মোবাইলের স্ক্রিন জুড়ে বিজ্ঞাপন। সিল্কের মতো এক মাথা চুল, কোমর ছাপানো। মেয়েটি তার মাথাটিকে ক্লক- ওয়াইজ, অ্যান্টি ক্লক-ওয়াইজ করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায় তার অপরূপ কেশরাশি। তারপর হাসিমুখে সামনে একটা বাক্স তুলে ধরে, বাক্স থেকে বেরিয়ে আসে সুন্দর চটের এক ছোট্ট থলি, যাকে কিনা বলে পাউচ। একে একে সেই থলে থেকে বেড়াল বার করার বদলে বার করে আনে চার রকম মাপের, ভিন্ন ভিন্ন গড়নের ছোট ছোট বোতল। মেয়েটি তার একটি বোতল হাতে নেয়, যত্ন করে তালুতে ঢালে জলীয় এক পদার্থ, তারপর চাঁপাকলির মত আঙুলের ডগা দিয়ে তা ঘষে ঘষে মাথায় মাখে।
মুগ্ধ হয়ে দেখে তৃষা। মেয়েটির মুখশ্রীতে মুগ্ধ হবে, নাকি তার মাথায় ওই জলীয় পদার্থটি মাখার স্টাইলে মুগ্ধ হবে নাকি তার সুন্দর ম্যানিকিওর করা চাঁপাকলির মত আঙুল দেখে মুগ্ধ হবে ভেবে পায় না। নিজের হাতের দিকে তাকায় সে। বাবাগো!! নিজেই শিউরে ওঠে নখগুলো দেখে। মাথা মুড়িয়ে ন্যাড়া করার মত কতে নখগুলো মুড়িয়ে কাটা। আচ্ছা মেয়েটার নখ গুলো ওর নিজেরই তো! এখন তো এখানেও নকল নখের পার্লারের ছড়াছড়ি। বহু কাল আগের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল তৃষার। সে বছর পূজোর আগে বড়মামা বিদেশ থেকে ফিরল, সঙ্গে তার বিচিত্র বিচিত্র সাজগোজের জিনিস, সবুজ রঙের লিপস্টিক যা ঠোঁটে ঘষলে হয়ে যাবে লাল, কালো রঙের আই শ্যাডো যার থেকে সোনালী আভা বেরোচ্ছে, আরো নানা কিছু। বড়মামা তার হাতে দেয় একটা প্যাকেট। তৃষা অবাক হয়ে দেখে সেই ছোট্ট প্যাকেটের মধ্যে সাদা সাদা লম্বা লম্বা নখ, প্লাস্টিকের। নিজে কোনকালেই লম্বা নখ রাখার পক্ষপাতী না, তার মূল কারণ, যত্ন করতে আলসেমী। কিন্তু তখন তো সামনেই পূজো, এগুলো পরে বন্ধুদের একেবারে অবাক করে দেওয়ার লোভ সে সামলাতে পারল না। সেই নখ আঙ্গুলের আসল নখের ওপর পরে নিয়ে চলল তৃষা ঠাকুর দেখতে।

