মফঃস্বলের প্র্যাকটিস তখন। খুপড়ি খুপড়ি ঘর, ঘরঘরে টেবিল ফ্যান, রোগী ঢুকছে, বেরোচ্ছে। বসার জায়গাটা ভিড়ে ভিড়াক্কার। প্রায় যন্ত্রের মতো দেখে চলেছি তাদের। রোগী ঢোকা মাত্রই সহকারী মেয়েটি ওজনের মেশিনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে, পরক্ষণেই রক্তচাপ মাপার কাফ টি জড়িয়ে দেয় রোগীদের বাহুতে। তার কাজও যন্ত্রের মতোই। এই তাড়াহুড়োটা পছন্দ না করলেও উপায় নেই আমার, পাঁচটা বত্রিশের ফিরে যাওয়ার লোকাল ট্রেনটা ধরতে না পারলে বাকি কাজ লাটে উঠবে।
এর মধ্যেই ঢুকলেন তিনি। বছর তিরিশের গৃহবধূ, সুশ্রী, পোশাক আসাকেও দারিদ্র্যের ছাপ নেই।
ঢুকেই বললেন, ঐ ওকে একটু বাইরে যেতে বলুন তো!
অনুরোধ না হুকুম বোঝা দায়।
সহকারী মেয়েটি একেবারে দুঃস্থ পরিবারের,কাঠ কাঠ। সে যেতে চাইছিল না, বিশেষত যেখানে মহিলা পেসেন্ট দের জন্যই ডাক্তারবাবু রেখেছেন তাকে। ইশারায় বাইরে যেতে বলি তাকে, সাইকিয়াট্রিস্টের উপর কাছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার দায়ও বর্তায় বটে।
যদিও তখনও অবদি বুঝিনি ঠিক কী বলতে চায় আমার রোগীনি। এর আগে দুএকবার দেখেছি তাকে, ধোওয়া ধুয়ি, ছোঁওয়া ছুঁয়ির বাতিক,ওসিডি র সমস্যা।

এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি, পেসেন্টের ডান হাতে একটা বড়সড় প্লাস্টিকের প্যাকেটও আছে।
আবার হুকুম আসে,
জুতোটা একবার খুলবেন স্যার!

–মানে?
জুতো খুলব কেন?
একটু সতর্ক হই এবার।

— কিচ্ছু না স্যার, একটা প্রণাম করতাম!

–জুতোর উপরেই করো! আর শোনো, আমি না একটা হাসপাতাল থেকে আসছি, সবচেয়ে নোংরা আমাদের হাসপাতালটা, জুতো পায়েই ঘুরেছি ওখানে, সেটা বুঝেই পায়ে হাত দিও!
বাড়তি সতর্কতা দেখাই আমি এবার। কাজ হয় তাতে।

— ঠিক আছে স্যার, হাতজোড় করেই নমস্কার করছি, কিন্তু এই ফুলটা আপনি অবশ্যই বাড়ি নিয়ে যাবেন,প্লিইইজ!

রীতিমত দামি ফুলের তোড়া। চাইনিজ কাপড়ের, তাতে আবার সুগন্ধী স্প্রে করা হয়েছে।

— আর কিছু বলবে? তোমার সাথে কে এসেছে,ডাকি তাকে?
বলি আমি।

— না স্যার,আর কিছু বলব না, ঐ ফুলগুলোর মধ্যে একটা কার্ড আছে, ওটা আপনিই শুধু খুলবেন…
একটা অদ্ভুত, রহস্য মাখা হাসি দিয়ে বেরিয়ে যায় সে।

তার বাড়ির লোক আসে, সহকারী মেয়েটিই ডেকে আনে, কথা হয়, প্রেসক্রিপশন করি। পরের পেসেন্ট ঢুকে পড়ে। সকলেরই তাড়া আছে।

চেম্বার শেষ করে উঠতে যাব, ফুলের তোড়ার দিকে নজর পড়ে। মলিনা, অর্থাৎ আমার সহকারীকে সেটা দিতে গিয়েও মনে পড়ে যায় ,আরে… কার্ড টায় কি আছে দেখা হলো না তো!!
অতএব প্যাকেটে থেকে সেটা সংগ্রহ করে বাকিটুকু মলিনাকেই ট্রান্সফার করি। গুরুগম্ভীর ডাক্তারকে নিরীহ সহকারী কোনো প্রশ্ন করেনা আর।
রাতে বাসায় ফিরে টিফিন বক্স বের করতে গিয়ে হাতে পড়ে কার্ডটা। সর্বনাশের পাঁচালী লেখা সেখানে। তার কষ্টের যাবতীয় বর্ননা সেরে সে ঘোষণা করেছে, একমাত্র ডাক্তারবাবু কেই সে ভালবাসে… অতএব, ইত্যাদি, কিন্তু….

