কমলা

অনুবাদঃ

২য় পর্ব
অধ্যায় ৩
পরদিনের উৎসবের জন্য প্রস্তুতি চলছিল সারারাত ধরে। সব দিক থেকেই অতিথি অভ্যাগতরা এসেছিলেন। বরযাত্রীদের বন্ধুরা এবং আত্মীয়রাও তাঁদের মধ্যে ছিলেন। ছিলেন সন্ন্যাসীর বিশেষ পরিচিত মানুষজন, নিচের শহরের শাস্ত্রী এবং পণ্ডিতেরা সপরিবারে, কাছের মন্দিরের পূজারিরা। বাইরের কাজে সাহায্য করার জন্য অনেক সংখ্যায় শূদ্ররাও এসেছিল। প্রিয় শূদ্র মেয়ে ইয়েশি এবং তার পুরো পরিবারকে দেখে কমলার বিশেষ সন্তোষ হয়েছিল। এদের সে আশৈশব চেনে। এরা থাকে আশপাশের বন, পাহাড় এবং উপত্যকাতে। বনের মধ্যে কাজ করতে করতে গাওয়া তাদের সুরেলা গান সে শুনতে পেত। তার সঙ্গে শোনা যেত কাঠ কাটতে কাটতে কুঠারের শব্দ এবং তার প্রতিধ্বনি। উঁচু স্বরে তাদের মধ্যেকার কথোপকথনের থেকে কমলা বহির্জগতের জ্ঞান সঞ্চয় করত। যখন নিচের বিশাল সবুজ সমতল ভূমিতে ফসল পেকে উঠত, তখন সে গভীর আগ্রহের সঙ্গে ফসল তোলা, মাড়াই এবং সংগ্রহের কাজ লক্ষ করত। কাজের মধ্যে ডুবে থাকা মানুষজনের মধ্যে সে তার বিশেষ বন্ধু ইয়েশি এবং ভাইদের খুঁজত। তাদের বৃদ্ধ পিতাও কমলার প্রিয় ছিলেন। তিনি কোন কাজ করতেন না। তবে সন্ধ্যায় তার দাবিমতো ভালো আহারের ব্যবস্থা করতে হত। ইয়েশির মায়ের কর্তব্য ছিল তাকে সন্ধ্যায় তরকারি রান্না করে দেওয়া। না দিতে পারলে মায়ের ভাগ্যে জুটত মারধর, যা মা ঠান্ডা মাথায় সহ্য করতেন। কখনও ইয়েশির মুখও সন্দেহজনকভাবে ফোলা দেখাত। কারণ, জিজ্ঞাসা করলে সে সুন্দর হেসে উত্তর দিত—“এটা কিছু না। বাবা তরকারি পায়নি। মায়ের মারের ভাগ আমি কিছুটা পেয়েছি।” হাত মুখের সঙ্গে ঠেকিয়ে সে সরলভাবে যোগ করত, “খুব খারাপ দেখাচ্ছে?” এইভাবে হেসে বিষয়টাকে লঘু করে দিত। কী সরল মানুষ এরা! তাদের মধ্যে এক ধরনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—ভালো বা মন্দ যাই বলুন—তারা ছিল বিশ্বস্ত, সৎ এবং জাতিগতভাবে কঠোর পরিশ্রমী। তাদের কেউ উপকার করলে,তারা তার জন্য যে কোন জিনিস করতে পারত।
বিবাহের দিনের সকাল ছিল সেপ্টেম্বর মাসের অন্যান্য সকালের মতো—শীতল এবং ঝরঝরে। পাহাড়ের উপর তির্যকভাবে সূর্যের রশ্মি পড়েছে এবং সতেজ শীতল বাতাসে শিশিরস্নাত পাতাগুলি ঝিকমিক করছিল। বাঁশের লাল পাতার “থোরনা” ঝোপগুলি যাদের মাথায় ইতস্ততঃভাবে বিশাল “পাল্লু” গাছ এবং তাদের লাল-হলুদ শরৎকালীন পাতা—সব মিলিয়ে এক বর্ণময় দৃশ্যের সৃষ্টি করেছিল। নিচের কুয়াশাচ্ছন্ন প্রাতঃকালীন উপত্যকার দিকে তাকিয়ে কমলা বৃদ্ধা মহিলার নিষেধ সত্ত্বেও ছুটে যেতে চাইছিল। সে শিশিরস্নাত শীতল পাথরের উপর পা ফেলে ইতস্তত পড়ে থাকা বুনো ফুল কুড়োচ্ছিল। ফুল তুলে নিজের গালে ছোঁয়াচ্ছিল। প্রতি দমকা হাওয়াতে সে জীবনের সুখানুভূতির স্পর্শ পাচ্ছিল। এই পরিবেশে কিছুক্ষণ থেকে সে ভুলে গেল যে সে আজকের কনে। পাখিদের গান মিষ্টি এবং পরিষ্কার ছিল। “টিউ টিউ” আওয়াজ যেন স্বর্গে পৌঁছে যাচ্ছিল আর পুরো উপত্যকাকে মাতিয়ে দিচ্ছিল। প্রকৃতির এই সুর কমলা তার ধমনীতে অনুভব করছিল। বন্য আনন্দে সে নিজেও ঠোঁটে “টিউ টিউ” “হুইউ হুইউ” ধ্বনি করতে করতে নাচতে শুরু করল। এখন অনেক ভোর। কমলা যখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল তখন বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকা ভৃত্য এবং অতিথিরা ঘুমোচ্ছিল। তাই সে স্বাধীনভাবে পছন্দমতো ঘুরতে পারছিল। পাহাড়ি ছাগলের মতো সে পাথরের উপর দিয়ে দৌড়চ্ছিল এবং লাফাচ্ছিল। আনন্দে তার ঠোঁটে যে গানই বেরিয়ে আসছিল, তারই সে প্রকাশ ঘটাচ্ছিল।
এইসময় এক গাছের পিছন থেকে এক ব্যক্তি কমলাকে নীরবে লক্ষ করে যাচ্ছিলেন। আগের সন্ধ্যার যে কনে লজ্জায় মাথাই তুলতে জানে না সে প্রকৃতির প্রতি সম্পূর্ণ নিবেদিত হয়ে আনন্দ উপভোগ করছে—এ এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য। এই দৃশ্য দর্শক ব্যক্তির মনে এক অনপনেয় ছাপ ফেলছিল। তিনি আর কেউ নন, কমলার শ্বশুরমশাই। এই দেখার মাধ্যমেই তিনি মেয়ের চরিত্র সম্বন্ধে একটা ধারণা করতে পারলেন এবং তিনি তাকে দয়ালু হাসিমাখা মুখে অভিনন্দন জানালেন। অনুপ্রবেশকারীকে দেখে প্রথমে কমলা বিস্মিত হল। যখন সে বুঝতে পারল তিনি কে তখন সে লজ্জা এবং ভয় অনুভব করল। নেচে এবং গান করে সে কি অন্যায় করেছে? অন্যরা একথা জানলে কী ভাববে? সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের সামনে মজা ও উপহাস করা মেয়েদের মুখ ভেসে উঠল। সে মাথা নিচু করে সরে দাঁড়াল। শ্বশুরমশাই সদয় স্বরে কথা না বললে সে হয়ত দৌড়ে পালিয়ে যেত।
