বাবার অনিচ্ছা, ছেলের পেছনে দামী মাস্টার দিয়ে লাভ নেই। ওটা গাধা। পড়তে বসলেই জানলার বাইরে চোখ, আর বইয়ের দিকে চোখ মানেই ভেতরে ইন্দ্রজাল কমিক্স। বাবার চোখকে ফাঁকি দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তখন বাবা অ্যাংরি ইয়ং ম্যান। অমিতাভ বচ্চনের সিনেমা নিয়মিত দেখতেন, আর সেই স্টাইলেই ঘরেও অ্যাকশন চলত। দু-চারটে ঠুসঠাস দ্রুমদ্রাম অ্যাকশন হতো বটে, তবে তা বইয়ের ওপর নয়, আমার ওপর! মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকলে, তারপর তো মা টেক ওভার করতেনই। ছেলের হয়ে বড় মুখ করে, স্বামীকে আঙুল তুলে বেশ কটা কড়া ভাষায় নিজের ফিল্ডে বল আনতেন। সময় সুযোগ পেলে উনুনের চিমটে, বা হাতপাখার ডান্ডা দিয়েও ‘মার বাসন্তী’ হয়ে ওঠার সুযোগ ছাড়তেন না। যে দুজন গৃহশিক্ষক ছিল, তারা টিউশনটায় ‘সাইড বিজনেস অফ আ স্লিপিং পার্টনার’-এর মতো নিযুক্ত ছিলেন। মায়ের লড়াকু মনোভাবেই এরপর এলেন একজন…

এই মানুষটি এক বাংলা মিডিয়াম স্কুলের লাইব্রেরিয়ান। গোলাকার মুখ, সামান্য পাতলা গোঁফ, খাটো গড়ন, শান্ত যেন প্রশান্ত মহাসাগর। স্কুল ছুটির পর ঠিক বিকেল পাঁচটায় তাঁর আসার সময়। বা রে! তখন তো আমার খেলার সময়। হিন্দু মিলন মন্দিরে, ব্রতচারী করানো হচ্ছে, লাঠি খেলা শেখানো হচ্ছে, যোগাসন অনুশীলন চলছে। সে হোক! আমি তখন ছন্নছাড়া পাগল পারা। খেলছি।

হঠাৎ বিশাল লোহার গেটের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল একটি মুখ। শরীর সেঁটে দাঁড়িয়ে। চোখ স্থির, আমার দিক। কি অস্বস্তি! আমার খেলার সময়টাই উনি কেড়ে নিতে এসেছেন! দু’দিন জ্বর বাঁধিয়ে পড়ে থাকতে পারতেন না কেন? কিংবা রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে পা ভাঙতে পারতেন না! আমার প্রাইম টাইমে তোমায় হাজির হতে হবে? শরীর খারাপ নিয়ে দুদিন কামাই করতে পারো না? রাস্তায় গুঁতো খেতে বা গড়িয়ে যেতে পারলেন না!

মানুষটা বড্ড একগুঁয়ে। পারসেভেরেন্স। একটাও মুখে ডাক নয়, হাত তুলে ডাকাও নয়। পাঁচ, দশ, পনেরো মিনিট। আমি না বেরোলে তিনি এক চুল নড়বেন না। অগত্যা আমাকে বেরোতেই হয়। নাহলে মা, বাবার রূপ ধরেন। চূড়ান্ত বিরক্তি নিয়ে অন্য গলিপথ ধরে বাড়ি পৌঁছে, বই সাজিয়ে বসি। পাশে এসে বসে উনি। কখনও নালিশ নয়, রেগে ওঠা নয়, সামান্য বকা ঝকাও খুব বিরল ঘটনা। তবে মায়ের দেওয়া চা, চুমুক দিয়ে সশব্দে খেতেন। বিস্কুটেই এত তৃপ্ত হতে কাউকে দেখিনি। আর ভালো টিফিন থাকলে তো মৌজ করে চোখ বন্ধ করে খেতেন। তিনি মাকে বলেছিলেন, “ও চেষ্টা করলে পারবে। স্কুলের ভালো দুচারজন স্যারের কাছে দিন। দু মাস পরেই আমি আর আসবো না। ট্রান্সফার নিয়েছি।”

আমার প্রথম ভালো স্যার। এরপর বিকেল পাঁচটায় অনেক বছর তাঁর মুখটা মন্দিরের গেটে খুঁজেছি। আজও পাইনি।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]