ধারবাহিক অনুবাদ গল্প সংকলন (৬ষ্ঠ পর্ব)

অঙ্গারেওয়ালি রসিদ জাহান
অনুবাদঃ

বিক্রয়
স্মৃতি এক বিষম বস্তু! সবচেয়ে খারাপ সময়ে সে তোমাকে বিপদে ফেলবে। আমি যখনই তার সরণি বেয়ে এগোব, পুরনো কথাবার্তা, মুখ, সেই এক পুরনো স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠবে। আমরা সবাই এই পথে গিয়েছি। প্রকাশের গাড়ি প্রকাশের মতই। তুমি তাকে বিদ্রুপ করতে পার, তুমি তার পা ধরে টান মারতে পার, কিন্তু সে তার জন্য নির্দিষ্ট সীমার বাইরে পা ফেলবে না। হয়তো সে একদা কারো প্রেমে পড়েছিল। তাকে দেখে এক টিন পোড়ানি বলে মনে হয়। কিন্তু, এতে আমার কী এসে যায়? সে আমার কাছে জীবন্ত ফিরে আসবে না, না আমি জীবনের প্রতি তার গোপন আগুনে হাওয়া দেব। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে, অনেক সময় সে আমাকে পাগল করে তোলে! আর আমি তার কাছে যেতে চাই। আমি তার ত্বকের নিচে যেতে চাই এবং নিজের চক্ষে দেখতে চাই সেখানে বরফ আর চকমকি ছাড়া অন্য কিছু আছে কি না।
যাহোক…সেই রাতে আমাদের পাঁচ জন মিলিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং গাড়ি করে রওনা হলাম। আমরা যুবক এবং সুখি ছিলাম। আমাদের মধ্যে চারজন মহিলা আর প্রকাশ। মজা আর হাসি সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে কিছু একটার অভাব ছিল। সেই সুন্দর, অন্ধকার এবং নক্ষত্রখচিত রাতে—যেমন রাত মানুষকে বন্য করে দেয়—আমাদের প্রত্যেকে আমাদের আসল আত্মাকে অনেক দূরে পাঠিয়েছিলাম, অনেক দূরে। আমার ভুল হতে পারে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে আমার আত্মা সেখানে ছিল না। হয়তো সেই রাতের বাতাস, জল, নীরবতা এবং সৌন্দর্য আমাকে যেভাবে জীবনে নিয়ে এসেছিল সেই ভাবে অন্যদেরও জাগরিত করেছিল।
যখন আমি নদীতীরে পৌঁছলাম, আমরা নদীর ওপরের ক্ষুদ্র ব্রিজের ওপর বসেছিলাম আর গল্প করতে শুরু করলাম। আমি গাড়িতে শুয়ে ছিলাম। আসলে আমার ভাল লাগছিল না। আর এই জায়গা, জলের শব্দ, ব্রিজ–আমার কাছে এদের সবকিছুর অন্য তাৎপর্য ছিল। সেই রাতেও এই অন্ধকার এবং তারাভরা আকাশ আর জলের একই শব্দ ছিল। কিন্তু সেখানে ছিলাম আমরা দুজন—সে আর আমি।
সেই আনন্দময় এবং বিপদ–সংকুল প্রেমের পথে আমরা দুজন ছিলাম, যেখানে সামান্য অন্তরায় মনে হয় পাহাড় বা সমুদ্রের মত অতিক্রম করার এক আনন্দঘন বাধা। হায়! সেই সময় কত সুন্দর, সূক্ষ্ম এবং প্রকৃতির কত কাছে ছিল! একজন অন্যজনের উপর চোখ রাখার মুহূর্তেই সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। দৈহিক সান্নিধ্য বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গের মত অনুভূতির সৃষ্টি করে, তার সঙ্গে এক ক্ষিপ্র উন্মাদনা এবং এক উত্তাপ বয়ে যায় আর এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করে যখন মানুষ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সমস্ত বিস্তৃত পৃথিবীতে সে আর আমি ছাড়া আর কারো অস্তিত্ব থাকে না।
জেলেরা জাল ফেলতে ব্যস্ত। আমি তাদের দিকে দৌড়ে গেলাম এবং তাদের কাজে হাত লাগালাম। এই যুবতী এবং সুন্দরী মহিলা সেই সুন্দর রাতে এক বড় গাড়ি চালিয়ে এলে জেলেদের মনে এক ধারণার জন্ম দেবেই।
তারা কাজ ভুলে গেল এবং ওদের জাল নিয়ে আমাকে খেলতে দিল।
সেও গাড়ি থেকে নেমে এল এবং নদীতীরে এল।
অভিযোগের সুরে সে জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কেন এখানে নেমে এসেছ?”
