
কাঁটাতারের গল্প
প্রেমের গল্প কি কখনও মৃত্যুর আখ্যানে শুরু হয়! মৃত্যু তো শেষ পর্যন্ত সব নেয়। ভালোবাসা সেখানে ছাড় পাবে কেন! কিন্তু সুদর্শনের চলে যাওয়ায় তো তাই হল। চিতাভস্ম থেকে জেগে উঠল অন্য আখ্যান।
মণিরেখা ফোন পেয়েছিলেন সুদর্শন চলে যাওয়ার এক মাসের মাথায়। জানুয়ারির পনেরো, ফেব্রুয়ারির সতেরো। বিকেলের দিকে ফোন এসেছিল। হোয়াটসঅ্যাপ কল। মণিরেখা স্কুল থেকে ফিরেছেন। মাঝারি ফ্ল্যাটটায় আপাতত তিনি একা। স্ক্রিনে অচেনা নম্বর। হোয়াটসঅ্যাপের ডিপিতে কয়েকটি পেকে ওঠা ধানের ছড়া।
গত এক মাস ফোন তুলে তিনি আগের মতো ‘হ্যালো’ অথবা ‘কে বলছেন’ বলেন না। স্কুল থেকে বড় ছুটি নিয়েছিলেন। কাজে যোগ দিয়েছেন দিন সাতেক হল। সুদর্শন না থাকায় সকালের দিকে ব্যস্ততা অনেক কম। তবু নিজের বেরনো শুরু হয়েছে।
তবে কাজ থেকে ফিরে বিকেলবেলায় একা। চাপা নিঃসঙ্গতা বিকেলের রোদ এড়িয়ে ফ্ল্যাটের চার তলার ঘরগুলোর এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। মেয়ে হায়দ্রাবাদে কাজে ফিরে যাওয়ার পর এই একাকীত্বের শুরু। সঞ্চারী যে ক-দিন ছিল প্রায় সময়ই কথা হত দুজনের। সুদর্শনকে নিয়েই কথা। সঞ্চারী কাজে ফিরে যাওয়ায় এখন তা আর নেই।
সে দিন অচেনা নম্বর চুপ থাকল কিছুক্ষণ। যেন দু দিক থেকেই যতটুকু হয় নীরবতা রাখার চেষ্টা। তারপর কথা বলল ও দিক-ই। বেশ থেমে বলা কথা। —আমি সিন্ধু। সিন্ধু ইসলাম। রাজসাহী থেকে দূরে আত্রাই-তে থাকি।
দপ করে একটি বিদ্যুৎ শিহরন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত এক মাসে মণিরেখা আর কোনও সংযোগে নেই। মাঝরাতের বুকে ব্যথায় সুদর্শন হঠাৎই চলে যাওয়ার পর সুদর্শন ছাড়া সমস্ত অতীত এখন মৌন। পাহাড়ের মতো নির্বাক। একটি নুড়িও ছিটকে ওঠে না। মণিরেখা বললেন, তুমি কি আর কিছু বলবে?
ও প্রান্ত বলল, দিন দশেক আগে খবর পেয়েছি। আর কী-ই বা বলার আছে আমার! রাখি।
তারপরও লাইনটা টিঁকে ছিল কয়েক সেকেণ্ড। বাইরের রোদ বেয়ে সময় হেঁটে যাচ্ছিল। রাস্তার মোড়ে গাড়ির এক দুটি হর্ন। লাইন কেটে গেল।
মাস ছয়েক আগেও যে নাম নিয়ে হুলুস্থুল, কখনও তর্ক তারপর দীর্ঘ চুপ হয়ে যাওয়া, চব্বিশ বছর সংসারের শয়ন-খাটটির একটি পায়া যেন নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। সেই নাম শেষ বিকেলে উঠে এল কানে। স্কুল ফেরত মণিরেখা। নিঃসঙ্গ মণিরেখা। সুদর্শন একলা করে রেখে যাওয়ার পর তিনি। এই নামটি জেনে যাওয়ার পর শব্দটি মুখে আনেননি কখনও। উচ্চারণ থেকেও আড়ালে রাখতে চেয়েছেন। সুদর্শন কখনও বলে ফেললে শুনতে অস্বস্তি হত এক সময়।
