(অরণ্যদেব)

বঙ্গাইগাঁও (অসম) যাবে বলে সে নাছোড়, দাদুর (ঠাকুরদা) এক কথা— এখন না। কাকু দূরে চাকরি করে, দিয়ে আসবে কে, নিয়েই বা আসবে কে ? যাব বললেই তো আর যাওয়া যায় না। দূরত্বও কম নয়। পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টার ট্রেন জার্নি। কয়লার ইঞ্জিন, চোঙ দিয়ে ভুক ভুক করে ধোঁয়া আর কয়লাগুঁড়ো ছাড়ে যে-সব প্যাসেঞ্জার ট্রেন— ওগুলোয় সময় অনেক বেশি লাগে। তাছাড়া দেড়-দুই মাসের মধ্যেই তো বাবা-মা আসবে, ভাই-ও আসবে। নাতি কেঁদে-কেটে একশা। দাদু ভাবছে এমন বায়নাক্কা তো নাতি সচরাচর করে না। মা-বাবা আর ছোট্ট ভাইকে ছেড়ে সে তো দিব্যি থাকে দাদু-কাকু-পিসির কাছে। কালোদিদা কত যত্ন করে দুইবেলা খাইয়ে দেয়। হাত ধোয়া জল দিয়ে রান্না করলেও কী স্বাদ! কালোদিদার গামলার মত বাটি থেকে শুকনো লঙ্কাপোড়া মাখানো পান্তাভাত খেতে কী ভালো লাগে। সবাই বলে ‘মমিসিঙ্গা’-দের হাতের রান্না নাকি দারুণ হয়। ঝালঝাল স্বাদ। এদের মেজাজও নাকি ঝালঝাল! ‘মমিসিঙ্গা’ মানে ঠিক কী, তা সে অনেকটা বড় হয়ে জেনেছে। শব্দটা আসলে ময়মনসিংহ। বাড়ির খুব কাছে কয়লাওয়ালা সাতসকালে কয়লা বিক্রি করে। কাকু বস্তা ভর্তি কয়লা নিয়ে আসে।কালোদিদা উঠোনের একধারে স্নানঘরের ইঁটের দেয়ালে ছপ ছপ করে ঘুঁটে চাপায়। কয়লা আর ঘুঁটে টিনের উনুনে গুঁজে লোহার লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে রান্না করে। বাঁধানো দুইপাটি দাঁতে সারাদিন ধরে জাবর কাটে। হামানদিস্তায় ঠং ঠং করে ঠুকে পান-সুপুরি নরম করে। কাত্থ বানায়— এই স্বাদের ভাগ পাওয়া যায়। কাশি হলে এভাবে ঠুকে ঠুকে বাসকপাতার রসও খাওয়ায়। তখন ওয়াক্ আসে।

একদিন কালোদিদা বাড়ির কত্তামশাইকে বলে— পোলাডার হাত পা কেমন ফুইলা গেসে, দেখেন নাই?

কত্তামশাই হাঁক দিলেন। ছেলেটা হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এল। এত হাঁপাচ্ছে কেন!কত্তামশাই ভালো করে হাত পা টিপে দেখলেন! আঙুল অনেকটা ঢুকে যাচ্ছে। হাওয়া পুরোপুরি বেরিয়ে যাবার আগে অল্প ফোলা বেলুনে আঙুল চাপলে যেমন হয়, অনেকটা তেমন না! গম্ভীর মুখে বললেন— দাদুভাই, যাও এখন খেলতে হবে না। গল্পের বই পড়ো। দাদুভাইয়ের কী আনন্দ। ছোটদের রামায়ণ বইটা পাতলা, পুরোটাই রঙিন ছবিতে ভরা। কবেই না পড়ে ফেলেছে। জটায়ু পাখিটার একটা পাখা কেটে ঝুলে পড়েছে, রক্ত পড়ছে। দেখলেই ছেলেটার কষ্ট হয়। মহাভারত বইটা একটু মোটা, ওটায় আবার গুড়িগুড়ি লেখা, কয়েক পৃষ্ঠা পরপর সাদাকালো ছবি। কত্তামশাইয়ের আঁতশ কাচ দিয়ে পড়তে দারুণ লাগে। লেখাগুলো বড় বড় হয়ে যায়। অর্জুনের ধনুকের চাইতেও ভীমের গদাটা ওর বেশি পছন্দ। ভীমকে খুব পছন্দ। ভীম বিষ মেশানো খাবার খেয়ে নদীতে ধুপ করে পড়ে গেছিল, সোজা সাপেদের রাজত্বে। সেখান থেকে বেঁচে ফিরে এসে দুর্যোধনকে আবার পিটিয়েছে। বেশ করেছে। দুর্যোধনটা খুব পাজি। আরও বেশি পেটালে খুব আনন্দ হতো। কাকু এই বইগুলো এনে দিয়েছে। আর একটা বই, ওতে ‘থুত্থুরে বুড়ি তার ঝুরঝুরে বাড়ি’ কবিতাটা আছে। ছবিতে বুড়ির বাড়িটার কী অবস্থা! ত্যারাব্যাঁকা তক্তায় পেরেক লাগানো বাড়ি। একটু বাতাস দিলেই ভেঙে যাবে। বুড়ি তাহলে কী করে থাকবে বাড়িতে? কাটা গাছের কাঠ দিয়ে বানানো ইয়া ঢোল না বাজালেই তো রাজামশাইয়ের যে শিং আছে কেউ জানতেই পারতো না, ভবম নাপিতও বিপদে পড়তো না। টুনটুনি পাখিটার কী সাহস, না? রাজামশাই জল দিয়ে গিলে ফেলল, অমনি ও পেটের ভিতর দিব্যি ঘুরে সো-ও-ও করে রাজার মুখ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল! আচ্ছা, পেটের ভিতরে গিয়েও টুনটুনি মরে গেল না কেন?

