
নক্ষত্রের গোপন নোটিফিকেশন
১. ফোন-কলগুলো কার?
রাত নামলেই
চাঁদটা তোমার জানলার পাশে এসে দাঁড়ায়—
সে কি সত্যিই চাঁদ?
নাকি কোনো মানুষ,
যার চোখের ভেতর নোনা আলো জমে থাকে ,সমুদ্রের গোপন মানচিত্রের মতো,
কে তোমার নাম ধরে ডাকে
হালকা নক্ষত্র ঘেঁষা স্বরে?
আমি শুনতে পাই না,
কিন্তু আমি দেখতে পাই
রাত বাড়লে তুমি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যাও।
তোমার বুকের ভেতর একটা নীল আগুন জ্বলে ওঠে।
যে আগুন বরফের ভেতরেও কীভাবে যেন গরম থাকে।
তুমি চুপ করে থাকো,
কিন্তু কথার মধ্যে লুকিয়ে রাখো
এক অদৃশ্য দ্বীপ।
আমি জিজ্ঞেস করি—
রোজ রাতে কে তোমাকে ফোন করে?
কোন স্বপ্নের জন্য তুমি নৌকা নামাও?
ঠিক চাঁদ সদাগরের মতো
অজানা জলের ভিড়ে?
সে তোমার কে হয়?
তুমি হেসে বলো,
“কিছুই না—শুধুই বাতাস…”
কিন্তু তোমার নিশ্বাসে আমি অনুভব করি—
কোনো অপরিচিত তারার
ঠান্ডা স্পর্শ।
আর আমার কৌতূহল
ম্যাজিকের মতন বাড়তে থাকে—
হিমালয়ের অন্ধকারে বরফের ভেতর হঠাৎ যেমন রোদের জন্ম হয়,
ঠিক তেমনি অকারণ,
অথচ নিঃসন্দেহ সত্যি।
তখন বুঝি—
তোমার করোটির ভেতর যে সিন্দুক আছে ,সেইখানে গোপনে তুমি একটা চাঁদ রেখে এসেছো
যার সাথে তুমি রোজ গল্প করো
যাকে তুমি তোমার দু-একটা তারা ছুঁতে দাও।

২. তোমার বুকের জল আমাকে ডাকে
তোমার বুকের ভেতরে যে জল আছে।
আমার বুকেও সে জল আছে।
অদ্ভুত এক জলীয় অন্ধকার,
আমরা দুজনে মুখোমুখি—
আমাদের কোনো রং নেই,
তবু প্রতি রাতে কে যেন
আমাকে আমার নাম ধরে ডাকে।
আমি দরজা খুলে দাঁড়াই,
রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি—
দু বাহু প্রসারিত করে
পুরনো কোনো পাখির ডানার মতো জাপটে ধরার চেষ্টা করি।
কিন্তু কোথায় কে!
আমি দিনের আলোতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি
কিন্তু রাত্রে
নক্ষত্র ভেজা আকাশের ভেতর ছুটে বেড়াই।
আমি বলি—
এসো ।
তুমি কিছু বলো না,
কিন্তু তোমার ছায়া এসে বসে
আমার পাশে—
আমার ঘরের মেঝেতে—
আদুরে বেড়ালটার মতো।
আমি জিজ্ঞেস করি—
“তোমার বুকে যে ব্যথা,
সে কি আমাকে চেনে?”
তুমি উত্তর দাও না—
কিন্তু জানালার কাঁচে
হঠাৎ জল জমে ওঠে,
আর আমি দেখি—
একটা শব্দ তোমার বুক থেকে
ছুটে আসছে আমার দিকে,
নগ্ন, নিঃসঙ্গ, কিন্তু সত্য।
ঠিক তখন
আমার শরীর জুড়ে
ঝর্ণার মতো শব্দ ওঠে—
ঘরের সব দরজা খুলে যায়
আর কেউ চিৎকার করে বলে—
অভি—মান…
অভি—মান…
অভি—মান…
কী অদ্ভুত,
এই একটা শব্দ আমাদের জীবন ছারখার করে দিল।
অথচ আমরা ভাবতেই পারিনা
অভিমান এত আলো নিয়ে আসতে পারে
আমাদের জীবনে?
এতো ফোয়ারার মতন!

৩. তোমার অন্ধকারের ভার নামিয়ে রাখো
আমার চোখের সামনে
ডানকুনি শহরটা ঘুমিয়ে পড়েছে
রাস্তার বড় ফ্লাইওভারটার ছায়া
গুটিয়ে নিয়েছে সন্তর্পণে।
আমি শুধু তোমার অপেক্ষায়
মোবাইলের একটা ঘর খুলে রেখেছি—
আর দেখি দরজার মাথায়
জোনাকিগুলো হারিকেনের আলোর মতো
ঠিক ঠাক ঝুলছে কিনা।
তুমি কি জানো—
রাতে তোমার নাম বললে
ঘরের আলো
তার নিজস্ব ওজন বদলে ফেলে?
এ যেন কোনো পুরোনো মন্ত্র নয়—
এ শুধু
তোমার প্রতি আমার নীরব অভ্যেস,
যার ভিতরে
ছোট ছোট নক্ষত্ররা ভেসে ওঠে।
তুমি মাঝে মাঝে ভুলে যাও—
আমি তোমার কে।
আর আমি—
তোমাকে ভুলে গিয়ে
নিজের পরিচয় খুঁজি।
রাতে জানলার কাঁচে
তোমার ছায়া এলে
আমি দেখি—
একটা গোপন নদী
তোমার ভেতরকার অন্ধকার থেকে
গলে গলে
আমার হাতে খসে পড়ছে।
এসো—
তোমার অন্ধকারের ভার
সারা জীবনের মতন
আমার বুকে নামিয়ে রাখো।
কিন্তু দ্যাখো আমি আলো নই,
তবু তোমাকে আলোর দিকে
নিয়ে যেতে যেতে
আমার বুকের ভেতর
একশ রকম জোনাকিরা
অপেক্ষা করে থাকে
নিঃশব্দে।
সেই আলোয়
তুমি যদি একবার
মুখ ঘুরিয়ে তাকাও—
আমি বুঝে যাই,
তোমার নীরবতার গভীরে
আমার নাম।


[পরম্পরা ওয়েবজিন, ডিসেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

এ এমন এক অনুভূতির অনুরোধ যা উপলব্ধি করা এবং তা অন্যান্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারা খুব সহজ কাজ নয়। বেশ কয়েকবার পড়লে হয়তো তল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।