
যাত্রাপথের আনন্দ-গান ২
(সোনাব্যাঙ)
সোনাব্যাঙ ইয়া বড় হাঁ-মুখে চুপচাপ বসে থাকে আমার জাঁদরেল ঠাকুর্দার ভয়ে। ড্যাবড্যাব করে তাকায়, চোখের রঙ গোলাপি। ঠিক কতবছর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম মনে করতে পারি না, তবে বাড়ির কেউ বলেছিল ওটা সোনাব্যাঙ। অনেকগুলো বছর ‘সোনা’ আর ‘কুনো’ বিষয়ে আতান্তরে ছিলাম। ব্যাঙ দেখলেই গা ঘিনঘিন করত। বুকে হেঁটে চলা বা জলজ প্রাণী দেখলে সভয়ে দূরে পালাতে চাইতাম। জলজ প্রাণী নিয়ে অসুবিধে কেটেছে কৈশোরেই, বুকে ভর দিয়ে হাঁটে— এমন প্রাণীদের আজও অপছন্দ। তো, যা বলছিলাম; আশ্চর্য হয়ে দেখতাম, সেই সোনাব্যাঙটি ঘরের মধ্যেই থাকে। ঠাকুর্দা যখন যেই ঘরে যায়, সেই ঘরে ঢুকে যায়! আমি তখন খুব বেশি হলে চার বা পাঁচ।
পেশায় ডাক্তার, স্বভাবে সাধু অথচ ক্ষেপে গেলে পরশুরাম— এই মানুষটা আমার কাছে একাধারে পরম আশ্রয়ের জায়গা আবার ভয়েরও। লুঙি পরেই পেশেন্ট দেখতেন গলিরাস্তা লাগোয়া বাড়ির সামনে কাঠের চেম্বারঘরে। দূর-দূরান্ত থেকে পেশেন্ট আসতো। হাফপ্যান্ট আর টুপি মাথায় চা বাগানের ম্যানেজার বা উচ্চপদস্থ কর্মচারী, আবার হা-হাভাতে লেবারও। খ্রিস্টান মিশনারীদেরও আসতে দেখেছি। অল্পদূরেই ভুটান। জয়গাঁ বা ফুন্টলসিং থেকে আসা ভুটানিজদেরও দেখেছি চেম্বারে। এরা এলেই বাড়িটা উৎকট গন্ধে ভরে যেত। ফেরার সময় এরা ঠাকুর্দাকে খাঁটি হিং উপহার দিত।
তো, তিনি যেদিন শহরের বাইরে যাবেন, সেদিন পরনে সাদা ঢোলা ফুলপ্যান্ট, কড়কড়ে ইস্ত্রি, জুতোর কাছটা ফোল্ড করা। গাঢ় রঙের গ্যালেজের ফিতের নিচে ধূসর বা হাল্কা রঙের ফুলশার্ট। মাথায় হ্যাট কখনো-সখনো। আসলে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত “শ্বেতি”-র কারণে সারাবছর ফুলশার্ট পরে শরীর ঢেকে রাখতেন। তখনকারদিনে শ্বেতি রোগটাকে বাঁকা নজরে দেখা হতো। ছোঁয়াচে রোগ ভাবা হতো। ঠাকুর্দা কখনো নিজের ছবি তুলতেন না। মৃত্যুর পর শায়িত শবদেহ ছাড়া তাঁর যৌবন বা বার্ধক্যের কোনো ফটো অন্তত আমার কাছে নেই।

শহর আলিপুরদুয়ার তখন তিনভাগে বিভক্ত। কালজানি নদীতীর লাগোয়া পুরনো শহর, দমনপুর চা বাগান সংলগ্ন আলিপুর জংশন, আর, এই দুইয়ের মধ্যবর্তী নিউটাউন। পুরনো শহরে কালজানি নদী ব্রিজের দিকে যে পাকা সড়কটি উঠে গেছে, সেই সড়ক ধরে রোজ ভোরবেলা একজন বুড়ো লোক, দড়ি দিয়ে বাঁধা একটি তিনচাকাওয়ালা বাচ্চাদের সাইকেলে বছর তিন-চারেকের একটি শিশুকে বসিয়ে আগে-আগে