
পালক

নদী চলছে নদীর মতন। ঢেউ চলছে ঢেউএর মতন। পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে আম, কাঁঠাল, জাম, বট, অশথ, অশোক, কদম, জারুল, শিরীশ, অর্জুন আরো কত কে? কেউ কারওকে কিছুই বলেনা। রতনবাবুদের মস্ত বাগান। গুনগুন করে ভোমরা ঘুরছে, জলের কাছ দিয়ে ফড়িং, কাদার ওপর সন্ত্রস্ত পায়ে বক, কাদাখোঁচা। কোথাও পানকৌরি। আলো ফুটেছে খানিক আগে। পাখিদের পাড়ায় ব্যস্ততা। পোকা মাকড়দেরও কাজের যেন শেষ নেই। ভোর ভোর গঙ্গাস্নানের অভ্যাস যাদের, তাদেরও দেখা যায়, দেখা যায় প্রাতঃভ্রমণকারী। আরেকজন আছে এদের সঙ্গে, সে বিল্ব। বিলু নামেই পাড়ায় চেনে। গলায় ঝোলানো দূরবীন, কাঁধের ব্যাগে খাতা কলম। সারক্ষণ পাখিদের পিছনে পিছনে। দেখে আর দেখে, মাঝে মাঝে খাতা খুলে কিসব লেখে। নদীর পাড়েই তিন্নিদের বাড়ি। জানালা দিয়ে নজর করে। সামনে পরীক্ষা, তাই ভোর ভোর উঠে পড়তে বসে। বিলুদা চাকরি করে কোথাও একটা। প্রায় প্রতিদিন ভোরবেলা কিম্বা ছুটির দিন বিকেল বেলা নদীর ধারের এই বাগানে আসে। ওই যন্ত্র চোখে লাগিয়ে বসে থাকে আর ঘুরে বেড়ায়। শুনেছে নাকি আরও অন্য জেলায়, অন্য রাজ্যে পাখির খোঁজে যায়।

কখনও জিজ্ঞেস করলে, হেসে বলে “আমার বন্ধুতো ওরা, তাই খবর নি? কি করছে? ঘর সংসার কেমন চলছে?” তিন্নি অতসব বোঝেও না, বলে বসে
“তুমি ওদের সবাই কে চেনো?”
“সবাইকে কি চেনা যায়? চেষ্টা করি। সবাই তো এক জায়গায় থাকেও না। কেউ এখানে শুধু খেতে আসে, বাসা হয়তো ওপাড়ে। কেউ ডিম পাড়তে আসে। কেউ বা বেড়াতে, শীত ফুরোলে চলে যাবে।”
“ও মা পাখিরাও বেড়ায় বুঝি?”
“বেড়াবে না? শুধু মানুষরাই কি বেড়ায়?”
“তা বেশ। তুমি সারাদিন এইসব করে বেড়াও, তোমায় বাড়িতে বকে না?”
“সারাদিন করতে পারলে তো বেশ হত। পারি কোথায়? এই তো আপিস যেতে হবে। ফিরতে ফিরতে রাত। তখন এদেরকে কোথায় পাবো? তবে রাতের পাখিদের পাওয়া যায়। কত রকম পেঁচা আছে। সেদিন কোথা থেকে একটা বুবো বেঙ্গলানেসিস এসে বসেছিল। তিব্র তার ডাক। অন্ধকারে শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়, মাথায় শিংএর মত পালক।”
বিল্ব এইসব বলতে বলতে হারিয়ে যায়। তিন্নি বোঝে বিলুদার চোখ অন্যদিকে, আকাশের মেঘের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া কোন চিল বা গোঁৎ খেয়ে ঘুরে বেড়ানো বাজ অথবা শকুন। অনায়াসে বলে দিতে পারে কোনটা কে? পরীক্ষার পর সকালটাতে বিলুদাকে আবার ধরতে হবে। নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেছে। জানালা থেকে নিজের পড়ার বইয়ে নজর ফেরায়।
