সাঁকোটা দুলছে (১৩ পর্ব)

নৌকা চলেছে নিবেদিতাকে নিয়ে গঙ্গায় ভাসতে ভাসতে বেলুড়ের দিকে। আজ ১৯০২ সালের ৫ জুলাই। জগদীশচন্দ্র এখনও ফেরেননি ইংল্যান্ড থেকে। নিবেদিতা ফিরে এসেছেন ভারতে। জাহাজে তাঁর এবারের সঙ্গী ছিলেন আইসিএস রমেশচন্দ্র দত্ত। ১৯০২ সালেরই ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ তারিখে মাদ্রাজে নামেন তাঁরা। ১৭ নং বোসপাড়া লেনের বাড়িতে নিবেদিতা পৌঁছলেন ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯০২। আজ জুলাই মাসের ৫ তারিখ। নিবেদিতা চলেছেন তাঁর পরম পিতার নিথর দেহের সামনে শেষবারের মতো নতজানু হয়ে বসতে। বেলুড় মঠে গতকাল রাত ন’টায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। যাত্রা করেছেন রামকৃষ্ণলোকে।
ক্রিসমাসের আনন্দে সেজে উঠেছে ১৯০০ সালের উইম্বলডন। ২৪ ডিসেম্বর। রাত বারোটার পর সান্তা ক্লজ সবার বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেবে শুভেচ্ছা উপহার। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন ঘুমন্ত জগদীশচন্দ্রের দিকে। ঘুমিয়ে আছেন তিনি এখনও বিকেলে। যত বিশ্রাম নেবেন তত সুস্থ হয়ে উঠবেন দ্রুত। সান্তা ক্লজ কি রেখে যাবেন ঘুমিয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক বন্ধুর মাথার কাছে সাফল্যের উপহার? ১১ ডিসেম্বর অপারেশন হয়েছে জগদীশচন্দ্রের। মাত্র চোদ্দো দিন হয়েছে। গবেষণার কাজে নেমে পড়ার জন্য অধীর হয়ে উঠেছেন জগদীশচন্দ্র। ডাক্তার বলেছেন, কমপক্ষে দু’মাস বিশ্রাম দরকার। অবলা পাশের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। মাঝরাতে এসে তিনি রাত জাগবেন। তখন নিবেদিতা যাবেন বিশ্রামে। এইভাবেই পালা করে করে রাতদিন পরম শুশ্রূষায় সুস্থ করে তুলছেন তাঁরা বৈজ্ঞানিক জগদীশচন্দ্র বসুকে। আর তাঁদের মাথার উপর বটবৃক্ষের ছায়ার মতো আছেন সারা বুল। তাঁর ব্যবস্থাপনাতেই উইম্বলডনে নিবেদিতাদের বাড়ির ছোট্ট পরিসর ছেড়ে কাছেই উইম্পল স্ট্রিটের এই বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রের বিছানার পাশে চেয়ারে বসে আছেন। সামনে ছোট্ট টেবিল। টেবিলে কলম, কালি, লেখার কাগজ। আজ কিছুটা সময় পেয়েছেন নিবেদিতা। জগদীশচন্দ্র এখন ঘুমোচ্ছেন। প্রিয় জোসেফাইন ম্যাকলয়েড, যাঁকে নিবেদিতা আদর করে য়ুম বলে ডাকেন, অনেকদিন তাঁকে চিঠি লেখা হয়নি সময়াভাবে। নিবেদিতা তাঁকেই চিঠির পর চিঠি লিখে সব জানিয়ে থাকেন। লেখার প্যাড ও কলম তুলে নিলেন তিনি হাতে।
Dr. Bose’s Bedside
29, Wimpole Street London W
Christmas Day, afternoon, 1900
My very most revered – Yum Yum,
Christmas today and your birthday tomorrow and not a word to you these so many weeks! It has not been for want of thinking but every energy was given, absorbed, till a fortnight ago. Then Dr. Bose underwent his operation on the 12th (অপারেশন হয়েছে ১১ ডিসেম্বর, পৃষ্ঠা ৭৫ — আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, মনোজ রায় ও গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য,১ম খণ্ড, বসু বিজ্ঞান মন্দির) and since then we have been in constant attendance on him. He is just round the corner, and his wife has a room in this house, and we take it in turns to spend the hours with him. He is doing splendidly, I think, and we all hope that he will get up far stronger and better than he was before he became ill.”