“এই মেয়ে! দাড়াও! দাড়াও! চলে যেও না। আমি দেখলাম সকালে তুমি কী কর।” কমলা এর আগে তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়নি। গম্ভীর কঠোর এবং দুরধিগম্য এই মানুষটির সঙ্গে সে এর আগে অন্যদের সঙ্গী হয়ে দেখা করেছে। কিন্তু তখন তাঁর হাস্যময় মুখ দেখে সে কথা বলার যথেষ্ট সাহস অর্জন করল। সে বলল, “আমার এখানে আসা উচিত হয়নি। ঠাকুমা আমাকে অনেক দূরে না যেতে বলেছিল। কিন্তু, দৌড়তে দৌড়তে খেয়াল না করে আমি এখানে এসে পড়েছি।”
এই কথা শুনে তিনি হেসে বললেন, “কিছু ভাববে না, ছোট্ট মেয়ে, ভিতরে যাও।” কমলার কানে দয়াময় হাসি বেজে উঠল এবং সে কীভাবে যেন বুঝতে পারল, এই মানুষটির সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায়।
সেই দিন কমলাকে নিয়ে অনেক রকমের আচার-প্রথার কথা ছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাতে বরের পাশে একটা জলচৌকিতে বসা। তখন চারিদিকে পিতলের দীপ জ্বলছে—সামনে পবিত্র অগ্নি। দুজনের কাছে ব্রাহ্মণদের উচ্চারিত মন্ত্র দুর্বোধ্য ছিল। নিকটে ছিলেন একমাত্র শাশুড়ি এবং শ্বশুরমশাই। পবিত্র মুহূর্তে “ব্রহ্মগ্রন্থি” নামের এক সিল্কের বন্ধন বেঁধে দেওয়া হল। এই গ্রন্থি কখনও খোলা যাবে না, এর মাধ্যমেই তারা সারা জীবন একসূত্রে বাঁধা হয়ে থাকবে। সঙ্গের এই মানুষটি, সে যেই হোক না কেন, তুমি জীবিত বা মৃত সারাজীবন তার স্ত্রী এবং সম্পত্তি হয়ে থাকবে। এ হল শাস্ত্রের বিধান এবং এই বিধি কখনও ভাঙা যাবে না। সেই রাতে আর একটি আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান হবার কথা ছিল। জ্যোৎস্নালোকিত রাতে বর এবং কনে একসঙ্গে আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদের সঙ্গিনী ক্ষুদ্র তারা “রোহিণীকে” খুঁজে নেবে। এই আবিষ্কারের অর্থ তারা সারাজীবন সুখে শান্তিতে একসঙ্গে বাস করার আশীর্বাদ পাবে।
বর এবং কনে হওয়া যেন মজা আর হাসির এক আড়ম্বরের ব্যাপার! সবচেয়ে বেশি আনন্দের ব্যাপার ঘটল যখন উভয়ে উভয়ের নাম নিজে ছন্দোবদ্ধ কবিতা বলার চেষ্টা করল—হিন্দু বিবাহের এই পরিচিত প্রথা।, ঘিরে ধরা মেয়ে তাদের খাবার খেতে বসতে দিল না। আক্রমণের প্রথম লক্ষ্য বর।
“বউএর নাম বল। অতিথিরা খাবার জন্য অপেক্ষা করছে।” তারা বায়না ধরল।
কোন উপায়ান্তর না দেখে তরুণ ছন্দ করার হাস্যকর চেষ্টা করল। প্রত্যেক ব্যর্থতায় মিলল হাস্যরোলের পুরস্কার। কেউ কেউ মজাও করল। “হায়, সে কনেকে লজ্জা পাচ্ছে”, মহিলামহলের মন্তব্য ভেসে এল, “সে যদি নিজের বউএর নাম ছন্দ করে না বলতে পারে, তাহলে বউকে কী দরকার?”
এই সময় নতুন করে হাসির রোল উঠল। এক বৃদ্ধা বললেন, “কে মুক্তোর মধ্যে তারা দেখেছে? আর ফুলের মধ্যে সর্বোত্তম হল গোলাপ, তোমাদের কমলা নয়।”
কমলার মুখ লজ্জার আবরণে ঢেকে গেল এবং সে বরের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে বুঝে নিতে চাইল সে এই তিরস্কার কীভাবে গ্রহণ করেছে। শীঘ্রই কমলার পালা এল এবং আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে তাকে পড়তে হল। সে গভীর সংকটের মধ্যে পড়ল, কীভাবে স্বামী গণেশ-এর মতো অকাব্যিক নামকে নিয়ে ছন্দ বাঁধবে। মহিলারা ছন্দ ধরিয়ে দিলে সে বলল, “বছরে একবার লম্বোদর দেবতাকে ঘোরানো হয়, আর আমার স্বামী গণেশ হাতির পিঠে প্রতিদিন চড়ে।”
কমলার ভাবল সে সফলভাবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি সে তার স্বামীর মতো স্বামীর নাম অজানিতভাবে বলে ফেলেছে। তাই বিস্মিত চোখে অন্যদের মুখ দেখে সে চমকে উঠল। তখন চারিদিক থেকে হাসির ঢেউ ভেসে আসছে।
“হরি! হরি!” তারা একসঙ্গে বলে উঠল, “নারকেল ভাঙ্গ। নারকেল ভাঙ্গ। সে সবচেয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন স্ত্রী হবে। সে স্বামীর নাম উচ্চারণ করেছে!”