কখনও মেয়েটির সঙ্গে কথা হয়নি মণিরেখার। এক বার অবশ্য ভেবেছিলেন সুদর্শনের কল রেকর্ড ঘেঁটে নম্বরটি বার করেন। সুদর্শন মেয়েটির সঙ্গে কত দূর এগিয়েছেন জানা নেই। মণিরেখা ভেবেছিলেন, সুদর্শনের আড়ালে মেয়েটিকে নিজেদের স্থিত দাম্পত্যের কথা জানাবেন। সঙ্গে কয়েকটি মৃদু ধমক। কিন্তু পরে মনে হয়েছে, ঘর না সামলে বাইরেটায় হাত দেওয়ায় হয়ত কিছু রুচিহীনতা রয়ে যায়।
তবে এখনের শেষ বিকেলে সিন্ধু নামটিতে আর কোনও অস্বস্তি নেই। কোনও বিরাগ নয়। ছেচল্লিশ বছর বয়স ও কানের ওপর দু-একটি চুল সোনালী হয়ে-ওঠা মণিরেখার কাছে সিন্ধু যেন গত জন্মের শব্দ। আগে কখনও চেনা। অধুনা বিস্মৃত।
কিন্তু মেয়েটি ফোনে আর কিছু বলেনি। কথা এগোতেও চায়নি। যেন সংক্ষিপ্ত আলাপ করা মাত্র। সুদর্শন একদিন যে শব্দটিকে ঘরে বয়ে এনেছিলেন, প্রথম প্রথম মণিরেখাকে জানিয়েছেন সাধারণ ব্যাখ্যায়, তারপর মণিরেখার একদিন সুদর্শনের অসতর্ক মোবাইলে প্রায় তিন মাসের মেসেজ আবিষ্কার, যেখানে ক্রমাগত নিবেদনের পর নিবেদন, রবীন্দ্রনাথের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ পাঠ করে সুদর্শনের পাঠানো ভয়েস, ও প্রান্ত থেকে ভালোবাসার ইমোজি, দেখা হওয়া কিংবা আর কখনও দেখা না হওয়ার আক্ষেপ, মণিরেখার মনে তখন থেকেই আশ্বিনের ঝড়। তর্ক ও রাতের বালিশে নিঃশব্দ অশ্রুপাত। মেয়ের বয়সী একটি মেয়ের সঙ্গে এত দূর?
মণিরেখা চোখ মুছে একদিন সুদর্শনকে বলেছিলেন, চার পাশের অনেক ভাঙনের মাঝে আমাদের ঘরকে আলাদা ভেবে এসেছি। আগামী বছর এক সঙ্গে থাকার পঁচিশ বছর হবে আমাদের। তার কাছাকাছি পৌঁছে এই পাওনা!
সুদর্শন চুপ করে থাকতেন। অথবা বিড়বিড় করে বলতেন, নিজেকে তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিয়ে আসব মণি। কখনও বলেছেন, সম্পর্কটি রাজসাহীর মেলায় গিয়ে দু দিনের দেখা হওয়া মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। বাকি যা দেখেছ সব ভার্চুয়ালিটি…।
তারপর এক সময় বাড়িতে ফোন ধরেননি সুদর্শন। সিন্ধু নামটি উচ্চারণও করতেন না ঘরে। মণিরেখা অবশ্য আপাত শীতলতার ভেতরেও সন্দেহ রেখে গেছেন। সুদর্শনের মধ্যে কোথাও যেন একটি আড়াল। যে আড়াল বহন করা হয়েছে বাকি ছ-মাস। আকস্মিক মৃত্যু পর্যন্ত।
মণিরেখা স্কুল থেকে ফিরে কিংবা রাতের কথায় মেয়েকে বললেন একদিন। হায়দ্রাবাদ থেকে সঞ্চারী অবাক হল শুনে।
বাবার জীবনের সংক্ষিপ্ত একটি আবেগ ও বাড়ির টানাপোড়েন আগেই জেনেছিল মা-র বলায়। সুদর্শন তখন বেঁচে। সঞ্চারী এ-ও জানত, বাবা যেখানে সাময়িক জড়িয়েছে সেই মেয়েটি তার নিজের থেকেও বয়সে ছোট। কিন্তু কী আশ্চর্য তার বাবার মন! মানুষের মন। কোথায় সীমান্তর ও পারের এক মেলা, সেখানে সিন্ধু নামের মেয়েটিও না কি একা হাঁটছিল। সারা রাত গান শোনার ঠেক খুঁজছিল। তারপর বাবার সঙ্গে চা খেতে খেতে দেখা হওয়া। পাশে বসে গান শোনা ও পরে অন্ধকার মাঠ ধরে হাঁটা দুজনের। মা-র কাছে ধরা পড়ার পর বাবা আবেগে এক দিন বলে ফেলেছিল, মুরশিদের খোঁজে হাঁটছিল দুই অন্ধ মুরিদ।
