
যাত্রাপথের আনন্দ-গান (নবম পর্ব)
(ধুনকর)
কমপক্ষে তিনবছর খেলা বন্ধ, ডাক্তার বরদলৈ পইপই করে বলে দিয়েছেন। পাড়ায় দুটো মাঠ। একটা বড়, একটা ছোটো। বন্ধুরা বাড়ির পাশের ছোটো মাঠটায় খেলে, ছেলেটা গালে হাত দিয়ে বসে থাকে মাঠের ধারে। চাতক পাখির মতো তাকায়— কখন হুড়ুদ্দুম করে বল আসবে, সে বল কুড়িয়ে লাথি মারবে। দুপুরের আগেই বৃষ্টি থেমেছে। ডুয়ার্সে বৃষ্টি মানে কী ভীষণ বৃষ্টি। থামতেই চায় না। বছরে একটা করে শীত চলে যায়, অমনি কাপড়ে মুড়ে, কষে বেঁধে, লেপ ঝোলাতে হয় বাড়ির সিলিংয়ে। ওগুলোকে ইয়া বড় পাটিসাপটা পিঠের মতো লাগে। পাটিসাপটার ভিতরে তুলতুলে ক্ষীরের পরত। লেপের ভিতরটাও তুলতুলে। কান-মাথা ঢেকে লেপ টানলে দাদুর (ঠাকুরদা) পা লেপের বাইরে বেরিয়ে যায়। অমনি সেই বইটা— রুশ উপকথা “দাদুর দস্তানা”-র গল্পটা মনে পড়ে। ঠকঠক ঠান্ডায় রাস্তায় পড়ে থাকা দস্তানার ভিতর হাঁস, মুরগি, খরগোশ, কাঠবেড়ালি, আরও কত কত প্রাণী একে-একে ঢুকছে। সব্বাই ঢুকতে-ঢুকতে একটা সময় দুম-ফট। ফ্যাট ক’রে দস্তানা ফেটে গেল। ভাগ্যিস লেপ ফাটে না! তবে, ভিতরে ঢুকে পাটিসাপটার মতো গোটাতে গেলে অন্যের ভাগে কম পড়ে। আবার টানটান করতে গেলে লেপের ভিতরে লাথি দিতে হয়। তখন ভিতরের তুলো সরে সরে যায়। ঘরে আলো জ্বলে। পা থেকে মাথা অবধি ঢাকা লেপের ভিতর থেকে ঘরের আলো দেখা যায়। অস্পষ্ট সে আলো। বড়রা বলে আকাশেও নাকি অমন ফুটো হচ্ছে। একদিন সূর্যের আলো আকাশের ঐসব ফুটো দিয়ে বৃষ্টিজলের মতো ক’রে সোজা মাটিতে পড়বে। সব্বার গায়ের চামড়া পুড়ে যাবে। ভালোই হবে। আমি তো কালো, চামড়া পুড়ে গেলে ফরসা হয়ে যাব! বন্ধুরা আর আমাকে “কালা” বলতে পারবে না।
বর্ষাকালে একটানা পনের-কুড়ি দিন বৃষ্টি হ’তে থাকে, হ’তেই থাকে — তখন কী শীত পড়ে! সিলিং থেকে পাটিসাপটা লেপ নামে। দীপাবলি চলে গেলে বাড়িতে ধুনকর আসে। বড় উঠোনটায় তুলো ধুলাই করে। লাল কাপড়ের ভিতর তুলো ঢুকিয়ে বড় সূঁচ দিয়ে সেলাই করে। মাঝেমাঝেই সূঁচটাকে মাথার চুলে ঘষে। যেদিন ধুনকর আসে, সেদিন সেদিন ছুটি। পড়তে হবে না একটুও। ছোটো মোড়া পেতে সারাদিন বসে থাকা যাবে। লেপ বানানো দেখতে কী দারুণ লাগে। ধুনকরের মাথা-নাক গামছা দিয়ে ঢাকা। হাতের লম্বা যন্ত্রটায় মাছ ধরার ছিপের সুতো লাগানো। টান দিলেই টং শব্দ করে। “হরধনু”-র মতো না? যখন ছিলা টান করে, আমি মনে-মনে বলতে থাকি;- ভাঙুক, ভাঙুক এই ধনুকটা। তা’হলে কাল আবার ধুনকর আসবে। কালকেও পড়াশোনা করতে হবে না। রাম যে ধনুকটা ভেঙেছিল, সেটা অনেক লম্বা ছিল। ছবিতে দেখেছি, কী ভারী ! ধুনকরের তুলো কাটার যন্ত্রটার অন্যপাশটা রাসমেলার বন্দুকের বাঁটের মতো। কাকাই বাঁশের কঞ্চি কেটে আমাকেও ধনুক বানিয়ে দেয়। তীর বানিয়ে দেয়। তীরের মাথাগুলো কিছুতেই মহাভারত বইয়ের ছবির মত অত চোখা হয় না। আমি ঘুঘু আর পায়রার পালক কুড়িয়ে আনি। তীরের পিছনে কষে বেঁধে দিই। অর্জুনের তীরের মতো না? বাড়ির পেছনে কত্তো কলাগাছ। ওগুলোকে রাক্ষস ভেবে আমি তীর ছুঁড়ি। আমার না রামের মত তূণীর নেই। কাকাইকে বলতে হবে এরপর এলে আমাকে যেন একটা তূণীর বানিয়ে দেয়! আচ্ছা, রাম আর লক্ষ্মণের তূণীরে অল্প কয়েকটা তীর কেন? রাবণের কত কত রাক্ষস সৈন্য। তূণীরের অত অল্প তীর দিয়ে সবগুলো রাক্ষসকে মারা যায়?

