দেব-দেবীরা কি শুধু ভালো আর সুন্দরই হন? গ্রিক পুরাণ আমাদের জানায় যে না, তাঁদের মধ্যেও মানুষের মতোই নানা অনুভূতি কাজ করে, আর সেই অনুভূতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে হিংসা, ক্রোধ, আর ঝগড়ার আগুন। এরিস, গ্রিক পুরাণের সেই দেবী, যিনি ঝগড়া, বিবাদ আর অশান্তির প্রতীক। তাঁকে সাধারণত কেউ তেমন গুরুত্ব দিতেন না, কিন্তু তাঁর একটা সামান্য কাজই জন্ম দিয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম বড় এক মহাকাব্যের—ট্রয় যুদ্ধ। একটা ছোট্ট আপেলের মাধ্যমে তিনি যে ঝগড়ার আগুন জ্বালিয়েছিলেন, তা দশ বছর ধরে অগণিত বীরের রক্তে গ্রিকের মাটিকে ভিজিয়েছিল। দেবতাদের সামান্য এক বিবাদ যে কতটা ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনতে পারে, তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ এই ট্রয় যুদ্ধ।

এরিসের জন্ম ও স্বভাব: অন্ধকারের বীজ

​​এরিসের জন্ম নিয়ে দুটি ভিন্ন কাহিনি প্রচলিত আছে। হোমারের ‘ইলিয়াড’ অনুযায়ী, তিনি যুদ্ধের দেবতা আরেসের বোন, আর দেবতাদের রাজা জিউস ও রাণী হেরার মেয়ে। কিন্তু হেসিয়ডের ‘থিওগনি’তে তাঁর পরিচয় আরও রহস্যময়। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন রাতের দেবী নিক্সের কন্যা, যিনি কোনো পুরুষ সঙ্গী ছাড়াই এরিসকে জন্ম দিয়েছিলেন। এই দ্বিতীয় গল্পটি এরিসের অন্ধকার আর বিশৃঙ্খলা তৈরির স্বভাবকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

​এরিস এমন এক দেবী ছিলেন যাকে দেব-দেবীরাও এড়িয়ে চলতেন, কারণ তিনি যেখানেই যেতেন, সেখানেই ঝগড়ার বীজ ছড়িয়ে দিতেন। তাঁর থেকেই জন্ম নিয়েছিল কষ্ট, ক্ষুধা, বেদনা, হত্যা, যুদ্ধ—এগুলো সবই বিবাদ আর ঝগড়ার ফল। তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল আসন্ন কোনো অশুভ ঘটনা। এরিস নামটা শুনলেই গ্রিক দেব-দেবীদের মনে একধরনের অস্বস্তি তৈরি হতো, কারণ তাঁরা জানতেন এরিস যেখানে আছেন, সেখানে শান্তি থাকবে না। তাঁর প্রতিটি কাজ প্রমাণ করে যে তিনি ঝগড়া, বিবাদ আর অশান্তিকে কতটা ভালোবাসতেন, আর এই কারণেই তিনি ‘ঝগড়ার দেবী’ হিসেবে পরিচিতি পান।

গ্রিক পুরাণ ও এরিস: ট্রয়ের যুদ্ধের সূচনা

​এরিসের নাম সবচেয়ে বেশি পরিচিত ‘গোল্ডেন অ্যাপল অফ ডিসকর্ড’ বা ঝগড়ার সোনার আপেলের ঘটনার জন্য, যা ট্রয়ের যুদ্ধের মূল কারণ হয়েছিল। এই ঘটনাই এরিসকে পাকাপাকিভাবে ঝগড়ার দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

​শুনতে অবাক লাগলেও, এই বিশাল যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে। মানুষের রাজা পেলেউস আর জলদেবী থেটিসের বিয়ের দারুণ উৎসবে প্রায় সব দেব-দেবীকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দেবতাদের রাজা জিউস, যিনি অলিম্পাসের সর্বোচ্চ শাসক, তিনিও সেই মহা উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ঝগড়ার দেবী এরিসকে ইচ্ছে করে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কারণ, সবাই জানত এরিস মানেই ঝামেলা! এমন এক শুভ অনুষ্ঠানে কেউ কোনো ঝামেলা চাননি। এরিস এই অপমান মেনে নিতে পারলেন না। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তিনি এক ভয়ানক পরিকল্পনা করলেন।

​তিনি একটি সোনার আপেল নিয়ে সেই ভোজসভায় এলেন, আর আপেলটার ওপর লিখে দিলেন “tē kallístē”, যার মানে “সবচেয়ে সুন্দরী নারীর জন্য”। এরপর, এক নিমেষে আপেলটা তিনি ছুঁড়ে দিলেন ভোজসভার মাঝখানে। সাথে সাথেই তিন প্রধান দেবী—হেরা, এথেনা, এবং আফ্রোদিতি, আপেলটা নিজেদের বলে দাবি করলেন। প্রত্যেকেই নিজেদের সবচেয়ে সুন্দরী মনে করতেন, আর দাবি করলেন যে আপেলটা তাঁদেরই প্রাপ্য। মুহূর্তেই দেবতাদের মধ্যে শুরু হলো তীব্র তর্ক।

