অঙ্গারেওয়ালি রসিদ জাহান

কুসঙ্গ

‘বাবা, সৈয়দ ভাই চলে যাচ্ছে।’
‘হুমম!’, তাড়াতাড়ি চোষ কাগজটি লুকিয়ে মুখ্য বিচারপতি স্যার আতাউল্লা বললেন।
চোখে ঘৃণার ঝলক এবং জ্বলন্ত বিদ্রোহ নিয়ে জাকিয়া জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে আপনি তাকে আবার তাড়িয়ে দিলেন?’
বিরক্তির স্বরে জজসাহেব বললেন, ‘তুমি এসবের কী জান? যাও, নিজের কাজ কর।’

তিনি তাকে চলে যেতে বলতে চাইলেন, কিন্তু সে তো একটি মেয়ে। তিনি তার দিকে তাকালেন এবং ক্রোধ চেপে রেখে শুধু বললেন, ‘জাকিয়া, চলে যাও। আমার কাজ আছে।’

জজসাহেব টেবিলের উপর কনুই রাখলেন। তাঁর চোখ ফাইলগুলির উপর নিবদ্ধ। কিন্তু তার মন অন্যখানে। তিনি সৈয়দের উপর এত ক্রুদ্ধ হয়েছেন। সে তো কোন কাজেরই নয়, আর এখন সে জাকিয়াকেও ধ্বংস করছে। আর এই মেয়েটির মনের জোর আছেঃ সে বাবার সঙ্গে খেলা করতে এসেছে! সৈয়দের বয়স আটাশ এবং সে ভ্যাগাবন্ডের জীবন যাপন করে। ‘এই বয়সে আমি কী না করেছি,’ জজসাহেব নিজেকে বললেন। ‘বিলাসজীবন একজনকে অলস করে তোলে। যখন কমবয়সি সন্তানদের রেখে বাবা মারা যান, আমার মা সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন এবং সমস্ত রকমের কঠিন কাজ করেছেন। তেরোবছর বয়স থেকে আমি টিউশনি করছি। সে সব দারিদ্র আর কষ্টকর দিনের কথা মনে করলে আমার কি বেদনা হয়। আর আজ আমার ছেলে আমার চোখের দিকে তাকাতে সাহস পায় আর আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি জীবনে কী করেছি? আমি ধনি হয়ে অন্যের কি উপকার করেছি? আমি নিজেকে এক গহ্বর থেকে বের করেছি এবং আমার সমস্ত পরিবারকে উঁচু আকাশে স্থাপিত করেছি বলে আমার ছেলে কার্ল মার্কসকে বগলের নিচে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

‘আমাদের বাড়ি ছিল খুবই ছোট, অন্ধকার, আলোহীন। সামনে ছিল একটি ছোট প্রাঙ্গণ। আমাদের কঠোর কাজের বিনিময়ে আমরা সারা বর্ষা বৃষ্টিতে কোন রকমে দাঁড়িয়ে কাটাতাম। এক খাটিয়াতে তিনজন শুতাম। আজকে, সুন্দর গদিওয়ালা বিছানার আরামে শুয়ে সৈয়দসাহেব ভাবছে সে পৃথিবীকে পালটাতে পারে। সে আমাকে জিজ্ঞেস করে আমার সন্তানরা কি ভালো পদে চাকরি পাবে, কীভাবে তা মানবতার কাজে লাগবে? আমার অতীত সঙ্গিদের কিছু লাভ করার ছিল না, যা ছিল তা হলো শত্রুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। সে আমাকে জিজ্ঞেস করে দারিদ্রের একই অবস্থায় বিরাজ করা মানুষদের প্রতি আমার কী সম্ভাব্য সমবেদনা আছে? সে আমার প্রতি অভিযোগ আনে যে আমি অতীত শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আইনের রক্ষা করি।

‘আমি আমার ভাগ্যকে পরিবর্তন করেছি। অন্যরাও তাদেরটা করবে এই কথা কি আমাকে তাদের বলে দিতে হবে? এগিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধি এবং সাহস আমার আছে। অন্যরা নিচ এবং অলস। কীভাবে তারা তাদের ভাগ্য পালটাবে?’

‘সে আমাকে বলে মুখ্য বিচারপতি হবার জন্য আমি যে কঠোর পরিশ্রম করেছি তা বিফলে গেছে। কার্যত, সে “বিফলে” কথাটা বলেনি। সে বলেছে আমি আমার কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আমি বিশ্বাসঘাতক না সে? সে আমার সমস্ত কঠোর পরিশ্রমকে নিন্দা করতে চায়। এত বছর ধরে এক অবিশ্বস্ত বিশ্বাসঘাতক হিসেবে সে আমার বাড়িতে বাস করেছে। সমাজে এই যথার্থ স্থানে পৌঁছতে আমিই একমাত্র কঠিন কাজ করেছি। সে কে?’