আমি রঙ্গ করে বললাম, “কেন আসব না? উপরে বসে থেকে কী করার ছিল?” সেখানে দাঁড়িয়ে, সকলের সামনে, সে আমাকে তার বাহুতে তুলে নিল এবং আমাকে চুম্বন করতে থাকল।
“আমি তো ওখানে আছি… কে আর থাকবে? চল, আমরা ফিরে উপরে যাই। কেন এখানে সময় অপচয় করছ?”
“ঈশ্বরের দোহাই, আমাকে ছেড়ে দাও”, আমি ওর কোল থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে ক্রুদ্ধ স্বরে বললাম।
ওর চোখগুলি, সেই মুখ, আরও এগিয়ে আসতে থাকল। ঊষ্ণ, দ্রুত প্রশ্বাস আমার মুখে জ্বালা ধরাচ্ছে। আমি মুখ সরিয়ে নিলাম। ওর চোখে আমার চোখ নিবদ্ধ। ওর কাছে আমার প্রতিবাদী দেহ নিস্তেজ হয়ে গেল।
“আমার সঙ্গে থাকতে তুমি কি বিব্রত বোধ করছ? আমি পৃথিবীকে তোয়াক্কা করি না; ওরা সবাই আমাদের দেখুক। আমি তোমাকে জগতের এই প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যাবো।” ধীরে ধীরে সে আমাকে নামিয়ে দিল।
আমি কি বিব্রত ছিলাম? আমার কাছেও এইসব ব্যাপার কিছু নয়। জেলেদের কথা ভুলে যান, যদি সমস্ত জগত আমাদের দেখার জন্য সেখানে উপস্থিত হত, আমি প্রেমের জন্য গর্বিত হতাম, লজ্জিত নয়।
আবার, সেই রাতে, আমার চোখের সামনে আবেগ এবং প্রেমের সেই বাঁকান মুখ জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু সেই সময় মহিলা আমি ছিলাম না। জীবনের মত প্রেমেও আন্দোলন আছে। প্রেম কোন মৃত কিছু নয় যে এক জায়গায় তাকে কবর দিতে হবে। তার নৃত্যের তালে সে যদি জায়গা বদল করে, তাহলে তা আরও প্রবল, আরও তীব্র এবং আগের চেয়ে বেশি সুন্দর হয়। হ্যাঁ, সে তার জায়গায় স্মৃতি রেখে যায়, সময়ের অতিবাহনের সঙ্গে সঙ্গে অস্থিরতা এবং বেদনার সৃষ্টি করে। কিন্তু এসব ছাড়া জীবন বলে কিছু আছে কি?
সেই রাতে আমি আমার নিজের সত্ত্বা থেকে আমি অনেক দূরে ছিলাম। আমি মনে মনে ছবি আঁকছিলাম, আর আমার সামনে কোন মোটরগাড়ি এসে দাঁড়ালে তাদের মুছে ফেলছিলাম। প্রথমে আমি ভীত ছিলাম। আমি একা ছিলাম এবং জানতাম না সেই গাড়িতে কে আছে। কিন্তু এক মহিলাকে দেখে আমি আশ্বস্ত হলাম। আমি নিচু হয়ে দৃশ্যমানতার বাইরে চলে গেলাম। আমাদের গাড়ি এমন ভাবে দাঁড় করানো ছিল যে আমি ওদের দেখতে পাচ্ছিলাম কিন্তু ওরা আমাকে দেখতে পাচ্ছিল না। দুই গাড়ির আলোর মাঝে আমার পরিচিত একজন পুরুষ আর তার সঙ্গে তার স্ত্রী এবং ছোট সন্তানেরা। সে অবিন্যস্ত, মদ্যপ এবং যে কোন রকমের সভ্যতা শিষ্টতার বাইরে চলে গিয়েছিল। উপুড় করা এক হাত সে উন্মত্তভাবে নাড়াচ্ছিল এবং অন্য হাত দিয়ে বাধ্য হয়ে নিজের মুখ ঢাকছিল।
কর্কশ স্বরে সে বলল, “একজন আলো নেভান! কী হচ্ছে এটা?”
গাড়িগুলির দরজা খুলে গেল। তিনজন বরখা-পরিহিত মহিলা নেমে এল।
‘প্রিয়া, এখানে বরখা তুলে দাও। এখানে তোমাকে কে দেখছে?” তাদের পাঁচ ছয়জনের দলের একজন বলল।
কিছুক্ষণ পরে তাদের কর্কশ কথা আমার কানে পৌছল, “কী সুন্দর, আমাকে একবার চুমু খাবে?”