কিন্তু তা-ও ভালো। বাবার ওই যে কর্ম ব্যস্ত জীবন, চাকরি করতে করতে এক ঘেয়ে হয়ে ওঠা পেশা, তার ভেতর এদিকের শান্তিনিকেতন, জয়দেবের মেলা, ওদিকে কুষ্টিয়া, সিলেট, শাহ্ জালালের মাজার বছর বছর এসব থাকছিল। কিন্তু অজান্তে জীবনের শেষ ছ-মাস কী যে হল! কোত্থেকে জুড়ে এল অমন এক জন। বাবা কেমন বুঁদ হয়ে থাকত শেষ বার রাজসাহী ঘুরে আসার পর। যেন অন্য কোনও ভাবনা, আর কোনও ডাক। মা-কে এক দিন বলেছিল, মেয়েটির ওই বয়সের বিশ্বাস আমায় টেনেছে…।
মা রাগত স্বরে বলেছে, অনেক হয়েছে, এ বার তুমি ফের। দু দিনে এমন কী পেয়েছ যে আমাদের চব্বিশ বছরের মিলিত বিশ্বাস ফিকে হয়ে এল?
বাবার চলে যাওয়া ও মেয়েটির ওই ফোনের পর সঞ্চারী মা-কে বলল, তুমি ওকে এক দিন ফোন কর মা। এখন আর তেমন চাপের কিছু নেই। শুনে বোঝ কী বলতে চায়। বাবা এমন কিছু করে রেখে যায়নি তো যাতে বড় কোনও টানাটানি হয়! তাছাড়া সীমান্তের এপার ওপারের ব্যাপার।
মণিরেখা বলেন, তেমন ভুল কি তোর বাবা করবেন? বিশ্বাস করতে পারি না। তবে শেষের ছ-মাস আমার কাছেও তিনি খানিকটা অচেনা হয়ে যাচ্ছিলেন।
সেদিনের সেই নম্বরটিতে তিনি ফোন করলেন অন্য একদিন। নিজের মোবাইলে আগের দিন সেভ করে রাখেননি। পাওয়া গেল প্রয়াত সুদর্শনের ফোন ঘেঁটে। আগে নামে রাখা ছিল, পরে সেভ করা অন্য শিরেপায়। দ্য লাস্ট ইউ। কল করার আগে মণিরেখার মনে দ্বিধা ছিল। ঠিক জায়গা তো! যদিও অনুমান শেষ পর্যন্ত মিলে গেল।
সিন্ধু চিনল। নিশ্চয়ই নম্বরটা ফোনে গুছিয়ে রেখেছিল। বলল, এখন তো টিউশন পড়াতে যাচ্ছি। আপনাকে রাতে বা অন্য কোনও দিন কল করি।
মণিরেখা একটু চুপ হয়ে থাকলেন স্বরের চলনে। হালকা স্নিগ্ধ গলা। বললেন, আমি ফাঁকা। তুমি রাতেও করে নিতে পার।
সঞ্চারী শুনে হায়দ্রাবাদ থেকে বলল, কোনও ভাবে তুমি আর কল কোর না মা। মেয়েটি করলে আলাদা। আর শোন, কোনও কাগজপত্রের যদি ছবি পাঠাতে বলে ভুলেও দিয়ে ফেল না। বলবে সব আমার কাছে। আমি নিয়ে গেছি।
মণিরেখা খানিকটা সতর্কই হলেন। আগ বাড়িয়ে ফোন করলেন না। কিন্তু ও দিকের কল আবার এল দিন তিনেকের মাথায়। সন্ধেয় মণিরেখা বারান্দা থেকে শহর দেখছিলেন। নিচের ডান দিকে কমপ্লেক্সের বড় লোহার গেট। কখনও কোনও গাড়ি এলে-গেলে সে গেট খোলা হয়। নইলে পাশে চলাচলের ছোট গেট। কিছু দিন আগে সুদর্শনকে নিয়ে কাচ ঢাকা গাড়ি বড় লোহার গেট পার হয়ে মিলিয়ে গিয়েছিল রাস্তায়। মণিরেখা ওপরের বারান্দা থেকে ভেজা চোখে দেখে গেছেন। পাশে তখন মহিলা পরিজনরা কেউ কেউ।
ও দিকের গলা বলল, আপনি সেদিন যখন ফোন করলেন আমি তখন সাইকেল নিয়ে পড়াতে যাচ্ছি। কথা হতে পারেনি। আজ তেমন কাজ নেই আমার।
আচমকা ফোন। তবু মণিরেখা যেন কথা বলতে চান। বললেন, তুমি সিন্ধু তো?