কমলাকে ধাক্কা দিয়ে এক বৃদ্ধা মহিলা বললেন, “তুমি জানো না, স্বামীর নাম শুধু শুনে যেতে হয়, উচ্চারণ করা যায় না কখনও। সে তোমার নাম বলতে পারে। কিন্তু তুমি পারো না। নাও এখন প্রায়শ্চিত্ত কর।” এইভাবে এই প্রহসনের পর্ব শেষ হল।
পরের তিনদিন ছিল, খুবই উত্তেজনাকর। সেই সময় মহাসমারোহে আনন্দোৎসব চলল। এই সব পালা চুকে গেলে,এক বিজয় মিছিল করে কমলাকে স্বামীর আলয়ে নিয়ে আসা হল। শহরে যাবার আগে বাবা কমলাকে কাছে ডেকে বললেন, যে তিনি সঙ্গে যাবেন না। কিন্তু সে চাইলে বাবাকে খবর পাঠাতে পারবে। তাকে বাহুর বন্ধনে আবদ্ধ করে তিনি চুমু খেলেন। কমলা বাবার গলা ধরে বলল, “হায়! তুমি কেন আসছ না?”
ধরা গলায় বাবা বললেন, “এর পর থেকে, বাছা, তোমাকে একা চলার চেষ্টা করতে হবে।”
এই বিদায়ক্ষণ দেখার জন্য সেখানে কেউ সাক্ষী ছিল না। মেয়েটি স্বামীর গৃহে পৌঁছনর আগে বুঝল না বিদায়ের অর্থ কী। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারল, সে কী হারিয়েছে এবং ব্যর্থভাবে তার জীবনের সবকিছু দাদার নাম স্মরণ করতে থাকল।
শিবগঙ্গা শহরে ব্রাহ্মণপল্লী বলতে একটি বাঁকান দীর্ঘ রাস্তা, যার উপরে গড়ে উঠেছে মোটা দেওয়ালের নিচু বাড়িগুলি সামনে বারান্দাসহ। সামনের দিকেও কয়েকটি বাড়ি রয়েছে, কয়েকটি একতলা এবং কয়েকটি দোতলা। প্রত্যেক বাড়ির পিছনদিক নদীর ধার পর্যন্ত বিস্তৃত। আর প্রত্যেক বাড়ির জন্য নিজস্ব স্নান করার ঘাট আছে। একটু দূরে আছে সাধারণের জন্য স্নানাগার। স্বল্পবাস সুদর্শন ব্রাহ্মণ বালকেরা বাড়ির সামনের চাতালের উপর বসে আছে। গায়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গয়না এবং মাথার চুল উপরে ঝুটি করে বাঁধা বা পিছনে ছড়ান।
সামনের থেকে বাড়িগুলি খুবই সাধারণ এবং ক্ষুদ্র মনে হয়। কিন্তু পিছনে ছড়ান বহির্বাটি সহ প্রাঙ্গণ এবং একটি বাগান। পাশাপাশি বাড়ির সঙ্গে কথোপকথনের জন্য সরু রাস্তা আছে। বাড়ির মহিলারা কর্তব্যরত অবস্থায় পাশের বাড়ির মহিলাদের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। বাড়ির পিছনের কুয়ো হল মহিলাদের মিলনস্থল। সেই কুয়োর চারধারে কাছেপিঠের মহিলারা পিতলের কলসি নিয়ে জল ভরতে আসে।
তখন খুব সকাল। কলসিভর্তি জল নিয়ে পুরুষ এবং মহিলারা ভেজা কাপড়ে নদী থেকে ফিরছে। তারা সবদিকে তাকাতে তাকাতে আসছে। বাতাসের গায়ে লেগে আছে ব্যস্ততা। চারদিক থেকে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, “তরকারি চাই! তরকারি! দই চাই! দই!” চটজলদি বানান ছন্দে ফলবিক্রেতারাও তাদের পসরার কথা চিৎকার করে বলছে।
“হালোয়! তুমি এখানে কী মনে করে?” দীর্ঘদেহী এক পুরুষ আজ্ঞাকারী মুখে কথা বলে উঠলেন। সেই মানুষটির শারীরিক বৈশিষ্ট ব্রাহ্মণোচিত, মুখে এক কঠোর, সংরক্ষিত ভাষা। রাস্তার একটি বড় বাড়ির বারান্দায় তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁর দিকে এক শূদ্র নিজের জুতো খুলে একটি চিঠি দিতে এগিয়ে আসছে। চিঠিটি হাতে নিয়ে ব্রাহ্মণ বাড়ির ভিতরে গেলেন। পত্রবাহক তৎক্ষণাৎ সুপারির থলে বের করল এবং পানের পাতা ও চুন এক হাতে নিয়ে সে পান বানাতে মাটিতে বসে পড়ল। এক আত্মতুষ্টির চোখে সে মাথায় এক ডালা মাটি নিয়ে দুধ দুইতে আসা মহিলার এবং পাশের দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতর দিকে প্রবেশ করা তরকারি বিক্রেতার দিকে তাকাল। বাড়ির পাশে গজিয়ে ওঠা একগুচ্ছ মোগরা গাছের গোড়ায় মাটি নিঙড়ে দিতে থাকা মালির সঙ্গে সে খুনসুটি শুরু করল।
পত্রবাহক বলল, “কী সুন্দর শীতল পরিবেশ! বকশিশ হাতে এক জোয়ান এল বলে!”
“কি, ‘পাশ’?”
“হ্যা! ‘পাশ’ করে গেছে,” সজ্ঞানে অন্য একজন উত্তর দিল। ভৃত্যের মুখে ইংরেজি শব্দ এক গুরুত্ব বহন করল।
সেই মুহূর্তে এক গ্রাম্য শকট বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। তখন সবাই চুপ। চালক চিৎকার করে বলল: “রাম! রাম! গোপাল! বাঈসাহেব এসেছেন!”