“তুমি জানো আমার সমস্ত হৃদয় উন্মোচন না করে তোমাকে কখনও কিছু লিখতে পারি না, তাই নীরব ছিলাম। প্রকাশের উপযোগী সুযোগ বা সামর্থ্য পাইনি। যা শিখেছি, শিখছি — তার অর্ধেক যদি তোমাকে বলতে পারতাম। অনেক কিছুই বলতে পারি না, কিন্তু একথা ঠিক, অন্তত আমার তাই বিশ্বাস — আমি সত্যিই শিখেছি, এমন কিছু, যা অপরের সম্বন্ধে সর্বদা কোমলতর, মধুরতর এবং সশ্রদ্ধ করে তোলে।…এখনও জানি না, কিভাবে আমার আত্মাকে অন্যের আত্মার সুরে বাঁধা যায় এবং প্রতি মুহূর্তে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কে আসা যায়। আরও শ্রদ্ধা চাই — আরও- আরও — মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধে — কতখানি যে প্রয়োজন তার!”
নিবেদিতা একবার তাকিয়ে দেখলেন জগদীশচন্দ্রের দিকে। উনি শান্ত সাধকের মতো ঘুমোচ্ছেন।
নিবেদিতা চিঠি দ্রুত শেষ করেন।
“I have been spending this evening with Dr. Bose — and quite naturally I fell to reading bits of the diary that I kept on the voyage.”
অসুস্থ জগদীশচন্দ্রকে নিবেদিতা শোনাচ্ছেন সেই ডায়রির লেখাগুলি, যা তিনি লিখেছিলেন স্বামীজির সঙ্গে জাহাজে আসার সময়ে। যে লেখাগুলি একত্রিত করে বই হবে — The Master as I Saw Him নামে।
নিবেদিতা চিঠি প্রায় শেষ করে এনেছেন। অবলা এবার উঠে আসবে। নিবেদিতা লিখলেন, “আমাদের বন্ধুত্ব ও একত্র কাজের বিষয়ে যখন আমরা কথা বলছিলাম তখন তিনি খুবই সহজভাবে বললেন, এসব কাজ করা কার জন্য তা জানি, এবং সেই ‘কে’ হলেন আমার পিতা (স্বামীজি)।”
“We know to whom we owe it” he says quite simply, when we talk of our friendships and the Work. And the ‘Whom’ is my Father.” ঠিকই তো বলেছেন প্রিয় বৈজ্ঞানিক — নিবেদিতা তো তাঁর পিতার কাজ করে চলেছেন। অলক্ষ্যে তিনিই। যাঁর কাছে তিনি ‘মার্গারেট নোবেল’ সঁপে দিয়ে হয়েছেন শুধু ‘নিবেদিতা’। নিবেদিতা লক্ষ করে দেখেছেন জগদীশচন্দ্র খুব সতর্ক হয়ে কথা বলছেন তাঁর বিশ্বাস ও আবেগ যা কিছুর সঙ্গে যুক্ত সেই বিষয়ে। যেমন নিবেদিতা মাঝে মাঝেই অসুস্থ জগদীশচন্দ্রের পাশে বসে গীতা পাঠ করে শোনাচ্ছেন। জগদীশচন্দ্রের ব্রাহ্ম অহং কিন্তু বাধা দিচ্ছে না। জগদীশচন্দ্র শুনছেন। শুনছেন নিবেদিতার ব্যাখ্যা। তিনিও নানান পৌরাণিক গল্প বলছেন নিবেদিতাকে। বরফ-শীতল ডিসেম্বর মাস গড়িয়ে গেল জানুয়ারি মাসে মনোরম সাহচর্যে সুশ্রুষায়। সারা দিনরাত নিবেদিতার তীক্ষ্ণ নজরদারি ও সেবায় জগদীশচন্দ্র দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। এখন তাঁরা এসে উঠেছেন নিবেদিতার মায়ের বাড়িতে।

নিজের ঘরে নিবেদিতা একা বসে আছেন। ব্রাহ্ম দর্শন নিয়ে আলোচনা চলছে কয়েকদিন ধরেই জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে। সময়াতীত যে অবস্থান, যার কাছে নিবেদন করা যায় মাত্র, তার কি কোনও আকার থাকতে পারে! প্রতীক কল্পনা তো কাল-নিরপেক্ষ নয়। প্রতীকের বিভিন্নতা ধর্মাচরণের বিভেদ তৈরি করে। পৌত্তলিকতা তাই রাজনৈতিক ঐক্য গঠনের বাধা স্বরূপ। সামাজিক উন্নয়নের অন্তরায় এই পৌত্তলিকতার ধারণা। ধর্ম আসলে একম্। অনুষ্ঠান বিচিত্র। আনুষ্ঠানিকতার এই বৈচিত্র্য বিচ্ছিন্নতাবাদের উৎস। বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে আশ্রয় করে বিভিন্ন দেবমূর্তি, প্রতীক। আর প্রতীকের বিভিন্নতার ফলেই মানুষে-মানুষে, ধর্মে-ধর্মে, সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে ঐক্য বিধ্বংসী সংঘর্ষ অনিবার্য। নিবেদিতা আশ্চর্যজনকভাবে দিনের পর দিন জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে ব্রাহ্মধর্ম নিয়ে আলোচনা করতে করতে খুব ভেতরে বুঝতে পারেন যে, নিরাকার পরমব্রহ্মের প্রতি এক অনুভব তাঁর ভেতরে তৈরি হচ্ছে, যা সাকার পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে। বিশ্বময় ধর্ম এক।
জানুয়ারি মাস। ১৯০১ সালের আজ ৪ তারিখ। গভীর রাত। নিবেদিতা নিজের ঘরে লেখার টেবিলের সামনে। তাঁর প্রিয় য়ুমকে জানাতেই হবে ব্রাহ্মধর্ম সম্পর্কে তাঁর বর্তমান উপলব্ধির কথা। বলতে হবে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে নিরাকার পরমব্রহ্ম অনুসন্ধানের প্রতি তাঁর বর্তমান আকর্ষণের কথা, তৈরি হওয়া বিশ্বাসের কথা। লিখছেন চিঠি এই বরফ-পড়া রাতে।