​গোল্ডেন আপেলের ঘটনায় জিউসের প্রধান আগ্রহ ছিল এই বিবাদকে এমনভাবে সমাধান করা যাতে অলিম্পাস পর্বতে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে। বিতর্কটি ছিল তাঁর স্ত্রী হেরা, কন্যা এথেনা এবং আরেক প্রভাবশালী দেবী আফ্রোদিতির মধ্যে। এই তিনজনের মধ্যে যেকোনো একজনকে বেছে নিলে জিউস বাকি দুজনের ক্রোধের শিকার হতেন, যা দেবতাদের মধ্যে এক ভয়াবহ যুদ্ধের কারণ হতে পারতো। এই জটিল পরিস্থিতি এড়াতেই জিউস একজন মরণশীল মানুষ, প্যারিসকে বিচারক হিসেবে বেছে নেন। তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ ছিল বিবাদের একটি নিরাপদ সমাধান খুঁজে বের করা, কোনো পক্ষের হয়ে দাঁড়ানো নয়।
​এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে জিউস এর বিচার করার দায়িত্ব দিলেন ট্রয়ের সুদর্শন যুবরাজ প্যারিসকে। প্যারিস যখন তিন দেবীর সামনে এলেন, তখন প্রত্যেকেই তাঁকে নানা প্রলোভন দেখালেন। হেরা তাঁকে ক্ষমতা আর রাজ্যের লোভ দেখালেন, এথেনা যুদ্ধের জ্ঞান আর জয়ের প্রস্তাব দিলেন, আর আফ্রোদিতি তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী, স্পার্টার রানী হেলেনকে এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। প্যারিস আফ্রোদিতিকে বেছে নিলেন এবং হেলেনকে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন।

​এই রায়ের ফল ছিল ভয়ংকর। প্যারিস হেলেনকে স্পার্টা থেকে অপহরণ করে ট্রয়ে নিয়ে গেলেন। এর ফলে, হেলেনের স্বামী মেনেলাউস এবং তার ভাই আগামেমনন গ্রিক রাজ্যগুলির অন্যান্য রাজাদের একজোট করে হেলেনকে ফিরিয়ে আনার জন্য ট্রয়ের বিরুদ্ধে বিশাল যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। এই যুদ্ধই মহাকাব্যিক ট্রয়ের যুদ্ধ (Trojan War) নামে পরিচিত, যা দশ বছর ধরে চলেছিল এবং হাজারো বীরের প্রাণ কেড়েছিল। এরিসের ছুঁড়ে দেওয়া সেই একটি আপেলই যেন হয়ে উঠেছিল হাজারো মৃত্যুর মূল কারণ! দেবতাদের ব্যক্তিগত ঝগড়া কীভাবে একটি সভ্যতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?

অন্যান্য পুরাণে বিশৃঙ্খলার দেব-দেবী

​পৃথিবীর বিভিন্ন পুরাণে এরিসের মতোই এমন কিছু চরিত্র আছে, যারা বিবাদ বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। তাঁদের উদ্দেশ্য বা কাজের ধরন এরিসের থেকে কিছুটা আলাদা হলেও, প্রায়শই তাঁরা ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ান।

নর্স পুরাণ ও লোকি: দুষ্টুমির আড়ালে বিপদ

​নর্স পুরাণে লোকি সরাসরি ঝগড়ার দেবতা নন, কিন্তু তিনি হলেন প্রতারণা, দুষ্টুমি আর সংঘাতের দেবতা। এরিসের মতোই তিনি প্রায়শই দেবতাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতেন, শুধুমাত্র নিজের স্বার্থে বা মজা করার জন্য। তাঁর উপস্থিতিতে নর্স দেবতাদের শান্তিপূর্ণ জীবনও অশান্ত হয়ে উঠত।

​লোকির কূটবুদ্ধির সবচেয়ে মারাত্মক ফল ছিল দেবতাদের প্রিয় বাল্ডারের মৃত্যু। বাল্ডারের মা, দেবী ফ্রিগ, পৃথিবীর সবকিছুকে শপথ করিয়েছিলেন যেন তারা বাল্ডারের কোনো ক্ষতি না করে। কিন্তু তিনি একটি ছোট মিস্টলটো গাছকে শপথ করাতে ভুলে গিয়েছিলেন। লোকি এই দুর্বলতা জেনে বাল্ডারের অন্ধ ভাই হোডারকে মিস্টলটোর তীর দিয়ে বাল্ডারকে আঘাত করতে উৎসাহিত করলেন। সেই তীর সরাসরি বাল্ডারের বুকে বিঁধল আর তিনি মারা গেলেন। বাল্ডারের মৃত্যু দেবতাদের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি।

