
ঈশ্বরই ধ্রুবক(পর্ব ১০)
তখনকার দিনে প্রকৃতি আর প্রাচুর্যের মধ্যে বিশেষ একটা তফাত ছিল না। তাই নিজের ওপর ভরসা করে দিন গুজরান হয়তো করা যেত, কিন্তু ততদিনে আমি আর নিয়ানডারথাল বা হোমো ইরেকটাসদের মত মনুষ্যেতর ছিলাম না। আমার মস্তিষ্কে নানাবিধ রূপান্তর নিরন্তর ঘটে চলেছিল – অনেকদিন ধরেই সেখানে স্মৃতি জমাবার বন্দোবস্ত চলছিল, প্রয়োজনে তাকে তাক থেকে ঝেড়ে মুছে পরিবেশন করার আয়োজন হচ্ছিল, ইদানিং সেখানে আবার নতুন করে একটি রসায়নাগার স্থাপনের কাজ শুরু হল যেখানে নিত্যনতুন রাসায়নিক কল্পনার উদ্ভাবন ঘটতে থাকবে। মস্তিষ্কের এইসব নানাবিধ পরিবর্তন আমাকে ধীরে ধীরে আমার একক অস্তিত্বের সংকট সম্পর্কে সচেতন করে তুলছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য একলা বাঁচার অভ্যাস যথোচিত নয়। সেই সীমাহীন দেশ, ক্ষয়হীন কালে আমার সর্বাগ্রে যা প্রয়োজন ছিল, তা হল সাহচর্য। যার সাথে আমার বেঁচে থাকার সংগ্রামকে ভাগ করে নেওয়া যায়, তেমন একজন সঙ্গীর অভাব যখন খুব বেশি করে অনুভূত হচ্ছিল, তখনই দেখা আপনার সাথে… আমার শব্দহীন অনুভবের কম্পাংক আপনার অন্তরে সেদিন যে অনুনাদের সঞ্চার করেছিল, তার রেশ এতকাল ধরে থেকে গেছে বলেই আমাদের একসাথে এতটা পথ হেঁটে আসা…
আমাদের মধ্যে শারীরিক কিছু কিছু পরিবর্তনও আসতে শুরু করেছিল। আমাদের হাতের আর আগের মত আজানুলম্বিত হওয়ার প্রয়োজন রইল না। অত লম্বা হাতকে সুক্ষ্ম কাজে ব্যবহার করা অসুবিধাজনক, তাই তা ক্রমশ ছোট হতে আরম্ভ করেছিল। একদিন লক্ষ্য করলাম, আপনি আপনার ডিন্ডিশ সন্নিভ অঙ্গুলি অর্থাৎ ঢেঁড়শের মত সরুসরু আঙুল দিয়ে ছোটখাটো ডালপালা কী সুচারুভাবে মুঠোয় ধরতে পারছেন! আপনি আমায় শেখালেন – কীভাবে বিভিন্ন মাপের আঙুলগুলি দিয়ে কোনোকিছুকে আঁকড়ে ধরার সময় আঙুলের ডগা বস্তুটিকে বিভিন্ন বেড়ে চেপে ধরতে পারে – ফলে বস্তুটি মুঠো ফস্কে বেরিয়ে যাবার সম্ভাবনা কমে যায়। এভাবে নানান ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে আমাদের দেহের গঠন সবে এক জায়গায় থিতু হতে শুরু করেছিল। কিন্তু আসলে সেই থিতু হওয়া ছিল মানবসভ্যতা নামক এক বিপুল নাট্য আয়োজনের যবনিকা উত্তোলন মাত্র!

