
খুদা-এ-সুখন: এক বিবাগী সম্রাটের শেষ দিনলিপি
মির তকি মির বহুদিন জানলা খোলেন না। কারণ ধুলো ঢুকে যাবে বলে নয়। গায়ে হাওয়া লাগবে বলে নয়। তিনি জানেন, জানলা খুললেই কিছু গন্ধ ফিরে ফিরে আসবে কিছু শব্দ ফিরে ফিরে আসবে। আর সবচেয়ে বেশি বেশি করে ফিরে আসবে একটা পুড়ে যাওয়া শহর।
লখনউ তখনও সুন্দর। সন্ধ্যা নামছে। গলি-ঘুপচিতে আতরের গন্ধ। কোথাও দূরে সারেঙ্গি বাজছে। নবাবি শহর নিজের সাজে সে ব্যস্ত। কিন্তু মিরের ঘরে বসে তা বোঝার কোনো উপায় নেই।
কারণ এখানে আলো আছে, উষ্ণতা নেই। এখানে কাগজ আছে, ভাষা আছে, কিন্তু শান্তি নেই।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে অর্ধেক লেখা গজল। কোনোটা শেষ। কোনোটা মাঝপথে থেমে আছে। কোনোটা শুধু প্রথম লাইনে এসে থমকে গেছে। দোয়াতে কালি আছে, কিন্তু মিরের হাত আর এগোয় না।
আশ্চর্য ব্যাপার ঘরের জানলাটা ভেতর থেকে বন্ধ। খিল তোলা। তার ওপর ছোট্ট লোহার তালা। যেন জানলাটা নয়, ভিতরের একটা সময় তিনি বন্ধ করে রেখেছেন।
ভৃত্য করিম মোমবাতি বদলাতে এসে দাঁড়াল। একটু ইতস্তত করে বলল, “মির সাহেব, জানলাটা খুলে দিই? বাইরে বাগানে রাতের জুঁই ফুটেছে।”
মির মুখ তুললেন না। বললেন, “জুঁই ফুটুক। সে তার কাজ করছে। আমাকে আমার কাজ করতে দাও।”
করিম চুপ করে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “একটু হাওয়া ঢুকলে আপনার ভালো লাগবে, হুজুর।”
এবার মির চোখ তুললেন। চোখদুটি ক্লান্ত, তবু তার ধার হারায়নি। তিনি মৃদু হেসে বললেন, “করিম, আমি এই কাগজের বাগানই সামলাতে পারি না, বাইরের বাগান আর কী দেখব?”
করিম আর কিছু বলল না। কথাটা সে আগেও শুনেছে। বাড়ির সবাই শুনেছে। কিন্তু আজ যেন কথার ভেতরে অন্য একটা কিছু বাজল। যেন তিনি ফুল-পাতার কথা বলছেন না। যেন তিনি এমন কিছুর কথা বলছেন, যার দিকে চোখ তুলে তাকাতে তাঁর ভয় করে।
বাইরে বৃষ্টি নামল। প্রথমে টিপটিপ। তারপর ঘন। দেওয়াল, কার্নিশ, সিঁড়ি, উঠোন—সবখানে বৃষ্টির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
মির কলম তুললেন। একটা লাইন লিখতে গিয়ে থেমে গেলেন। কালি জমে গোল দাগ হয়ে রইল। তিনি বিরক্ত হয়ে কাগজটা সরিয়ে দিলেন।
ঠিক তখনই সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল।
করিম নিচে নেমে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলল, “এক বুড়ো লোক এসেছে, হুজুর। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। বলছে, দিল্লি থেকে এসেছে।”
“দিল্লি?”