মালি লাফিয়ে গাড়ির কাছে গেল এবং তিনজন অর্ধ-উলঙ্গ শিশুকে তুলে নিল। সে নানা আকারের অনেকগুলো বান্ডিল নামাল। বাড়ির ভিতর থেকে লোকজন দরজার কাছে এসে জড় হল।
“কে এল? কে এল? রমাবাঈ না কি?” কমলার শাশুড়ি এগিয়ে এলেন। অর্ধ-উলঙ্গ শিশুরা তাঁর কাছে দৌড়ে গেল। তিনি তাদের কাছে টেনে চুমু খেলেন। এক পুরুষকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে তিনি মাথায় ঘোমটা টানলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন সব কুশল কি না। সমস্ত বান্ডিল নামান হয়ে গেলে রমাবাঈ নামলেন। তাঁর মা তাকে চুম্বন করলেন। অর্থাৎ, কমলার শাশুড়ির জ্যেষ্ঠা কন্যা এবং জামাতা এসেছেন। বারান্দার দিকে সম্মানের সাথে তাকিয়ে রমাবাঈ তাঁর বাবার উদ্দেশ্যে বললেন, “খুব সুন্দর যাত্রা হয়েছে।”
“খুব ভালো কথা। খুব ভালো কথা, “বৃদ্ধ মানুষটি বললেন, “ভিতরে গিয়ে আগে বিশ্রাম নাও। তোমাদের বিশ্রাম প্রয়োজন। রাস্তায় কি মেষপালকের সরাইখানায় উঠেছিলে?”
“না, আমরা সোজা আসছি।”
“সেটাও খুব ভালো। কারণ, রাস্তায় ডাকাতের গুজব আছে।” ইতিমধ্যে রমাবাঈয়ের স্বামী বাড়ির ভিতরে সমস্ত মাল ঢোকানর পর শ্বশুরমশাইকে প্রণাম করতে এলেন। তিনি একজন ক্ষুদ্রকায়, গাট্টাগোট্টা মানুষ, ব্রাহ্মণ হিসেবে বরং কালো। বোন গুঙ্গিকে রমাবাঈ জড়িয়ে ধরলেন। গুঙ্গির মুখে তখন খুশির হাসি। একটি শীর্ণকায়া সুদর্শনা মেয়ে পিছনে চৌকোণা প্রাঙ্গনের কাছে দাঁড়িয়েছিল। সে এগিয়ে আসেনি, বরং রমাবাঈ এগিয়ে আসতে মাথা নিচু করল।
“আচ্ছা! এই তাহলে কমলা?”, শাড়ি গোছাতে গোছাতে রমাবাঈ বললেন। আর বলতে বলতে তিনি বঙ্কিম চোখে পাশের ঘরে স্তুপ করে রাখা বান্ডিলগুলোর দিকে তাকালেন। তিনটি শিশু কমলাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে এবং তার দিকে তাকিয়ে রইল। কী করতে হবে ভেবে না পেয়ে কমলা বান্ডিল জড়ো করা পাশের ঘরে প্রবেশ করল। পিছন থেকে সে শুনতে পেল গুঙ্গি চিৎকার করে বলছে, “বান্ডিলগুলোতে হাত দেবে না”, কারণ রমাবাঈ কিছু বান্ডিল খুলছিলেন। মাও সেখানে ছিলেন। সবাই একসঙ্গে বসে আলাপ শুরু করলেন। আর কমলা পাশের ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল।
অধ্যায় ৪
ছয়মাস হয়ে গেল কমলা স্বামীগৃহে এসেছে। প্রাথমিক অভিজ্ঞতা ভালোই ছিল। গুঙ্গি তাকে পছন্দ করত না। কিন্তু তার দেবর ও শাশুড়ি তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন। কমলাকে সমস্ত বিষয় নিজের থেকে উত্তম দেখে, গুঙ্গি মনে করত তার ভূমিকা ছায়াবৃত হয়েছে। সেটা সে ক্ষমার চোখে দেখতে পারেনি। কমলার মধ্যে এমন কী ছিল যার মাধ্যমে সে মানুষের হৃদয় জয় করেছিল? তাকে কঠোর কথা শোনালেও তার চোখের জাদু সবাইকে আকর্ষিত করত। মাথা উঁচু করে চলাফেরার মধ্যে চারপাশের সবাই তার মধ্যে সর্বোত্তম কিছু খুঁজে পেত। এক সময় তার নরম ও মিষ্টি ব্যবহারে গুঙ্গি এবং তাকে যা কাজ করতে দেওয়া হতো তা স্বেচ্ছায় পালন করতে দেখে গুঙ্গি বিস্মিত হতো। সবচেয়ে ভারি কাজও তার চোখে লঘু মনে হতো, কারণ বাবার সঙ্গে অতিবাহিত জীবনে সে তো এতে অভ্যস্ত ছিল। বাবা জানতেন কমলা কাজকে ভয় করবে না। বৃদ্ধ শ্বশুরমশাইকে অনেকটা তার বাবার মতোই মনে হতো। কারণ, তিনি নিজে একজন শাস্ত্রী ছিলেন এবং প্রাচীন গ্রন্থ ভালোবাসতেন। বাবার মতো যখনই সে শ্বশুরমশাইয়ের মুখের দিকে আগ্রহের সঙ্গে তাকাত, তখনই তিনি তার পিঠ চাপড়ে আদর করতেন। আর ছোট্ট কমলা বাবাকে হারিয়ে এই বৃদ্ধ মানুষটির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল।এই আকর্ষণ, সরল ব্যবহার এবং শ্বশুর-বৌ-এর সম্পর্ক সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা দেখে প্রথম প্রথম শ্বশুরমশাই অবাক হয়ে যেতেন। সাধারণত যে কোন বধূ তার শ্বশুরমশাইকে ভালোবাসার চেয়ে সমীহ করে চলে। যখন তিনি পড়ার ঘরে থাকতেন, যা ছিল বাড়ির সামনের দিকে, এবং যেখানে কমলা কাজের শেষে নির্ভয়ে চলে যেত। ঘরের বইপত্র সাজিয়ে দিত এবং যখন তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করতেন তখন তার দিকে নির্বাক ভালোবাসার চোখে তাকাত। প্রথম দিকে ছোট্ট আগন্তুকের এই ব্যবহারে তিনি অস্বস্তি অনুভব করতেন। কিন্তু, কয়েকদিন যেতেই তিনি এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়লেন এবং তার আসার জন্য অপেক্ষা করতেন। তাঁর মনে হল কমলা যে কোনভাবেই হোক তাঁর পাঠে সাহায্য করছে। একদিন তিনি অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করলেন যে গ্রন্থগুলির বিষয়বস্তু কমলার জানা। কারণ বই ঝাড়াই এবং সাজানোর সময় সে আপনমনে বলে ফেলেছিল, “সৃষ্টি শ্লোকের এই বইটি কি আমি উপর রাখব? আপনার কি আজ এই বইটির প্রয়োজন হবে?”