ধুনকর কাঠের অন্য একটা যন্ত্র দিয়ে তুলো ধুনতে থাকে। রুটি বেলনির মতো যন্ত্র। মাথাদুটো আবার কাকাইয়ের ব্যায়াম করার ডাম্বেলের মতো। পিড়িং-পিড়িং করে তুলো ভাঙে। কত তুলো ওড়ে। ঘরের ভিতরেও কী করে যেন তুলো ঢুকে যায়। ধুনকরের মাথার চুল সরষের তেলে চপচপ করছে। কানের পাশ দিয়েও অল্প তেল গড়াচ্ছে। মাথায় অত তেল কেউ দেয় ! লেপ সেলাইয়ের সময় লোকটা হাসে। ঝুলো গোঁফের নিচের ঠোঁটটা ফোলা ফোলা। কোমর থেকে তামাক পাতা আর চুন বের করে হাতে ডলে, ফরাত ফরাত করে হাতে থাপ্পর মারে, তারপর তামাক পাতা ঠোঁটের নিচে গুঁজে দেয়। ওর কানে দুল। আচ্ছা, ছেলেরা কানে দুল পরে? শীতের সময় স্নানের আগে কালোদিদা রোজ মাথায়-গায় সরষের তেল মাখায়। খরখরে কড়ে আঙুলটাকে কালোদিদা সরষের তেলের বাটিতে ডুবায়। তারপর আমার দুই কানে গুঁজে কয়লার উনুনে লোহার শিক খোঁচানোর মতো করে সমানে নাড়ায়। আঙুলের খোঁচায় কী ব্যথা লাগে। সুড়সুড়িও লাগে। তেল দিতে এলেই রাগ উঠে যায়। চিৎকার করে পালিয়ে যাই। গা চ্যাটচ্যাট করে। হাতও। তেল খুউব বিচ্ছিরি!

মাঠের ধারে বড় ডোবা। জলে টইটম্বুর। কচুরিপানা থকথক করছে। ডোবার জলে সাপ আছে। মাছও আছে। প্রতিদিন বিকেলে রাজুর বাবা আর বলাইকাকু ছিপ দিয়ে মাছ ধরে। জর্দার কৌটোর মধ্যে কেঁচো কিলবিল করে। কেঁচো খাওয়া কইমাছ, চ্যাং মাছ, শাঁটি মাছ ওরা খায় কী করে? ঘেন্না লাগে না! ডোবার পিছনে রেল গুদাম, তার পিছনে মিটারগেজ রেললাইন।আলিপুরদুয়ার রেল স্টেশন। আলিপুরদুয়ার জংশন হয়ে প্রথমে আলিপুরদুয়ার কোর্ট স্টেশন, তারপর এই স্টেশন। শহরের অনেকটা বাইরে নিউ-আলিপুরদুয়ার স্টেশন। ওটা অনেক বড়। সকাল, দুপুর আর সন্ধ্যায় আলিপুর জংশন থেকে কয়লার ইঞ্জিনের ট্রেন আর মালগাড়ি ভুসভুস করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বাড়ির পিছনের ছোটো স্টেশনটায় আসে, তারপর নিউ-কুচবিহার অবধি যায়। ওদিক থেকেও আসে। সপ্তাহে দু’দিন দুটো ট্রেন বাংলাদেশ বর্ডারের কাছে গীতালদহ অবধি যায়। ফেরতও আসে। বর্ষাকালে মাঠটা কাদায় ক্যাতক্যাত করে। লম্বালম্বি মাঠের দুই দিকে কাটা সুপুরি গাছের দুটো গোলপোস্ট। পোস্টের উপরদিকে বাঁশ বেঁধে বার বানানো হয়েছে। বাঁশদুটো অল্প বাঁকা। সবাই খালি পা’য় ফুটবল খেলে। বারপোস্টের পিছনের বাড়িটায় মুলি-বাঁশের দেয়াল। ওদের বাড়িতে বল গেলে বাড়ির ভিতর থেকে কী চিৎকার করে! বল আটকে রাখে। রাখবেই তো। গোলে তো আর নেট নেই! ওদের রান্নাঘরের দেয়ালে ঝোলানো থালা-বাসনগুলো বুম-বুম করে ছুটে আসা বলের আঘাতে মাটিতে পড়ে ঝনঝন শব্দ করে। প্রতিদিন কতবার এমন হয়। এরপরেও চিৎকার করবে না? ওরা যখন বল আটকে রাখে, তখন আমার খুব মজা হয়। আমি খেলতে পারছি না, বন্ধুরা কেন খেলবে? সন্ধ্যা হচ্ছে। মাথার উপর গুচ্ছের মশা। কোত্থেকে যেন এসে গোলগোল করে ঘুরছে আর একসঙ্গে সবগুলো পিঁ-পিঁ শব্দ করছে। শঙ্খের ফুঁ শোনা যাচ্ছে। ট্রেনের হুইসিলও। যাই বাড়িতে। দাদু বলেছে; শঙ্খের ফুঁ কানে গেলেই সোজা বাড়িতে ঢুকতে হবে। হাত-পা ধুয়ে কিছু খেয়েই সোজা পড়তে বসতে হবে। বন্ধুরা অন্ধকারে ফুটবল খেলছে। আমি রাস্তার ছোটো পাথরে লাথি দিতে দিতে বাড়ি ফিরছি। মনেমনে ঠাকুরকে ডাকছি আর বলছি— ঠাকুর, এবারে ঐ বাড়িটা যেন বলটাকে আটকে রাখে.. তুমি দেখো ঠাকুর… আজকে বল যেন আর ফেরত না দেয়… প্লিজ ঠাকুর!

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