শব্দটা মিরের ঠোঁট থেকে খুব আস্তে বেরোল। যেন তিনি কাউকে ডাকলেন না। বরং নিজের ভিতরে বহুদিন বন্ধ থাকা একটা দরজা খোলার শব্দ শুনলেন।
তিনি বললেন, “ওকে ওপরে নিয়ে এসো।”
কিছুক্ষণ পরে দরজায় এসে দাঁড়াল এক বৃদ্ধ। গায়ে ভেজা চাদর। পায়ের কাছে কাদা। মুখে দীর্ঘ পথের ধুলো। চোখে এমন এক দৃষ্টি, যা একই সঙ্গে বাস্তবও হতে পারে, স্মৃতিও হতে পারে।
বৃদ্ধ ঘরে ঢুকে কুর্নিশ করল না। শুধু মিরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চাদরের ভাঁজ থেকে ছোট্ট চটের পুঁটলি বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
মির জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কে?”
বৃদ্ধ বলল, “আমার নাম জেনে কী হবে? আমি যেখান থেকে এসেছি, সেই জায়গার নাম জানলেই যথেষ্ট শাহজাহানা বাদের বাইরে এক পোড়া খানকাহর ধ্বংসস্তূপে এটা পেয়েছি। ওখানকার লোকজন বলল, জিনিসটা নাকি আপনার বাবার। তাই নিয়ে এলাম।”
মিরের বুক কেঁপে উঠল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর আঙুল পুঁটলির দিকে এগিয়ে গেল।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “খুলে দেখেছেন?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়ল। “না। তবে একটা কথা বলব?”
“বলুন।”
বৃদ্ধ বলল, “শুনেছি লখনউ আপনাকে খুদা-এ-সুখন বলে। সবাই বলে, আপনার গজল মুক্তোর মালা। তাই ভাবলাম, পোড়া মাটির তলায় যে দু-একটা জিনিস এখনও বেঁচে আছে, সেগুলোর জায়গা হয়তো আপনার ঘরেই ঠিক মানাবে তাই আপনাকে ফেরত দিতে এলাম না হলে ধুলোতেই মিশে যেত।”
এই বলে বৃদ্ধ ঘুরে দাঁড়াল।
মির হঠাৎ বললেন, “দিল্লির খবর কী?”
বৃদ্ধ পেছন ফিরে তাকাল না। শুধু বলল, “দিল্লি? শহর যেমন ছিল, তেমন আর নেই। কিন্তু যারা তাকে বুকের ভেতর নিয়ে বেঁচে আছে, তাদের কাছে দিল্লি এখনও জ্বলছে।”
লোকটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। করিম তার পিছু নিল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “হুজুর, লোকটা গেট পেরোতে না পেরোতে মিলিয়ে গেল। বৃষ্টির ভেতর কোথায় গেল, দেখতে পেলাম না।”
মির কোনো উত্তর দিলেন না।
তিনি পুঁটলিটা খুললেন। ভেতর থেকে বেরোল পুরনো এক তসবিহ। কালচে। তার গায়ে পোড়া মাটির গন্ধ। সঙ্গে কয়েকটি আধপোড়া হলদেটে কাগজ। বেশির ভাগ লেখা মুছে গেছে। শুধু একটি ভাঁজ করা টুকরোয় কাঁপা হাতে লেখা কয়েকটি লাইন এখনও টিকে আছে।
মির কাগজটা মোমবাতির কাছে আনলেন। পড়লেন।
লেখা আছে—“পুত্র, মানুষের বাহবা মধুর। কিন্তু সাবধান। যেদিন দেখবি তোর কলম সত্যের চেয়ে প্রশস্তির কাছে বেশি নম্র হয়ে যাচ্ছে, সেদিন জানবি, তোর ভাষা বেঁচে আছে, কিন্তু আত্মা নেই।”