আপিসে বিলুকে নিয়ে অনেকে হাসে। “কি হে বিল্ব? তোমার কোকিলেরা কাকের বাসায় ডিম পাড়ল?” প্রথম প্রথম বিল্ব মশকরা বুঝতনা। খুব আগ্রহ নিয়ে বলতে যেত ওর অভিজ্ঞতা। “জানেন কি কোকিল ছাড়া আরও অনেক পাখি আছে যারা অন্যের বাসায় ডিম পেড়ে আসে?” শুনে সহকর্মীর দল হাসে, কেউ আবার টিপ্পনী কাটে, “মানুষই সুযোগ পেলে অন্যের ফাঁকা উনোনে হাঁড়ি চড়িয়ে দেয়, পাখিদের আর কি দোষ?” সকলে হো হো হেসে ওঠে, বিল্ব সেখানে যোগ দেয়না। ওর মন পড়ে থাকে নীল আকাশের তুলোট মেঘেদের গায়, যেখানে ডানায় ডানায় পালকের ওম ছুঁয়ে যায় রোদ।
সেদিন রতনবাবুদের বাগানে একটা লম্বা ঝুলের পাখি দেখে বিলুর চোখ ঝলসে গেছিল। সাদা ঝকঝকে লম্বা লেজ নিয়ে পাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দুয়েকটা পোকা ধরে, একই ভঙ্গিমায় লেজের ঝালর নিয়ে পাতার আড়াল হয়ে যায়। লেজ সমেত প্রায় ফুট দুয়েক লম্বা, লেজের ঝালরটাই বারো ইঞ্চি, মাথায় ঝুঁটি। এ পাখির কথা পড়েছে বুলবুলির জ্ঞাতি, নাম দুধরাজ। রাজার মতোই জমকালো তার রূপ। এই অঞ্চলে কখনও দেখেনি। চটপট খাতা খুলে লিখে নেয় অভিজ্ঞতার কথা। গাছের গায়ে হেলান দিয়ে লিখছে, সেখানে পাড়াতুতো দাদা শুকদেব এসে হাজির, “একটা কথা ছিল।“ বিলু অবাক হয়ে তাকায়, পাড়ায় লোকজনের সাথে তেমন মেলামেশার সুযোগ হয়না। শুকদেব হঠাৎ কি মনে করে, কে জানে? ওর এই ভালোবাসাকে তো সবাই ভালো চোখে নেয় না। তাই একটু তফাতে থাকতেই পছন্দ করে। আমতা স্বরে বলে, “বলুন কি বলবেন?”
“তরুন শর্মার নাম শুনেছো?”
“কোন তরুন শর্মা? ফোটোগ্রাফার?”
“বাঃ তুমি তো বেশ খবরাখবর রাখ দেখছি।”
“নামী লোক, ওয়াইল্ড লাইফ নিয়ে কাজ করেন। সবাই চেনে।”
“সবাই চেনে কিনা জানি না, আমি তো চিনতাম না। গেল হপ্তায় আমাদের আপিসের প্রোগ্রামে নিয়ে এসেছিল। সেখানেই জানলাম। ছবির স্লাইড শো হল। অনেক বাঘ, হনুমান, কাক, বকের ছবি দেখলাম। সেসব দেখে আমিও তোমার কথা বললুম বুঝলে?”
“আমার কথা? সে কি? কেন?”
একটু কুঁকড়ে যায় বিল্ব। লোকজন ওকে নিয়ে আলোচনা করবে, ভাবলেই কেমন অস্বস্তি হয়। বেশিরভাগ লোক তো হাসাহাসিই করে। শুকদেব বলে, “আহা, ঘাবড়াচ্ছ কেন? খারাপ কিছু তো বলিনি। উনি বলেন অর্নিথোলজি না কি যেন?”
“হ্যাঁ, পাখি নিয়ে চর্চা।”
“ওই তো, তুমিও জানো দেখছি। তা বললুম, আমাদের পাড়াতেও একজন আছে। তা শুনে খুব আগ্রহ দেখালো। তারপর তোমার ওই পাখিটার কথাও বললুম, বুঝলে। তা শুনে তো খুব আহ্লাদ।”
“সেকি কোন পাখি?”
“হুঁ হুঁ ভায়া এ কি গোপন থাকে? তাঁতীগড় থেকে থাবা থাবা গরুর মাংস নিয়ে আসছ, সে কি জানি না?”
এবার আতঁকে ওঠে বিল্ব। কয়েকদিন আগে একটা বাচ্চা ল্যাগার ফ্যালকনকে কালিবিলের ধারে কুড়িয়ে পায়। বাচ্চাটার একটা ডানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাথে করে নিয়ে এসেছে, কাক শালিখ ঠুকরে শেষ করে দিত। একটু সুশ্রুষা করে আবার ছেড়ে দেবে। এর মধ্যে খবর চাউর হয়ে গেছে, জেনে বেশ ভয় পেয়ে গেছে। “আপনাকে কে বলল?”
