
কলকাতার শূন্য
সেদিন বিকেলে অর্ক প্রথম বুঝল, কলকাতা আসলে একটা প্রকাণ্ড মায়া। হাওড়া ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে সে দেখল—গাড়ি চলছে, মানুষ ছুটছে, অথচ পুরো শহরটা যেন কোনো গন্তব্যে পৌঁছোচ্ছে না। বাসের ডিজিটাল বোর্ডে গন্তব্যের জায়গায় একটা শব্দই বারবার ঝলসে উঠছে—‘ফিরে যাও’। ফিরে যাওয়ার কোনো পথ খোলা নেই জেনেও শহরটা আর্তনাদ করছে।
অর্ক নিচে নেমে এল। ভিড়ের মাঝখানে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। ঠিক তখনই তাকে দেখল সে। মেয়েটা গঙ্গার ধারের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এই জনসমুদ্রে সে ও ভীষণ একা, যেন এই শহরের কোলাহলের সঙ্গে তার কোনো নাড়ির টান নেই।
অর্ক এগিয়ে গিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কোথায় যাবেন?”
মেয়েটা তাকাল। চোখে কোনো তাড়া নেই, বরং এক গভীর স্থিরতা। সে বলল, “যেখানে কলকাতা নেই।”
অর্ক অবাক হয়ে দেখল, মেয়েটার অবয়ব যেন গোধূলির রোদের মতন কিছুটা ঝাপসা। মেয়েটি জানাল তার নাম ইরা, তবে পরক্ষণেই ম্লান হেসে যোগ করল, “এই শহরে নামগুলো আর টেকে না। তুমি চাইলে আমার নাম বদলে দিতে পারো।”
অর্ক কিছুটা ভেবে বলল, “তাহলে আজ থেকে আমি তোমায় ‘শূন্য’ বলে ডাকব?”
মেয়েটার হাসিতে বিদ্রূপ আর ক্লান্তির মিশেল। সে বলল, “বেশ তো, আজ থেকে আমি না হয় তোমার কলকাতার শূন্য।”
তাদের আলাপ নিবিড় হতে সময় লাগল না। কলেজ স্ট্রিটের পুরনো বইয়ের গন্ধ, কফি হাউসের গরম কফির ধোঁয়া আর মেট্রোর গুমোট ভিড়ের ভেতর দিয়ে তারা হাত ধরাধরি করে হাঁটতে থাকল। কিন্তু অর্কর মনে হচ্ছিল, কোথাও একটা বড় রকমের গোলমাল হচ্ছে। শহরের দেওয়াল গুলো রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলছে। কাল যে দেওয়াল গুলোতে কবিতার লাইন ছিল, আজ সেখানে ডিসকাউন্টের বিজ্ঞাপন। যে মুখগুলো কাল স্লোগান দিচ্ছিল, আজ সেখানে এক যান্ত্রিক হাসি।
শূন্য বলল, “অর্ক, কলকাতা এখন একটা স্মৃতি মাত্র। যা দেখছ, সবটাই তার সস্তা নকল। একটা মরীচিকার ভেতর বসে আমরা কি সত্যি প্রেম করতে পারি?”
একদিন তারা নন্দন চত্বরে গেল। সিনেমা হলের সামনে ভিড় নেই, অথচ অবারিত দ্বার। ভেতরে ঢুকে অর্ক দেখল স্ক্রিনে কোনো ছবি নেই, শুধু একটা তীব্র সাদা আলো থমকে আছে।
“সিনেমা কই?” অর্কর প্রশ্নে শূন্য হাসল। বলল, “সবাই এই আলো দেখতে পায় না অর্ক। যারা ভালোবাসতে জানে, তাদের মনেই ছবি তৈরি হয়।”

অর্ক তাকিয়ে রইল স্ক্রিনের দিকে। হঠাৎ দেখল—দুটো ছায়া মানুষ কলকাতার রাস্তায় হাঁটছে। বৃষ্টি পড়ছে না, অথচ তারা ভিজে সপসপ করছে। চারপাশের চেনা শহরটা জলরঙের ছবির মতো আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে। অর্ক ফিসফিস করে বলল, “ওরা কি আমরা?”
শূন্য মাথা নাড়ল, “ওরা কোনোদিনই আমরা নই। ওটা আমাদের একটা না-থাকা অসুখ।”
দিন গুলো দ্রুত ক্ষয়ে যেতে থাকল। একদিন অর্ক নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দেখল, তার দরজার ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘এখানে কেউ থাকে না’। সে আতঙ্কিত হয়ে শূন্য কে ফোন করল। ওপাশে শুধু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের শব্দ। অর্ক আর্তনাদ করে উঠল, “তুমি আছো?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল, “তুমি কি আছো?”
সেদিন আকাশ পরিষ্কার ছিল, অথচ শহরটা ভিজে সপসপ করছিল। শূন্য অর্কর চোখের দিকে তাকিয়ে শেষ বারের মতো বলল, “আমি চলে যাচ্ছি অর্ক। যেখানে কলকাতার কোনো স্মৃতি পৌঁছোতে পারবে না।”
অর্ক হাত বাড়াল, “আমি তো তোমাকে ভুলব না।”
শূন্যের শেষ কথা ছিল— “কলকাতা সব ভুলে যায়। মানুষও। তুমিও ব্যতিক্রম নও।”
পরের দিন অর্ক আবার হাওড়া ব্রিজের ওপর রেলিং এর ধার ধরে দাঁড়াল। অর্ক দেখল বাসগুলো আগের মতোই চলছে, বোর্ডে সেই একই সতর্কবার্তা—‘ফিরে যাও’। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে সেই চেনা শূন্যতা নেই।
এক চা-ওয়ালা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “কাকে খুঁজছেন দাদাবাবু?”
অর্ক বলল, “কলকাতার শূন্যকে।”
লোকটা করুণার হাসি হেসে বলল, “ওসব আপনার মনের ভুল দাদা। সব ভুলে যান। ও সব গল্প ছিল।”
অর্ক বুঝল, কলকাতা কোনো মানচিত্র নয়। এটা একটা দীর্ঘস্থায়ী অভ্যাস, একটা অপূর্ণ প্রেমের পাণ্ডুলিপি। সে আজও প্রতিদিন নন্দন থেকে কলেজ স্ট্রিটে ফিরে আসে। সে জানে, যেদিন এই শহর আবার নিজের সত্য খুঁজে পাবে, সেদিন ভিড়ের বুক চিরে হেঁটে আসবে তার ‘শূন্য’।
প্রেম মানে তো কেবল কাছে থাকা নয়; প্রেম মানে হারিয়ে যাওয়া কোনো শহরকে নিজের ভেতর আজীবন খুঁজে চলা। কলকাতা প্রতিদিন নিজেকে বদলে ফেলে, অথচ অর্ক প্রতিদিন একইভাবে এই শহরের মায়াটা কেই ভালোবেসে যায়।