নাটক যখন, তখন তার নানান কুশীলব নিশ্চই থাকার কথা। এই নাটকে আমি আপনি যদি রঙ্গমঞ্চের অভিনেতা হই, তাহলে সেই নাট্যরঙ্গের পরিচালক হল – কল্পনা। কল্পনাই মানবসভ্যতা নামক এই নাটকটিকে প্রথম থেকে পরিচালনা করেছে, এবং এখনও করে চলেছে। আমরা কল্পনা করেছি তাই আজ সংখ্যা মুদ্রিত সামান্য কাগজের টুকরো আমাদের জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে দাঁড়িয়েছে, সামান্য কাঁটাতারের সীমানা বিপুলা পৃথিবীকে মানচিত্রের বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, সামান্য একটি বোতাম – বিরোধী রাষ্ট্রের অগণিত নিরীহ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করছে, সামান্য একটি ভুয়োখবর মানুষে-মানুষে অপরিসীম ঘৃণার সঞ্চার করতে পারছে! আর এসব হয়েছে, কারণ মানুষ কল্পনা করতে শিখেছে, আমি আপনি কল্পনা করতে শিখেছি বলে! তাই আজকে অর্থনীতি এবং রাজনীতি দ্বারা পরিচালিত প্রতিটি রাষ্ট্রব্যবস্থা তার সীমানাভুক্ত নাগরিকদের কল্পনা শক্তিকেই আসলে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। কখনো ধর্মের নামে হিংসা বেচে, কখনো দেশপ্রেমের জিগির তুলে, কখনো জাতির পরিত্রাণের ভুল পথ বাতলে, কখনো রুটিরুজির সমস্যা থেকে চোখ ফেরানোর উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, আসলে রাষ্ট্রশক্তি সচেতনভাবে নাগরিকের কল্পজগতে এক বিকল্প পরিস্থিতি নির্মাণের চেষ্টা করে চলেছে… আর আমি আপনি সেই উত্তাল যুগসমুদ্রে নিজেদের ভাঙাচোরা প্রাচীন ডিঙি নৌকাখানা কোনরকমে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি!
অন্যান্য প্রাণীরা তাদের জীবনধারণের জন্য শরীরী বৈশিষ্ট্য ব্যতীত অন্য কোনো বাহ্যিক উপাদানকে বড় একটা ব্যবহার করতে পারতো না। তাদের শারীরিক বিবর্তনের রেখাচিত্র সরাসরি তাদের যাপনচিত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বেঁচে থাকার জন্য যেমনটা দরকার, তেমন ভাবেই তাদের শরীর গড়ে উঠেছিল, কারোর শিকারীর ক্ষীপ্রতার জন্য মাংসপেশী সুগঠিত হল, কারোর দূর থেকে শিকারকে দেখতে পাবার জন্য তীব্র দৃষ্টিশক্তি জন্মালো, কারোর ঠোঁট তীক্ষ্ণ হল তো কারোর বিপদ টের পাবার জন্য ঘ্রাণ বা শ্রবণশক্তি আরো জোরদার হল, কারোর আবার দেহের বর্ণ পরিবেশের সাথে এমনভাবে মিশে গেল, যাতে তাকে সহসা শনাক্ত করা না যায়… সবই হল তাদের বেঁচে থাকার তাগিদ থেকে। আমাদের পূর্বপুরুষদের ক্ষেত্রেও শুরুটা সেভাবেই হয়েছিল; কিন্তু আমার-আপনার পর্যন্ত এসে পরিবর্তনের সে সঞ্চারপথ আর ততটা সরল রইল না…
হাতের ব্যবহার আমাদের ক্রমশঃ বস্তুনির্ভর হতে শেখাল। যেদিন আপনি একটি গাছের ভাঙা ডালকে আপনার বজ্রমুষ্ঠিতে আঁকড়ে ধরলেন, আমি আবিষ্কার করলাম – আপনার হাতের ব্যবহারিক দৈর্ঘ্য এক নিমেষে অনেকটা বেড়ে গেছে। আপনার দেখাদেখি আমিও হাতে একটা ভাঙা ডাল তুলে নিয়ে আনাড়ি নাড়াচাড়া করতে গিয়ে দেখলাম ওই ডালের আঘাতে পাশের গাছ থেকে একটি সুমিষ্ট ফল মাটিতে পড়ে গেল। পড়ে পাওয়া সেই ফল কুড়িয়ে সোল্লাসে আমরা দু’জনেই সেদিন লাফিয়ে উঠেছিলাম। বাকিরা শুনলে হয়তো হাসবে, কিন্তু আমার বিশ্বাস, হয়তো আপনিও একমত হবেন, এরপর থেকেই চাকা ঘুরতে শুরু করে। এর আগে দেহ অসংলগ্ন কোনো প্রাকৃতিক উপাদানকে নিজ দেহের বর্ধিত অংশ হিসাবে ব্যবহার করে খাদ্য সংগ্রহের দুঃসাহস আর কোনো প্রাণী দেখায়নি! তবে একথাও ঠিক, একদিনে হাতে ধরে গাছের ডাল ব্যবহার আমরা আয়ত্ত করতে পারিনি, তার জন্য আমাদের অনেকদিন সময় লেগেছিল। দীর্ঘ অধ্যাবসায়ের মাধ্যমেই হাত এবং চোখের সমন্বয় সাধন (Hand-eye coordination) আমাদের করায়ত্ত হয়।