মিরের আঙুল কেঁপে উঠল।
যেন বহুদিন ধরে ভিতরে জমে থাকা একটা প্রশ্নের আচমকা উত্তর পেয়ে গেছে।
তিনি আবার দেখতে পেলেন আকবরাবাদের গলি। বাবার কণ্ঠস্বর। তারপর ঘোড়ার খুর। চিৎকার। আগুন। ধোঁয়া। মনে পড়ল দিল্লির আতঙ্কের দিনগুলো। মনে পড়ল নাদির শাহের সৈন্যদের রক্তমাখা তরোয়াল। মসজিদের সিঁড়িতে চাপ চাপ রক্ত। ছিন্ন কাপড়। দাউ দাউ আগুন। আর সেই আগুনের মধ্যে জ্বলতে থাকা তাঁর প্রিয় দিল্লি—যে শহর পরে তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে, অথচ বাস্তবে আর কখনও তার ফিরে যাওয়া হয়নি।
মির চোখ বন্ধ করলেন।
ঠোঁট নড়ল। তিনি খুব আস্তে আস্তে বললেন, “দিল্লি যা এক শহর ছিল আলমে-ইন্তিখাব…”
বাকিটা আর বললেন না। গলা ভারী হয়ে এল। যেন শব্দের আগেই কান্না এসে দাঁড়াল।
তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন—
“আগ থে ইবতিদা-এ-ইশ্ক মে হাম,
আব যো হ্যায় খাক, ইন্তিহা হ্যায় ইয়ে।”
মানে—প্রেমের শুরুতে আমি ছিলাম আগুন। এখন যে ছাই হয়ে গেছি, এ-ই তার শেষ পরিণতি।
এমন সময় আবার কড়া নাড়ার শব্দ।
এবারের শব্দ আলাদা। কড়া। মাপা। কর্তৃত্বপূর্ণ।
করিম এসে বলল, “হুজুর, দরবার থেকে লোক এসেছে।”
কিছুক্ষণ পরে ঘরে ঢুকল এক খাসনবিশ। পোশাক পরিপাটি। কথাবার্তা মেপে বলা। সে বলল, “মির সাহেব, কাল নবাবের বিশেষ আসর। আপনাকে একটি কাসিদা পাঠ করতে হবে। হুজুর চান, আপনার কলমেই আগামীকালের সভা পূর্ণ হোক।”
সে টেবিলে একটি মোড়ক রাখল। মির বুঝলেন, ভেতরে টাকা আছে।
খাসনবিশ বলল, “এ অগ্রিম নজরানা।”
মির টাকার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “কী লিখব?”
খাসনবিশ একটু থমকাল। তারপর বলল, “হুজুরের মহিমা। তাঁর দয়া। তাঁর রুচি। তাঁর রাজ্যের শান্তি।”
মিরের মুখে ক্লান্ত হাসি ফুটল। তিনি বললেন, “রাজ্যের শান্তি? রাজ্য আমি একবার দেখেছি। আবার তাকে ভস্ম হতেও দেখেছি। এখন আর মহিমা লিখতে আমার ইচ্ছে করে না।”
খাসনবিশের গলা শক্ত হল। “দরবারের আশা অবহেলা করা ঠিক হবে না, মির সাহেব।”
মির মোড়কটা হাতে তুললেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর সেটি খাসনবিশের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
তিনি বললেন, “নবাবকে বলবেন, তিনি তাঁর দেশের রাজা। কিন্তু আমি অন্য এক দেশের প্রজা।”
খাসনবিশ কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “মানে?”
মির এবার সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর গলার স্বর বদলে গেল। “ভাষারও এক বাদশাহি মেজাজ আছে, মুনশি। সেখানে টাকা আগে আসে না। সত্যি কথা আগে আসে। এটা নিয়ে যান।”
খাসনবিশ অপমান গিলে নিয়ে বলল, “তাহলে ফিরে গিয়ে আমি কী বলব?”