চলতেন। দড়ি বাঁধা সাইকেলটি বুড়োর হাতের টানে পিছুপিছু এগিয়ে যেত। শিশুটি অপার বিস্ময়ে রাস্তার দুধারে টিনের সাইনবোর্ডের ছবি দেখত। ঘড়ির ছবি, মারফি রেডিওর বিজ্ঞাপনে মুখে আঙুল দেওয়া বাচ্চাটির ছবি, আমূল স্প্রে-র টিনের কৌটোর ছবি— আরও কত কী! সব কি আর মনে থাকে? মাঝেমাঝে বুড়ো ভোরের ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়তেন। তাঁর দাদুভাইকে সাইনবোর্ডের অক্ষরগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন। কালজানি ব্রিজ থেকে ফেরার পথে দুর্গাবাড়ির কাছে একটি মিষ্টির দোকানে পুরি-তরকারি খেতেন। শিশুটিও খেত। দাদু-নাতির ব্রেকফাস্ট হয়ে যেত সাতসকালেই।
সোনা ব্যাঙটি অবশেষে নাতির ন্যাওটা হয়েছে। বুড়ো তদ্দিনে পরপারে চলে গেছেন। নাতি ক্লাস টুয়েলভ এবং টুকটাক সিগারেট খায়। টিউশন থেকে ফেরার পথে বন্ধুদের সাথে চারমিনার বা চার্মস-এ কয়েক টান দেয়। তারপর লেবুপাতা মুখে ঘ’সে, আরও ঘন্টাখানেক হাম্বার সাইকেলে প্যাডেল করে, তারপর বাড়ি ফেরে। বাড়িতে মা-বাবা যদি সিগারেটের গন্ধ টের পায় তাহলে নির্ঘাত কেলো হবে। তার চাইতে বাঁধের উপরদিয়ে ঘুরে-ফিরে গন্ধ ঘুচিয়ে বাড়ি ফেরা ঢের ভালো। রাত জেগে পড়তে হবে। স্টকে আছে আকাশনীল ক্যাপস্ট্যান তামাকের প্যাকেট, হাতে বানানো সিগারেটের জন্য কাগজের কার্টিজ। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে “কচ্ছপছাপ মচ্ছর আগরবাত্তি” জ্বালিয়ে একচিলতে পড়ার ঘরে আরামসে সিগারেট বানিয়ে খাওয়া যায়। বদ্ধঘর এমনিতেই কচ্ছপের ধোঁয়া ও গন্ধে ভরা, কে আর ঘুম ভেঙে তহকিকাত করতে আসবে। ব্যাঙ আর কচ্ছপের যুগলবন্দি চলতে থাকে শেষ রাত অবধি।
“কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে” — তবুও বেদনা জাগে, প্রিয় সোনাব্যাঙের জন্য। নাতি তখন কলেজে, ফাইনাল ইয়ার। বাড়ি থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরে, শিলিগুড়ি শহরে। সেই বছর আলিপুরদুয়ারে ভীষণ বন্যা হ’ল। কালজানির বাঁধ ভেঙে শহর প্রায় ১০ ফিট জলের তলায় ডুবে রইল দেড় দিন। জল নেমে গেলেও এক হাঁটু পলির তলায় ক্যাতক্যাত করতে থাকল শহরের বাড়িগুলো। কত শত-সহস্র মূল্যবান দলিল-দস্তাবেজ যে পললসমাধিতে গেল, তার ইয়ত্তা নেই। প্রিয় সোনাব্যাঙটিও পলির তলায় ডুবে মরল। ইয়া হাঁ-মুখ, গোলাপি পাথর বসানো চোখ— ঠাকুর্দা ও নাতি, উভয়েরই বড় প্রিয় সোনাব্যাঙ; কী যে অপূর্ব ছিল সেই অ্যাশ-ট্রে !