এর কিছুদিন বাদে, এমনি এক গরমের দুপুর ছিল। তখন আমরা সাভানা ঘাসে ছাওয়া এক বিস্তীর্ণ প্রান্তরে উপস্থিত হয়েছি। আশেপাশে বহুদূর অবধি কোনো গাছ বা গাছের প্রেতচ্ছায়ার চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছিল না। রোদ্দুরের তাপ ঝলসে দিচ্ছিল আমাকে, আপনাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও খিদের জ্বালায় আমাদের দু’জনকে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছিল, কারণ ঘুরে না বেড়ালে খাবার পাবার অন্য কোনো উপায় আমাদের জানা ছিল না। তখনও আমরা খাবারের জন্য পরনির্ভরশীল, হয় অন্য প্রাণীর অভুক্ত শিকার নচেৎ প্রতিবেশী গাছের ফল। ঘুরতে ঘুরতে সেদিন হঠাৎই একটু দূরে চোখে পড়ল কিছু শকুন। সহসা আমার এবং আপনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। আমার আপনার চোখাচোখি হল, কারণ তখনও আমাদের গলা থেকে কিছু বিক্ষিপ্ত শব্দ ছাড়া আর কিছু বেরোয় না। আমাদের আধা-পরিণত মগজ দিয়ে আমরা বেশ বুঝতে পারলুম, নিশ্চই কোনো শিকারের উচ্ছিষ্ট সেখানে পড়ে আছে। কিন্তু সহসাই আমাদের খেয়াল পড়ল, আমাদের একমাত্র সম্বল – গাছের ডাল, যা ততদিনে আমরা একটু-আধটু চালাতে শিখেছি, তা আমাদের আশেপাশে নেই। বিনা অস্ত্রে সেই উচ্ছিষ্ট খাদ্যে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। হঠাৎ আমি অবাক হয়ে দেখলাম, আপনি নিচু হয়ে মাটি থেকে একটি পাথর হাতে তুলে নিলেন এবং নিজের আঙুলের মুঠোয় ধরলেন। এরপর অদ্ভুত কায়দায় হাতটিকে প্রথমে পিছনের দিকে একটু টেনে এনে তারপর সহসা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে হাতের আঙুলগুলো খুলে দিলেন। মুঠো খোলা পেতেই পাথরটা বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে পড়ল। ঘটনার এই আকস্মিকতায় শকুনগুলো চমকে উড়ে গেল, আর আমাদের মিলে গেল সেই উচ্ছিষ্ট খাবারের ওপর একচ্ছত্র অধিকার! এই স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনায় আমরা দু’জনেই হতবাক হয়ে গেলাম এবং পরক্ষণেই এই আবিষ্কার আমাদের নতুন জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত করে দিল। আমরা বুঝতে শিখলাম, এভাবে যদি পাথরকে নিক্ষেপ করা যায়, তাহলে আমাদের নাগাল আমাদের দেহের তুলনায় বহুলাংশে বেড়ে যাবে, যা কিনা গাছের ডাল ব্যবহারের চেয়েও বেশি! এইভাবে উন্নততর প্রকৌশল বা টেকনিক শেখার হাতেখড়ি হল, আমার – আপনার।
পাথর ছুঁড়তে শিখে আমরা এখন সহজেই উচ্ছিষ্ট খাবারের ভোগসত্ত্ব দখল করার কৌশল শিখে ফেলেছি। এর জন্য আমি বা আপনি এখন আর নিজেদের সীমিত শারীরিক গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নই, বরং বস্তুনির্ভর যাপনের পথে আমরা ধীর অথচ নিশ্চিতভাবে ক্রমশঃ এগিয়ে চলেছি। এখন আমার-আপনার কাছে খাবারের সংস্থান অপেক্ষাকৃত সহজ, কিন্তু পরনির্ভরশীলতা আমাদের পিছু ছাড়েনি। অন্য কোনো প্রাণি শিকার করলে তবেই আমরা সাধারণতঃ সেখানে ভাগ বসিয়ে আমিষ খাবার খেতে পারি, নচেৎ ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলেন পরিচয়েৎ’ অর্থাৎ গাছের ফল পেড়ে কিম্বা ছোটখাটো ব্যাঙ-ট্যাঙ ধরে কামড় বসিয়ে নিজেদের ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে হয়! এরকম বেশ চলছিল, হঠাৎ একদিন আপনি আরেক কান্ড করে বসলেন…