​লোকি এখানেই থামেননি। একবার তিনি সৌন্দর্যের দেবী সিফের সোনালী চুল চুরি করে নিয়েছিলেন, কারণ চুল নিয়ে তাঁর সৌন্দর্যকে লোকি হিংসা করতেন। এই ঘটনার ফলে দেবতাদের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত লোকিকে দেবতাদের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল এবং সিফের জন্য নতুন করে সোনালী চুল তৈরি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর এই ধরনের কাজগুলোই প্রমাণ করে যে তিনি কতটা অস্থিরতা আর বিবাদ পছন্দ করতেন।

মিশরীয় পুরাণ ও সেঠ: হিংসা আর ক্ষমতার সংঘাত

​মিশরীয় পুরাণে সেঠ হলেন বিশৃঙ্খলার দেবতা। তাঁকে প্রায়শই খারাপ আর ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাঁর হিংসা আর ঈর্ষা শুধু দেবতাদের মধ্যে নয়, পুরো সৃষ্টিতেই ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছিল।

​গল্পের শুরুটা ছিল এমন: ওসিরিস ছিলেন এক দয়ালু আর জ্ঞানী রাজা, যিনি মিশরকে শাসন করতেন। তাঁর শাসনে দেশ সমৃদ্ধ হয়েছিল, কৃষিকাজ উন্নতি লাভ করেছিল, আর মানুষ সুখে-শান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল। তিনি ছিলেন কৃষি, উর্বরতা আর পরকালের দেবতা। মিশরের মানুষ তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসত। কিন্তু ওসিরিসের এই জনপ্রিয়তা তাঁর ভাই সেঠের মনে গভীর হিংসা আর ঈর্ষা তৈরি করল। সেঠ ছিলেন মরুভূমি, ঝড় আর বিশৃঙ্খলার দেবতা। তাঁর স্বভাব ছিল হিংস্র আর অস্থির। তিনি তাঁর ভাইয়ের খ্যাতি এবং ক্ষমতা দেখে ক্রোধে জ্বলতে লাগলেন।

​একবার সেঠ একটি বিশাল ভোজসভার আয়োজন করলেন। সেখানে তিনি একটি চমৎকার সিন্দুক নিয়ে এলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে, এই সিন্দুকটি যিনি ঠিক তাঁর শরীরের মাপে তৈরি, সেই ব্যক্তিকেই এটি উপহার দেওয়া হবে। একে একে সবাই চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু কারও শরীরেই সিন্দুকটি ঠিকমতো হলো না। অবশেষে, ওসিরিস যখন সিন্দুকে ঢুকলেন, তখন দেখা গেল এটি ঠিক তাঁর শরীরের মাপে তৈরি। সবাই যখন উল্লাসে ফেটে পড়ল, সেই মুহূর্তেই সেঠ আর তাঁর সঙ্গীরা দ্রুত সিন্দুকের ঢাকনা বন্ধ করে দিল এবং ওটাকে শক্ত করে আটকে দিল। এরপর তারা সেই সিন্দুকটিকে নীলনদে ফেলে দিল। এই বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে ওসিরিসের মৃত্যু হলো।

​গল্প এখানেই শেষ হলো না। ওসিরিসের স্ত্রী, দেবী আইসিস ছিলেন তাঁর স্বামীর প্রতি গভীরভাবে অনুগত। তিনি তাঁর স্বামীর দেহ খুঁজে বের করার জন্য দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। বহু কষ্টের পর তিনি সিন্দুকটি খুঁজে পেলেন। কিন্তু তাঁর সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। এই খবর সেঠের কানে পৌঁছলে তিনি আরও হিংস্র হয়ে উঠলেন। সেঠ, ওসিরিসের দেহকে ৪২ টুকরা করে কেটে মিশরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিলেন, যাতে কেউ আর তাঁর দেহ খুঁজে না পায়। কিন্তু আইসিস হাল ছাড়লেন না। তিনি প্রতিটি টুকরা খুঁজে বের করলেন এবং জাদুবিদ্যা দিয়ে সেই টুকরোগুলোকে এক করলেন। এরপর তিনি ওসিরিসকে অল্প সময়ের জন্য জীবিত করে তাঁদের ছেলে হোরাসের জন্ম দিলেন।

​বড় হওয়ার পর হোরাস তাঁর বাবার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে সেঠের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধ করলেন। এই যুদ্ধ ছিল ক্ষমতা, হিংসা আর পারিবারিক সংঘাতের এক শক্তিশালী প্রতীক।

