বাঙালীর হজমশক্তি প্রবল এমন অভিযোগ(!) কেউ করেননা কারণ দূর্বলপেট ব্যাপারটা বাঙালির বার্থরাইট। কিন্তু এসব বিপদকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সে বেপরোয়া রকমের ভোজনবিলাসী এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই শ্রীরামপুর বা তার আশেপাশে কোথায় কী কী খাবার পাওয়া যায় তার সুলুকসন্ধানে সে একনিষ্ঠ গবেষক এবং পৃষ্ঠপোষক। এই শহর মূলতঃ মিষ্টির জন্যই বিখ্যাত ছিল এবং এখনও আছে। অসংখ্য ঐতিহ্যপুর্ণ প্রাচীন এবং অপেক্ষাকৃত নবীন অথবা কিছু সদ্যজাত মিষ্টির দোকানে সুশোভিত শ্রীরামপুরে কিন্তু বেশ কয়েকবছর আগে থেকেই এই শহরের ভোজনরসিকদের রসনায় বিরিয়ানী, মোমো , পিৎজা, চাউমিন, চিলি চিকেন, কাবাব ইত্যাদির আগ্রাসন শুরু হয়ে গেছে যার দাপটে এখন মানুষের বাড়িতে অতিথিসমাগম হলে তাদের খাদ্যতালিকায় মিষ্টান্নের একাধিপত্য কিছুটা হলেও প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে গেছে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাছাড়া খাদ্যরুচিতে মানুষের অনেক পরিবর্তন হয়েছে এটাও ঠিক, এব্যাপারে ধীরে ধীরে নিরবে একধরনের কালচারাল রেভোলিউশন ঘটে গেছে।

একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় আজকাল “চিকেন” তার পূর্রগৌরব হারিয়েছে । তার স্ট্যাটাস এখন কুমড়োর মতন। আমাদের ছেলেবেলায় অর্থাৎ ষাট সত্তর বছর আগে ব্যাপারটা অন্যরকম ছিল। তখন চিকেন শব্দটা চালু ছিলনা । তাই ‘ চিকেন কারি’ নয়, বলা হতো ‘ফাউল কারি’। ‘ ফাউল কারি’ ,’ফাউল চপ’ অথবা ‘ফাউল কাটলেট’ আলাদা গ্ল্যামার ও গাম্ভীর্য নিয়ে খাবার টেবিলে হাজির হলেও আমআদমীর জনপ্রিয়তার নিরিখে কিন্তু মাটন এবং পুকুর থেকে তোলা টাটকা মাছের কদর ছিল বেশি।

শ্রীরামপুরে মদনের দোকানের ‘ফিস্ চপ’ চিরকালই তুমুল জনপ্রিয়। এই চপ যিনি খাননি আমি নিশ্চিত যে তাকে আরো একবার এই ধরাধামে জন্মাতে হবে শুধু এইটা খাবার জন্যে। আমি যখন সদ্যকৈশোরের চৌকাঠে পৌঁছেছি অর্থাৎ সত্তর/আশি বছর আগে তখন থেকেই অনেকের মতো আমিও মদনদার দোকানের ‘ফিস চপ’এর একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে গেছি। এই বিশেষ রেস্টুরেন্টে মানুষের যাওয়া-আসার জন্য আরো একটি কারণ ছিল। অগ্নিযুগের বিখ্যাত বিপ্লবী শহীদ গোপিনাথ সাহার ভাই ছিলেন মদনদা। হয়তো সেইজন্যই রাজনীতি-সচেতন মানুষ, বিশেষকরে বামপন্থী মানুষদের একটা চোরাটান ছিল এখানে। কিন্তু আশী-নব্বই বছরধরে এখানকার “ফিসচপ”এর অসাধারণ জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা সম্ভব হয়েছে যে কারণে সেটি হলো এত দীর্ঘসময় জুড়ে এই খাদ্যটির কোয়ালিটি একইরকম ভালো। কয়েকটি যুগ ধরে এইরকম QA & QC অর্থাৎ Quality Assurance & Quality Control ধরে রাখা একটা বিস্ময়। রেস্টুরেন্টটির বহিরঙ্গে তেমন চটকদার আধুনিকতা না থাকলেও মদনদার তৃতীয় প্রজন্মের মানুষদের অমায়িক ব্যবহার, আন্তরিকতা এবং খাদ্যের অন্তরের ঐশ্বর্য মানুষকে আজও আকর্ষণ করে। আমাদের যৌবনকালে আরো একটা প্রিয় ঠেক ছিল জি.টি.রোডের ওপরে “বাসন্তী কেবিন” যেখানে ডিমের ডেভিল বা কষামাংস খাবার জন্যে অনেকেই লাইন দিতে ক্লান্তিবোধ করতোনা। সে অবশ্য এখন মুমূর্ষু রোগীর মত ধুঁকছে। এর একটা কারণ হয়তো এর একেবারে সামনে দিয়ে কয়েকবছর আগে তৈরি হওয়া উড়ালপুল নির্মাণের ফলে পথচলতি মানুষের দৃষ্টির আড়ালে কিছুটা চলে গিয়েছে। এখন প্রতিযোগিতা সবক্ষেত্রেই ভীষণ বেড়ে গেছে ,এটাও কারণ। কেক-প্যাস্ট্রির বিখ্যাত “Mio Amore”, মুখোরোচক খাবারের “হ্যাংলা” অথবা “বাঞ্ছারাম” ছাড়াও মাহেশ অঞ্চলে গত কয়েকবছরের মধ্যে অনেক ঝাঁ-চকচকে আধুনিক চেহারার রেস্তোরাঁ তাদের হরেকরকম পসরা নিয়ে জাঁকিয়ে বসেছে।

