
ঘড়ির কাঁটা
ঘুমটা ভাঙতেই ঘড়ির দিকে চোখ চলে গেল তিথির। ক’টা বাজে? যাঃ! সাড়ে সাতটা বেজে গেল? কই অ্যালার্মটা বাজল না তো! মোবাইল ফোনটা হাতে নেয় তিথি। ওহো! আজ তো শণিবার, অফিস নেই। গতকাল তাই অ্যালার্মও দেয় নি। বিছানায় পাশের জায়গাটা খালি। তার মানে সুজন বেরিয়ে গেছে হাঁটতে। এ তো জানা কথাই, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, কোন ঋতূরই ক্ষমতা নেই সুজনের মর্নিং ওয়াক আটকাবে। তিথি এবার একটু পাশে গড়িয়ে গিয়ে পাশবালিশটাকে আরও একটু জড়িয়ে, কম্বলটাকে নাক অব্দি টেনে পুরো খাটটা জুড়ে আবার ঘুমিয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, আটটা বাজুক, সুজনও ফিরবে, সাথে সাথে ঢুকবে মালতীও। তারপর মালতী চা টা করলে আজ আরাম করে বিছানায় বসে বেড টি খাবে, তবে খাট থেকে নামবে। আজ শুধু যে অফিস ছুটি তাই নয়, আজ অন্য কোন কাজও নেই তেমন।
কি গো? ন’টা বাজে তো এবার বিছানা ছাড়ো। ওঠ, চা নাও।
সুজনের ডাকে তিথির ঘুম ভাঙে। ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ে,
নটা বাজে! সেকি? মালতী কোথায়? তুমি চা করলে নাকি?
মালতী আসেনি।
আসেনি? সেকি? কাল তো কিছু বলেনি যে আজ আসবে না। তোমাকে বলেছিল নাকি?
না তো।
তার মানে আজ আর সে আসবে না। জানে আমার ছুটি আজ, কোথাও যাবোও না। সেই জন্যেই পরশু অত খবরাখবর নিচ্ছিল, আজ ছুটি কিনা ইত্যাদি। ঠিক সুযোগ বুঝে ডুব দিল। নাও এবার বাসন মাজো, ঘর ঝাঁট দাও।
গজগজ করতে করতে চা টা শেষ করে উঠে পড়ে তিথি।
এ বাড়িতে সবার ছুটি আছে, তোমার, ঠিকে ঝির, রান্নার লোকের, ড্রাইভারের, নেই শুধু আমার ছুটি। সপ্তাহভর অফিস আর সপ্তাহ শেষে সংসার ঠেলো।
আহা! দেখো নিশ্চয়ই কোন সমস্যা হয়েছে। চলো আজ জলখাবার আমার ডিপার্ট্মেন্ট।
থামো তুমি। দরদী দাদা এলেন মালতীর। এই তোমার আশকারাতেই এত কামাইয়ের ধুম তার। দেখো না, কাল এসে আবার এক নতুন গল্প ফাঁদবেন, বানিয়ে বানিয়ে।
বেলা দশটা নাগাদ ফোনটা আসে। উল্টো পারে মালতীর গলা। তিথি চিড়বিড় করে ওঠে গলা পেয়েই।
দিদি,
আসবি না, তাই তো? সে তো আমি আগেই জানি। তা আজ কোন গল্প আবার বলবি শুনি?
মালতীর সুরে বলতে থাকে তিথি,
কার হাত ভাঙল, কাকে নে ডাক্তারের কাছে ছোটতে হবে, বাড়িতে মেয়ে জামাই এসিছে… এর কোনটা?
উল্টো দিক চুপ। কোন উত্তর নেই।
কি হল? সাড়া নেই কেন?
হেঁ হেঁ। খুব রেগে আছো দেখতিসি। হেঁ হেঁ।
হাসছিস তুই!! আমাকে সমস্যায় ফেলে হাসছিস!
কাউকে হাসতে দেখলে বা শুনলে আপনা থেকেই তিথির হাসি পায়। কিন্তু আজ একেবারে পিত্তি জ্বলে গেল।
ও দিদি। আজ না ঘুম থিকে উঠতি পারি নি গো একদম। এখনো কেমন ঘুম লেগি আছে চক্ষে। কাল রাতে যা কান্ড হলো নি গো,
রাখছি ফোন, তোর গাল গপ্পো শোনার সময় নেই আমার এখন, মেলা কাজ পড়ে।
ফোনটা কেটে দেয়, কিন্তু কৌতূহলও হয়। মালতী দুর্দান্ত সব গল্প বানায়। যদিও মালতীর মতে সবটাই সত্যি, কোনটাই বানানো নয়। তবু তিথি বেশ বুঝতে পারে তার মধ্যে কোনটা বানানো আর কোনটা সত্যি। দেখ দেখ করে এ বাড়িতে মালতী আজ দশ বছর ধরে কাজ করছে, সুখে দুঃখে সঙ্গে থেকেছে, এ বাড়ির সঙ্গে আপনাআপনিই একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে মালতীর ।
তুমি শুনতে পেলে?