“… I have just tried to write to Swami for his birthday on the 7th, but I cannot. I have torn up the sheet.”
প্রিয় য়ুমকে বলে চলেছেন তাঁর আত্মদর্শন। নানা প্রশ্ন।
“I wish I could come to you Dear, and tell you everything and ask you what I ought and ought not to do.”
দ্বিধা ও দ্বন্দ্বময় এক রাতের অন্ধকার আকাশ-কথা নেমে আসছে কলমে তাঁর।
“And yet the very thought of such a thing seems like selfishness. But it is so difficult to know the Right – so difficult Yum Yum. And so easy to go through life simply fighting and opposing. Have I any business to go on in England? Is it a real call to stay here? – or only a fancied call? As far as wishes go – my whole soul is in India. I am more and more convinced that there is nothing to be done outside. And what I am doing here seems the nearest fancy work.”
নিবেদিতা একটু সামলে নিলেন নিজের আবেগকে। তিনি কি রমেশচন্দ্র দত্ত এবং ক্রপটকিনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কথোপকথনের ফলে অধৈর্য হয়ে উঠেছেন ভারতবর্ষের পরাধীনতার শাপমুক্তির কাজে আত্মনিয়োগ করার জন্য? জানা যায় না। তবে তাঁর আত্মা ভারতসেবায় উন্মুখ। জগদীশচন্দ্র এখন সুস্থ এবং তাঁরা এখন উইম্বলডনের নিজের বাড়িতে আছেন — এই খবরটি লেখার পরেই নিবেদিতা প্রকাশ করেন তাঁর এক আশ্চর্য বোধের উন্মোচন।
“I am trying to get the whole of the Brahmo feeling and tradition honestly. And it seems the right and necessary side to get.”
“আমি খুব ঐকান্তিকতার সঙ্গে ব্রাহ্ম ঐতিহ্য ও অনুভূতি আয়ত্ত করবার চেষ্টা করছি।”
“But at last I think I am getting it all. And I am throwing myself into it completely, as I S.R.K. would wish me to do, and try, if that might be, to reach GOD that way.”
নিবেদিতা ঝাঁপ দিয়েছেন ব্রাহ্ম ধর্মের গভীরতম দর্শনে। এক সময় স্বামীজীর নির্দেশ ছিল, ‘make inroads into Brahmos’। সেই নির্দেশ পালনে নিবেদিতা চেষ্টা করেছিলেন ঠাকুরবাড়ির ব্রাহ্ম সংগঠনে ভাঙন তৈরি করতে। ‘Crusade’ ধর্মযুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই নিবেদিতা আজ উইম্বলডনে নিজের বাড়িতে ১৯০১ সালে ঘোষণা করছেন — যদি সম্ভব হয় এই পথে ঈশ্বরের কাছে যাই। তিনি লিখে চলেছেন অর্গলহীন প্রিয় য়ুমের কাছে।
“You will remember that we (or at least I) did not love even Shiva and Kali at first. Even S.R.K.(Sri Ramakrishna) cannot have loved all religions equally. So I may say without any disloyalty to the effort I am making that at present it is dreadfully like the Puritanism of my childhood. But I feel strongly that the more this is the fact, the more must I try to do it”
তিনি ব্রাহ্ম দর্শন চর্চা ও অভ্যাস করছেন। তিনি বলছেন স্বামীজি এই অনুমোদন দেবেন না কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের কাছ থেকে তিনি সর্ব ধর্মের চর্চার এই তাগিদ পেয়েছেন।
“And sometimes I am quite clear and sure that the call and the effort come straight from S.R.K. Himself. And at other times I think of Swami and shudder – for I do not think he could understand or approve – and to be disapproved of by him is still the uttermost depth of me. Moreover, I seem to be casting away all that I have lived for – all that it has been Freedom to possess – so far. But how mean even to think in such a way! As if it were so dreadful to see one’s own miserable little self in the wrong! No wonder one is so shy of seeing it hungry or cold or ridiculed!”