বাগবাজারের “মিত্রকাফে “র ফিশফ্রাই এর গন্ধ নাকি গড়িয়া থেকেও পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে শ্রীরামপুর কিন্তু পিছিয়ে নেই। বছর দুয়েক আগে এখানেও তাদের একই নামের নিজস্ব একটি শাখা নেতাজী সুভাষ এভিনিউতে খুলে ফেলেছে। এখানকার উল্লেখযোগ্য খানদানি রেস্তোরাঁ হিসেবে গঙ্গার ধারে “Denmark Tavern” এবং আদালত প্রাঙ্গণে হেরিটেজ “ভেতো” ভোজনরসিকদের আকর্ষণ করে যাচ্ছে। “ভেতো” নামটা একটু নেতিয়ে পড়া ‌‌‌‌মনে হলেও তার ভেতরের সাজসজ্জা ও ambience কিন্তু নিঃসন্দেহে ইংরেজ আমলের মতো।
“বিরিয়ানী” নবাব বাদশাদের খানা হলেও এখন শহর বা শহরতলীর অলিতে গলিতে পাওয়া যায় এবং আমজনতার হেঁসেলেও ঢুকে পড়েছে । সন্দেহ নেই যে এই পদটির কৌলিন্য আগের মতো নেই। এটি রান্না করার ঘরাণা অর্থাৎ expertiseও আর গোপন নেই। তাসত্ত্বেও কলকাতায় চিৎপুরের একদা বিখ্যাত “রয়্যাল” বা “আমিনিয়া” অথবা পার্কষ্ট্রিট অঞ্চলের “সিরাজ” এর বিরিয়ানী না খেলে সে বিরিয়ানী-প্রেমিকদের আসরে পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকবে । তবে ভয় নেই, কলকাতার বিখ্যাত সব বিরিয়ানীর দোকান যেমন “আমিনিয়া” ইত্যাদি শ্রীরামপুরেও তাদের শাখা খুলে ফেলেছে আর প্রায়ই দেখা যায় শহরের বিরিয়ানী প্রেমিকরা সেখানে দীর্ঘ লাইন দিয়ে কিনছেন। এছাড়াও কলকাতার একটি বহুল প্রচারিত রেস্তোরাঁ চেন “ভূতের রাজা দিলো বর” শ্রীরামপুর বটতলায় তাদের শাখা খুলে ফেলেছে। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত “গুপি গায়েন বাঘা বায়েন” সিনেমার জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে নামমাহাত্মে এই শহরের ভোজনরসিকদের আকর্ষণ করতে শুরু করেছে।