বরখা-পরিহিত মহিলাদের একজন বলল, “কেন নয়? তুমি নিলেই আমি দেব!” বক্তার স্বর সম্পূর্ণ মৃত এবং অসংবেদনশীল শোনাল।
ওদের মধ্যে তিনজন মহিলা এবং পাঁচ–ছয়জন পুরুষ ছিল। নিশ্চিতভাবে, কোন একজনকে অপেক্ষা করতে হবে। পুরুষদের মধ্যে দুজন সম্ভবত অন্যদের চেয়ে অধিক ধনী এবং গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই কারণে দুজন মহিলাকে সামান্যতম আলোড়ন ছাড়া তাদের হাতে তুলে দেওয়া হল। আর সেই দুই জোড়া মানব-মানবী জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
এখন রইল একজন মহিলা এবং তিনজন পুরুষ। তাদের মধ্যে তর্ক শুরু হল, শেষে ঝগড়াতে পরিণত হল কে আগে যাবে আর কে শেষে।
“ইয়ার, আমি আগে যাবো। আমি তোমাদের আগেই বলেছি।”
“মাশা আল্লা, কখনও না। কেন তুমি আগে যাবে? তুমি সব উপভোগ করবে আর আমার উদ্দীপনা মিইয়ে যাবে?”
অন্য জন ক্রুদ্ধ ভাবে বলল, “চার নম্বর মহিলা কেন বেরিয়ে আসছে না?”
“ঠিক আছে, লটারি হোক”। এইবার পুরুষটির স্বরে ক্রোধ এবং উদ্বেগ দেখা গেল।
“কত আর অপেক্ষা করব, তাড়াতাড়ি কর?”
অন্ধকারে তিনজন পুরুষ সমানে চাপানউতোর করে চলল। একজন মহিলা এবং তিনজন পুরুষ। এবং তিনজনের সবাই এতই একগুয়ে এবং অতিমাত্রায় উত্তেজিত ছিল যে কোন সিদ্ধান্তে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই তিনজনের স্বরে রণিত হচ্ছে লালসা, তাদের দেহ অনিয়ন্ত্রিতভাবে মোচড় খাচ্ছে।
মহিলা নিশ্চুপ। বাজারে যখন তিন বা চারটি মদ্দা কুকুর একটি কুকুরিকে এই রকম আবেগ এবং অস্থিরতা নিয়ে তাড়া করে, তখন কুকুরিও মুখ লুকিয়ে রাখে এবং এতজন ক্ষিপ্র খদ্দেরের কাছ থেকে পালিয়ে যায়। কিন্তু মহিলা যেন বাজারের মধ্যে তাড়া খাওয়া কুকুরির থেকেও খারাপ অবস্থায় পরিণত হয়েছে। তার সামনে একদল ধনী পুরুষ এবং তাদের স্ত্রী। দরজা খোলা মোটরগাড়ির দরজার সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে।
মেয়েটিকেই জিজ্ঞেস করা হল, “এই মেয়ে তুমিই বল। আমাদের মধ্যে কে আগে তোমার সঙ্গে যাবে?”
মেয়েটি উচ্চস্বরে হেসে উঠল, “আরে, যে কোন একজন এসে পড়। তোমাদের সবাই তো আমার কাছে সমান।”এই কথা বলে মহিলাটি ব্রিজের দিকে দৌড়ে গেল আর একজন পুরুষ তার পিছু নিল।
কয়েক মিনিট পরে টর্চের জোরাল আলো জ্বলে উঠল। আমার বন্ধুরা নদীর দিকে নামতে যাচ্ছে। সেই কয়েক সেকেন্ড প্রবল আলোয় দুইটি নগ্ন দেহ দেখা গেল। অন্ধকারের বুক চিড়ে যখন চারিদিকে টর্চের আলো জ্বলে উঠল, পরিচিত হবার ভয়ে নগ্ন পুরুষটি মহিলার বরখার নিচে লুকনোর চেষ্টা করল।
নিশ্চিতভাবে পাপ করা কোন পাপ নয়। কিন্তু ধরা পড়াই পাপ।
হঠাৎ, মহিলার মৃত হাসির আওয়াজ অন্ধকারের বুকে ঢেউ খেলে গেল। সে কুকুরদের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
আমি নদীতীরের সেই স্থানে আর কোনদিন যাইনি।