“বাছা গেরস্ত বাড়িতে চিল পুষবে, আর গরুর মাংস এনে খোয়াবে, সেটা তো ঠিক নয়। পাড়ায় রাধামাধবের মন্দির আছে, একটা শুদ্ধাচারের ব্যাপার।”
“ওটা চিল নয়, বাজ।”
“বাজ তোমার মাথায় পড়বে, যদি সবাই জানতে পারে।”
“পাখিটা আহত। সেরে উঠলেই চলে যাবে।”
“তাই তো বলছি, চলে যাবার আগে একবার দেখিয়ে দাও।”
“কাকে?”
“ওই যে বললুম, তরুন শর্মা।”
“উনি আমাদের বাড়ি আসবেন?”
“সে ওনার মত লোক কি এমনি আসেন? আমি বললুম, তবেই না?”
“লোক জানাজানি হয়ে যাবে। এখন এইসব পশুপাখি বাড়িতে রাখতে নেই।”
“আরে বাবা, এ কি যে সে লোক? ইনি জানলে তোমার ভালোই হবে। আর আমারও।”
“আপনারও?”
“আপিসে ইজ্জত বাড়বে। বাকি সব তো ফেকলুর মতো ছবি দেখলো। উনি কেমন আমার সাথেই গল্প করল, ম্যানেজার পর্যন্ত অবাক! হুঁ হুঁ জানেনা তো কোথায় থাকি?”
“কবে আসবেন?”
“এই শুক্রবার।”
“ও বাবা ঠিক হয়েই আছে?”
“আরে এরা সব সেলিব্রিটি লোক, বুঝলে না। সব ঠিক থাকে। ক্লাবের তালেবরাও বুঝবে, আমি কী?
“ক্লাব?”
“আরে আমাদের পাড়ার শিশু সংঘ ক্লাব। ব্যাটারা তো জানেই না, আমি কাদের সাথে ওঠাবসা করি। দেখবে আর জ্বলবে। তাহলে ওই কথাই রইল শুক্রবার তোমার চিল থুড়ি বাজ কে সাজিয়ে গুজিয়ে রেখো, ওর ছবি উঠবে।”
হুঁ হুঁ করতে করতে শুকদেব চলে যায়। বাজটাকে নিয়ে চিন্তায় পড়ে বিল্ব। জানাজানি হয়ে থানাপুলিশ না হয়। পাখিটার ভালোর জন্যই কাছে এনে রেখেছিল। তা থেকে এই রকম ঘটনা ঘটবে ভাবেনি।

শুক্রবার সকাল থেকেই পাড়াতে সাজো সাজো রব। শুকদেব পুরো ক্লাব মাথায় করেছে। সেলিব্রিটি ফোটোগ্রাফার তরুন শর্মা আসছে। সেটা সম্ভব হয়েছে ওর জন্য, লোকজনকে বুঝিয়ে দিতে হবে। অনেকে এসে পাখিটার খোঁজ নিচ্ছে। বিলু কাউকে ঘরে ঢুকতে দেয়নি। বলেছে “অসুস্থ পাখি, এত লোক দেখলে ভয়ে পেয়ে যাবে।“ বেশ খানিক পর, লাল বাতি জ্বালিয়ে একটা মস্ত গাড়ি এসে দাঁড়ায়। এবার বিল্ব সত্যি ভয় পেয়ে গেছে, দেখে তরুন শর্মার সাথে চীফ কনজারভেটর বিশ্বনাথনও আছেন। বন্যপ্রাণী ঘরের রাখার জন্য এবার হাতকড়া নিশ্চিত। ভয়ে ভয়ে গাড়ির কাছে যায়, লক্ষ্য করে গাড়ির ভিতর গ্লাসে গ্লাসে সাজানো রঙিন পানীয়। এই সকাল বেলাতেই দুজনের চোখেই রঙ লেগে রয়েছে। শুকদেব কে ডেকে বলে, “বাড়িতে বুড়ো বাবা মা রয়েছে, সেখানে মদ টদ খেয়ে সাহেবরা ঢুকবে?”
