১. প্রশ্নটা কেন অস্বস্তিকর

প্রশ্নটা শুনতে খুবই সাধারণ—বই না পড়েও কি পাঠক হওয়া যায়?কিন্তু এই প্রশ্নটা আমাদের ভেতরের একটা নৈতিক কাঠামো কে নাড়িয়ে দেয়।কারণ আমরা পাঠক শব্দটার মধ্যে একটা অদৃশ্য শুদ্ধতার সার্টিফিকেট জুড়ে দিয়েছি। পাঠক মানে যে বই কেনে, বই পড়ে, বই শেষ করে, তারপর আরেক টা বই শুরু করে। এই সরল ধারাবাহিকতার বাইরে গেলেই সন্দেহ—তুমি তবে কে? বইমেলা এই সন্দেহের মধ্যে দাঁড়িয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে।কারণ বইমেলায় ঢুকে দেখা যায়—অনেক মানুষ বই পড়ছে না, কিন্তু বইয়ের ভেতরে আছে। কেউ পাতা উল্টাচ্ছে,কেউ সূচিপত্র দেখছে, কেউ বা প্রথম অনুচ্ছেদ পড়ে থেমে যাচ্ছে, আবার রেখে দিচ্ছে। আমার মনে প্রশ্ন জাগে এই মানুষগুলো কি পাঠক নয়?

২. পাঠক কে যে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ে ?

পাঠক শব্দ টা কে আমরা খুব যান্ত্রিকভাবে সংজ্ঞায়িত করেছি।কত পাতা পড়লাম, কত বই শেষ করলাম—এই সংখ্যাগুলো দিয়েই আমরা পাঠকত্ব মাপি। কিন্তু পাঠ বা পড়া কি সত্যিই সংখ্যার ব্যাপার?অনেক বই আছে, যেগুলো শেষ না করেও আমাদের ভেতরে থেকে যায়।আবার অনেক বই আছে, যেগুলো শেষ করেও আমাদের কিছুই দেয় না।তাহলে পাঠ করার আসল জায়গাটা কোথায়?বইমেলা এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—পাঠ শুরু হয় বই খোলার আগেই।কভার দেখা, শিরোনাম পড়া, লেখকের নামের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নেওয়া—এই সবই পাঠের অংশ।বই না পড়েও পাঠ শুরু হতে পারে। এই কথাটা মানতে আমাদের একটু সাহস লাগে।

৩. বেঞ্জামিন ও অভিজ্ঞতার প্রশ্ন

ওয়াল্টার বেঞ্জামিন সরাসরি “পাঠক” নিয়ে কোনো নৈতিক সংজ্ঞা দেননি।কিন্তু তিনি বারবার বলেছেন—আধুনিক যুগে মানুষের সঙ্গে শিল্প, লেখা, বস্তুর সম্পর্ক বদলে গেছে।The Work of Art in the Age of Mechanical Reproduction প্রবন্ধে তিনি দেখিয়েছিলেন, যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগে শিল্পের “aura”—তার একক উপস্থিতি—ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।এই কথা বইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।আজ বই শুধু বই নয়—এটা ছবি, পোস্ট, উদ্ধৃতি, রিল, আলোচনা।এই ভাঙা ভাঙা অভিজ্ঞতার মধ্যেই পাঠ তৈরি হয়।সম্পূর্ণতা আর শর্ত নয়। বেঞ্জামিন আরেক জায়গায় “ফ্ল্যানিউর”-এর কথা বলেন—যে মানুষ শহরের ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়, উদ্দেশ্যহীনভাবে, কিন্তু গভীর মনোযোগে।সে দেখে, শোনে, থামে।সে সবকিছু ভোগ করে না, কিন্তু সবকিছুর ভেতরে থাকে।বইমেলার পাঠক অনেকটা এই ফ্ল্যানিউরের মতো।