‘ইব্রাহিম, যাও ভাই ইব্রাহিম, একটা এক্কা নিয়ে এস!’, বাড়ির অন্য দিক থেকে এই স্বর ভেসে আসে।

জজসাহেব এই স্বর শুনে আরও ক্রুদ্ধ হন। ‘এখন মহামান্য এক্কাগাড়িতে বেরোবেন…আমাকে অপমান করতে…কারণ সে ভাল করেই জানে যে সম্মানীয় ব্যক্তিরা সন্ধ্যায় এখানে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। কতবার আমি তাকে বলেছি…তুমি যদি এইরকম আচরণ কর তাহলে অন্য কোন শহরে গিয়ে বাস কর, কিন্তু সে শুনবে না! সে বলে আমাকে যেখানে থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে আমি সেখানে থাকব। কে তাকে আদেশ দেবে? কার আদেশ সে পালন করবে? সে তার বাবার কথা শোনে না। অবশ্যই, সে বিমাতার পুত্র। সে পিতামহীরও কথা শোনে না। তাহলে সে কার আদেশ শুনবে? পার্টির? আর কোন সে শয়তান পার্টি? একদল দণ্ডপ্রাপ্ত এবং দুশ্চরিত্র ব্যক্তি ছাড়া কিছু নয়, যারা অন্যদের উন্নতি বা উত্তম অবস্থা সহ্য করতে পারে না! তারা দাবি করে যে তারা হাঁতে গোনা কিছু লোকের সম্পদ পুনর্বন্টন করে দেবে। কিন্তু তারা কি জানে যে কত কষ্ট করে সম্পদ অর্জন করতে হয়?’

এক দীর্ঘ এবং গভীর দীর্ঘশ্বাস টেনে জজসাহেব তাঁর অনুচিন্তন জারি রাখলেনঃ ‘আমি কি তার জন্য কোন কাজ খুঁজে দিতে পারি না? বিশেষ করে আমি তিন অগ্রজ সন্তানকে কাজে নিযুক্ত করেছি। জ্যেষ্ঠতম, আল্লার কৃপায় একজন কলেক্টর। দ্বিতীয়জন রেলে আর তৃতীয়জন পুলিশে কাজ করছে। আর এই বান্দা চাকরি প্রত্যাখ্যান করছে। যখনই আমি তাকে বলতে চেষ্টা করিঃ আলসেমি ছাড় এবং কোন কাজ কর, কী উত্তর আমি পাই? উত্তর হলঃ “যে সিঁড়ি দিয়ে আপনি উঁচুতে উঠেছেন আমি সমস্ত বিশ্বকে সেই সিঁড়িতে ওঠাতে চাই।” কীভাবে সবাই সমান হতে পারে? সবার উপরে, সে এত নির্লজ্জ…। সে কানপুরে গিয়েছিল…। ছয়মাস না যেতেই তার টাইফয়েড হয়েছিল। যে বন্ধুদের সে কমরেড বলে তারা দুদিনও তাকে সেবা দিতে পারেনি। তারা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছিল। আর সে? আক্রমণ না করে সে তাদের প্রশংসা ছাড়া কিছু করেনি। এই বলে সে তাদের পক্ষ নেয়ঃ; “তারা ডাক্তার বা নার্স নয়। সর্বোপরি্‌, তাদের কাছে অর্থ নেই। তারা আমাকে হাসপাতালে না নিলে, আমি মারা যেতাম।” সে পিতামহীর চোখের মণি। তিনি চোখের জলে প্রায় আমাদের বাড়ি ভাসিয়ে দিলেন। এখন তাঁর স্বাস্থ্যের নিরাময় হয়েছে, আর এখন তিনি এই নতুন…শুরু করেছে…’

