
যেখানে তাল থামে না
সারাটা পুজো পাড়ার ক্লাবের মণ্ডপে কেটেছে ঢাকি স্বপনের। ভোর থেকে গভীর রাত, আলো-ধোঁয়া-ধুনুচির ভিড়ে, দুর্গা ঠাকুরের আরতির সঙ্গে মিশে গেছে তার ঢাকের বোল। হাতে ব্যথা করেছে, তবু থামেনি—
“ধিক-তে-তে, ধিক-তে-তে, ধিক… ধিক-তে-তে!”
চারদিকে আনন্দ, নতুন জামা, মিষ্টির গন্ধ, আতসবাজির ঝলক। স্বপন সবার জন্য বাজিয়েছে, পাড়ার সবাই আনন্দ করেছে, সবার বাড়িতে আনন্দ পৌঁছেছে, কিন্তু নিজের ঘরে আলো জ্বলেনি। কারণ স্বপনের মেয়ে পাড়ার প্যান্ডেলের এক কোণে বসে থেকে থেকে দেখেছে তার বন্ধুদের নতুন ফ্রক। স্বপনের মেয়েও জানে এ বছর ধানে ভালো লাভ হয়নি। নিজেদের কোনও ধানজমি নেই—স্বপন ভাগের জমি চাষ করে। চাষ না থাকলে ক্ষেতমজুরের কাজ করে। আর সারা বছরের ঢাক বাজানোর কাজই বা কতটুকু! তবু বাপ-ঠাকুরদার ঢাক বাজানোর নেশাটা এখনো স্বপন ধরে রেখেছে।
বিজয়ার দিন দুপুরে ঢাক নামিয়ে মেয়েটা খুব আস্তে আস্তে স্বপনকে বলল—
— “বাবা… আমারও কি ফ্রক হবে?”
ঢাকি তাকাল, চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে হালকা হাসি—
— “আজই কিনব। তোর হাসিই তো আমার উৎসব।”
হাটের দোকানে দাঁড়িয়ে কুঁচকে যাওয়া নোট, কয়েন গুনল সে। দাম মেলাতে সময় লাগল, তবু মিলে গেল। মেয়েটার হাতে এল নীল ফ্রক, সাদা বোতাম চকচক করছে। সে বুকে জড়িয়ে ধরল, মুখে উজ্জ্বল আলো—যেন অষ্টমীর ভোগ খাওয়ার আনন্দ।
ফেরার পথে সূর্য ডুবল, আকাশ লালচে হলো। ধানক্ষেত নিস্তব্ধ, হঠাৎ ঢাকির কাঁধের ঢাকটা নিজে নিজে দুলে উঠল।
“ধিক-তে-তে… ধিক-তে-তে—ধিক!”
শব্দটা মাঠ কাঁপিয়ে দিল, পুকুরে ঢেউ তুলল, ক্লাবের ভাঙা মণ্ডপেও আলো জ্বলে উঠল। যেন ঠাকুর বিদায় নেননি, তিনি ঢাকির সঙ্গেই আছেন।
মেয়েটা স্বপনের হাত চেপে ধরে বলল—
— “বাবা, ঢাক কে বাজাচ্ছে?”
ঢাকি চোখ মুছল, হেসে বলল—
— “আজ দুর্গা ঠাকুরের বোলটা আমাদের ঘরেই বাজছে রে।”
নীল ফ্রকটা থেকে যেন এক মুহূর্তের জন্য আলো ছড়িয়ে পড়ল। যেন রাতের অন্ধকার ভেদ করে ঠাকুরের আশীর্বাদ ঝরে পড়ল। তারপর সব আবার স্বাভাবিক।
কিন্তু স্বপন আর স্বপনের মেয়ের কানে বাজনা বাজতেই থাকল—
“ধিক-তে-তে, ধিক-তে-তে…”
যেন তাল থামতেই চায় না। এই ঢাকের বোল উৎসবের আনন্দ হয়ে ঘুরে ঘুরে তাদের ঘরে ফিরে আসে। সবার ঘরে হয়তো এখনও পৌঁছায়নি, কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই পৌঁছবে—এই আশাতেই তারা বেঁচে থাকে, এই আশাতেই স্বপনের হাত থামে না।

খোঁজ
ট্রামটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল কলেজ স্ট্রিটের ভিড়ের ভেতর দিয়ে। জানলার বাইরে বইয়ের দোকানগুলো পেছনে সরে যাচ্ছিল। সাদা-কালো অক্ষর ভেসে আসছিল চোখে, অথচ কোনো শব্দের মানে দাঁড় করাতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল কোথাও যেন আগে এসেছি, কোথাও আগে বসেছি, কিন্তু তার নামটা মনে পড়ছে না।
পাশের সিটে বসা লোকটা হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“কোথায় নামবেন?”
আমি মুখ খুলে কিছু বলার চেষ্টা করলাম।
কিন্তু ঠোঁট দিয়ে বেরোল একেবারেই অন্য শব্দ।
আমি নিজেই যেন চিনতে পারলাম না সেই উত্তর। লোকটা একটু অবাক হয়ে তাকাল, তারপর হাসল, আবার নিজের দিকে ফিরল।
ট্রামটা কাঁপতে কাঁপতে এগোচ্ছিল।
আমি পকেট থেকে টিকিট খুঁজতে গিয়ে বের করলাম একটা পুরনো কাগজ—চিঠি হবে হয়তো। অর্ধেক মুছে যাওয়া অক্ষর, কালি ছড়ানো। উপরের দিকটা কেটে ফেলা, ঠিকানাটুকু নেই। লিখেছিলাম কাকে? কবে? মনে নেই। শুধু দেখেই বুকের ভেতর কেমন হাহাকার উঠল। আজকাল তো চিঠি উঠে গেছে, তাহলে এইসব পকেটে এলো কী করে?
জানলার ধারে হেলান দিলাম।
রাস্তার নামগুলো চোখে পড়ছিল—বিদ্যাসাগর, কলেজ, থেকে শ্যামবাজার। পাঁচ মাথার মোড়—সব পরিচিত, অথচ কোথাও যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমি ভুল মানচিত্রে হেঁটে যাচ্ছি, আর খুঁজে ফিরছি এমন একটা জায়গা যার নাম মুখে আনতেই পারছি না। আমার প্রতিটা পকেটে অসংখ্য কাগজের টুকরো।
ট্রামটা থামল একটা স্টপেজে। লোকজন নেমে গেল একে একে। আমিও নামব বলে উঠতে গিয়ে থমকে গেলাম। কেন নামব? কোথায় যাব? গন্তব্যের নাম মনে পড়ছিল না।
ড্রাইভার পেছন থেকে ডেকে বলল—
—“শেষ স্টপেজ, নামুন।”
আমি তাকালাম চারপাশে। সব সিট ফাঁকা, শুধু আমি বসে আছি। হাতে মুচড়ে ধরা সেই পুরনো কাগজটা কেমন গরম হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল ওর ভেতরেই হয়তো উত্তরটা লুকিয়ে আছে।
ট্রামের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম। রাস্তায় আলো ঝলমল করছে, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম না কোনদিকে হাঁটব। মাথার ভেতর কেবল একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—
আমি কী খুঁজছিলাম এতদিন ধরে? মানুষ? ঠিকানা? না কি নিজের নামটাই?
পকেটের ভেতর হাত দিয়ে সমস্ত কাগজ গুলো বার করলাম, কিন্তু কিছুই পেলাম না।


বাহ্। অপূর্ব
মন কেমনের শব্দ জুড়ে
হেমন্তের বিষাদে কবিতাও বিষন্ন