৪. বইমেলা: বই পড়ার পরীক্ষাগার

বইমেলা কোনো শপিং মল নয়।এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে বই কেনা না-কেনাও গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।বেকার ছেলে-মেয়েরা ঘুরে ঘুরে বই দেখে।ছাড়ের পার্সেন্টেজ হিসেব করে, আবার ভাবে—এটাও যথেষ্ট নয়।কেউ কিনতে পারে না, কেউ কিনতে চায় না, কেউ কিনবে বলে রেখে দেয়।এই ঘোরাঘুরিটাই বই পড়ার সামাজিক রূপ।বই এখানে বাজারের বস্তু হলেও, বই পড়া পুরোপুরি বাজারের অধীন নয়।বই না কিনে বেরিয়ে আসার মধ্যেও একটা নৈতিক সিদ্ধান্ত থাকে—আমি এখনো প্রস্তুত নই। আমার টাকা নেইআমি তাড়া হুড়ো করে গ্রহণ করতে চাই না।

৫. যে বইগুলো কেনা হয়, পড়া হয় না

যে বইগুলো আমরা কিনে পড়ি না—তারা কোথায় থাকে?তারা বুকশেলফে থাকে না শুধু।তারা আমাদের সময়ের ভেতরে থাকে।ভবিষ্যতের কোনো প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করে।এই বইগুলো ব্যর্থ বই নয়।এরা সম্ভাবনার বই।এরা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সব বই এখনই পড়া হয়ে ওঠেনা পাঠক হওয়া মানে সব সময় পড়া নয়;পাঠক হওয়া মানে কখন পড়তে হবে, সেটা জানাও।

৬. ডিজিটাল যুগ ও নতুন পাঠক তত্ত্ব

ডিজিটাল যুগ আমাদের পাঠক কে টুকরো করেছে।আমরা পুরো বই পড়ি না, কিন্তু ভাব নিয়ে বাঁচি বেশি।একটা উদ্ধৃতি, একটা ধারণা, একটা বিতর্ক—এগুলোই আজ অনেক সময় বই পড়ার কেন্দ্র।এটা কোনো ক্ষয় নয়, এটা একটা রূপান্তর।এখানে পাঠক মানে সে,যে প্রশ্ন তোলে,যে ভাব ধরে রাখে,যে দ্রুত ভোগের যুক্তিতে সব শেষ করে না।বইমেলায় ঢুকে বই না কিনে বেরিয়ে আসার সাহসটাই আজকের দিনে মাস্ট বড় পাঠ।এটা বিশাল চ্যালেঞ্জ বাজারকে, যে আমাদের বলে প্রতিটি আগ্রহের মূল্য দিতে হবে; তাড়াহুড়োকে, যে শেখায় সব কিছু এখনই শেষ করতে হবে; আর নিজের অপরাধবোধকে, যে বারবার মনে করিয়ে দেয় বই না কিনলে বা না পড়লে আমরা বুঝি কম পাঠক, কম বুদ্ধিমান, কম যোগ্য।

৭. শেষ কথা: পাঠ নতুন করে ভাবা দরকার

তাই শেষ পর্যন্ত বইমেলা আমাদের কোনো উত্তর দেয় না, বরং আমাদের কাছ থেকে একটা সাহস দাবি করে।সাহস—নিজেকে পাঠক বলতে, এমন কি তখনও, যখন আমরা কোনো বই শেষ করিনি।কারণ পাঠক হওয়া মানে প্রতিদিন কিছু পড়া নয়,পাঠক হওয়া মানে প্রতিদিন সবকিছু কিনে নেওয়াও নয়।পাঠক হওয়া মানে—বাজারের তাড়না থেকে নিজেকে সরিয়ে আনা তাড়াহুড়োর যুগে থামতে শেখা,আর নিজের ভেতরের সেই কণ্ঠস্বরটাকে চুপ করিয়ে দেওয়া কে বলে—তুমি যথেষ্ট নও।বইমেলায় ঢুকে বই না কিনে বেরিয়ে আসা তাই কোনো ব্যর্থতা নয়।এটা এক ধরনের নীরব ঘোষণা পাঠ যা এখনো বাজারের চেয়ে বড়,আর পাঠক এখানে সংখ্যার চেয়ে গভীর।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]