চকিতে তার দিকে ঘুরে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “সৃষ্টির শ্লোক সম্বন্ধে তুমি কী জান?” সে প্রথমে ভয় পেল। চোখ তুলে নিরীহ ভাবে উত্তর দিল: “আমি জানি। আমার বাবার খুব প্রিয়। আমার মনে হয় আমি বুঝি।”
কী আশ্চর্য এক আয়ত কালো চোখ! কেমন নির্দোষিতা, ভালোবাসা এবং বিশ্বাস ঐ চোখদুটি প্রকাশ করে! তিনি অনুভব করলেন চোখের দৃষ্টি তাঁকে ভেদ করে যাচ্ছে। নমনীয় স্বরে বললেন, “তুমি বোঝো? বলো, তুমি কী পড়তে পারো?”
এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল, “খুব সামান্যই। কিন্তু বাবা প্রায়ই ঐ শ্লোকগুলি উচ্চারণ করতেন বলে আমি অনেক আগেই তাদের জেনে গেছি। তখন আমি বাবার বাহুর উপর শুয়ে থাকতাম আর বাবা আমাকে ঘুম পাড়াতেন।”
“কে তোমাকে পড়তে শিখিয়েছে?”
“কীভাবে শিখেছি জানিনা। যখন আমি খুব ছোট তখন বালির উপর খেলতে খেলতে আমি পড়তাম। বাবা আমাকে বসিয়ে দিয়ে বলতেন পড়ুয়া এক মানুষের মেয়েরও পড়তে জানা উচিত। তিনি বলতেন: ‘লক্ষ্মী পড়ত পারত।”
শ্বশুরমশাই বললেন, “লক্ষ্মী কে?”
“নিশ্চয়ই সে আমার দ্বিতীয় সত্তা, কারণ কখনও কখনও তিনি আমাকে লক্ষ্মী বলে ডাকতেন এবং আমাকে বলেছিলেন সে অনেক দিন ছিল। আমি তাকে বলতাম সে আমার ছায়া—কারণ সামনে আমি কমলা আর পিছনে আমার ছায়া লক্ষ্মী। তা খুব মজার, না?” সে হেসে মুখ লুকিয়ে ফেলেছিল। আর শ্বশুরমশাই তার নিরীহ আচরণে বিস্ময় প্রকাশ করে মাথায় টোকা দিয়েছিলেন।
শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে বধূমাতার এই অত্যধিক ঘনিষ্ঠতা এবং অনুগ্রহের সম্পর্ক সমস্ত আপাত ভব্যতার বাইরে। গুঙ্গি অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে এই সম্পর্ককে ভুল ব্যাখ্যা করেছিল। সে প্রচার করল, কমলার উদ্দেশ্য মন্দ, সে তার এবং তার মায়ের সঙ্গ ভালোবাসে না। সে নির্লজ্জ এবং সপ্রতিভ। আর এই সপ্রতিভতা আড়াল করতেই সে নম্রতার মুখোশ পরে থাকে। গুঙ্গি আরও বলত, সে ভালোভাবে কাজ শেষ করে নেয়, শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে অধিক সময় কাটানোর এবং তাঁর নিজের মেয়ের বিরুদ্ধে তাঁকে প্রভাবিত করার জন্য। প্রথম প্রথম গুঙ্গির মা এইসব কথাকে বিশেষ আমল দিতেন না। তিনি কমলাকে পছন্দ করতেন এবং বলতেন: “যত পারে ভালোবাসা আদায় করুক না! বেচারা, ওর তো বাবা নেই।” গুঙ্গির মা সহজ সরল এবং সাধাসিধে ধরনের ছিলেন। অন্যের কথাতেই তিনি পরিচালিত হতেন। মুহূর্তের উত্তেজনায় তিনি কঠিন ভাষায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতেন। তাই, মেয়ের মুখে ক্রমাগত অভিযোগ শুনতে শুনতে তিনি গোপনে স্বামীকে ভর্তসনা করতেন এই কারণে যে তিনি পরিবারের প্রতি সঠিক আচরণ করছেন না। এই কথায় সূক্ষ্মভাবে মিশে থাকতো কমলার প্রতি ইঙ্গিত। “কমলার পাশে গুঙ্গিকে কেমন ম্লান দেখায় তা কি আপনি দেখেন না? তবুও আপনি গুঙ্গির বিয়ের চেষ্টা করছেন না। সে সাধারণ পোশাক এবং গয়না পরে থাকে আর কমলা আপনার কাছে খুব প্রিয়। সে নিশ্চয়ই বাড়িতে থাকবে। লোকমুখে শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি:– ‘দেখ কী ভালো বউমা তুমি পেয়েছ! কী সুন্দরও সে! কোথা থেকে নিয়ে এলে?’ কিন্তু, তাদের নজরে গুঙ্গি পড়ে না। আপনার মতো আমাদের ছেলেও যদি বউমাকে পছন্দ করে, তাহলে সে তারও হৃদয় আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে নেবে। তখন আমরা কোথায় যাব? সে তখন আমাদের কথা ভাববে না। হায়! কি দুর্দিনেই না এই মেয়ে এই বাড়িতে পা ফেলেছে? সম্পর্কে ঘুণ ধরছে। গুঙ্গি অপমানিত বোধ করছে।” এইভাবে তিনি বৃদ্ধ মানুষটির মন বিষিয়ে দেবা চেষ্টা করলেন। তখন থেকে তিনি কমলাকে নিয়ে মন্দিরে যাওয়া বন্ধ করলেন—এই অনুগ্রহ তিনি পরিবারের কোন সদস্যের