‘আরে, ইব্রাহিম ভাই, তুমি এখনও যাওনি?’
‘তাহলে, সে এখনও এখানে আছে? এই কঠিন জীবন যাপনের কী অর্থ আছে? জগতের সবার দুঃখ এবং তাদের সবাইকে তোমার হৃদয়ে ধারণ করার পিছনে কী যুক্তি আছে? প্রত্যেকেই নিজের ভালটা বুঝে নিতে পারে। যদি কেউ নিজের শান্তি ধরে রাখতে এবং চুপ করে না থাকতে পারে, অন্তত একজনের সবার কথা নিয়ে মাথা না ঘামানো উচিত। এই জ্ঞানহীন বালক আমার সামনে আয়না রেখে চিরকাল কাটিয়ে গেল। সমস্ত জগৎ আমার প্রশংসা করে। সাফল্য এবং সমৃদ্ধির জন্য আমার নাম জনশ্রুতিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে আমার ছেলের কাছে আমার জীবন মুল্যহীন, উদ্দেশ্যহীন, লক্ষ্যহীন। কষ্টের কথা সে কী জানে? কিন্তু জেল থেকে ফেরার পর থেকে, সে ভাবছে সে যেন হজ থেকে ফিরেছে!

‘তেরো বছর বয়সে থেকে আমি কাজ করতে শুরু করেছি! আমি নিজেকে শিক্ষিত করেছি, আর তারপর আমার ছোট ভাইদের স্কুলে পড়ানোর ব্যবস্থা করেছি। অনেক কষ্টের সঙ্গে, আমি ‘এনট্রান্স’ পরীক্ষা পাশ করি এবং তেরো টাকা বেতনে এক কাজে যোগ দিই। যখন আমরা আমাদের কুটির থেকে প্রাঙ্গণযুক্ত বাড়িতে প্রবেশ করি, কিভাবে আমার মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি তার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম একদিন আমি তাকে তার হাত এবং পায়ের কাছে দুই পরিচারিকা থাকবে এমন প্রাসাদে নিয়ে যাব। আর আমার ছেলে কী বলে? সে বলে, ‘সেই দুই পরিচারিকাকে প্রশ্ন করুন ওরা আপনার বাড়িতে দাসের মতো কাজ করতে কেমন অনুভব করে?’

‘ওয়াজিদ! ওয়াজিদ! আমি ইব্রাহিমকে একটা এক্কা আনতে বলেছিলাম, কিন্তু সে এখনও একটা পেল না।’

‘ইব্রাহিম এখানে নেই।’

‘ভাই, তাহলে তুমি যাও, একটা নিয়ে এস।’

‘বেগম সাহেবা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন এই সময়ে কোথাও না যেতে।’

‘তুমি যদি নিজে না যেতে পারো, তাহলে তুমি কি ইব্রাহিমের খোঁজ করতে পার না?’ জাকিয়া ওয়াজিদকে বকুনি দিল। ‘সৈয়দ ভাই, আমি যদি তুমি হতাম, আমি কখনও এখানে এতক্ষণ থাকতাম না। চাকররাও তোমাকে সম্মান করে না। সত্যি, তোমার কোন লজ্জা নেই! যদি হামিদ ভাই ওকে কিছু করতে বলত, সে তাহলে…’

সৈয়দ হাসলেন এবং বললেন, ‘হামিদ ভাই আর আমার মধ্যে কী কোন তুলনা চলে? তিনি তাদের টিপস এবং বাড়তি পয়সা দেন। তিনি একজন কালেক্টর।’

‘কে তোমাকে কালেক্টর হতে বাধা দিয়েছিল?’, ভাবনার সূত্র খুঁজতে গিয়ে স্যার আতাউল্লা বললেন। ‘আমি এত বছর পরিশ্রম করেছি, যাতে আমার সন্তানদের সমৃদ্ধি হয়, তারা সম্মানিত হয়। একজন কালেক্টর, অন্যজন পুলিশঃ ওদের দেখলে আমার হৃদয়ে কী আনন্দ হুয়। কিন্তু এই নিকম্মা ছেলেটা বলে আমি খ্যাতির পিছনে দৌড়াই; সে বলে সেই কারণে আমি দান করি। সেই জন্যই আমি আমার বৃদ্ধা মায়ের জন্য পরিচারিকা রাখি। আমার জন্য তার বিন্দুমাত্র সমবেদনা নেই। গতকাল, রাগের বশে আমি যখন ফৈয়াজিকে চড় মারি, সে আমার সমালোচনা করে। আমার ভৃত্যদের উপর কি আমার কোন অধিকার নেই? যদি ভৃত্যদের না মারতে পারি তাহলে আমি কী করে ওদেরকে দিয়ে কাজ করাব?’