সুজনকে ডাক দেয় তিথি,
তিনি নাকি আজ ঘুম থেকে উঠতে পারেন নি। নবাব নন্দিনী হয়ে যাচ্ছেন দিন দিন।
আচ্ছা ঠিক আছে, চলো আজ আমরা বরং লাঞ্চে বাইরে কোথাও যাই। অনেকদিন বাইরে খাইনা।
তিথি খুব একটা অমত করল না। বেরিয়ে পড়ল দুজনে বেশ অনেকদিন পরে। ভালো একটা সিনেমা দেখে, বাইরে খাওয়াদাওয়া করে সারাদিনটা মন্দ কাটলো না।, রাতে বাড়ি ফেরার পরে মালতীর ওপর রাগটাও খানিক কমল।
রবিবার সকাল। সাড়ে সাতটার সময় মালতীরানীর প্রবেশ, তিথি তখন আধোঘুমে। একদম চায়ের কাপ নিয়ে এসে তাকে জাগায় মালতী। তিথির মাথা এখন ঠান্ডা। চায়ে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় মালতীর দিকে। এটার জন্যেই অপেক্ষা করছিল এতক্ষন যেন মালতী।
শোন তবে দিদি, কাল কান্ডটা।
বেশ গুছিয়ে বসল মালতী,
পরশু রাত্তিরে তো রোঝকার মত শুতি গেছি। কতক্ষণ ঘুম্যেছি ঝানি না। তারপর যখন ঘুম ভাঙল, ধড়মড় করি উঠি বসি, মনে করি আঝ আর ক্যানিংটা বোধহয় ধরতি পারলাম না। যাঃ! আঝ একটু আগে আগে পৌঁছানো দরকার ছেল। তো তাড়াহুড়ো করি রেডি হইয়ে ছুটতে থাকি, পরের ট্রেনটা মিস করা চলবি নি। অন্ধকার তখনো।
বাধা দেয় তিথি।
তুই কি রোজই অন্ধকার থাকতেই বেরোস না কি? তা হলে ঢুকতে ঢুকতে রোজ আটটা বাজাস কি করে?

না না। আলো ফুটলেই বার হই। কিন্তু কাল তো এট্টু আগি বেরুবো ভাবিছিলাম। শীতকালে তো প্রায়ই অন্ধকার থাকতেই বেরতি হয়। তবে স্টেশনে পৌঁছাতি পৌঁছাতি আলো ফুট্যে যায় রোঝ। কিন্তু আজ ঘর হতি বেইরে দেখি কি কুয়াশা কি কুয়াশা! সামনে এক্কেরে উনুনের ধোঁয়ার মত, দেখি দুহাত দূরের কিছু দেখা যায় না যেন। তা ওরই মধ্যি তো আমি ছুটিছি,
মুখে গাম্ভীর্য্য বজায় রাখলেও, মনে মনে মজা পায় তিথি গল্পের বহরে।
কটা বাজে তখন? আরো লোকজন ছিল তো রাস্তায়?
সেটাই হল গে কতা। পেরায় কুড়ি মিনিটের রাস্তা, কি বলব দিদি, জন মনিষ্যি নেইকো।
তোর ভয় করল না একটু? কুয়াশা মানেই কিন্তু তার মধ্যে ভূত দেখা যায়। তা দেখলি নাকি একটাকেও?
ঠাট্টা করতিসো দিদি, ওই কুয়াশায় কত সময় রেল লাইনে লোক কাটা পড়ে ঝানো?
মালতী মুখ ভার করে। তিথি তাড়াতাড়ি সামাল দেয়,
আচ্ছা আচ্ছা আর ঠাট্টা করব না, বল এবার।
তা হোল কি আমি তো জোরে জোরে ছুটতিছি, এইবার স্টেশন দেখা গেল। তার মধ্যে শুনি যেন গাড়ির খবর হতিছে। একটু যে জিরবো তার আর উপায় রইল না। আরো জোরে ছুটতি লেগেছি আমি তখন। হঠাৎ শুনি চেনা গলার ডাক। তাকিয়ে দেকি,
নিশ্চয় নিশির ডাক ছিল। তাই তো? সে গপ্পোই শোনাবি তো এবার? বলবি পেছন ফিরে দেখি কোথাও কিছু নেই। এইসব তো?