ও প্রান্ত বলল, আমারও মনে হয়েছে কখনও আপনার সঙ্গে একটু কথা বলি। আপনার নিশ্চয়ই অনেক অভিমান জমা আমার ওপর।
মণিরেখা চুপ করে থাকলেন। গলা শুনে মনে হয় যেন সঞ্চারীর মতো কেউ। সিন্ধুর গলা ধীর ও শান্ত। সুদর্শন কি স্বরের-ও মোহে পড়েছিলেন! বাড়িতে প্রথম দিকে বলেছিলেন, রাজসাহীর মেলায় গিয়ে আলাপ। রাতে পাশাপাশি বসে গান শুনতে শুনতে কিছু কথা হয়। অবশ্য মণিরেখা সুদর্শনের হোয়াটসঅ্যাপে দুজনের কথোপকথনের যে আঁচ পেয়েছিলেন, তাতে তার পক্ষে এটিকে অন্য রকম সম্পর্ক ছাড়া আর কী-ই ভাবা সম্ভব! মেয়েটি সুদর্শনকে এক জায়গায় লিখেছিল, রাজসাহী থেকে অল্প দূরে নাটোরে রাণী ভবানির দেউলে সারা রাতের মেলা হয়। গান হয়। তাছাড়া আত্রাইতে আমাদের গ্রাম ছাড়িয়েই পতিসর, রবি ঠাকুরের কাছারি। তুমি আসবে না? সুদর্শন উত্তরে লিখেছেন, সম্ভবত আর কখনোই আমাদের দেখা হবে না সিন্ধু…। মণিরেখা ভেবেছেন, সঞ্চারীর বয়সী একটি মেয়ে সুদর্শনকে তুমি করে কেন-ই বা লিখবে!
খানিক চুপ থাকার পর এই দিন মণিরেখা বললেন, অভিমান নয় তোমার ওপর আমার রাগ জমেছিল। অনেক রাগ। তোমাকে ফোনে ধমকানোর কথাও ভেবেছি। তবে এখন সব-ই অতীত। রাগ অভিমান সব। পনেরো-ই জানুয়ারি উনি সব নিয়ে গেছেন।
সিন্ধু বলল, উনি যখন রাতের দিকে কল করতেন, জানি না তখন কেন অলৌকিকের মতো কথা আসত। নিজের মৃত্যুর কথা বলতেন বারবার। আপনাদের পারিবারিক সম্পর্ক যে বেশ গোছানো তা-ও বলতেন। তবু বলতেন সব কিছু ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা। বলতেন আমাদের সবাইকে ছেড়ে দূরে কোথাও যাবেন।
তখন খানিকটা এগোচ্ছে মণিরেখার টেলিফোন সংলাপ। বারান্দায় একলা বসে তিনি বললেন, সে কথা অনেক দিন ধরে আমাদেরও শোনাতেন। আমাকে। মেয়েকে। আমরা শুনতে চাইতাম না। বেশির ভাগ সময়ই হেসে ওড়াতাম। মাস চারেক আগের যে চেক-আপ, সেখানে ইসিজি ইকো সব নর্মাল। তবু এমনটা তো হল…!