রাত গভীর। নিবেদিতা যেন নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলে চলেছেন। ড. বোস এবং মিসেস বোস চাইছেন, ভারতে পৌঁছে কলকাতা যাবার আগে ভারতবর্ষের বিভিন্ন পরিচিত জায়গায় এই গবেষণার বিষয়ে যেন বলেন নিবেদিতা। মিসেস বোস বলেছেন, অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো তুমি ঘুরে বেরাবে এই সংবাদ নিয়ে। নিবেদিতা মনে করেন যদি সত্যিই প্রয়োজন হয় এইরকম কাজ করতে তিনি পিছপা হবেন না, বরং মহত্ত্ব মনে করবেন। তাঁর ক্লান্ত মাথা ঝুঁকে পড়ে টেবিলের উপর। ঘুম নেমে আসছে শরীর জুড়ে। সামনে তাঁর কাজের সমুদ্র। ঢেউ এগিয়ে আসছে। অজস্র পাতায় পাতায় বিজ্ঞানের নানা কথা অক্ষরে অক্ষরে এগিয়ে আসছে ঢেউয়ের তালে তালে। নিবেদিতা লিখে চলেছেন সেই সব পাতার অক্ষরমালা, নিজের বয়ানে সাজিয়ে চলেছেন ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে।

নৌকা ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। তাই বোধহয় যায়। বোঝা যায় না কোথায় কতদূর ভেসে চলে যেতে পারে নৌকা সওয়ারিকে নিয়ে। স্রোত জানে। যে ভাসে সে কি জানে? নিবেদিতা বসে আছেন স্থির। রোদে মুখ লাল হয়ে গেছে তাঁর। গোপালের মা মাথায় কাপড় চাপা দিয়ে রেখেছে। নৌকা চলেছে। নিবেদিতা ভাবতে থাকেন তিনি তাঁর আদেশ পালনের কাজই করে চলেছেন। ভারতবর্ষের বিবেক জাগ্রত করার কাজ। শিক্ষিত করে তোলার কাজ। দূরে কোথাও সাঁকো দুলে ওঠে। যে সাঁকো বারবার গড়ে তোলার চেষ্টা প্রতিনিয়ত করে যেতে হয়। সাঁকো দুলে ওঠে। ভেঙে পড়ে। নতুন সাঁকো গড়ে তোলে মানুষ। দুই পাড়ের যোগাযোগ করতে সাঁকো গড়ে, সাঁকো ভাঙে। চমকে ওঠেন নিবেদিতা! ঝটিতি সোজা হয়ে বসতেই নৌকা দুলে উঠল।
‘দেখো, দেখো মার্গারেট, দেখো অবলা! আরে কোথায় গেলে সব?’ জগদীশচন্দ্র চিৎকার করে দ্রুত আসেন লিভিং রুমে। নিবেদিতা আর অবলা কিচেন থেকে দৌড়ে চলে এলেন।
‘কী হল? এত চিৎকার চেঁচামেচি কিসের? ব্রেকফাস্ট রেডি। সবাই টেবিলে এসো।’ অবলা ট্রে রাখেন টেবিলে। নিবেদিতা ফলের রস আর নানা রকম কাটা ফল গুছিয়ে রাখেন টেবিলের উপর।
জগদীশচন্দ্র উত্তেজিত হয়ে চেয়ারে বসেন। ‘দেখো দেখো উইলিয়াম ক্রুক আমাকে কেমন এক চিঠি লিখেছেন! দেখো! শোনো শোনো কী বলেছেন উনি — I have read the most interesting account of your researches with extreme interest. I wonder whether I could induce you to deliver a lecture on these or kindred subjects of research before the Royal Institute.’
