
আমাদের ভাইদের নামকরণ কে করেছিলেন জানিনা কিন্তু বেশ মিলিয়ে করা হয়েছিল। জ্যাঠামশাই এর একমাত্র পুত্রের নাম নিখিলেশ ( যাকে আমরা ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতাম এবং সম্পর্কের রসায়নে ‘আপন’ দাদার চাইতে একটুও কম ছিলেননা হয়তো বেশিই ছিলেন), তারপর আমরা একে একে অমরেশ, অনিলেশ ও অসীমেশ।
চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে ভর্তি হলাম শ্রীরামপুরে চাতরা নন্দলাল স্কুলে। মনে আছে বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম দাদাকে নিয়ে আমরা চারজন। তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন গৌরীবাবু। তিনি আমাদের বাবারও মাষ্টারমশাই ছিলেন। গম্ভীর ব্যারিটোন ভয়েসের মিশেলে প্রশ্ন করলেন,
“কিহে, এরা সব ইস্কুলে ভর্তি হবে ?
ঠিক আছে।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হলো। দাদা ক্লাশ নাইনে , আমি আর মেজদা ক্লাশ থ্রী । ছোটভাই অসীমেশ ভর্তি হয়েছিলো পূর্ণচন্দ্র পাঠশালায় ক্লাশ ওয়ানে। রোজ ইস্কুল থেকে ফেরার পথে তাকে তার পাঠশালা থেকে আমাদের বাড়িতে ( দুমিনিটের পথেও নিরাপত্তার কারণে ) সঙ্গে নিয়ে আসতে হতো। কখনো যদি একটু আগে পৌঁছে যেতাম তখন সেখানকার মাষ্টারমশাই কালীবাবু আমাদেরও ক্লাশে বসিয়ে দিতেন। আমিও সুর করে বলতাম – ‘এক কড়ায় পোয়া গন্ডা’…

নতুন ইস্কুলে ভর্তি হবার পর লেখাপড়া কতটা শিখছিলাম জানিনা কিন্তু সহপাঠীদের প্রতিভার স্পর্শে খুব দ্রুত বেশ কিছু গালাগাল আর মধুর বাক্যবাণ শিখতে শুরু করে দিয়েছিলাম। সেগুলো প্রয়োগ করার সুযোগ অবশ্য ছিলো না।
মনে আছে তখন খুব রাগারাগির সময় একটা বাক্যবান খুব চলতো। প্রতিপক্ষের দিকে চোখ পাকিয়ে কেউ কেউ চিৎকার করে বলতো — ” এরপর যদি বেশি বাড়াবাড়ি করিস্ তো মেরে তোর বাপের বিয়ে দেখিয়ে দেবো।”
মারের চোটে হাত পা ভাঙতে পারে বুঝতে পারি কিন্তু নিজের বাপের বিয়ে দেখার সুযোগ আছে কিনা আজও বুঝিনা। কিন্তু গালাগালটা খুব চালু ছিলো। অবশ্য তার কয়েকবছর পরে আমরা যখন ক্লাশ নাইনে তখন আমাদের এক সহপাঠী সত্যি সত্যি তার বাপের বিয়ে শুধু দেখেইনি, সেই বিয়েতে রীতিমত সেজেগুজে বরযাত্রী গিয়েছিল। সে যখন ক্লাশ নাইনে তখন তার বিপত্নীক বাবা আবার একটা বিয়ে করার তোড়জোড় করে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে তার ছেলেকেও বরযাত্রী হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলেন। এটা আমার নিজের চোখে দেখা কারণ এই বিবাহে পাত্রপক্ষ ও পাত্রীপক্ষ দুটোই আমাদের পাড়ার এবং আমাদের ভীষণ পরিচিত ছিলো।
আমাদের যৌথ পরিবারের বাড়িতে অনেক সদস্য। সেই সময় একবার কোনো কারণে অনেক আত্মীয়স্বজনের সমাবেশ হয়েছিলো। তখন অবশ্য এমনিতেই আমাদের বাড়িতে অনেক মানুষ থাকতেন যেমন সেইসময় কোনো বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে থাকতেন আরকি।
আমাদের বিধবা বড়োপিসীমা, ধবধবে গায়ের রং আর চকচকে সাদাবেশ ,স্বল্পবাক ও রাশভারী মহিলা ছিলেন। একদিন রাতে যখন খাওয়া হয়ে গেছে, একটু পরেই ঘুমোতে যেতে হবে তখন কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তিনি আমার ওপর প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে হঠাৎ ভয়ঙ্কর রেগে বললেন – “কেন একাজ করলি জবাব দে।”
কী কাজের জবাব চাইছিলেন কিছুই বুঝতে না পেরে আমি হঠাৎ কেন জানিনা নতুন শেখা আমার গালাগালির স্টক থেকে দুম করে একটা মিশাইল ছুঁড়লাম ,
— ” তাতে কার বাপের কি ?”
সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ। পিসীমা কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলে উঠলেন — “সবাই শোনো, এইটুকু ছেলে অনিল আমার বাপ তুললো।”
বাপ তোলার মানেটাই বুঝতে পারলাম না। ভীষণ ভয় পেয়ে আমি তৎক্ষণাৎ অকুস্থল থেকে পালিয়ে গেলাম। এর পরেরদিন সকালে কী শাস্তি আমার জন্যে বরাদ্দ হবে সেই ভয়ে কাঁটা হয়ে রাতে ঘুমাতে গেলাম। পরদিন কী হবে কে জানে।
গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। দেখি আমাদের দাদা চুপিচুপি আমাকে ডাকছেন। আমি ধড়মড় করে উঠে পড়লাম। একটু দূরে আমাকে নিয়ে গিয়ে একটু আস্তে হলেও বেশ গম্ভীর গলায় হালকা ধমকের সুরে দাদা বলে উঠলেন,
-” তুই কি আজ পিসীমাকে বাপ তুলে
গালাগাল দিয়েছিস ? খুব অন্যায়
করেছিস, খবরদার আর কোনোদিন করবিনা বল্।সবাই খুব রেগে আছে। কাল সকালে কেউ বকুনি দেবার আগেই তুই নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইবি। তাহলে আর কেউ বকবেনা, বাকিটা আমি সামলে দেবো।”
তখন রাত কটা জানা সম্ভব ছিলোনা। মনে নেই। শুধু মনে আছে সেই নিশুতি রাতে ঘর থেকে চলে যাবার আগে দাদা সবার অলক্ষ্যে সামান্য ঐটুকু ধমক দেবার জন্যই অনেকক্ষণ ধরে আমাকে জড়িয়ে আদর করে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়তে বলেছিলেন।

তারপর থেকে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। আমার দীর্ঘজীবন তার নিজের গতিতে এগিয়ে চলছে। আমাদের দাদা অনেক বছর আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তবু অসংখ্য ঘটনার মধ্যে থেকে জানিনা দুচারটে হীরকখন্ড কেন হঠাৎ স্মৃতির আকাশে উজ্জ্বল হয়ে ভেসে ওঠে। জানিনা কেন তখন চোখের জল থামতেই চায়না।