সে দিনও আমি আর আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছি খাবারের আশায়। জঙ্গলাকীর্ণ সে পথে হঠাৎ চোখে পড়ল একদল নেকড়ে জাতীয় প্রাণী শিকার নিয়ে টানাটানি করছে। এবারেও আপনি পাথর ছুঁড়লেন ওদের দিকে। কিন্তু এবার একটু অন্যরকম ঘটনা ঘটল। আমরা দু’জনে অবাক চোখে দেখলাম – সেই নেকড়ের দলের মধ্যে একটা নেকড়ে আপনার ছোঁড়া পাথরের ঘায়ে ছটফট করতে করতে মারা গেল। এই অত্যাশ্চর্য ঘটনায় হতচকিত হয়ে গেলাম আমরা দু’জনেই। দৌড়ে মরা নেকড়েটার কাছে গিয়ে আমরা দেখলাম, আপনার ছোঁড়া পাথরটা গেঁথে আছে নেকড়েটার গলার কাছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে টাটকা, উজ্জ্বল, শোনিত ধারা। মনে আছে? – সেই আমাদের প্রথম তাজা উষ্ণ রক্তের স্বাদ পাওয়া! সামান্য একটা পাথরখন্ড ছুঁড়লে যে অমন সুস্বাদের সুযোগ পাওয়া যায়, তা যেন আমাদের সামনে এক নতুন সম্ভাবনাময় জগতের পথ খুলে দিল – আমাদের জায়মান মস্তিষ্কে একরকম আলোড়ন সৃষ্টি করল! এ এমন এক আলোড়ন, যার প্রাবল্য যত দিন গেছে, তত উত্তরোত্তর বেড়েছে। জীবনধারণের স্বাভাবিক চাহিদায় যে ঘটনার সূত্রপাত সেদিন আমার-আপনার হাত ধরে হয়েছিল, তা ছিল একান্তই জৈবিক প্রতিবর্ত ক্রিয়া। তার পিছনে দেহের চাহিদা মেটানো ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে চারপাশে দেখতে দেখতে অবাক লাগে – সেদিনের সেই সামান্য দুর্ঘটনার মধ্যে ভবিষ্যতের এত ভয়ংকর সম্ভাবনার বীজ লুকিয়ে ছিল! আপনার সেদিনের সেই যৎকিঞ্চিত পাথরের টুকরো আজ পরিবর্ধিত, পরিমার্জিত হতে হতে এমন বিপুল আয়ুধ উদ্ভাবনের জাল বিস্তার করেছে, যাতে আমি-আপনি অহরহ শিউড়ে উঠছি। আমাদের প্রতিবেশি মানুষজন, যারা নিজেদের সুসভ্য বলে দিবারাত্র সোচ্চারে দাবি করে, তারাই সেই উন্নত, ভয়ংকর অস্ত্র চর্চিত রণসাজে সজ্জিত হয়ে, নিরন্তর একে অপরের তুলনায় আরো ক্ষমতাশালী প্রমাণের ভয়ংকর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে! সেদিনের সেই স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনার আজকের এই স্বহন্তারক পরিণতি দেখে সত্যিই এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা আমাকে গ্রাস করে…
আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে – আমিই সেদিন নেকড়েটার গলা থেকে পাথরটা বার করেছিলাম। বিশ্বাস করুন, আমার সেদিন মনে হয়েছিল নির্ঘাত সেই পাথরটার মধ্যে এমন অদৃশ্য কিছু আছে, যার জন্য এই অত্যাশ্চর্য কান্ডটি সেদিন ঘটেছিল। অবাক বিস্ময়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই পাথরখন্ডটাকে আমরা দু’জনেই দেখছিলাম। আপনার অনুধাবন ক্ষমতা চিরকালই আমার অপেক্ষা বেশি। তাই আপনি অচিরেই বুঝতে পেরেছিলেন – আসল রহস্য লুকিয়ে ছিল পাথরটির আকৃতিতে, পাথরে ছুঁচালো দিকটিই গেঁথে গিয়েছিল নেকড়েটার গলায়। সেদিন আকারে ইঙ্গিতে আপনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন – খাদ্য সংগ্রহের এক অবিশ্বাস্য, নতুন বন্দোবস্ত – পাথর দিয়ে শিকার! আমাদের কাছে শিকার করার জন্য অন্যান্য মাংশাসী প্রাণিদের মত ধারালো নখ, ছুঁচালো দাঁত কিম্বা জোরালো মাংসপেশি ছিল না, কিন্তু তার বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে আমরা হাতে পেলাম সামান্য একটি প্রস্তরখন্ড। এক লহমায় আমরা বাড়িয়ে নিলাম আমাদের নাগাল, কমিয়ে নিলাম আমাদের শরীরী দক্ষতার ব্যবধান এবং সুকৌশলে ছিনিয়ে নিলাম খাদ্যশৃঙ্খলের সর্বোচ্চ আসন!