প্রতি দেখাতেন না। কমলার সমস্ত কাজ এখন বাড়ির সবার চোখে সন্দেহজনক মনে হল এবং শ্বশুরমশাইও কমলার প্রতি ঔদাসীন্য দেখাতে শুরু করলেন। গুঙ্গির জয় হলো। আর কমলা দুঃখে নীরব অশ্রুপাত করতে থাকল। প্রায়ই সে কোণে এবং সবার অগোচরে নিজেকে লুকিয়ে রাখতো। সে কী করতে পারত? কেউ তাকে পছন্দ করে না। সে নিশ্চয়ই কিছু অন্যায় করেছে, বৃদ্ধ মানুষটিকে অসন্তুষ্ট করার মতো কিছু, কারণ সে তাঁর কাছে গেলেই তিনি তাঁকে সরিয়ে দিতেন এবং কোন কাজ করতে দিতেন। সে তাঁর দিকে গোপনে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করত। কিন্তু তিনি বলতেন: “বড়রা কাজে ব্যস্ত থাকলে মেয়েদের চুপ থাকা উচিত।” এই মৃদু বাধায় নিরীহ আচরণ এবং হৃদয়ের আনন্দ অবদমিত হতো।
স্বামীকে সে ভালোভাবে জানতেও পারেনি। বিয়ের অব্যবহিত পরেই তিনি চলে গেছেন পড়াশুনার জন্য অনতিদূরের এক শহরে। সব পরীক্ষা শেষ করে তিনি ফিরবেন। এক তরুণের ক্ষীণ স্মৃতি তার মনে ভেসে আসে। যিনি বিয়ের অনুষ্ঠানের সময় পাশে বসে ছিলেন। তখন তার মনে এক অদ্ভূত, অস্থির অনুভূতি হয়েছিল। সে ভাবত কখন সে পালিয়ে বাঁচবে। সে জানত তিনি তার স্বামী। অনুষ্ঠান আর তামাশার মাধ্যমে তারা এক অজানা, রহস্যময় উপায়ে একত্রে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু, সে কখনও তাঁর কথা ভাবেনি এবং তাঁর সঙ্গে মিলিত হবার ইচ্ছাও অনুভব করেনি। বাইরের জগতের প্রতি তার আকর্ষণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। সে সমবয়সি মেয়েদের সঙ্গে ভাব পাতিয়েছে। তাদের কথায় তার কাছে এক নতুন, ভয়াবহ জগৎ উন্মোচিত হতো। এখন আর সে শৈশবের জীবনে নেই। সেই জীবনের মধুর, সরল স্বাধীনতা অদৃশ্য হয়ে গেছে। সে এমন অনেক কথা জেনেছে, যা তাকে ভীত করে। ভয়ে, বিস্ময়ে সে আরও শান্তভাবে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে।
কমলার বিশেষ বন্ধু ছিল চারজন। তারা আশপাশের বাড়ি থেকে আসত এবং কুয়োর ধারে প্রায়শই তাদের মধ্যে দেখা হতো। প্রথমে তাদের মধ্যে আসা এই আগন্তুককে সবাই এড়িয়ে চলত। তার একটি কারণ সে বিবাহিত বউ। তারা ঈর্ষান্বিত ছিল। কিন্তু তার সরল নিরীহ আচরণ তাদের মন জয় করে নেয়। একদিন ঠাট্টাচ্ছলে তারা কমলাকে কটু কথা বলেছিল, এই জন্য যে সে শ্বশুর এবং শাশুড়ির মন জয় করেছে, যা এক ব্রাহ্মণ পরিবারে আগে কখনও দেখা যায়নি। তারা বলেছিল, “তুমি অঙ্গুলিহেলনে তাঁদের পরিচালনা কর। আমরা শুনতে পাই যে ‘তোমাদের বাড়িতে চিনির রসের বন্যা বয়ে যায়’ তুমি কীভাবে সামলাও বলো তো। বাবা নেই, মা নেই? তুমি নিশ্চয়ই এক ছোট্ট ডাইনি!”
সাশ্রুনয়নে কমলা উত্তর দেয়, “আমি সেরকম কিছু করিনি। তোমরা যা ভাবছ তা নয়।”
“হ্যাঁ, আমরা ভালোভাবেই জানি শীঘ্রই তোমার গদি টলে যাবে। তোমার যা এক প্রিয় ননদ!”
কমলা প্রতিবাদ করে বলে, “কিন্তু, তা নয়।” যখন সে নিজেই ব্যাখ্যা করতে উদ্যত হচ্ছে, তখন দীর্ঘকায়া কালো মেয়ে ভাগীরথী তাকে থামিয়ে বলে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমরা সব জানি। আমরাও এমন অবস্থায় পড়েছিলাম। খালি তোমার নির্বুদ্ধিতা আর তাদের প্রতি বিশ্বাস আমাদের অবাক করছে। বুঝলে বাছা, এত বিষণ্ণ হয়ো না। শাশুড়ি ও ননদ তুমি যেমন ভাবো তেমন মধুর আর নিরীহ হয় না। এমন সময় আসবে যখন তাদের এবং স্বামীর হাতে প্রহৃত হওয়া ছাড়া একদিনও যাবে না। তারা তোমার খাবারও বিষাক্ত মনে হবে। অবাক চোখে তাকিয়ে আছ কেন? তোমার মা তোমাকে এসব কথা বলেননি? ওহো তোমার তো মা নেই। বেচারা! মনে হয় না তুমি প্রহার সহ্য করতে পারবে।”
“আমাদের সবার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভয় পাবার কিছু নেই। নারীর জীবন এমনই”, শাস্ত্রীর মেয়ে রুকমা বলল।
“কিন্তু, ওরা কেন আমাকে মারবে?”