— কয়েকদিন দেরি হলেই ছেলে কিন্তু মরে যেত। বিছানা থেকে গড়িয়ে পড়লেও বাঁচানো যেত না, বুঝলেন? এক্ষুনি হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে, নইলে…

বঙ্গাইগাঁও রেল কোয়ার্টারে ছেলে বিছানায় শুয়ে। মোড়ায় বসে ডক্টর বরদলৈ গম্ভীর মুখে একথা বললেন ছেলের বাবাকে। মা-র চোখে জল। ছেলের হাতে ইন্দ্রজাল কমিকস্। অরণ্যদেব-এর বিয়ের সংখ্যা। ইন্দ্রজাল কমিকস্ এর সবাই এসেছে বিয়ের অনুষ্ঠানে। ম্যানড্রেক, লোথার, নার্দা, লোথারের বউ কার্মা, ফ্ল্যাশ গর্ডন— নেমতন্ন খেতে কে আসেনি! কত ফল সাজানো। মজবুড়ো, গুরান, মিস তাগামা, ব্যান্ডর সেনা,কান মাথায় তোয়ালে চেপে ঘুমাতো যে কর্ণেল, সেও এসেছে। প্রেসিডেন্ট লুয়াগাও। আরও কত লোক। ইয়া সবুজ ডাইনোসরটা, হিজ, হার্জও আছে। এদের দেখে ডায়নার ডেভ কাকু খুশি হলেও, ডায়নার মা ভয় পাচ্ছে। মেয়েটা কী কুক্ষণে যে অরণ্যদেব-কে বিয়ে করতে পাগল হ’ল! তুফান আর ডেভিল তো সবখানেই থাকে। বাচ্চা রেক্স খুব আনন্দ করছে। সবাই গ্লাস হাতে ঝর্ণার জল খাচ্ছে। কিলাউই এর সমুদ্র তীরে জেড পাথরের ঘরে ডায়না আর অরন্যদেব। সমুদ্র স্নান করে সোনালি বালুতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সলোমন আর নেফারতিতি-র মুখে দড়ি বেঁধে সমুদ্রে স্কি করছে। আচ্ছা, অরন্যদেব যখন স্নান করে বা পোশাক বদলায়, তখন তো উদোম গা-য় থাকে, তখনও ওর চোখদুটো দেখা যায় না কেন? হাসপাতালের বেডে শুয়ে এগুলোই শুধু মনে পড়ে ।

সারাদিনে একটুক্ষণ পর পর নার্স এসে ইঞ্জেকশন দিয়ে যায়। লোহার বিছানাটার উল্টোদিকে বড় বড় কাচের জানালা। জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখা যায়। ভীম আর লোথারের মত শক্তি থাকলে হাসপাতালে এত এত ইঞ্জেকশন খেতেই হতো না। সকালে-বিকেলে থিন অ্যারারুট বিস্কুট, অল্প দুধ দেয়। দুপুরে আর রাতে অল্প গলাভাত খেতে দেয়। নেফ্রাইটিস হলে নাকি লবন খাওয়া নিষেধ। নুন ছাড়া রান্না খাওয়া যায়? বাবার বন্ধু কাকুরা, কাকীমণিরা রোজ বিকেলে আসে। মাথার পাশে ওষুধ রাখার বাক্সটার উপর অনেকগুলো শুকতারা আর চাঁদমামা জমেছে। ভাগ্যিস দাদু সময়মতো এক্সচেঞ্জ অফিস থেকে টেলিফোন করে কাকুকে ডেকে পাঠিয়েছিল, আর কিছুদিন দেরি হলেই সত্যিকারের শুকতারা হয়ে যেতাম।

সকাল নটায় পোঁ পোঁ করে সাইরেন বাজে। কোয়ার্টারে রোদ ঝুপঝুপ বারান্দায় গরম রুটিতে ঘি লাগিয়ে তার উপর চিনি ছিটিয়ে দুইভাইকে খেতে দেয় মা। হাসপাতাল ফেরত কত নিয়ম। অল্প দূরে লোকজন গোল করে জটলা করেছে। সামনে বিশাল শটিবন। ওই তো পাশের কোয়ার্টারের সূর্য, নীলম ওরাও শটিবনের সামনের মাঠটায় মোরগ লড়াই দেখছে। পাশাপাশি কোয়ার্টারগুলোর বাগান ভেরেন্ডা গাছে ভরে গেছে। আগেরবার বঙ্গাইগাঁওতে এসে সূর্য আর নীলমের সাথে ভেরেন্ডার ডাল ভেঙে ফুঁ দিয়ে বল বানিয়েছি। বলগুলোয় বেগুনি রঙ চিকচিক করতো। গাছে কত ফড়িং বসতো। আমরা ছুটে ছুটে ফড়িং ধরতাম। ভেরেন্ডার ডাল ভাঙতাম। তারপর হাতে ধরা ফড়িং-এর মুখে ভেরেন্ডার কষ লাগিয়ে ছেড়ে দিতাম। ফড়িংগুলো গোত্তা খেয়ে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যেত। নিস্তেজ ফড়িংয়ের মত বারান্দায় চৌকির উপর শুয়ে আছি। দুর্যোধনের উরু গদা দিয়ে অন্যায়ভাবে ভেঙেছিল ভীম। সেজন্যই তো সে স্বর্গে যাবার রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছিল। ফড়িংগুলোকে কষ্ট দেবার জন্য ভগবানও কি …

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ডিসেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]