নিবেদিতা ঝুঁকে পড়েন ডাইনিং টেবিলের উপর, ‘তার মানে রয়্যাল ইন্সটিটিউটে বক্তৃতা দেওয়ার একটি পথ তৈরি হচ্ছে! এটা আমাদের জয় ‘বো’! আজ কিন্তু দুপুরের লাঞ্চ হবে পাইন বনে!’
অবলা এসে আলতো করে নিবেদিতার কাঁধে রাখেন স্নেহের হাত, ‘সে হবেখন! কিন্তু এত উত্তেজিত হওয়া ঠিক নয়। শুনি শুনি, কী বলেছেন মি. ক্রুক!’
‘সেটাই তো শোনাতে চাইছি! শোনো – If you could do so, I shall be very glad to put your name down for a Friday Evening Discourse after Easter of 1901.’ বুঝলে ফ্রাইডে ইভিনিং ডিসকোর্স-এ বক্তব্য রাখা হল সবচেয়ে গৌরবজনক। কিন্তু…!’ জগদীশচন্দ্র চিন্তিত হয়ে উঠেন।
‘চিন্তার কিছু নেই বেয়ার্ন! তোমার পেপার লেখার কাজ সব আমি সামলে দেব। শুধু তুমি বিষয়গুলো যখন যেমন আসছে লিখে যাও, ভাষার পরিচর্যা সম্পূর্ণ আমার দায়িত্ব।’ নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করে।
‘আমি সেটা বলতে চাইনি মার্গারেট।’ জগদীশচন্দ্র চিঠিটি ভাঁজ করে রাখেন। অবলা ফলের রস ও জলখাবারের প্লেট এগিয়ে দিতে দিতে বলেন, ‘ইস্টারের আগেই তো তোমার ছুটি শেষ হয়ে যাচ্ছে। যে কাঠখড় পুড়িয়ে ভারতের ব্রিটিশ শিক্ষাকর্তারা তোমার ছুটি মঞ্জুর করেছে, মনে হয় না সেই সরকার তোমার ছুটি এক্সটেনশন করবে! তার উপরে আছে তোমার গবেষণার বিরুদ্ধে থাকা এদেশের বৈজ্ঞানিকেরা!’
‘এক্সাক্টলি! আর আমি আর ছুটির জন্য দরখাস্ত করব না, অসম্ভব! চূড়ান্ত অপমানজনক!’ জগদীশচন্দ্র ফলের রসের গ্লাসটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে শেষ করে নামিয়ে রাখলেন।
‘তার মানে তোমরা ধরেই নিচ্ছ যে রয়্যাল ইন্সটিটিউটে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু বক্তৃতা করবে না!’ নিবেদিতা সোজাসুজি বলেন।
‘সম্ভাবনা কম। কারণ এই দেশ একটি পরাধীন দেশের বৈজ্ঞানিককে এখানকার সাদা চামড়ার বৈজ্ঞানিকের নাকের ডগায় ডুগডুগি বাজাতে দেবে না!’ জগদীশচন্দ্র মৃদু হেসে নিবেদিতার দিকে তাকায়।
নিবেদিতা সরাসরি জগদীশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমরা চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেব। তুমি ইস্টারের পর রয়্যাল ইন্সটিটিউটে ফ্রাইডে লেকচার দেবে!’
‘কিন্তু কীভাবে?’ অবলা নিবেদিতার পাশে এসে বসেন। নিবেদিতার এই ভণিতাহীন সরাসরি জড়তাহীন কথাবার্তা অবলার খুব পছন্দের।
‘কীভাবে জানি না। কিন্তু বক্তৃতা বেয়ার্ন দেবে এই বলে রাখলুম আমি! ‘বোস ওয়ার’ শুরু হয়ে গেছে! আমি এই যুদ্ধের একজন সৈনিক। একজন সৈনিকের যুদ্ধে জেতাটাই একমাত্র কাজ।’
নিবেদিতা জোরের সঙ্গে কথা বললে তার একটি ভিত্তিভূমি থাকেই, অবলা সেটা জানেন। নিবেদিতার এই যুদ্ধংদেহী মেজাজের সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচয় আছে জগদীশচন্দ্রের ও অবলার।
অবলা এখানেই থামাতে চান, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, সে পরে হবেখন। এখন জলখাবারের দিকে মন দাও। এসো।’
‘রয়্যাল ইনস্টিটিউটে ফ্রাইডে ইভিনিং ডিসকোর্সে যদি আমার এক্সপেরিমেন্ট দেখাতে পারতাম! অনেকেই পুরোটা তো বুঝে উঠতে পারেননি। যদি এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে বোঝানো যেত এই নতুন মতবাদ…’
নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রের কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠলেন, ‘তুমি কি ড. ওয়ালারের কথা ভাবছ? উনি তোমার নতুন তত্ত্ব মানেন না। উনি তোমার বিরুদ্ধে দল পাকাচ্ছেন!’