মির বললেন, “বলবেন, মির আজকাল প্রশস্তি কম লেখে। মানুষের হাড়ে জমে থাকা কান্নার শব্দ বেশি শোনে।”
লোকটি চলে গেল।
করিম ভয় পেয়ে ফিসফিস করে বলল, “হুজুর, এ ভালো হল না।”
মির শুকনো গলায় বললেন, “সব ভালো জিনিস শরীরকে আরাম দেয় না, করিম।”
রাত আরও গভীর হল। বৃষ্টি থেমেছে। শুধু কার্নিশ থেকে টুপটাপ জল পড়ছে। দূরে কুকুর ডাকছে। মির আবার টেবিলে বসলেন। বাবার লেখা কাগজটা সামনে রাখলেন। নতুন সাদা কাগজ টানলেন। কলমে কালি দিলেন।

এবার তিনি লিখতে শুরু করলেন।তিনি লিখলেন এমন কিছু পঙ্ক্তি, যেখানে দরবার নেই, সিংহাসন নেই; আছে আহত মানুষের অহংকার। আছে এমন এক আত্মা, যে দারিদ্র্য মেনে নিতে পারে, নির্বাসন মেনে নিতে পারে, কিন্তু বিক্রি হতে পারে না।
কয়েকবার লিখে কাটলেন। আবার লিখলেন। বহুদিন পরে যেন তাঁর হাত নিজের ভাষা ফিরে পেল। বাইরে ভেজা রাত। ভিতরে শুকনো শব্দ। এই দুইয়ের মাঝখানেই কবিতার জন্ম হয়।
হঠাৎ তাঁর চোখ গেল বন্ধ জানলার দিকে। জানলাটা কত বছর ধরে বন্ধ? তিন? পাঁচ? তারও বেশি? প্রথমে হয়তো ধুলো আটকাতে। তারপর শোরগোল ঠেকাতে। তারপর অভ্যাসে। শেষে হয়তো ভয় থেকে।
বাইরে যা আছে, তা যদি ভিতরের চেয়ে বেশি সুন্দর হয়?
অথবা বাইরে যা নেই, তা যদি ভিতরে থাকা স্মৃতিকে আরও অসহ্য করে তোলে?
তিনি আস্তে উচ্চারণ করলেন—
“লে সাঁস ভি আহিস্তা, কি নাজুক হ্যায় বহুত কাম,
আফাক কি ইস কারগাহ-এ-শীশাগরী কা।”
বাংলায় যার মানে—আস্তে শ্বাস নাও। এই পৃথিবী খুব ভঙ্গুর। যেন কাচের কারখানা।
মির ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। খিল খুললেন। তারপর তালাটা ও খুলে ফেললেন।
জানলা খুলতেই এক ঝটকায় ভিজে হাওয়া ঘরে ঢুকে পড়ল। বাগানের পাতায় বৃষ্টির জল জ্বলজ্বল করছে। জুঁইয়ের গন্ধ এল। কোথাও জমে থাকা জলে আকাশের টুকরো কাঁপছে।
মির অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তাঁর মুখে তখন আনন্দ নেই। স্বস্তিও নেই। আছে বহুদিনের পাথর চাপা পড়ে থাকা শ্বাস প্রশ্বাসের সামান্য মুক্তি। আছে এমন এক ব্যথা, যা আর সে কারুর কাছে লুকোতে চাইছে না।
তিনি খুব আস্তে করে বললেন, “দিল্লি, তুই আর আমার কাছে ফিরবি না। কিন্তু তোর শোকটুকু আমি কেন বন্ধ করে রাখব?”
করিম দরজার আড়াল থেকে সব দেখছিল। প্রথমবার সে দেখল, মিরের মুখের কঠিন ছায়াটা একটু নরম হয়েছে। কান্না নয়। হাসিও নয়। যেন দীর্ঘ নির্বাসনের পর কেউ আবার নিজের নাম শুনতে পেয়েছে। যেন জমে থাকা বরফে কোথাও চিড় ধরেছে।
মির ফিরে এসে বাবার তসবিহ হাতে নিলেন। আধপোড়া চিরকুটটা গুটিয়ে টেবিলের গোপন দেরাজে রাখলেন। পুড়িয়ে ফেললেন না। দূরে সরিয়েও রাখলেন না। হাতের কাছেই রাখলেন। যেন সেই কাগজে শুধু বাবার কথা নয়, নিজের কাছেও একটা দায় রেখে দিলেন।
ভোরের একটু আগে তাঁর লেখা শেষ হল। সকালে দরবারের গাড়ি এল। করিম ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি যাবেন?”
