রান্তিক মানুষ কি আদৌ নিজের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিতে পারে? ইলা মিত্রের সংগ্রামই যেন তার সঠিক উত্তর—তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সাবঅল্টার্ন কণ্ঠ স্তব্ধ করা যায় না।

ভারতীয় ইতিহাসবিদ Ranajit Guha তাঁর প্রবন্ধ “On Some Aspects of the Historiography of Colonial India” (1982)-এ লিখে
ছিলেন:“Historical writing … fails to acknowledge, far less interpret, the contribution made by the people on their own, that is, independently of the elite to the making and development of this nationalism.”অর্থাৎ বলা যায়“যে ঐতিহাসিক লেখালিখি সাধারণ মানুষের অবদানকে স্বীকারই করে না, তার ব্যাখ্যা তো দূরের কথা। স্বাধীনতার ইতিহাস নির্মাণে জনতার নিজস্ব ভূমিকা, যা এলিটদের বাইরে গড়ে উঠেছিল, তা উপেক্ষিত থেকে যায়।” এই বক্তব্য যেন
ইলা মিত্রের অবস্থানের সত্যিটা তুলে ধরে। তিনি ছিলেন জনতার প্রতিনিধি, নিম্নবর্গের কণ্ঠস্বর। অথচ ইতিহাসচর্চায় তাঁর ভূমিকা প্রায়শই আড়ালে থেকে গেছে।

অন্যদিকে Sumit Sarkar “Writing Social History” (1997)-এ লিখেছিলেন It was more important to explore the historical limits of mainstream nationalism … Already, Ranajit Guha had gathered … That was the nucleus of the Subaltern Studies collectiv অর্থাৎ মূলধারার জাতীয়তাবাদের সীমা অন্বেষণ করা অনেক বেশি জরুরি ইতিমধ্যেই রঞ্জিত গুহ সেই দিশায় এগিয়েছিলেন… সেখান থেকেই সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ গড়ে উঠেছিল।”
সুমিত সরকারের এই বক্তব্য মনে করিয়ে দেয়, মূলধারার জাতীয়তাবাদ আমাদের যতই গর্বিত করুক না কেন তা কিন্তু প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতাকে ধারণ করতে পারে নি। সেই দিক দিয়ে বিশ্লেষণ করলে ইলা মিত্র সেই সীমারেখাকে অতিক্রম করেছিলেন—তিনি ছিলেন রাষ্ট্রীয় রাজনীতির বাইরে, কিন্তু গ্রামীণ আন্দোলনের কেন্দ্রে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইলা মিত্রকে দাঁড় করালে দেখা যায়, তিনি কেবল বাংলার নয়, পৃথিবীর এক প্রতিরোধী নারীর প্রতীক। চেক বিপ্লবী লেখক জুলিয়াস ফুচিক মৃত্যুর আগে কারাগার থেকে লিখেছিলেন Notes from the Gallows, যা হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের দলিল। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে অসংখ্য নারী সরাসরি অস্ত্র হাতে লড়েছিলেন। ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধেও নারী সৈনিকরা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইলা মিত্র কে রাখলে বোঝা যায়, তিনি কেবল স্থানীয় আন্দোলনের নেত্রী নন, সেই দিক দিয়ে তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক বিপ্লবী নারীর ঐতিহ্যেরও উত্তরসূরি।

কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁর নাম আজও আড়ালে থেকে গেছে। কারণ রাষ্ট্র সব সময় সংগ্রামী প্রতীককে আড়াল করে রাখে। সমাজও হয়তো লড়াই করা নারীর চেয়ে বিনোদন দানকারী নারীকে বেশি মনে রাখে। অথচ ইলা মিত্রের সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মাটি ও মানুষের সঙ্গে যুক্ত না হলে নেতৃত্ব ফাঁপা হয় রাষ্ট্রের দমননীতি যতই নির্মম হোক, প্রতিরোধের আত্মাকে ভাঙা যায় না, আর নারীর শক্তি সংসারের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনীতিতেও ইতিহাস বদলাতে পারে।

সমসাময়িক তুলনায় দেখা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হলেও তাঁর রাজনীতির রণকৌশল ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছনোর সংগ্রামে সীমাবদ্ধ। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নাম উজ্জ্বল, কিন্তু সেটি গড়েছে রাজনৈতিক বংশপরম্পরার উত্তরাধিকার কে ঘিরে। আন্তর্জাতিকভাবে নিউজিল্যান্ডের জাসিন্ডা আর্ডার্ন মানবিক নেতৃত্বের নজির তৈরি করেছেন, কিন্তু তিনি কোনওদিন জনতার মধ্যে গিয়ে শারীরিক দমন যন্ত্রের মুখোমুখি হননি। ইলা মিত্রের রাজনীতির প্যাটার্ন ছিল আলাদা—তিনি মাটির মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে প্রতিরোধকে নিজের দেহে বহন করেছিলেন। এটাই তাঁকে আলাদা করে তোলে, আজকের রাজনীতির জন্য তিনি রয়ে যান এক আয়না।

ইলা মিত্র সিনেমার নায়িকা নন, রাষ্ট্রশক্তির মুখ নন, সুরের দেবীও নন। তিনি ছিলেন ক্রীড়াক্ষেত্রে দীপ্ত, সংস্কৃতিচর্চায় পারদর্শী, আর কৃষক আন্দোলনের অবিচল প্রতীক। তাঁর জীবন যেন এক প্রতীকী বৃত্ত—শৈশবের খেলার মাঠ থেকে পাকিস্তানি কারাগারের অন্ধকার কুঠুরি পর্যন্ত, আলোর সূচনা মিলেমিশে গেছে প্রতিরোধের ছায়ায়। তাঁকে তাই বলা যায় “আলোকহীন আইকন”—যিনি আলোয় না থেকেও অন্ধকারের অগ্নিশিখা হয় জ্বলে উঠেছিলেন ।

আজকের দিনে যখন ক্ষমতার আলোয় সাজানো আইকনদের ভিড়ে প্রকৃত প্রতিরোধী কণ্ঠ চাপা পড়ে যায়, তখন ইলা মিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেন—আইকন মানে কেবল জনপ্রিয়তা নয়, বরং সংগ্রামের উত্তরাধিকার।
আর সেই উত্তরাধিকার কে কবি গোলাম কুদ্দুস এক অমোঘ ভাষায় উচ্চারণ করেছিলেন—

“ইলা মিত্র স্তালিন নন্দিনী,
ইলা মিত্র ফুচিকের বোন।”

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, নভেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

4 3 ভোট
Article Rating
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Nandita Sinha
Nandita Sinha
7 months ago

খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা। খুবই ভালো লেগেছে

Shampa bhattacharya
Shampa bhattacharya
7 months ago

খুব সুন্দর লেখা। ইলা মিত্রর কথা জানতে পেরে খুব ভালো লাগলো।।

Dr Dipak Banerjee
Dr Dipak Banerjee
7 months ago

ইলা মিত্র এর কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
আজকের রাজনীতির আবহাওয়া সম্পূর্ণ ওনার বিপরীত।
খালি মিথ্যাচার, লোভ, যেন তেন প্রকারেন ক্ষমতা ভোগের লালসায়, সবাই ছুটছে! কাজেই ইলা মিত্রের জীবনের
আয়না ওনারা দেখতে পাবেন না!