‘উনি এই মুহূর্তে গ্রেট ফিজিয়োলজিস্ট! ওঁকে বোঝাতে পারলেই তো বাদবাকি সবাই মেনে নেবেন! কিন্তু এইসব ভেবে তো লাভ নেই এখন!’ জগদীশচন্দ্র খাবারে মন দেন।
‘কেন?’ নিবেদিতা তাকান।
‘আমার ছুটি শেষ হয়ে যাচ্ছে ইস্টারের আগেই। আর ভারতের ব্রিটিশ প্রভুরা আমার ছুটি বাড়াবে না এ আমি নিশ্চিত।’ জগদীশচন্দ্র চামচে স্যুপ তুলে মুখে দিলেন।
নিবেদিতা চুপচাপ বসে থাকেন। নাক, কান, গালদুটি লাল হয়ে ওঠে।
কাজের মেয়েটি কতগুলো কাঠ এনে ফায়ারপ্লেসে দিয়ে যায়। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। আগুনের গনগনে ছায়া পড়ে নিবেদিতার চোখের তারায়।
নিবেদিতা যুদ্ধ-প্রস্তুতি নিতে চলেছেন। তিনি নিজেই এই যুদ্ধের নামকরণ করেছেন ‘বোস ওয়ার’। সমস্ত রকমের সাহায্য-সহযোগিতার সম্ভাবনাগুলো এক জায়গায় এনে ফেলা জরুরি। এই কাজে পরম ভরসা দুই বন্ধু — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রমেশচন্দ্র দত্ত। একজন এই মুহূর্তে ভারতে থেকে সাহায্য করে চলেছেন। তাঁকে সব জানানো জরুরি। অপরজন এই মুহূর্তে এখানে অর্থাৎ ইংল্যান্ডে। প্রাক্তন আইসিএস রমেশচন্দ্র দত্ত ভারতের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য এবং এই মুহূর্তে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি।
বন্ধুত্ব হবার পর থেকেই অগ্রজ বন্ধু রমেশচন্দ্র দত্তের কাছে আলাপ-আলোচনায় এক অন্য ভারতের ছবি দেখতে পাচ্ছেন নিবেদিতা। ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক শোষণে নিষ্পেষিত ভারতের কঙ্কালসার চেহারা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার ভারতবাসী না খেতে পেয়ে মারা গেছে, মানুষের লাশ পড়ে থেকেছে সবুজ উর্বরা ভারতবর্ষের কাঁচা মাটির পথে পথে, তার নেপথ্য কাহিনী শুনেছিলেন রমেশবাবুর কাছে। খরা, উৎপাদন কম, ব্রিটিশ সরকারের খাজনা শোধ করতে না পারায় নির্মম অমানুষিক অত্যাচার নেমে এসেছিল সরল সাদাসিধে রোগাভোগা অর্ধনগ্ন ভারতবাসীর উপর। চক্রবৃদ্ধি হারে খাজনা মেটাতে গ্রামের চাষিরা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে ঘরবাড়ি, জমি-জিরেত, থালা-বাসন, বউ-মেয়ে- ছেলে। নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। রমেশবাবু তাঁর লেখা ‘ফেমিন ইন ইন্ডিয়া’ বইটি তখন নিজের খরচে ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিলি করে বেড়াচ্ছেন বিলেতে ও দেশে। এমনকী লর্ড কার্জন পর্যন্ত বইটি পড়ে বলেছিলেন – It ( Famine in India ) will be most useful to me to have in so concise a form a reasonable and well informed statement…’ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই বইয়ের বিষয় নিয়ে এবং ভারতে ব্রিটিশ অত্যাচার নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি! সবচেয়ে বড় বিষয়টি হল রমেশবাবু তাঁর বইতে ল্যান্ড রেভিনিউ নির্দিষ্ট করার বিষয়ে যুক্তি-নির্ভর সমালোচনা করেছেন, খাজনা নির্ধারণের নির্দিষ্ট পদ্ধতিও বলেছেন, যা আলোচনা হয়েছে লন্ডন পার্লামেন্টের হাউসে। নিবেদিতার কাছে এই বিষয়গুলো এক নতুন জানালা খুলে দিচ্ছে। রমেশচন্দ্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভারতবর্ষকে দেখার এক বাস্তব সুযোগ পাচ্ছেন নিবেদিতা।
“In London, late in 1900, and throughout 1901, it was the pleasure and privilege of my friends and myself to see much of Mr. Dutta in many ways, and one felt more and more… Ramesh Chandra Dutta was a man of his own people. The object of all he ever did was not his own fame, but the uplifting of India.” লিখছেন নিবেদিতা।