‘আমি কি পরিমাণ কষ্ট সহ্য করেছি সে কি জানে? কী করে আমরা অহংকারী ঊর্ধস্তনদের হাতে হেনস্তা হয়েছি এবং আমি তাঁদের সন্তুষ্ট করতে কী পরিশ্রম করেছি? নিজের পছন্দ না হলেও এমন অনেক কাজ আছে যা একজনকে করতে হয়, কারণ সে যদি সেই কাজ করতে অস্বীকার করে, তাহলে তাকে চিরকালের মত কূয়োতে পচতে হবে। আমি যদি অসৎ হতাম এবং মাথা নত করতাম…তাহলে কীসের জন্য এসব কিছু? এইসব কি সেই দিনের জন্য নয় যখন আমি এবং আমার সন্তানরা শান্তিতে এবং আরামে বাস করতে পারব? আর সে আমার চোখের দিকে তাকায় আর বলে…’

জজ সাহেবের জানালার কাছে একটা মোটরগাড়ি এসে দাঁড়াল এবং স্যার আলি বেগ-এর ছেলে গাড়ি থেকে নামল। ‘আরে, সৈয়দ, এটা কার মাল?’
‘আমার।’
‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
‘আমি পার্টি অফিসে যাচ্ছি।’
‘’কী সব ফালতু জিনিসের মধ্যে জড়াচ্ছ? কেন এই সব ছাড়ছ না? আবার জেলে গেলে কী হবে বল তো?’

সৈয়দ হাসল এবং বলল, ‘আমি জেলে যেতে ভালোবাসি না। আমি বাইরে থেকেই কাজ করতে চাই। কিন্তু আমরা তোমার মতো অফিসারের দয়ার উপর নির্ভর করি। তোমরা তো আমাদের যেখানে খুশি পাঠাতে পার।’

তাঁর জানালার বাইরের এই আলোচনা জজ সাহেব শুনলেন এবং নিজেকে বললেন, ‘হ্যাঁ, স্যার, আপনি ঠিক! আপনার কি জেদ আর মূর্খামির কোন শেষ নেই? আমি প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষকে জেলে পাঠাই। আমার আঙুলের এক হেলনে মানুষ ফাঁসিতে যায়। আমার ছেলেরও কি এই চূড়ান্ত অপরাধের জন্য জেলে যাওয়া উচিত নয়? আমি ওর দিকে তাকাকেও চাই না। আল্লাকে ধন্যবাদ যে সে আজ চলে যাচ্ছে।
‘কিন্তু আমি কি কোনদিন শান্তি পাব না? একদিকে আমার মা ওকে ফিরিয়ে আনতে বলবে, অন্যদিকে আমার স্ত্রী জাকিয়াকে প্ররোচিত করার অন্য ওকে দায়ি করবে এবং বাড়িতে ওর আসা নিষিদ্ধ করবে। এইবার দেখি আম্মা কি করেন এবং জাকিয়া নিজের ইচ্ছেমত ক্রোধ ছুঁড়ে দিক। আমি আর সৈয়দ মিয়াঁকে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছি না। কোন কারণে তাকে আমি যদি ডেকে পাঠাই সে এমন বান্দা নয় যে লেজ গুটিয়ে চলে আসবে। সে আবার স্বমূর্তি ধারণ করবে। সে আমার অর্থকে দেশের অর্থ বলে। যথেচ্ছভাবে সে আমার অর্থ খরচ করে আর সবসময় তর্ক করতে থাকে। আমি যাই বলি বা করি সে তার নিজের বিচারের দাঁড়িপাল্লায় তা ওজন করে…কিন্তু সে ওজন করার কী জানে? আমি জানি; কারণ আমার অভিজ্ঞতা আছে। আমি মুদিওয়লার সঙ্গে এক গ্রাম ময়দার জন্য লড়াই করেছি। ভবিষ্যতের জন্য আমি সমস্ত ইচ্ছা জলাঞ্জলি দিয়েছি।

‘তারপর আমার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হল। কী ভয়ঙ্কর মহিলা! একদিনের জন্যও আমি আমি সাহচর্য পাইনি। সৈয়দ মায়ের ছবিতে থুতু ফেলে। আমি যে অগ্রগতির জন্য হন্যে হয়ে ফিরি তার প্রতি তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। অর্থের প্রতি তার কোন ভালোবাসা নেই। লোকে বলে সে পয়মন্ত। সে বাড়িতে আসার দিন থেকে আমার আইনি পেশার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সে কিছুতেই সতর্ক ছিল না! সে মারা যাবার পরে সুঘরাকে বিয়ে করতে আমাকে কী লড়াই না করতে হয়েছে। আমার প্রথম স্ত্রী বেঁচে থাকলে, আমার বর্তমান সম্মানকর মর্যাদার সে কি যোগ্য হতে পারত? সে কি যোগ্য এবং সক্ষম লেডি সাহেব হতে পারত? এই চিন্তায় আমার শরীরে কাঁপন আসে…তওবা, তওবা!’