কলকাতার মিষ্টি নিয়ে আর কি আর বলবো । নকুড়ের সন্দেশ অথবা জলযোগের “পয়ধী” (শুনেছি নামটি দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ) যে খায়নি মনে হয় তার মানবজন্মই বিফল। কলকাতা থেকে এবার দৃষ্টি প্রসারিত করবো শহরতলীর দিকে।
শ্রীরামপুর শহরে এলে ‘মহেশ দত্ত’র কড়াপাকের লাল রসগোল্লা, জলভরা সন্দেশ, লবঙ্গলতিকা, বা ‘যজ্ঞেশ্বর’এর দই না খেলে আপনার নামে কিন্তু FIR হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। আমি ছেলেবেলা থেকেই দেখছি শ্রীরামপুরে ‘মহেশ দত্ত’র দোকানের যেকোনও মিষ্টির এতো বেশি গুডউইল যে সব মানুষের ভীষণ ভরসার জায়গা, বিশেষকরে পুজোর জন্য মিষ্টি হিসেবে। বহুবছর ধরে শুনে আসছি তারা নাকি খুব শুদ্ধাচারে সবকিছু তৈরি করে। এই দোকানের জনপ্রিয়তার জন্য একটি ধর্মীয় কাহিনী চালু আছে । এখানে “গুটকা” নামে একরকমের ছোট ছোট সন্দেশ পাওয়া যায়। জনশ্রুতি আছে যে স্বয়ং জগন্নাথ নাকি একবার ক্ষুধার্ত হয়ে ছদ্মবেশে এখানে হাজির হয়ে ঐ গুটকা খেয়েছিলেন। অবশ্য ছদ্মবেশী জগন্নাথকে কীভাবে সনাক্ত করা হয়েছিল সে প্রশ্ন কেউ করেনা। তবে এটা ঠিক যে বনেদীয়ানা বা আভিজাত্যের নিরিখে কেউ তাকে টেক্কা দিতে পারবেনা। অনেকদিন আগে ভীষণ জনপ্রিয় “অক্ষয় মিষ্টান্ন ভান্ডার” কোনো অজ্ঞাত কারণে ইদানিং রোজ নিয়মকরে খোলা থাকলেও শোকেসে দুচারটে আইটেম সাজিয়ে রেখে চুপচাপ বসে থাকে ও মাছি তাড়ায়। তাদের এই দৈন্যদশার কারণ কেউ বুঝতে পারেনা। কিন্তু তার ঠিক পাশেই প্রায় সমবয়সী “উমা মিষ্টান্ন ভান্ডার” কলেবরে ও জৌলুসে এখন রিতিমত প্রাণবন্ত ও সরগরম।

তবে পারঘাটের কাছে “অতিথি” এখনও সুনামের সঙ্গে অতিথি-আপ্যায়ন করে যাচ্ছে। মিষ্টি প্রস্তুতকারীদের নিজেদের মধ্যেও প্রতিযোগিতার ঠান্ডা লড়াই নিশ্চয়ই আছে। চাতরায় “যজ্ঞেশ্বর মিষ্টান্ন ভান্ডার”এর লাল দই এর স্বাদ প্রায় কিংবদন্তির মতো। তার জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দেবার হিম্মৎ কারোর ছিলোনা। কিন্তু কয়েকবছর আগে শ্রীরামপুর স্টেশনের কাছে একটি মিষ্টির দোকানে একইরকম স্বাদের দই প্রস্তুত করে তারা দইপ্রেমিদের চমকে দিয়েছে। গোপন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে যে ঐ যজ্ঞেশ্বরের একজন কারিগরকে নাকি বেশি টাকার লোভেই ফুসলে এখানে নিয়ে এসে কাজে বহাল করার পর tecnology transfer সহজ হয়ে এই সাফল্য।
একথা ঠিক যে শ্রীরামপুর মিষ্টির শহর, হরেকরকম মিষ্টির জন্য বিখ্যাত। রক্তে চিনির মাত্রা বাড়লো কি কমলো, সেসব পরোয়া না করেই এই শহরের মানুষরা লাগাতার মিষ্টি খেয়ে যায়। এখানকার মানুষ জন্ম থেকেই মিষ্টান্নের জন্য বলিপ্রদত্ত।

আজকাল অবশ্য কেউ বেশি খায়েনা। সবাই স্বাস্থ্য সচেতন। জিমে গিয়ে অনেক পুরুষ ও মহিলা শরীরের ওজন ঠিক রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। বিশেষকরে মহিলারা কেউ পৃথুলা হতে চাননা । অল্পবয়সী মেয়েদের দেখলে অবাক হতে হয়। মিষ্টি দেখলেই ভয়ঙ্কর কেউটে সাপ দেখছে ভেবে আঁতকে ওঠে। ওবেসিটি ভীষণ বাজে একটা ব্যাপারস্যাপার ঠিকই । সবাই চায় তন্বী থাকতে যদিও তন্বীর কোনো সর্বগ্রহণযোগ্য প্যারামিটার নেই । তবু অনেকেই আজকাল শরীরের ওজন কমানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন ।

কিছুদিন আগে কোনো পত্রিকায় একটা লেখা পড়েছিলাম। এক ভদ্রমহিলা একটি ওয়েট ম্যানেজমেন্ট সেন্টারে গিয়েছিলেন । রিসেপশনিস্ট মেয়েটির প্রশ্ন,- আপনার ওজন ?
পঁচানব্বই কেজি
ইস্ , একটুর জন্যে আমাদের অফারটা মিস্ করলেন।,
ও তাই ! তা এখানে রেট কত ?’
‘কিলোয় দু’হাজার।’
ভদ্রমহিলা আকাশ থেকে পড়লেন ,
‘এতো ? এই টাকায় পাঁচ কিলো পাঁঠার মাংস হয়।’
রিসেপশনিস্ট মহিলা বললেন,
‘সেই ভালো , আপনি বরং মাংস টাংস খেয়ে নিজের ওজনটাকে একশো কিলো করে আসুন, তাহলে আমাদের অফারটা পাবেন — কিলোতে পনেরো শো ।’

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের আগের রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]