তিন সন্তানের মা পারভিন। বয়স বেশি না, মেরেকেটে তিরিশ।
বছরের অনেকটা সময় স্বামী ব্যবসার কাজে দূরেই থাকে।
পারভিন তার শাশুড়ির সাথে এসেছে। ছ’মাস ধরে অনেক ঝাড়ফুঁক, লোকাল ডাক্তার হওয়ার পর অবশেষে শহরের ডাক্তার, নার্ভের ডাক্তার।

–হয়টা কি?
আমার প্রশ্নের উত্তরে পারভিন তার হাতের কাপড় সরিয়ে দেখায়, অস্পষ্ট কয়েকটা আঁচড়ের দাগ দেখতে পাই।
–এরকম অনেক আছে!
নিচু স্বরে বলে সে।
–আর কি হয়?
পাশ থেকে ওর শাশুড়ি ঠেলে।
— দম লেগে আসে, মাঝরাতে! বুকের ওপর কেউ উঠে বসলে যেমনটা হয়, ঐরকম! দেখতে পাই নি, কিন্তু কেমন যেন গা ভর্তি লোম, গায়ে খুব জোর —দম আটকে যায় আমার!
সামান্য কেঁপে ওঠে সে।
–জিন্ মনে লয়,দেশঘরে অমন হয় গো, আজ হচ্ছে তিন মাস,সব বললে আপনারে দেখাতে… কিছু একটা করেন ছার!
শাশুড়ি বলে।
আজ কয়েকদিন বৌমার ঘরে শুচ্ছেন তিনি — এমন হলে কোরআন এর আয়াৎ পড়লে নেমে যায় নাকি জি্ন।

ভাবতেই হয়, হিস্টেরিয়া, নাকি ক্যাটালেপ্সি, নাকি অন্য কিছু!

এই এক রহস্যময় রোগ। কয়েক হাজার বছর আগে লোকে বলত নারীশরীরে জরায়ুর তেষ্টা পায় আর আর্দ্রতার সন্ধানে শরীরের সর্বত্র ঘুরে বেড়ায় হিস্টেরস্ অর্থাৎ জরায়ু– এ থেকেই অমন নাম,হিস্টেরিয়া!
এমন হলেই প্রচলিত নিয়মের তোয়াক্কা না করেই অদ্ভুত যত লক্ষণ তৈরি হবে। মেসমার থেকে ফ্রয়েড,কম মাথা ঘামান নি এ নিয়ে।
অবদমিত ইচ্ছে? ভিক্টোরিয়ান যুগের অনুশাসন!
মেয়েদেরই বেশি হয়, তবে কি ছেলেদের এসব হয়না? জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন?
ভূতে ধরাও তাহলে এমনই রোগ? দেবতার ভর? ক্ষমতাহীন ঊনমানবের সাময়িক ক্ষমতায়ন?
মুখে তো কতকিছুই বলা যায় না!

চল্লিশোর্ধ্ব মৌসুমী আসত ঝড়ের মতন। অনিয়মিত হলেও মাঝে মধ্যে একটা করে ঝোড়ো স্পেল যেন।
বিয়ের চেষ্টাও হয়েছে তার,লাভ হয়নি। সবাই জানে ওর মাথা খারাপ। একটা কিছু লুকিয়ে রাখত মৌসুমী, একটা কষ্টের ইতিহাস!
সেটা উদ্ধার হলো একবার,সে তখন উন্মত্ত। ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেল ওর জেঠুর ছেলে — আছারি বিছারি কাঁদল মৌসুমী। ধর্ষিতা হয়েছিল সে আর যে দাদার অপকীর্তি সবার থেকে লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন, যাকে সে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করত,তার মৃত্যুতে এত কেঁদে শেষমেশ আমাকেই প্রশ্ন করলে, আমার কী হলো বলুন তো স্যার? আমি এরকম হয়ে গেলাম কেন?

চোদ্দ বছরের শর্মি।
দোলের দিন ছেলেদের সাথে রং খেলতে দেয়নি দিদা।
সন্ধ্যা থেকে শরীরের একদিকে প্যারালিসিস।
সরকারী হাসপাতালে কদিন ভর্তি হয়ে অবশেষে সাইকিয়াট্রি বিভাগে।
ওষুধ বেশি লাগে নি, সাজেশনের শক্তিতেই উঠল সে। মনের যে কী আশ্চর্য ক্ষমতা!

আরও একজনের কথাও বলি। বছর চল্লিশের লোক, মুদি দোকানী। তিন বছর থেকে দুচোখের পাতা খুলতে পারেন না। অনেক জায়গায় দেখিয়ে শেষে চেন্নাইয়ের বিখ্যাত চোখের হাসপাতাল। ওনারা অজ্ঞান করে চোখ পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, চোখে কিছু হয়নি,যা হয়েছে মনে।
ভর্তি রেখে নানান চেষ্টাতে‌ কিছুই না হওয়ায়
সেকালের প্রচলিত আধা অ্যানাসথেসিয়ায় খানিকটা হিপনোটিক সাজেশনের পর জানলাম নিজের ভাইকে ছেলের মত বড় করেছিলেন তিনি। নিজের স্ত্রীর সঙ্গে সেই ভাইয়েরই অন্যরকম আচরণ নজরে আসে তাঁর। শাসন করতে পারেন নি, ছেড়ে চলে যেতে পারেন নি, এরপর ওনার দৃষ্টিটাই হারালেন – যা দেখতে চাননি,তা আর দেখবেন না!
মনের গতিপ্রকৃতি কী অদ্ভুত ভাবুন তো! আর আমরা পন্ডিতি ফলাতে গিয়ে ভুলেই যাই, ফ্রয়েড কিম্বা ইয়ুঙ,এরা কেউই বোধহয় বুদ্ধু ছিলেন না।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ডিসেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]