নিবেদিতা স্থির তাকিয়ে থাকেন গঙ্গার প্রবাহের দিকে। মাঝি দাঁড় টানছে ছলাৎ ছলাৎ। ভাসতে ভাসতে অনেকটা দূরে চলে গেছেন নিবেদিতা। স্বামীজির দীর্ঘ ছায়ার বাইরে এক চরম যুক্তি-নির্ভর পথ দেখতে পেয়েছেন নিবেদিতা তিনজনের সান্নিধ্যে — জগদীশচন্দ্র, পিটার ক্রপটকিন এবং রমেশচন্দ্র দত্ত। বৃহত্তর বৃত্তের একই কক্ষপথের পথিক মনে হয় যেন সবাইকে নিবেদিতার। নিবেদিতা খুব গভীরে ভেবে দেখেছেন স্বামীজির প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্থা তাঁর আছে। তবুও স্বামীজি-নিরপেক্ষ এক ধরনের স্বাধীন চিন্তা ও ভাবনা গড়ে উঠছে নিজের ভেতরে। গড়ে উঠছে এক নতুন ভারতবর্ষ নতুন অর্থ নিয়ে। হিন্দু জাতীয়তাবাদ থেকে নিবেদিতা খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের দিকে, রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের দিকে। একদিকে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের জয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দরিদ্র ভারতবাসীর জয়-পতাকা, সেই সঙ্গে অদ্বৈতবাদের দর্শনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। এক অভিনব গবেষণার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন বিজ্ঞানী। সেই কাজে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন নিবেদিতা। অপরদিকে ভেঙে পড়ছে প্রাচীন হিন্দু ধর্মের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা তাঁর চিন্তা ও ভাবনা। ক্রপটকিনের সমাজতান্ত্রিক ভাবনায় মানুষের মুক্তির সংগ্রাম, রমেশচন্দ্র দত্তের জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ নিবেদিতার চিন্তন ও মননে গভীর প্রভাব ফেলেছে। নিবেদিতা অনুভব করছেন এক নতুন নিবেদিতা বিকশিত হচ্ছে যেন তাঁর ভেতরে।
আইসিএস রমেশবাবু রিটায়ার করেছেন ১৮৯৭ সালে। তিন বছর হয়ে গেছে। ১৮৯৮ সালে লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে থিসিস সাবমিট করলেন তিনি ‘ইকনমিক ন্যাশনালিটি’-এর উপর। গত বছরে ১৮৯৯ সালে লক্ষ্ণৌ কংগ্রেসে তিনি কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের নানান রূপ নানান ভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এবং ইন্টেলেকচুয়ালদের সামনে তুলে ধরছেন বহু পরিশ্রমে তথ্য সহ। ভারতবর্ষের ঐতিহ্য, ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ভারতবর্ষের মেধা-সম্পদ সব সব তুলে আনছেন একের পর এক ব্রিটিশ জাতির সামনে। তাঁর সর্বক্ষণের চিন্তা ভারত, ভারতবর্ষ এবং ভারতবাসী। ঠিক এই অবস্থান থেকেই তিনি দেখতে চাইছেন জগদীশচন্দ্রের আবিষ্কার ও গবেষণার বিষয়টিকে। ব্রিটিশদের সামনে বিজ্ঞানের এই জয়ধ্বজা তুলে ধরা শুধু জগদীশচন্দ্রের কাজ নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের কাজ বলে মনে করছেন তিনি। জগদীশচন্দ্র তাঁর গবেষণার কাজ এখানেই সম্পূর্ণ করে দেশে ফিরুন — এই ইচ্ছা নিবেদিতার মতো রমেশচন্দ্রবাবুরও। তাঁর জন্য রমেশচন্দ্রের চেষ্টার ত্রুটি নেই। সেই কারণেই লন্ডনে থাকাকালীন তিনি আসছেন মাঝে মাঝেই জগদীশচন্দ্রের কাছে। আসছেন নিবেদিতার কাছে আলোচনায় পথ খুঁজতে। শুনতে চাইছেন সমস্যা ও সংকট।
‘আসুন আসুন মি. দত্ত। আমি আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।’
‘খুশি হলাম শুনে। ইটস্ আ প্লেজার! তা তোমার বৈজ্ঞানিক বন্ধুটি এখন কেমন আছেন? তিনি কোথায়?’