আর না না, নিশির ডাক না গো দিদি, দেখি পাড়ার নিশিকান্ত। স্টেশনের আগে একটা মদের ঠেক আছে, সেখান থেকেই বেরিয়ে আসতেছে নিশিকান্ত। পিছন থিকে ডাকতিসে নাম ধরি। আরে, আমার কি তখন শোনার সময় আছে? যা হোক করি এ ট্রেনটা মিস করা চলবেনি, ওভারবিরিজে উঠতে লেগেছি, তখন ডাক দে বলে কিনা- যাও কোথা এত রাতে?
আমি একেরে থমকে গেছি। বলে কি! মাথা ঠাতা খারাপ না কি? চেঁচিয়ে বলি, অ্যাতো খেয়েছ যে মাথাটা মোটে ঠিক নেই কো? রাত দেখছো? সকাল তো এই হোল বলি। তা সে বলে, দেকো ঘড়ি। রাত সাড়ে বারোটা বাজে আর তুমি একা একা এই শীতের রাতে চলিছ ট্রেন ধরতে।
কি বলবো দিদি। আমি পুরো ওই কি বলো না তুমি… কি যেন কনফিজড
কনফিউসড?
হ্যাঁ হ্যাঁ। কি বলব দিদি, তুমি আমারে বল আমি সত্যি বলি না, বাইনে বাইনে বলি। কিন্তু বিশ্বাস কর, এ কতা একটুও মিথ্যা না, সে আমারে ঘড়ি দেখালো, দেখি সত্যিই রাত সাড়ে বারোটা।
কি বলিস? তুই ঘড়ি দেখতে জানিস? কবে শিখলি?
কি যে বল দিদি। নম্বরগুলো চিনি না, কিন্তু ওই ছোট আর বড় কাঁটা কোথায় দাঁইড়ে আছে দেখি টেইম বলি দিতে পারি। ঘড়ি দেখতি না পারলি হবে? কত টেনসন রোজ থাকে বলো দেখি দিদি। সময়ে ট্রেন ধরতি পারব কি না। নিজেরে নে ওই ভীড় ট্রেন থিকে নাবতি পারব কিনা, সব থিকে বড় হল গে সময়ে পৌঁছাতি পারবো কি না। ঘুমের মধ্যিও দিদি এই টেনসন ওই কাঁটার মত টিক টিক করি থেকি যায় গো।
তারপর?
তারপর আর কি? ওই নিশিকান্তই পৌছে দিল বাড়ি আবার। তুমি বল দেকি দিদি, এমন কান্ড করি ফেলি কি আর ঘুম আসে? তা ভোরের দিকে চোখ লাগি গেল।
মালতী অপেক্ষা করে এর পরে তিথির ধমকের। কিন্তু তিথি আর সাড়া দেয় না। কি সাঙ্ঘাতিক কষ্ট করে ভোর না হতেই দলে দলে মালতী, লতিকা, মর্জিনা, আমিনারা দক্ষিন চব্বিশ পরগনার ক্যানিং, গোচারণ, চম্পাহাটি, লক্ষীকান্তপুর, বারুইপুর থেকে ঢোকে দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়া, যাদবপুর, ঢাকুরিয়া, বালিগঞ্জে। স্টেশন থেকে শুরু করে পায়ে হাঁটা, ছড়িয়ে যায় দক্ষিন কলকাতার অলিতে গলিতে বাড়িতে বাড়িতে, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বারো মাস।
তোর বর কি করছিল? সে টের পায়নি?
তার কতা আর বলনি। পাশ থিকে আমারে বাঘে টেনে নে গেলেও সে জাগবে নি। রোঝ তো নেশা করে,
শীতের মাঝরাতে কম্বলের নিশ্চিন্ত ওমে ঘুমিয়ে, ভোরের চা টাও মালতীর হাত থেকে খেয়ে তবে বিছানা ছাড়তে অভ্যস্ত তিথির ভাবতেই ভয় করে, যদি এমন,হত যে সে আজ তিথি না হয়ে হতো মালতী। মালতীর মতই ভুল করে কুয়াশায় ঢাকা কোন এক শীতের গভীর রাতে, ভোরবেলা কাজে বেরোনোর চিন্তায় ঘুম ভেঙে একা ছুটতে ছুটতে চলতো এক নির্জন স্টেশনের দিকে, ট্রেন ধরবে বলে। নিরাপত্তার বলয়ে বাস করা তিথির ভেতরটা কেঁপে ওঠে।
তোর অ্যালার্ম ঘড়ি নেই? আমার ঘরে একটা আছে, নিয়ে যাস আজ।
মালতীর জন্য কি এক মায়ায় মন ভিজে যায় তিথির।


বাঃ। ভালো গল্প।
মানুষের গল্প।
নমস্কার নেবেন।