“আর ছেনালি করিস না তো। গরুর মাংস ঢোকাচ্ছিস তাতে অসুবিধা নেই সাহেবরা এলেই দোষ? চল,চল ছবি তোলাবি চল।”
তরুন শর্মা আর বিশ্বনাথন দুজনেই বিল্বর খুব প্রশংসা করল। বিল্ব একফাঁকে কাউকে দিয়ে পাশের দোকান থেকে একটু মিষ্টি নিয়ে আসে। কত মানী লোক পায়ের ধুলো দিয়েছে। দুজনেই বিল্বর ফোন নম্বর নিয়ে রাখল। তরুন বললেন, “বুঝলে ভাই সেন্ট্রাল গভর্মেন্টের টাইগার প্রজেক্ট, দুশো কোটি টাকার কাজ। আমি কয়েকদিন আগে কানহা করে এলাম। এবার সুন্দরবন। তুমি যাবে নাকি?” বিলু বলে, “সময় পেলে যেতে পারি ওখানে আমার এক বন্ধু আছেন তার কাছে অনেক রকম মাছরাঙা আছে।” শুনে তরুন লাফিয়ে ওঠেন। এমনিতে নেশা করে আছে তাই উচ্ছাস প্রদর্শনী একটু বেশী। “বেশ তুমি তাহলে আমায় মাছরাঙার ছবি তুলিয়ে দিচ্ছ। আমি তোমায় ফোন করব।”
বিশ্বনাথন বললেন, “পাখির ওপর কাজ করবে?” শুনে বিলু তো এক পায়ে খাড়া, “নিশ্চই করব, আপনি বলুন।”
“বলব, তার আগে এই পাখিটাকে ছেড়ে দিও।”
“সে তো দেবই, স্যার। সেরে উঠলেই ছেড়ে আসব।”
“বেশ তখন আমায় ফোন কোরো।”
মিষ্টি খেয়ে দুই অতিথি ঘর থেকে বের হয়। শুকদেব তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে পুরো ঘটনার ফুটেজ সংগ্রহর জন্য। বিল্বর আজ আপিস যেতে অনেক দেরী হয়ে গেল।
বাজটা সুস্থ হবার পর কালিবিলে ছেড়ে আসে বিল্ব। তরপর বিশ্বনাথনকে ফোন করে। উনি বিল্বকে আপিসে ডেকে পাঠান। সেখানে গিয়ে কাজের কথা শোনে। উৎসাহে উদ্দীপনায় প্রায় কাঁপতে থাকে। বাংলার শকুনদের নিয়ে একটা কাজ করতে হবে। বিদেশী প্রজেক্ট। এনিয়ে সরকার অনেক টাকা দেবে। মাত্র দশ পনের বছরের মধ্যে শকুনরা লুপ্ত হয়ে যাবার মুখে। মালবাহী গরু মহিষের গায়ে পায়ের ব্যথা কমাতে পশুচিকিৎসকেরা ডাইক্লোফেনাক নামে এক ওষুধ ব্যবহার করতেন। পশু মারা গেলে, তার মাংসপেশী জুড়ে এই ডাইক্লোফেনাক ওষুধ ছড়িয়ে থাকত। আর সেই মাংস খেয়ে শকুনদের কিডনির দফারফা। শকুনের বংশনাশ হবার উপক্রম। প্রথমে তো বোঝাই যাচ্ছিলনা, কেন এত শকুন মারা যাচ্ছে? তারপর বিজ্ঞানীরা ডাইক্লোফেনাকের তথ্য উদ্ঘাটন করার পর,গবাদী পশুর ক্ষেত্রে এই ওষুধ প্রয়োগে বিধিনিষেধ তৈরী হয়। কিন্তু ততদিনে শকুনের সংখ্যা তলানীতে ঠেকেছে। বিশ্বনাথনের বক্তব্য, বিল্বকে একটা রিপোর্ট তৈরী করতে হবে,এখন শকুনেরা কেমন আছে? কাজ ঠিকঠাক হলে পারিশ্রমিকও আছে। বিল্ব পাখি ভালোবাসে, পাখি দেখতে তার কখনও পরিশ্রমই হয়নি তো পারিশ্রমিকের কথাই আসেনা। কাজ পেয়ে লাফাতে লাফাতে বাড়ি ফেরে।