রাজসাহী কিংবা আত্রাই-র গ্রাম গ্রাম থেকে সিন্ধু কথা বলছিল ধীর গলায়। গোরাই নদীর কাছাকাছি ওদের গ্রাম। সে গ্রামের ধানের ছড়া-ই হয়ত ওর ফোনের ডিপি। মেয়েটি বলল, মৃত্যুর কথা আমাকেও বলতেন। বলতেন খবর পেলে আমি যেন যাই। ওনাকে যেন গোরাই নদীর তীরে নিয়ে আসি। আমি কিছু বলতে চাইতাম না। মনে হত মানুষকে তার মৃত্যুর স্বপ্নও বলতে দিতে হয়।

মৃত্যুরও স্বপ্ন থাকে মানুষের! মণিরেখা তার এই ছেচল্লিশ বছর বয়সে শুনলেন। তাকে জানাচ্ছে তার মেয়ের বয়সী একটি মেয়ে, যে সুদর্শনের মৃত্যু ভাবনাকেও প্রশ্রয় দিয়েছে। মণিরেখা অবাক হয়ে যান। সিন্ধুকে বলেন, তোমাকে আর কী বলে গেছেন উনি?
বহু দূর অন্ধকার থেকে সিন্ধুর টেনেটেনে বলা কথা। মণিরেখার কানে সুদর্শনের স্মৃতিচারণ। সিন্ধু বলে, আপনাদের সম্পর্ক চব্বিশ বছরের স্থায়ী। সেখানে আমি কে! তবু উনি আমার সঙ্গে জড়ালেন। পরে আমিও খানিকটা। কোনও পরিণতি নেই বুঝে, শেষ পর্যন্ত দূরে যেতে হবে জেনেও। বিচ্ছেদের এটুকু ভাবনা ছাড়া ভালোবাসা গাঢ় হয় না মনে হয়।
সিন্ধু থামল। থেমেই থাকল। অথচ লাইন কেটে গেল না। মণিরেখার মনে হল ফোনের ও পারে কেউ যেন নীরবে কাঁদছে। সুদর্শনকে যে পেতে চেয়েছে ও চায়নি। না-পাওয়া নিশ্চিত জেনেও এগিয়েছে। সুদর্শনও তাই।
ফোনের পর মণিরেখা নিথরের মতো বসে থাকলেন বারান্দায়। নিচে পাচিলের বাইরে তাদের পাড়ার রাস্তা। বড় রাস্তা খানিকটা দূরে। এ দিকটায় কলকাতা শহরের কলরোল ততটা নেই। সুদর্শন দেখে দেখে অপেক্ষাকৃত কম-ব্যস্ত এলাকার চার তলায় ফ্ল্যাট নিয়েছিলেন। দূরে চওড়া রাস্তায় পরপর গাড়ি। দূরত্বটুকুর কারণে রাস্তার শব্দও অনেক কম।
অনেক রাতে তিনি কথা বললেন সঞ্চারীর সঙ্গে। মেয়ে শুতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মা-র কথা শুনল সে। সেদিন যেন মা-র ভেতরের থেকে বলা কথা। মা-কে সিন্ধু যেভাবে যা বলেছে। সঞ্চারী বলল, আমিও আশ্চর্য হচ্ছি মা। এমনটাও হয়!
সঞ্চারী রাগ করল না সেদিন। মা-কে কোনও সতর্কতাও শোনাল না। বরং চলে যাওয়া বাবার প্রতি যেন আর একটু মায়া হল। এত বছর দেখা ও পরে মায়ের হয়ে কথা শোনানোর বাইরে যেন আর এক বাবা। মণিরেখা যখন সম্পর্কটা আবিষ্কার করেছিলেন প্রায় তার পরপরই মেয়েকে খানিকটা বলেছেন। সঞ্চারী দূর থেকে বাবাকে খানিকটা বকাবকিও করেছে। বলেছিল, মা-কে যদি আমার কাছে নিয়ে আসি একা তুমি সামলাতে পারবে তো সব?