মির বললেন, “যাব। পালিয়ে গেলে সত্যিটা ছোট হয়ে যেতে হয়।”
দরবারে সেদিন রোশনাই। সুগন্ধ। গালিচা। লোকের ভিড়। সবাই অপেক্ষা করছে—আজ মির নবাবের প্রশস্তির মালা গাঁথবেন।
মির ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। কাগজ খুললেন। প্রথমে চারদিকে তাকালেন। তারপর পাঠ শুরু করলেন।
কিন্তু সেই লেখার ভিতর নবাবের কোনো গুণ কীর্তন ছিল না। ছিল মানুষের স্বাধীন আত্মার কথা। ছিল পোড়া শহরের স্মৃতি। ছিল সেই ভাষার কথা, যে ভাষা মাথা নত করতে জানে, কিন্তু হাঁটু গেড়ে বসতে জানে না।
সভায় নিস্তব্ধতা নেমে এল।
কেউ তাকিয়ে রইল। কেউ চোখ নামিয়ে নিল। কেউ বুঝল। কেউ বুঝল না। কিন্তু সবাই টের পেল—এই বৃদ্ধ মানুষটিকে কেনা যায় না।
ফেরার সময় এক তরুণ কবি বাইরে এসে তাঁকে প্রণাম করল। খুব নিচু গলায় বলল, “মির সাহেব, আজ আপনি ভয় পেলেন না?”
মির হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “ভয়? ভয় তো আমি অনেক আগেই পেয়েছি। যেদিন দিল্লি আমার সামনে পুড়ছিল।”
বাড়ি ফিরে তিনি দেখলেন, জানলাটা খোলা। করিম বোধহয় বন্ধ করতে ভুলে গেছে। বাগানের হাওয়া ঘরে ঢুকছে। কাগজের কোণ নড়ে উঠছে।
একখানা অসমাপ্ত গজলের পাতা উড়ে মেঝেতে পড়ল।
মির পাতাটা কে তুলে আবার টেবিলে রাখলেন। তারপর জানলার ধারে গিয়ে বসলেন। অনেকদিন পরে বাইরের গাছগুলোর দিকে তাকালেন। পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। সেই আকাশ দিল্লিরও ছিল, লখনউয়েরও। কিন্তু তিনি জানেন তার নিচে মানুষের ভাগ্য এক নয়। তিনি নিজের মনে খুব আস্তে বললেন, “ভাষারও তো একটা বিবেক আছে।”
করিম দূর থেকে কথাটা শুনল। পুরো মানে বুঝল না। শুধু তার মনে হল, বাড়িটার ভেতর আজ অন্য রকম আলো খেলে বেড়াচ্ছে। যেন এই ঘরে অনেকদিন পরে আবার নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে।
সেদিনের পর লখনউয়ের লোকজন দেখল, মির সাহেবের জানলাটা আর সহজে বন্ধ হয় না।
কেউ কেউ বলল, বৃদ্ধ কবি শেষ বয়সে বাগান দেখতে শিখেছেন।
করিম চুপ করে থাকল। সে জানত, কথাটা ঠিক নয়।
মির বাগান দেখতে শেখেননি।
তিনি শুধু তাঁর শোককে ঘরের বাইরে একটু হাওয়া খেতে দিয়েছেন।
,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,, সমাপ্ত,,,,,,
ছোট অভিধান
তসবিহ — জপগণনার দানা; মুসলিম প্রার্থনায় ব্যবহৃত মালা।
কাসিদা — প্রশস্তি বাবন্দনা-ধর্মী কবিতা।
খাসনবিশ — দরবারি লেখক বা নথিকার।
খানকাহ — সুফি দরবেশদের আস্তানা বা সাধনাকেন্দ্র।
নজরানা — সম্মানসূচক অর্থপ্রদান বা উপঢৌকন।
দোয়াত — কালি রাখার পাত্র।
গজল — উর্দু-ফারসি কাব্যের একটি বিশেষ রীতি।
খুদা-এ-সুখন — ‘কাব্যের ঈশ্বর’ বা ‘বাক্যের অধিপতি’।
আলমে-ইন্তিখাব — বেছে নেওয়া শ্রেষ্ঠ জগৎ বা নগর।
কারগাহ-এ-শীশাগরী — কাচ তৈরির কর্মশালা; রূপক অর্থে ভঙ্গুর পৃথিবী।