কিছুদিন আগেও ভাগাড়ের কাছে, ট্রেন লাইনের ধারে বড় বড় তাল, নারকেল জাতীয় গাছে শকুনেরা বাসা করত। তাদের বিষ্ঠার দাগে গাছের চারিধার সাদা হয়ে থাকত। লোকে বলত, শকুন বসলে নাকি গাছ মরে যায়। ওদের ডানার ঝাপটে মৃত্যু আসে। আজ কিনা মানুষের কারণে সেই ‘মৃত্যুদূত’এর মরণ ঘণিয়ে এল? তাহলে সত্যি মৃত্যুদূত কে? বিল্বর ভালো লাগেনা। অনেক খুঁজে নদীর অন্য পাড়ে আবিস্কার করে একটা শকুনের দল কে। পুরো দলে ষোলটা পাখি আছে। আনন্দে বিশ্বনাথনকে ফোন করে জানায়। কনজারভেটর খুশি, বলেন “বেশ তবে, ওদের ওপর নিয়মিত নজর রাখ। গতিবিধি, খাদ্যাভ্যাস, প্রজনন সব কিছুর রেকর্ড চাই।”
তিন্নির পরীক্ষা শেষ, আজকাল সকালে ওঠার চাপ নেই, তবু অভ্যাসবশতঃ উঠে পড়ে। বিলুদাকেও রতনাবাবুদের বাগানে ঘুরতে দেখা যায়না। কোথায় যে থাকে, কে জানে? সেদিন একটা অদ্ভুত পাখির কেরামতি দেখলো। পাখিটা কালো হলুদ মেশানো রঙ, পাঁচ ছয় ইঞ্চির বেশি নয়। গাছের মাথা থেকে লাফিয়ে উড়ে, ডানা মুড়ে একটা বলের মতো ঘুরতে ঘুরতে নিচে নামে আর সুর করে কিছু বলে। বিলুদা থাকলে ঠিক চিনিয়ে দিত। ছেলেটা যে কোথায় গেল?
বিলু আজকাল ভোরবেলাতেই স্নানটান করে বেরিয়ে পড়ে। নদীর ওপাড়ে চলে যায়, ঘন্টা দুয়েক দেখে তারপর আপিস যায়। শনি রবি ছুটির দিন সারাদিন সাইকেল নিয়ে ঘুরতে থাকে। এই ক’দিনে শকুনদের নিয়ে আরও কিছু তথ্য হাতে এসেছে। ওরা সকালে উড়াল দেয়, নদীর উজান বরাবর চলতে থাকে। প্রায় তিরিশ কিলোমিটার ব্যাস নিয়ে চলাফেরা করে। যেতে যেতে আজকাল আরেকটা জায়গায় বেশকিছু নিরুপদ্রব বড় গাছের দেখা পেয়েছে। সেখানে ডিম পাড়ার পরিকল্পনা করছে। বিলু শকুনদের বাসা তৈরী করার সরঞ্জাম জোগাড় করতে দেখেছে। একদিন রবিবার দুপুরে সাইকেল নিয়ে শকুনের পিছনে পিছনে যেতে যেতে প্রায় দশ কিলোমিটার উত্তর দিকে চলে যায়। সেখানে আছে এক সেনা ছাউনি। অনেকখানি জায়গা নিয়ে সেই ছাউনি, কত শত গাছ, কেমন ছায়াঘেরা শান্ত পরিবেশ। শকুন দেখতে সাইকেল নিয়ে ঢুকতে যাবে, গেটের ইয়া লম্বা জোয়ান রাস্তা আটকায়। “কোথায় যাবে?” মুখ কাঁচুমাচু করে বলে “ওই গাছগুলোর কাছে।”
“পারমিশান আছে?”
“পারমিশান? পাখি দেখব, তার পারমিশান?”