এ দিন সঞ্চারী ঘুমনোর আগে মা-কে বলল, তোমার যদি মনে হয় তুমি ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখ। মাঝেমাঝে কথাও বলতে পার। নিশ্চয়-ই খারাপ কিছু হবে না। পারলে ভিসা পাসপোর্ট করে ঘুরে যেতে বল একবার।
ফলে মণিরেখা ফোন করলেন আরও একদিন, বিকেলের দিকে। মনে হচ্ছিল বেশ চেনা কাউকে কল করছেন সেদিন। কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ও পাশের সেই নরম গলা বলল, আপনাকে আমার মনে আছে।
মণিরেখার গলায় অকারণ ব্যাকুল ভাব। বললেন, কাগজপত্র করে সীমান্ত পেরিয়ে তুমি একবার কলকাতায় এসো। তোমাকে দেখতে চাই, তোমাকে কিছু দিতে চাই আমি। এই যোগাযোগটুকু আমাদের থেকে যাক সিন্ধু।
ও পাশের গলা সামান্য হাসল। বলল, আমাকে উনিও দেখা করার জন্য কলকাতায় যেতে বলতেন। কিন্তু ভিসা পাসপোর্টের কত যে ঝামেলা। তাছাড়া সময় পাইনি, আবার ভেতর থেকে রাজিও হইনি। বরং চাইতাম কুষ্টিয়া বা সিলেটের কোনও মেলায় আমাদের আবার কোনও দিন দেখা হোক…। আপনি বরং একবার বাংলাদেশে আসুন। আমাকে আপনি কখনও কিছু দেবেন না। আপনাকে বরং আমাদের স্মৃতির জায়গাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখাব।
মণিরেখা বললেন, যাব সিন্ধু। কখনও তোমার সঙ্গে দেখা হবে। ওনার স্মৃতির জায়গাগুলো ঘুরে দেখে আসব।


পড়তে পড়তে মন ভার হয়ে গেল। খুব ভাল গল্প।
কাঁটাতারের গল্প পড়তে গিয়ে সাত্যকিবাবুর প্ল্যানচেট ও মৃত্যুর পাণ্ডুলিপি মনে পড়েছে। অসমবয়সী নারী পুরুষের প্রণয়, সে’ অর্থে অবৈধ। তিনটি গল্পই ইঙ্গিতবাহী। নারী পুরুষের প্রণয়ের সংজ্ঞা অতিক্রম করে যার ব্যাপ্তি অসীম। গল্পগুলির নামকরণে সে ইশারা থাকে। সূক্ষ্ম ইঙ্গিতবাহী এক দর্শন তিনটি গল্পেরই আত্মা।
তিনটি গল্পেই মূল পুরুষ চরিত্রটি মৃত। এর আগের দুটি গল্পে মৃতের ‘বৈধ’ নারী চরিত্রটি আউট অফ ফোকাস ছিল খানিকটা। নতুন গল্পে তার ওপরেই স্পটলাইট।
কাঁটাতার পেরিয়ে যাওয়ার জন্য এই প্রণয়, মৃত্যুটির এবং মণিরেখার ওপর ফোকাস জরুরী ছিল। এসবই লেখকের গভীর ভাবনার হদিশ । পাঠক তার আভাস পেয়ে যায়।
ভালোবাসার জন্য মন দরকার, বয়স নয়। আর ভালোবাসা হল বহুগামী। কেননা আমরা ভালোবাসি সেটা, যা আমাদের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করে। আমরা তারই প্রতি আকৃষ্ট হই যা নিজের নেই অথচ অন্যের মধ্যে আছে। তাকে আপন করে নেওয়ার নামই ভালোবাসা। সুদর্শন হয়তো সিন্ধুর মধ্যে প্রৌঢ় অবস্থায় সেই সুপ্ত ইচ্ছেকে খুঁজে পেয়েছে যা মণিরেখার মধ্যে ছিল না। তাই একে অবৈধ ভালোবাসা বলতে আমি রাজি নই। আশ্চর্য হই সিন্ধুর চরিত্র নিয়ে। যে কিনা কোনো পরিণতি নেই জেনেও সম্পর্কে জড়িয়েছে। সুদর্শন মারা গেছে জেনেও ফোন করে খোঁজ নিয়েছে তার স্ত্রীর কাছে! কি আশ্চর্য! আবার মণিরেখার কাছ থেকে সে কিছু চায় না একথা বলেই দিয়েছে। বরং প্রেমিকের পত্নীকে তাদের দুজনের ঘুরে বেড়ানো জায়গাগুলো দেখাতে চেয়েছে। অসাধারণ চরিত্র চিত্রণ সিন্ধু ইসলাম।
আবার মণিরেখার একটি কথা মুগ্ধ করে “ঘর না সামলে বাইরেটায় হাত দেওয়ায় কিছু রুচিহীনতা রয়ে যায়”। – এই বাক্যের মধ্যে মণিরেখার চরিত্রসত্তা লুকিয়ে আছে।
চমৎকার ভালো লাগা একটি গল্প। উপস্থাপনও মনকাড়া। ধন্যবাদ লেখককে এত সুন্দর গল্প উপহার দেওয়ার জন্য।