খাদ্য বন্দোবস্ত আরো সুনিশ্চিত করতে আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন, শুধু আমাকে দিয়ে হবে না, আরো লোক চাই। গোষ্ঠী তৈরি হল। প্রাকৃতিক প্রাচুর্যের মধ্যে গোষ্ঠিবদ্ধ জীবন আমাদের কৌশলগত সুবিধা দিল। শিকার ধরার জন্য আমরা ছুঁচালো পাথর খুঁজতে আরম্ভ করলাম। কিন্তু যেমন চাইছি, তেমনটা সবসময় পাওয়ার কথা নয়, পেলাম ও না তাই। তখন আপনি নিদান দিলেন – ‘আমরা আর প্রকৃতির উপর নির্ভর করে থাকবো না। আমাদের হাত আছে, সেই হাত দিয়ে আমরা নিজেরাই আমাদের প্রয়োজন মোতাবেক পাথরের হাতিয়ার গড়ে নেবো এবার থেকে…’। না, এতগুলো কথা আপনি মুখে বলেননি, তবে আপনার হাবেভাবে আমাদের বুঝে নিতে অসুবিধে হয়নি! আপনি নিজে হাতে শিখিয়ে দিলেন – কীভাবে পাথরের সাথে পাথর ঠুকে তাকে সূচীমুখ করে তুলতে হয়। সেই সূত্রেই একদিন আপনি, প্রমিথিউসের মত আমাদের জন্য নিয়ে হাজির করলেন আগুন! আমরা সবাই আপনার থেকে শিখে নিলাম আগুন উৎপাদনের গোপন মন্ত্রটি। ইশারায়, আকারে-ইঙ্গিতে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এই প্রকৌশল প্রবাহের স্বতঃস্ফূর্ত ধারাবাহিকতা জন্ম নিল… এবং একইসাথে তা চিরতরে বদলে দিল মানুষের সামাজিক বুনোট…
আপনি বোঝালেন – আমাদের একযোগে খাদ্য সংগ্রহে বেরোলে সুবিধা, নানান দিক থেকে যদি আমরা গেরিলা পদ্ধতিতে শিকার্যকে আক্রমণ শানাতে পারি, ঠিক যেমনটা নেকড়ে, হায়না বা বন্যকুকুরের দল করে, তাহলে খাদ্যের সুনিশ্চিতিকরণ হবে। আমরা তা গ্রহণ করলাম, এবং আমাদের আদিম জীবন মেতে উঠল এক নতুন ক্রীড়ায় – মৃগয়া। খাবারের সুনিশ্চিত বন্দোবস্তের সাথেই সাথেই বাস্তুতন্ত্রে আমাদের আধিপত্য বেড়ে গেল, আমরা অন্যান্য প্রাণীকুলের মাথায় চড়ে বসার দিকে অনিবার্যভাবে এগিয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথেই তাদের প্রত্যেকের ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য খাদ্যের চাহিদা এবং যোগানের মধ্যে অসামঞ্জস্যের যে পরিস্থিতি তৈরি হল, তা আপনাকে ভাবিয়ে তুলল। আপনি বিধান দিলেন – আমাদের ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়া উচিত… ছিন্নমূল জীবনপ্রবাহের সেই শুরু… সেই তখন থেকে আজও আমরা থিতু হতে পারলাম না! সুদিন অন্বেষনের যে বীজমন্ত্র সেদিন আমাদের কর্ণমূলে আপনি উচ্চারণ করেছিলেন, তা আজও আমাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, ক্রমাগত আমাদের আদিম শিকড় থেকে অপসারী করে তুলছে, ঘর থাকা সত্ত্বেও তাই আজও আমরা উদ্বাস্তু! আশা করি, একদিন আমরা ফিরে যেতে পারবো আমাদের সেই ফেলে আসা ঘর।

শুধু ভয় হয়, সেই ঘর খুঁজে পেতে খুব বেশি যেন দেরি না হয়ে যায়…