হিন্দু পুরাণ ও নারদ মুনি: শুভ পরিণতির জন্য কলহ

​হিন্দু পুরাণে নারদ মুনি এক অদ্ভুত আর বিশেষ চরিত্র। তাঁকে প্রায়শই ‘কলহপ্রিয়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, কারণ তিনি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় খবর নিয়ে যান, যা প্রায়শই ভুল বোঝাবুঝি বা বড় ধরনের ঝামেলার জন্ম দেয়। কিন্তু গ্রিক দেবী এরিস বা নর্স দেবতা লোকির মতো তাঁর উদ্দেশ্য শুধু বিশৃঙ্খলা তৈরি করা বা ধ্বংসের বীজ বোনা নয়। নারদের ‘ঝগড়া’ প্রায়শই একটা বড় আর ভালো উদ্দেশ্য বা ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ হয়ে থাকে। তাঁর হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ধর্ম প্রতিষ্ঠা, কোনো খারাপ মানুষের বিনাশ বা নতুন জ্ঞান পাওয়ার দিকে নিয়ে যায়। তিনি যেন মহাবিশ্বের এক অদৃশ্য পরিচালক, যিনি সাময়িক অস্থিরতা তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক পরিবর্তন আনেন।

​নারদের ঝগড়াটে স্বভাবের একটা উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো দক্ষ প্রজাপতি আর শিবের মধ্যে বিবাদ। দক্ষ ছিলেন খুব অহংকারী, আর তাঁর জামাতা শিবকে তিনি মানতে পারতেন না। নারদ মুনি দক্ষের কাছে শিবের সমালোচনা করতেন এবং শিবের কাছে দক্ষের অহংকার তুলে ধরতেন, এমনভাবে পরিস্থিতি তৈরি করতেন যেন দক্ষ আর শিবের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়ে। এর ফলে, শিবকে অপমানিত হতে দেখে সতী দেবী সেই যজ্ঞে আত্মাহুতি দেন। এরপর শিবের ক্রোধে দক্ষের যজ্ঞ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এই বিবাদের মাধ্যমে দক্ষের অহংকার ভেঙে যায় আর বিশ্বে ন্যায় প্রতিষ্ঠা পায়।

​নারদের এই ভূমিকার আরেকটি দিক দেখা যায় শ্রীকৃষ্ণের লীলায়। যখন শ্রীকৃষ্ণ দুষ্ট রাজাদের বিনাশ করে যাদব বংশকে শক্তিশালী করে তোলেন, তখন যাদবরা খুব অহংকারী হয়ে ওঠে। নারদ মুনি তাদের মধ্যে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সন্দেহ আর বিভেদ তৈরি করতেন, যা তাদের অহংকারকে উসকে দিত। তিনি জানতেন যে এই অহংকারই তাদের পতনের কারণ হবে। এর ফলে, যাদবরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে একে অপরকে শেষ করে ফেলে।

​এরিস এবং লোকি মূলত তাঁদের নিজেদের দুষ্টুমি, হিংসা বা প্রতিশোধের জন্য বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন, যার ফল হয় ধ্বংসাত্মক আর অপূরণীয়। কিন্তু নারদ মুনির ক্ষেত্রে, তাঁর ‘কলহপ্রিয়তা’ একটি গভীর উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রক্রিয়া।

উপসংহার

​এরিস গ্রিক পুরাণে শুধু একজন ঝগড়াটে দেবী হিসেবেই আটকে নেই, তিনি মানুষের খারাপ দিক—হিংসা, বিবাদ আর সংঘাতের প্রতীক। তাঁর একটা ছোট্ট কাজ, সামান্য একটা আপেল, কীভাবে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে আর এক মহাকাব্যিক ঘটনার সূচনা করতে পারে, তার এক অসাধারণ উদাহরণ তিনি। এরিস আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, কখনও কখনও সবচেয়ে ছোট কারণও সবচেয়ে বড় ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে।

​বিশ্বের অন্যান্য পুরাণেও এরিসের মতো চরিত্ররা নানাভাবে বিশৃঙ্খলা বা সংঘাত তৈরি করেছে, যা মানব ইতিহাসের জটিলতা আর গল্পের আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই চরিত্রগুলো আমাদের শেখায় যে, যখন দেবতারা ঝগড়াটে হন, তখন ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে—তা সে ধ্বংসাত্মক পরিণতিতেই হোক বা কোনো মহৎ উদ্দেশ্যের আড়ালেই হোক।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, নভেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Dr Dipak Banerjee
Dr Dipak Banerjee
9 months ago

খুব ভালো লাগলো, অনেক নতুন দেবদেবীদের কান্ড জানতে পারলাম, এত সুন্দর করে লেখার জন্য অনেক ধন্যবাদ।