সেই সময়টাতে বন্ধু চন্দ্রিলের প্রতি তার সদ্য একটু মৃদু প্রেম ভাব দেখা দিয়েছে। চন্দ্রিল নানা ছলে একটু হাতটা ধরলে, মনের মধ্যে বেশ বুড়বুড়ি কাটছে, মনে হচ্ছে আরও কিছুক্ষণ থাকুক না হাতটা ধরে। কিন্তু সেই চন্দ্রিলই যখন ঠাকুর দেখার ভীড় থেকে তৃষাকে উদ্ধার করার ছলে এক হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে নিয়ে অন্য হাতটা খপ করে ধরল, তৃষার “ওরে ছেড়ে দে ছেড়ে দে “ আর্তনাদে আশপাশের বেশ কয়েকজন মারমুখী হয়ে এগিয়ে এল, ” কি হয়েছে দিদি, এ ছেলেটি কি আপনাকে ডিসটার্ব করছে? এই ছেলে…”
তৃষা তাড়াতাড়ি উদ্ধার করে, চন্দ্রিলকে। চন্দ্রিল তো হাঁ।
“তোর হল টা কি?? ওই রকম ষাঁড়ের মত চেঁচালি কেন!!”
“নখের আঠা খুলে গেছে তোর হাতের চাপে। শিগগির একটা ডেন্ডরাইট জোগাড় কর, এক্ষুণি।”
নখ আর আঠার চক্করেই প্রেমটা হতে হতেও হল না তখন। তৃষা শুনেছে চন্দ্রিল পরে যার সাথে ঘুরে বেড়াত, তাকে নাকি প্রথম দিনেই জিজ্ঞেস করেছিল যে তার হাতের নখগুলো আসল কি না।
পুরনো কথা ভাবতে ভাবতেই দেখে ইতিমধ্যে আরও একটা বোতল থেকে সাদা সাদা কিছু ঢালল মেয়েটি।
ও, বুঝলাম এটা হল শ্যাম্পু,
তৃষা নিশ্চিন্ত হয়, এ আর দেখানোরই বা কি আছে, আর আমার দেখারই বা কি আছে! কিন্তু আশ্চর্য হয়ে সে দেখে যে শ্যাম্পু করাটাকেও মেয়েটা একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেল! অনেকদিন আগে দেখা অপর্ণা সেনের ‘পরমা’ সিনেমাতে রাখীর মাছ খাওয়ার দৃশ্য মনে পড়ল। অমন স্টাইলের সাথে কাঁটা বার করে যে মাছ খাওয়া যায়, জানাই ছিল না। এর শ্যামপু করাটাও ঠিক তেমন, বিভিন্ন কোণ থেকে নেওয়া সাবানের ফেনা ভরা মাথা সমেত মুখের ছবি, আর সে মুখের যা ভাব, দু’ চোখ বোজা, আয়েসে, ঠোঁটের হাসিতে মৃদু আহবান যেন।
শ্যাম্পু চোখে গেলে চোখ জ্বলার ভয় আজকাল আর নেই, ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে তৃষার। তার এক মাথা ঝাঁকড়া চুলে শ্যাম্পু হত সপ্তাহে একদিন, রবিবার করে। প্রতি রবিবার বাড়িতে সে এক তুলকালাম কান্ড। চোখ টিপে বন্ধ করে থাকলেও কোন ফাঁক দিয়ে শ্যাম্পু জল ঠিক ঢুকে যেত চোখে, আর তারপর চলতো মায়ের সাথে তার খন্ড যুদ্ধ। চুলের মুঠি তখন মায়ের হাতে, পড়ত পিঠে দুই ঘা গুম গুম করে। শ্যাম্পুজল, চোখের জল, ‘বাবা গো, জেঠু গো বাঁচাওও গো’ ইত্যাদি করেও মায়ের হাত থেকে নিস্তার ছিল না। অথচ চুলও সে কাটবে না। কিছুতেই।
লম্বা চুলের কত শখ ছিল সেই বয়সে, ভাবতে গিয়ে উদাস হয়ে পড়ে তৃষা। মেয়েটি কেমন সুন্দর করে শাওয়ার জলে, শ্যাম্পু করা চুল ধুয়ে ফেলছে, যেন টুকরো টুকরো বরফ ঝর্ণার জলের সাথে নেমে চলেছে উপত্যকার দিকে। তৃষা বিজ্ঞাপনটা থেকে বেরোতে পারে না, মুগ্ধ হয়ে দেখতেই থাকে।
ততক্ষনে আরো একটা পর্ব, ঘন ক্রীমের মতো কন্ডিশনার লাগানো, ধুয়ে ফেলা শেষ। হাতে আবারো কিছু ঢেলে পুরো চুলটাতে মাখিয়ে পেছন ফিরে মেয়েটি মেলে ধরল টানটান চুলের লম্বা গোছা। মাথা দোলালো একটু, চকচক করে উঠলো চুল। ঘাড় ঘুরিয়ে মিষ্টি হাসলো মেয়েটা, হাতে বিজ্ঞাপনের সেই বাক্স।
তৃষার হাতটা আপনা থেকেই নিজের মাথায় চলে গেল। আর কি চুল উঠবে তার? থার্ড কেমোর পর সব চুল পড়ে যাচ্ছে দেখে সম্পূর্ন ন্যাড়া হয়ে এসেছে সে। চোখের কোনা ভিজে ওঠে।


বিজ্ঞাপন শেষ হয়ে গেছে। সুদোকুর পাতাটা আবার এসে গেছে ফোনে। চোখ মুছে খেলায় মন দেয় তৃষা।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]


    4.5 2 ভোট
    Article Rating
    1 Comment
    Oldest
    Newest Most Voted
    পংক্তির ভেতর মন্তব্য
    সব মন্তব্য
    Sima
    Sima
    3 months ago

    খুব সুন্দর লেখাটা তানিয়া।মজা ছিল আর বিষাদে শেষ টা।সুন্দর বর্ণনায় একটা ফ্লো রয়েছে। দারুন …