“নিশ্চয়ই তোমার দুর্ব্যবহারের জন্য। আমরা যে সর্বদা দুর্ব্যবহার করে থাকি! যদি ঘি নষ্ট হয় এবং তুমি যদি কাছে থাক, তাহলে তুমিই দায়ি, যদিও তোমার ননদ এই কর্ম করেছে। তুমি হলে শয়তানের ছায়া।”’
চোখে জল নিয়ে বারো বছরের কোমল, সুদর্শন একটি মেয়ে হারনি বলল, “কেন, গত রাতে আমাকে মেরেছে। আমার স্বামী খাবার খায়নি বলে। শাশুড়িমা বললেন, এর মূলে আমি। যতই আমি বলি আমি কিছু জানি না, ওরা আমাকে মারে এবং না খাইয়ে রাখে।”
ভাগীরথী বলল, “এ তো কিছু নয়। আর একটু বড় হও। তখন স্বামীর ব্যবহারে তোমরা দেখ কেমন ভুগতে হয়। উলটো দিকের রাস্তার সীতার কথা শুনেছ? বেচারা! স্বামী তার কাছে গয়না চেয়েছিল, যা তার নিজের মা কিছুক্ষণ আগে সীতাকে পরিয়ে গেছেন। ফল কী হল? স্বামী এক নর্তকীকে বাড়ি এনে বৌকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিল যতদিন না সে কিছু গয়না তার হাতে তুলে দেয়।”
শুনে অজ্ঞানত কমলা গলার হার স্পর্শ করে, আর সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে।
“না, না! এরকম গয়না নয়। এ তো শিশুর খেলনা। তোমার স্বামী এর জন্য লালায়িত হবেন না,” রুকমা বলল।
কমলা আন্তরিকভাবে বলল, “তিনি যদি চান আমি তাঁকে দিয়ে দেব। তাহলে তো তিনি আমাকে মারবেন না?”
কমলার নিরীহ আচরণে ভাগীরথী আলোড়িত হয়ে তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, “না, বাছা! কেউ তোমাকে মারবে না। দেখি কে তোমাকে মারে? এসব কথা আমাদের বলা উচিত নয়। ঈশ্বর যাদের শিক্ষা দেয়নি, মানুষ কেন দেবে? তুমি ভিতরে যাও। ওরা যা বলে তা পালন কর। ভাবতে হবে না, কেউ তোমাকে মারবে।”
এতক্ষণ চুপ করে থাকা মোটাসোটা চেহারার ভীমা বলল, “কী সরল ছোট্ট মেয়ে!” কমলার কাছে এসে সে বলল, “আমি তোমার বন্ধু হব।”
ছোট্ট হারনি বলল, “আমিও হব।” কুয়োর পাশে চার বন্ধু জড়ো হলো আর তাদের হাত বাড়িয়ে দিল। জলভরা উজ্জ্বল চোখে কমলা তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কমলার শ্বশুরমশাইয়ের উপর পরিবারের সবাই যতই প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করুক না কেন, তাঁর হৃদয়ে কমলার জন্য কোমল স্থান অটুট ছিল। তিনি দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির মানুষ ছিলেন। একবার তিনি যা বিশ্বাস করতেন সেই বিশ্বাস থেকে তাকে টলান কঠিন ছিল। নিজের মনে তিনি অনুভব করতেন যে তাঁর বউমা অন্য মেয়েদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং নিজেকে তাঁর বিশেষ অভিভাবক বলে মনে করতেন। বিয়ের পরদিন সকালে তিনি দেখেছিলেন ছোট্ট কমলা কীভাবে প্রকৃতির কোলে নিজের স্বাধীনতা উপভোগ করছে। সেই স্মৃতি এখনও সতেজ আছে। তিনি ভাবতে পারতেন না অন্য গুণ তার যাই থাক সে তঞ্চকতা করতে পারে না। তবু স্ত্রীর কথার সম্মান রাখতে তিনি তাঁর ঘরে কমলার ঘনঘন আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কমলার আসার দিন থেকে তিনি কমলার হাতের জল দিয়ে হাত ধুয়ে আহার গ্রহণ করতেন। শুধু তাই নয় খাবার সময় তাকে পাশে বসতে দিতেন। এতে কমলার বিশেষ আনন্দ হতো। অন্য প্রথা বদলে গেলেও এই প্রথা বজায় ছিল। কিন্তু, রমাবাঈ যেদিন বাড়ি এলেন তিনি কমলাকে ভিতরে গিয়ে দাঁড়াতে আদেশ দিলেন। কমলাকে পাশে না দেখতে পেয়ে বৃদ্ধ মানুষটি যখন খোঁজ নিলেন, তখন রমাবাঈ কর্তৃত্বের সঙ্গে এগিয়ে এসে বললেন, “ও পরে আমাদের সঙ্গে বসবে।” কারণ মেয়েরা বাবাকে ভয় পেত এবং তাই চাইল না কমলার উপর এই দুর্ব্যবহার তিনি জানুন। তিনি বললেন, “ওকে দেখো। বেচারা! ও খুবই কম খায়।” বলার পর তিনি কমলার নাম ধরে ডাকলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাকে একটি কাজ দিয়ে ভিতরে পাঠান হয়েছে। তারপর আহারের সময় কমলা শ্বশুরমশাইকে আর কখনও দেখেনি।
এক সন্ধ্যায় দুই বোন সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হয়েছিল। তারা এক অনুষ্ঠানে যাবে—পুরো পরিবারই সেখানে আমন্ত্রিত ছিল। মা তাদের বললেন,”কমলাকেও নিয়ে যাও।” উত্তরে তারা বলল কমলা কাউকে চেনে না, তাই তাকে নিয়ে যাবার অর্থ হয় না। কমলার গয়না পরার জন্য তারা মায়ের অনুমতি চাইল। তাকে তাই সরিয়ে দেওয়া হল। তার বাবার উপহার, মুক্তোর হার এবং কানের দুল গুঙ্গি পরেছিল। দুই বোন তারপর বেরিয়ে গেল। ঠিক তারপরেই কাশী এল। কমলা বিষণ্ণ বোধ করছিল। কাশীকে আসতে দেখে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে তার দিকে দৌড়ে গেল। ক্রুদ্ধ চোখে কাশী তাকে ফিরিয়ে দিল।
“নিজেকে আর কত বোকা বানাবে? কেন তুমি ওকে সব গয়না দিয়েছ? এইমাত্র আমি তাকে দেখলাম। এখন তো নিয়ে যেতে পারব না। আমি এতটা রাস্তা এসেছি শুধু তোমাকে রামচন্দ্র পন্থের অনুষ্ঠান বাড়িতে নিয়ে যাবার জন্য। সেখানে বিশাল আড়ম্বর! বৃদ্ধ, খোঁড়া, অন্ধ এবং বিধবা ছাড়া সবাই সেখানে গেছে। কিন্তু, আমার কমলা! শূন্য মুখে চোখের জল ফেলে কী হবে? তুমি কি সুখী?”