টেলিফোন বেজে উঠল। জজ সাহেব ভ্রুকুঞ্চিত করলেন। রিসিভার তুলে বললেন, ‘হেলো… কে বলছেন?’
‘…’
‘আরিফ… কোন আরিফ?’
‘…’
‘হ্যাঁ, আপনি সেদিন এসেছিলেন…’
‘…’
‘আপনি এখন একজন সাব-ইনস্পেক্টর, তাই না?’
‘…’
‘হ্যাঁ, এখন আমার মনে পড়ছে।’
‘…’
‘হ্যাঁ, আপনি আপনার ছেলের বিয়ের কথা বলেছিলেন।’
‘…’
‘কিন্তু, আমাকে ক্ষমা করবেন…আমি আজ আসতে পারব না।’
‘…’
‘না, পাঁচ মিনিটের জন্যও না। বাড়িতে আমার একটি ডিনার পার্টি আছে; আমি আসতে পারব না।’
‘…’
‘হ্যাঁ, আমি সুখি। আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন।’
‘…’
‘না, আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। আমি এইমাত্র বলেছি আমি ফাঁকা থাকলে আসব।’
‘…’
‘হ্যাঁ, হামিদ এখানে আছে। কিন্তু ওকেও ডিনারে থাকতে হবে। তাহলে ঠিক আছে, খুদা হাফিজ!’

জজ সাহেব চোখ তুলে দেখলেন জ্যেষ্ঠ পুত্র হামিদ সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হেসে হামিদ জিজ্ঞেস করল, ‘কে কথা বলছিলেন?’

‘একজন মৌলবি সৈয়স হাসান। একসময় তিনি আমাদের প্রতিবেশি ছিলেন। শৈশবে তিনি আমাকে কোরান শিখিয়েছেন। এই ভদ্রলোক তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র। তিনি কনস্টেবল ছিলেন, এখন সাব-ইনস্পেক্টর হয়েছেন। তাঁর ছেলের বিয়ে। তিনি ইতিমধ্যেই তিন থেকে চার বার এসেছেন আমাকে নিমন্ত্রণ করার জন্য। আর এখন তিনি বলছেন…’

‘আমি জানি না এই লোকগুলি কেন এমন মাথামোটা? তাঁরা নিজেরা কেন বোঝেন না? তাঁরা কেন অন্য লোককে মিথ্যার আশ্রয় নিতে প্ররোচিত করেন? ভাবুন…এক মুখ্য বিচারপতি এক কনস্টেবলের ছেলের বিয়েতে উপস্থিত থাকবেন! এটা অযৌক্তিক!’

জজ সাহেব তাঁর যোগ্য পুত্রের দিকে স্নেহের চোখে তাকালেন, যে কিনা আল্লার কৃপায় এখন কালেক্টর। সে লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করেছে এবং বাবার সঙ্গে দেখা করতে চারদিনের ছুটি নিয়ে এসেছে। বাবার প্রতি ভালোবাসা এবং মনের মিলে তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সে কখনও বাবাকে মিথ্যাবাদি, বিশ্বাসঘাতক বা অর্থহীন হিসেবে চিত্রিত করেনি।

এক্কার টং টং আওয়াজ শোনা গেল। ডেস্কের ওপর রাখা শোষ কাগজের টুকরোর ওপর তাঁর নজর পড়ল, যাতে তিনি লিখেছেনঃ ‘ওই ছেলেটা বলে আমার জীবন এক অপচয়। প্রকৃতপক্ষে, শুধু অপচয় নয়, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তা এক বিরাট শূন্য।’

তখন তিনি হামিদের দিকে চোখ তুলে বললেন, ‘সৈয়দ সাহেব চলে যাচ্ছে। সে ভাব দেখাচ্ছে এখানে থেকে সে আমাদের উদ্ধার করেছে…সেই অলস, নিকম্মা ছেলে…’

বয়সের থেকে বেশি বিজ্ঞ শঙ্কিত আর্দ্র স্বরে হামিদ বলল, ‘বাবা, একে কুসঙ্গ ছাড়া আর কিই বা বলবেন?’

মাথা ঝাকিয়ে জজ সাহেব তাঁর সমর্থ এবং যোগ্য ছেলের থেকে পাওয়া সমবেদনা গ্রহণ করলেন।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, নভেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]