আশ্চর্যের বিষয়, মেয়েটি আর কখনও আসেনি আমার কাছে।
জুতো জোড়াই কি সামলে দিল সব!

এই যে কাউকে একপেশে ভালবেসে ফেলা, উল্টোদিকের লোকটাও যে তাকে ভালবাসে এটাও নিশ্চিত ভাবে ধরে নেওয়া, এও একটা অসুখ। ইরোটোম্যানিয়ার অসুখ।

বিষয়টাকে “ইনফ্যাচুয়েশন” বলে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। কারণ, এ রোগের শিকার যাঁরা, তাঁরা কেবল অমুক লোকটা আমায় ভালবাসে ভেবেই ক্ষান্ত দিচ্ছেন না,অবসেসিভ লোকের মতো ক্রমাগত লেগে থাকছেন,চিঠি পত্তর, নানান উপহার পাঠাচ্ছেন, দিনের পর দিন যাকে ভালবাসছেন বলে মনে হয় তাঁর কাজের জায়গায় গিয়ে বসে থাকছেন, বাকিদেরও বলছেন। উল্টোদিকের মানুষটা প্রথম দিকে কিছুই না বুঝলেও ক্রমাগত এমন অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পড়েন।
সেলিব্রিটি মানুষজনের অনেকেই এর ঠেলা জানেন।

আঠেরো উনিশের একটা মেয়ে আমার কাছে আসত। মেয়েটির মায়ের অভিযোগ একেবারেই লেখাপড়া করে না সে। বিশদ জানতে গিয়ে দেখি, দুটো কাজ সে করে,এক, অনিয়মিত ভাবে গিটার শিক্ষা, দুই, সিগনেচার প্র্যাকটিস!

আর পড়াশোনা?
তাজ্জব বনে জিগ্যেস করি তাকে।

-ওটা আর দরকার নেই ডাক্তার আঙ্কেল!
এটুকু বলেই কী যেন একটা গোপন কথা বলার মতো করে ফিসফিসিয়ে বলে,
অমুক সিঙ্গারের নাম শুনেছ? সামনের বছর ওর সঙ্গেই আমার বিয়ে তো! এজন্যই তো গিটার শিখছি, অটোগ্রাফ দেওয়াটাও প্র্যাকটিস করছি, দরকার হবে ঠিক!

যার কথা বললে সে, তিনি অত্যন্ত খ্যাতিমান মানুষ, মেয়েটির ডবল বয়েস তাঁর। যতদূর জানি বিবাহিত, দুই সন্তানের জনক।

মেয়েটি কে সেকথা বলতেই মাছি তাড়ানোর মতো করে বললে, শিগগিরই ডিভোর্স হবে ওর, বলেছে আমায়, সামনের ফেব্রুয়ারি তে আমরা বিয়ে করে সুইজারল্যান্ড যাব… রোজ রাতে ফোন করে আমায়, আমি যত ফোন রাখতে চাই,ততই এইসব বলবে! কাউকে বোলোনা প্লিজ, মিডিয়া ঝাঁপ দিলেই কেলেঙ্কারি!

মা-কে আলাদা করে জিগ্যেস করলাম,ও যার কথা বলছে তিনি কি আপনাদের ঘনিষ্ঠ মানুষ?
তাছাড়া ও যা বলছে, সেটা কি সত্যি?

দেখলাম, বিষয়টা মায়ের অজানা নয়। একটু চুপ করে থেকে বললেন,
মেয়েটা পাগল হয়ে গেছে ডাক্তারবাবু! টিভিতে গান শুনে ওনার কাছে গান শেখার জেদ করল মেয়ে। ভদ্রলোক কাউকেই গান শেখান না, মানুষটা ভালো, ওকে ভালো করেই বোঝালেন,গলা তৈরীর অ্যাডভাইস দিলেন।
কদিন পরে শুনি,ও নাকি রোজ ওনাকে ফোন করছে… উনি কয়েকদিন ফোন ধরেননি বলে বাড়ি চলে গেছিল! আমার আর কোনো মান সম্মান রইল না স্যার!