“ফৌজকা জগা হ্যায়, অ্যায়েসে থোড়ি হোতা হ্যায়? ভাগো হিঁয়াসে।”
সাইকেল ঘুরিয়ে ফিরে আসে বিল্ব। পরদিন বিশ্বনাথনকে ফোন করে জানায়। উনি বলেন “চিন্তার কিছু নেই। আমি লিখে দেব। ওটা নিয়ে দেখাবে। পারমিশান দিয়ে দেবে।”
এই ছাউনির বড় কর্তা ব্রিগেডিয়ার সিং। তিনি বিশ্বনাথনের চিঠি দেখে অনুমতি দিলেন তবে একটা শর্ত সাপেক্ষে। বিল্বর পুলিশ ভেরিফিকেশন হবে, তবেই ছাউনিতে ঢোকার ছাড়পত্র পাবে। সব শুনে বিল্ব সেদিন বাড়ি ফিরে আসে। মনটা ভার, শকুনগুলো কী করছে এ সপ্তাহে জানা হলনা। বাসা তৈরী হল কিনা? ডিম পাড়ল কিনা? সন্ধ্যের সময় ষোলজনের কতজন ফিরে গেল? কতজন থেকে গেল? কিছুই জানা হলনা। মন খারাপ নিয়ে নদীর ঘাটে গিয়ে বসে। তিন্নি জানালা দিয়ে দেখতে পেয়ে, পায়ে পায়ে কাছে আসে, “কি গো আজ অসময়ে?” বিলু সমস্যার কথা বলে। তিন্নি জিজ্ঞেস করে “ভেরিফিকেশন করতে কতদিন লাগবে?”
“তা কি আমি জানি? কোনদিন তো করতে হয়নি।”
বিলুকে পেয়ে তিন্নি সেদিনের ডিগবাজি খাওয়া পাখিটার কথা জিজ্ঞেস করে। পাখির কথা শুনে বিলুর মন চাঙ্গা হয়ে ওঠে, “ওমা! তাই বুঝি? এখানে ফটিকজল এসেছে?”
“ফটিকজল?”
“হ্যাঁ তো, ওই রকম ডিগবাজি খেতে খেতে ডাক দেয় ফটিকজল। তা তোর কি খবর? পরীক্ষা হয়ে গেছে?”
পাখি ছাড়া বিলু যে তিন্নির খবর নিচ্ছে, শুনেই তিন্নির মন ভরে গেল। “পরীক্ষা তো হয়েই গেছে।”
“তো এবার কি মাস্টার্স?”
“না এবার বিয়ে।”
“সেকি? এখন কেউ পড়াশুনা শেষ না করে বিয়ে করে নাকি?”
“বাবা বলেছে, ভালো পাত্র। বিয়ের পরে পড়তে।”
“ও ঠিক হয়ে গেছে?”
“ওই এক রকম, কথা চলছে।”
“বাঃ তবে সেটাও ভালো।”
সন্ধ্যের সময়টা নদীর ধারে বড় মনোরম। পশ্চিম দিগন্ত লাল করে সূর্য্য ডুবে যায়। আর অজস্র পাখি তাদের বাড়ি ফেরার মিছিলে আকাশ ভরিয়ে তোলে। আজ বিলুর দূরবীণ নেই, খাতাও নেই। ছিল শুধু শকুনদের জন্য এক-গলা মন খারাপ। ঘরমুখো পাখিদের দেখে কিছুটা আনন্দ পায়। তিন্নি চুপ করে ঢেউএর শব্দ শোনে। বুঝতে পারে, ওর পাশে বসা মানুষটির মন আকাশের গায়ে, সেখানে নাগাল পাওয়া মুশ্কিল।
পুলিশ ভেরিফিকেশন হতে বেশি সময় লাগেনা। এক সপ্তাহের মধ্যে বিল্বর সেনা ছাউনিতে যাতায়াতে কোন বাধা থাকেনা। ছাউনির একপাশে অনেকগুলো তালগাছের দল একসাথে দাঁড়িয়ে, সেখানেই শকুনেরা বাসা নিয়েছে। ছাউনির ভিতরেই একটা বাড়ির ছাদে উঠে দূরবীণ চোখে লাগিয়ে বসে থাকে। তবে বিল্ব বুঝতে পারে, এরা ওকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারেনি। বিল্বর আসেপাশে ছায়ার মতো এক দুজন জোয়ান সবসময় থাকে। বিল্ব দূরবীনে চোখ রেখে কি করে? ওদের আশ্চর্য্য লাগে। একজন তো একদিন জিজ্ঞেস করে ফেলে, “তুমি এত দূর থেকে আসো এই গিধগুলোকে দেখতে?”
“হ্যাঁ তো।”
“তোমার চলে কী করে?”
“ওই চলে যায়।”
“সেকি এর জন্য তুমি টাকা পাওনা?”
“আমি তো পাখিদের ভালোবাসি।”
“শুধু ভালোবাসায় তো পেট চলে না।”
“আমার একটা ছোট চাকরি আছে আর বাড়িতে খাওয়ার লোক বৃদ্ধ মা আর বাবা।”
“সেকি তুমি বিয়ে করোনি?”