“আরে, আমি কোথাও যেতে চাই না। শুধু তুমি আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ বসো। তাতেই আমি সন্তুষ্ট। আমার এত খারাপ লাগছিল, জানি না কেন? আমি কাউকে চিনি না, তাই আমার যাওয়া উচিত নয়। আগে আমার এরকম মনে হয়নি। মনে হচ্ছে, আমার পুরনো বাড়িতে ফিরে যাই।”
“সত্য হলো, কেউ তোমাকে ভালোবাসে না। কোথাও কিছু ঘটেছে। কিন্তু, এসো। আমি সময় নষ্ট করব না। তুমি এটা আর এটা পরে নাও,” নিজের গলা থেকে দুটো হার খুলে নিয়ে সে বলল, “এখন তোমাকে ঠিক দেখাচ্ছে। সামান্য এই গয়না পরেও তোমাকে কী সুন্দর দেখায়! আমি ওদের চমকে দেব।”
“কিন্তু, আমার শাশুড়ি?”
“আমি অনেক আগেই তাঁর অনুমতি নিয়েছি এবং তিনি তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছেন।” আনন্দোচ্ছল চোখে কমলা বন্ধুকে অনুসরণ করে জমায়েতের দিকে গেল। সমস্ত দুঃখ ভুলে সে একটি সন্ধ্যা কাশীর সঙ্গে কাটাল।”
রমাবাঈ বাড়িতে ফেরার পর বিশাল ঝামেলা শুরু হল। তিনি, ওপর-নিচ করতে লাগলেন এবং উত্তেজিতভাবে সবার সঙ্গে কথা বলতে থাকলেন। তিনি প্রায়শই মাকে এক ঘরে নিয়ে যেতেন এবং সেখানে ফন্দি আঁটা হতো। স্বামীও সঙ্গে থেকে পরামর্শ দিতেন, যুক্তি আঁটতেন এবং রমাবাঈ-এর সঙ্গে এক সুরে কথা বলতেন। কমলার বিয়ে রমাবাঈয়ের স্বামী অনুমোদন করেননি। কারণ তাঁর নিজের অন্য ফন্দি ছিল। বিয়ে সম্পন্ন হতেই তিনি হতাশ হন এবং সমস্ত বিষয়েই দোষ ধরতেন। নিজের কূটবুদ্ধির জন্য তাঁর গর্ব ছিল। তিনি তাই প্রস্তুত ছিলেন কমলার আচরণ এবং ব্যবহারে অন্য ব্যাখ্যা দিতেন যা কমলার পরিপন্থী ছিল। “কী একমাত্র ছেলে এবং এক বিখ্যাত লোকের উত্তরাধিকারী একজন কপর্দকহীন লোকের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হবে, যার মা’র কোন পূর্ব পরিচয় জানা যায় না এবং বাবা এক ভবঘুরে ভিখিরি! কী অধঃপতন! কিসের তাড়া ছিল? আমি ভেবেছিলাম এক বা দু’বছর অপেক্ষা করা যেত। লিখতে, পড়তে জানে! স্বামীর চেয়ে চতুর এক মেয়ে! জগতের এখন এই পরিণতি হয়েছে! সবচেয়ে ভালো স্থান সে অর্জন করে ফেলেছে এবং আমরা জানি না যখন ছেলে ফিরবে তখন সে কী কৌশল করবে?” তিনি এও বললেন যে তাঁর সুপারিশ করা মেয়ের সঙ্গে বিয়ে না দিয়ে পরিবারের বিশাল ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বললেন, “সেই মেয়ে এক বড় লোকের কন্যা ছিল। সেই সম্পর্ক ছেলেকে অনেক উঁচুতে তুলে দিত। এখনও, আমি কীভাবে আর বলব, বাধা অনেক!” অস্পষ্টভাবে তিনি জানালেন তাঁর ভাবনার এক পরিকল্পনা ছিল এবং ইঙ্গিতে জানালেন এক লোকের সঙ্গে কমলা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। সেই লোক কমলাকে না পেয়ে হতাশ হয়েছে।
এত উত্তেজনার কারণ কমলা বুঝতে পারেনি, এও বুঝতে পারেনি কিসের এত জল্পনা—কল্পনা চলছে। শ্বশুরমশাই অবশ্য এত যোগ দেননি। বরং যখন তিনি তাদের কাছাকাছি যেতেন তখন এক আকস্মিক নীরবতা সৃষ্টি হতো। কারণ, তারা তাঁকে ভয় পেত, যদিও তাঁর উপস্থিতিতে রমাবাঈ কমলাকে ঝাঁঝাল মন্তব্য শুনিয়েছেন। কমলা বৃদ্ধ মানুষটির চিন্তা এবং শক্তির প্রশংসা করত। কিন্তু সে বিস্মিত হতো কেন তাঁকে অবহেলা করা হচ্ছে। যখন না জেনে সে তাদের উত্তেজিত জটলার কাছে যেত তখন এক অশুভ প্রভাব নেমে আসত। সবার চোখ তার উপর নিবদ্ধ হতো। তার চলন এবং চেহারার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি বর্ষিত হতো। তাদের উপস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করে সে নিজেকে সরিয়ে নিত এবং বাড়ির কোন এক কোণে নিজেকে লুকিয়ে রাখত। সে জানত না যে সে গভীর আলোচনার বিষয়বস্তু, সে এও জানত না যে এসব আংশিকভাবে তার স্বামীর জন্য যে পরীক্ষায় পাশ করে সরকারি চাকরি পেয়েছে। [চলবে…]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