এ হলো মোবাইল ফোনের আগের জমানা। এই মেয়েটিও আসেনি আর।

তবে ইরোটোম্যানিয়া যে কতদূর যেতে পারে সেটা আমার হাসপাতালেরই একটা ঘটনায় মালুম পেয়েছিলাম।
আমাদের এক স্নাতকোত্তর পাঠরত ছাত্র বড়ো বেকায়দায় পড়েছিল সে যাত্রা। ডাক্তার ছাত্র, বেশ লাজুক। আউটডোরে দেখা এমনই এক রোগিনী কথা নেই, বার্তা নেই, তার জন্যে হন্যে হয়ে পড়ল।
এইচ ও ডি স্যার তাকে ডেকে বকাবকি করায় রাতদুপুরে সে ঢুকে পড়ল বয়েজ হস্টেলে। হৈহৈ কান্ড তখন। ছেলেটি পর পর কদিন হাসপাতালেই এলোনা। তাতে কি! মেয়েটা রোজ আসে, সবকটা ঘরে খুঁজে বেড়ায় তাকে, গালিগালাজ করে। ডিপার্টমেন্টাল হেড একদিন এসে বললেন, আর তো পারা যায় না! কাল বিকেলে মেট্রো স্টেশন যাওয়ার পথে সারা রাস্তা আমার পিছু পিছু গেছে ও, সঙ্গে আর কটা বখাটে সাঙ্গপাঙ্গ, হিন্দিতে গাল দিতে দিতে বলছিল, আমি আমার ছাত্রকে হুকুম করছি না কেন?
মেরে ধরে দেয়নি এইই যথেষ্ট!

সেদিন ফেরার সময় আমিও গেলাম হেড এর সঙ্গেই। আগাগোড়া মেয়েটা উল্টোদিকের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে গেলেও অজানা কোনো কারণে কিছু না বলেই চলে গেল।
ব্যাপারটার নিস্পত্তিও হলো অদ্ভুত ভাবে। আমাদের সেই লুকিয়ে পড়া ছাত্র সেসময় ডিপ্লোমা পড়ত। তেড়েফুঁড়ে পড়াশোনা করে সে ডিগ্রি তে সুযোগ পেয়ে চলে গেল মুম্বাই। আপাতত শান্তি নেমে এলো ডিপার্টমেন্টে।

তবে সবসময় এমন শান্তি মেলেনা। শেষটায় অন্য একজনের কথা বলি। কলকাতায় থাকলেও সে আদতে ভিন রাজ্যের মানুষ। ফ্ল্যাট বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করত প্রথমে, তারপর এলোমেলো ঘুরতে ঘুরতে শেষে আর কিছুই করত না। আমাদের হাসপাতালে তাকে ধরে নিয়ে
এলো পুলিশ। সে নাকি কোন্ জনপ্রিয় নেত্রীর বাড়ির ভেতরের ঘরে লুকিয়ে বসেছিল! ধরা পড়ার উপক্রম হওয়ায় সে পালানোর সময় হাতপা চালায় এবং যারপরনাই মারধর খায়। বিষয়টা রাজনৈতিক চেহারা নেওয়ার মুখে পুলিশ ওর আচরণের অসংলগ্নতা দেখে এখানে আনে।

কয়েকদিনের চেষ্টায় যা জানলাম তা হ’ল, এ ঘটনাটাই প্রথম নয়। যে বিল্ডিং এর কেয়ার টেকার ছিল সে, সেখানেও এক ভদ্রমহিলার পিছু নেওয়ায় চাকরিটা যায় তার।
কিছুদিন চুপচাপ থাকার পর হঠাৎ করেই তার মনে হতে শুরু করে, খবরের কাগজের কোনো কোনো বিজ্ঞাপনে তাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলা হচ্ছে। ঘটনা ওখানেই থেমে রইল না, একদিন বিকেলের দিকে সে সটান হাজির হলো তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর অফিস থেকে বেরোনোর সময়। কেননা তার ধারণা, তাকে একটা চাকরি দেবেন বলেই স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী খবরের কাগজে বিশেষ সংকেতে ডেকেছেন তাকে।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য অদ্দুর পৌঁছাতে পারেনি সে, তার আগেই পুলিশ তাকে আটক করে। কদিন পর ছেড়েও দেয় তার ভাবগতিক দেখে।

মুশকিলটা হলো সে এবার যাবে কোথায়?
দেশোয়ালি ভাইদের সঙ্গে থাকলেও সারাটা দিন কী করে? এদিকে তখন সে সম্পূর্ণ অসংলগ্ন,সাইকোটিক!