বিল্ব হাসে। একসময় বাড়িতে বিয়ের ব্যাপারে বলত। এই বাউন্ডুলে ছেলেকে কে বিয়ে করবে? বিল্বরও ভয়, বিয়ে হয়ে গেলে বৌ এসব যদি করতে না দেয়? জোয়ানটি হেসে বলে, “মরার পর ওপরওয়ালাকে কি জবাব দেবে?” বিল্ব না বুঝে হাঁ করে থাকে। জোয়ানটি হেসে বলে, “তোমায় ভগবান হাতিয়ার দিলো, তুমি যে কিছু করলে না। তার কি হবে?”
বিল্বর কোন জবাব নেই। চিরকাল সবার চোখে হাস্যস্পদ হয়ে থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে। নিজের কথা শুনে জোয়ান দুটি নিজেদের মধ্যে হেসে গড়িয়ে পড়ে। তবে এ কয়দিনে এটা বুঝে গেছে যে, বিল্বর আর যা উদ্দেশ্য থাকুক, ‘জাজুসি’ করতে আসেনি।

একদিন আবার ব্রিগেডিয়ার সিং ডেকে পাঠালেন। নিজে থেকেই বললেন ব্যারাকে অনেকে পরিবার নিয়ে থাকেন। তাদের ছেলেমেয়েদের পাখি আর প্রকৃতি চেনানোর ক্লাস করাতে। প্রস্তাব শুনে, বিল্বর মন ভরে ওঠে। বাড়ি ফিরে এসে কাকে বলে? কাকে বলে? আবার নদীর ঘাটে তিন্নিকে পেয়ে বলে ফেলে তার নতুন কাজের কথা। সেনাপতিদের ছেলেমেয়েদের পাখি চেনাতে হবে। তিন্নি তাকিয়ে তাকিয়ে বিল্বর চোখের উজ্জ্বলতা লক্ষ্য করে। পাখি নিয়ে কথা বললে বিল্ব জগত সংসার ভুলে যায়। বেশ একটা খুশি নিয়ে বাড়ি ফেরে, তখন ফোন আসে তরুন শর্মার। সেই ফোটোগ্রাফার।
“কি হে ছোকরা! তোমার, আমাকে কিংফিশারের ছবি তুলিয়ে দেবার কথা ছিল? ভুলে গেল?”
গলার স্বরের তীব্রতায় বিলুর আপাদমস্তক জ্বলে ওঠে, লোকটা ভেবেছে কি? হুকুমের চাকর? ঠান্ডা গলায় উত্তর দেয়, “দেখুন আমি কিন্তু আপনার ছবি তোলানোর জন্য দায়বদ্ধ নই। ফোন নম্বর দিয়ে দিচ্ছি কথা বলে নিন।” তরুন শর্মা এতটা ঔদ্ধত্য আশা করেনি। হিস হিস করে বলে, “দুদিন শকুন দেখে, নিজেকে অর্নিথোলজিস্ট ভেবে ফেলেছো? এ জন্য তোমায় পস্তাতে হবে।” বিল্ব আর কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দেয়।
পর পর দুটো রবিবার ফৌজের বড় গাড়ি বোঝাই করে বিল্ব চলল, বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা, কালিবিল। সে দলে ছোট ছেলেমেয়ে, তাদের মায়েরা আর দুতিনজন সিপাইও ছিল। সকলে খুব আনন্দ করেছে। অনেক পাখি চেনা হল, তাদের ডাকের সাথে পরিচয় হল। তাদের আদব কায়দা জানা হল। বিল্ব খুশি, ছেলেমেয়েরা আরও খুশি। তবে ফেরার পথে একজন সেপাই বিল্বকে ডেকে বলে, “আপনাকে কিন্তু কোম্পানি, এখনও বিশ্বাস করেনা। ভাবে, কোন দুশমন দেশের জাসুস। সাবধানে থাকবেন।” বিল্ব অবাক হয়ে তাকায়। রাতের গাড়ির হেডলাইটে মুখের ওপর আলো অন্ধকার খেলে বেড়াচ্ছে। মনের অন্ধকার পরিস্কার করতে জিজ্ঞেস করে, “আমায় কি করবে এরা?”
“দেখুন আমি সামান্য সিপাই। আমার কাছে অত খবর থাকেনা, যা মনে হয় বললাম। আপনি সাবধানে থাকবেন।”
সে রাতে বাড়ি ফিরে একরাশ চিন্তা বাসা বাঁধে। তখন মা এসে খবর দেয়, যে পাড়ায় বিয়ে লাগছে। আজ পাকা কথা হয়ে গেল। বিল্বর মন এখন অন্যখানে। কাল থেকে আপিস, একসপ্তাহ সেনা ছাউনিতে যাওয়া হবেনা। নিজের চেয়ে শকুনগুলোর জন্য দুশ্চিন্তা হতে থাকে।
সপ্তাহের দিনে সকালে, আপিস যাবার আগে নদীর অন্য পাড়ে গিয়ে শকুনদের আগের বাসা দেখে এসেছে কয়েকবার। তবে অপেক্ষায় থাকে, কবে ছাউনিতে গিয়ে এখনকার অবস্থা দেখবে? হয়তো বাসা তৈরী সম্পূর্ণ। শিগ্গিরি ডিম পাড়বে।
সেদিন ছাউনিতে ঢুকে নির্ধারিত জায়গায় সাইকেল রেখে এগিয়ে যায়, খেয়াল করে জায়গাটা অনেকটা আলো হয়ে আছে। তাকিয়ে দেখে তালগাছগুলো নেই, তাই এতো আলো! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনা। একজন চেনা সিপাইকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে, “গাছগুলোর কি হল?” সে উত্তর দেয়,
“ওখানে? স্টোররুম তৈরী হবে তাই জমি পরিস্কার করা হয়েছে।”
“আর পাখিগুলো?”
“তাদেরকে উড়িয়ে দিয়েছে।”
“কিন্তু ওদের বাসা? কয়েকজন তো ডিমও পেড়েছিল।”

কান্নায় বিল্বর গলা বুঁজে আসে। সিপাইটি কিছু বলে না, দূরে আঙুলে ইশারা করে। বিল্ব তাকিয়ে দেখ। বড় বড় ঋজু গাছগুলো টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে। মাথা নিচু করে, কোন কথা না বাড়িয়ে ছাউনি থেকে বেড়িয়ে আসে।
রাতে বাড়ি ফিরে খায়না বিলু। মা এসে জিজ্ঞেস করে “কি রে শরীর খারাপ?” বিলু জবাব দেয়না। মা জানে, ছেলে বড্ড সংবেদনশীল। তাই আর কিছু বলে না, শুধু একটা খাম হাতে ধরিয়ে যায়। বিলু তাকিয়ে দেখে, একটা বিয়ের কার্ড। তেল সিঁদুরে অলঙ্কৃত দুটো নাম ‘পালক’ আর ‘চিরঞ্জীত’। বিলু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, “মা এরা কারা?” মা বলেন, “আমাদের পাড়ার মেয়ে, চিনিস না?” বিলু খানিক আহত হয়ে বলে, “মা, বড্ড মন-খারাপ হয়ে আছে। আর হেঁয়ালি কোরো না। না বলতে হয় বোলোনা”
“কোনদিন দূরবীণ সরিয়ে কাছের মানুষজনের দিকে তাকিয়েছিস? যে জানবি?”
“আরে! কে বলবে তো?”
“মেয়েটা তো তোর নাগালই পেলনা। তুই থাক তোর পাখিদের নিয়ে।”
“উফ্ বড্ড গোল করছো। আমার নিমন্ত্রণের দরকার নেই জানারও দরকার নেই।”
“তিন্নির ভালো নাম ‘পালক’। বোকা ছেলে।”
হঠাৎ যেন বিল্বর চোখের সামনে থেকে একটা আচ্ছাদন সরে যায়। সারা জীবন পালকের খোঁজে ছুটে বেড়ালো, আর এই পালকটা কেন যে চোখেই পড়েনি?


[লেখকের পরম্পরায় প্রকাশিত রচনা]
- ভারতবর্ষ – ছোট গল্প
- শোক – ছোট গল্প
- বিষধর – ছোট গল্প
- বিলু শকুন – ছোট গল্প
- গল্পঃ ঘুড়ি
- ছোটদের গল্প: পুজো আসছে
- শাড়ি
- গয়না – ছোট গল্প
- পূর্বাভাস
- অভিযোগ
- জঙ্গলের প্রতিশোধ
- মানুষ
- আরও গল্প
- বাংলা লাইভে প্রকাশিত গল্প
[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