কিভাবে জানি না তার ধারণা হয়েছিল কলকাতারই একজন উঠতি নেত্রী তাকে ভালবাসে,আর সেজন্যই তাকে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে।

অতএব কদিন পরেই সে ওই নেত্রীর বাড়ির উঠোনে পাতা বেঞ্চিতে গিয়ে বসে থাকত। ফ্রি তে চা খেত। যাতায়াত করার সময় রাজনৈতিক নেতাদের দস্তুর মত নেত্রী পাবলিকের দিকে তাকিয়ে হাসলে বা হাত নাড়লে সে ধরে নিত তাকেই অভিবাদন জানানো হচ্ছে। অবশ্য তখনও অবদি সে কোনো কথা বলারই সুযোগ পায়নি।

দিনের পর দিন এমন হতে হতে একদিন তার মনে হলো, এভাবে না, একবার অন্দরমহলে না গেলেই নয় তার — আর সেই করতে গিয়েই এই কান্ড! মিডিয়া তোলপাড়! সে যুগটা অবশ্য এতোখানি ব্রেকিং নিউজের নয়, তবুও খবরটা করতে অনেকেরই আগ্রহ ছিল।

স্পষ্টই বোঝা গেল,তার চিকিৎসার প্রয়োজন — তাইই লিখে পাঠাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে শেষমেশ তার কী হলো তা আর জানা হলো না আমার।

আসলে সভ্য জগতের নিয়মে যারা “নর্ম” মেনে চলেন,তারাই তো “নর্মাল”, আর তার অন্যথা হলেই “অ্যাবনর্মাল “!
যাঁদের কথা বললাম, তাঁদের সকলের আচরণই প্রচলিত গন্ডির বাইরে। শেষ জন তো একেবারেই সাইকোসিসে ভোগা মানুষ। ব্যস্ত দুনিয়ায় এদের খোঁজ রাখে কে?

আশ্চর্যের বিষয়, ফরাসি চিকিৎসক ডি ক্লেরামবল্ট সাহেব এ রোগের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে গেছেন সেই ১৯৪২ সনে, তাঁর নামেই আজও এমন ঘটলে তাই “ডি ক্লেরামবল্ট সিনড্রোম” বলা হয় এই রোগকে। অবশ্য “ইরোটোম্যানিয়া ” শব্দটাই বহুল প্রচলিত।

আর দীর্ঘ তিন তিনটে দশক এদের নিয়েই কাটিয়ে দেওয়া আমি ভাবি, কতটা সরল আর নিঃসঙ্গ এরা!

শেষ হাজার দুয়েক বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায় এসবের উল্লেখ থাকলেও এই মুহূর্তে আমি আরেকজনের কথাই ভাবছি।
সে থাকত জঙ্গলে। বনবাসে আসা রাজপুত্রদের ভালো লেগেছিল তার। বড় রাজপুত্র তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ ভাবেই একটু রসিকতা করেই হয়তো বলেছিলেন,দ্যাখো, আমি তো বিবাহিত, তুমি বরং আমার ভাইকে কথাটা বলো না!
এতোসব রসিকতা বোঝার ক্ষমতা ছিল না জংলী মেয়েটার, অতএব এইসব চাপানউতোরের মধ্যে সে ছুটে গেল নতুন বৌটির দিকে। যার নিট ফল,নাক কান কাটা যাওয়া।

ডাক্তারী ভাষায় “কয়লিনিকিয়া” বলে একটা কথা আছে, রক্তাল্পতা এবং আরও কিছু শারীরিক কারণে হাতের নখগুলো চামচের বা কুলোর মতো বেঁকে যায় এখানে। মেয়েটার নখগুলোও হয়ত ওরকমই ছিল। আর সংস্কৃত ভাষায়”শূর্প” মানে যে “কুলো” সেটা আমরা জানি না নাকি! মহাকালের পাতায় ওই নামেই সে রয়ে গেল।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুন ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য