‘তিনি আর অবলা গেছেন ডা. ক্রমবির কাছে। চেক আপে। এমনিতে তাঁর শরীর ভালই আছে।’
‘কাজ শুরু করে দিয়েছেন? আচ্ছা সেই বিখ্যাত ফিজিয়োলজিস্ট ড. ওয়ালার তাঁর সমালোচনা করছিলেন খুব!’
‘ইদানিং আবার তিনি ড. বোসের গুণমুগ্ধ!’
‘ওহ্! ড. ওয়ালার! খুব সাবধান। ওই ভদ্রলোক থেকে একটু দূরত্ব রাখাই ভাল।’
‘না না। উনি এখন ড. বোসকে সাহায্য করার জন্য মুখিয়ে আছেন!’
‘সেটাই তো মুশকিলের ব্যাপার! ভারতীয়দের প্রতি এদের মুগ্ধতার পিছনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্য অঙ্ক থাকে। ডোন্ট মাইন্ড মিসেস নোবেল!’
‘না না। আমি কিছু মনে করিনি মি. দত্ত। আজ যখন আপনাকে ফাঁকা পেয়েছি তখন কিছু বিষয়ে একটু পরিষ্কার করে নেওয়ার সুযোগ ছাড়ছি না।’
‘অবশ্যই!’
‘তার আগে বলুন ব্ল্যাক কফি উইথ…’
‘উইথ নাথিং! জাস্ট ব্ল্যাক কফি!’
‘আপনার সুইট দুই মেয়ে কমলা ও বিমলা কেমন আছে?’
‘ওরা ওদের মতো করে ভালই আছে।’
‘নাইস টু হিয়ার। জাস্ট আ মিনিট, আমি কফি নিয়ে আসছি।’
রমেশচন্দ্র নিবেদিতার পড়ার টেবিলে এক ঝলক তাকিয়ে বইগুলো দেখে নিলেন। নিজেরই ইংরেজিতে অনুবাদ করা ‘মহাভারত — দ্য এপিক অফ এনসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’, তাঁর লেখা ‘হিস্ট্রি অব সিভিলাইজেশন ইন ইন্ডিয়া’, ‘ফেমিন ইন ইন্ডিয়া’ ইত্যাদি। বইগুলো দেখে একবার মৃদু হাসলেন। এসে বসলেন সোফায়। নিবেদিতা কফি নিয়ে এসে বসলেন উল্টোদিকে।
‘আপনার ‘ফেমিন ইন ইন্ডিয়া’ বইটি আমার ভারতবর্ষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে! ল্যান্ড রেভেনিউ নিয়ে এত তথ্যনির্ভর দিকনির্দেশনামূলক লেখা…।’
‘ধন্যবাদ ধন্যবাদ। ওটা তো লিখেছি মূলত ব্রিটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের জন্য আর তাদের ভারতীয় কাউন্টারপার্টদের জন্য।’
‘আপনার কাছে ইকনমিক ন্যাশনালিজম সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। পলিটিক্যাল ন্যাশনালিজমকেও আপনি আলোচনায় এনেছেন। কিন্তু হিন্দু ন্যাশনালিজম কি এনসিয়েন্ট ন্যাশনালিজম নয়? ভারতবর্ষের ভিত কি হিন্দু ন্যাশনালিজমের ঐতিহ্যের উপরে দাঁড়িয়ে নেই?’
‘ওরে বাবা! একসঙ্গে এত প্রশ্ন জমে আছে ভেতরে? বলছি বলছি!’ কফির কাপে খুব বড় করে চুমুক দিলেন রমেশচন্দ্র দত্ত।
নিবেদিতা উৎসাহিত হয়ে বলে চলেন, ‘আপনার ইকনমিক ন্যাশনালিজম একটা নতুন ভাবনা হিসেবে সবাই আলোচনা করছে। সেখানে ভারতীয় ঐতিহ্যের বা সংস্কৃতির কোনও প্রভাব নেই? হিন্দু ধর্মীয় সংহতির যে সুমহান ঐতিহ্য আছে তা কি নেশনহুড তৈরি করে না ভারতবর্ষে? জাতীয় চেতনা তৈরি করে না?’ নিবেদিতা এক ধাক্কায় সব বলে দিয়ে কফির কাপে চুমুক দিলেন আরামে।
‘হিন্দু সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু ন্যাশনালিজম গড়ে উঠেছে যাকে আমি কালচারাল ন্যাশনিলজম বলি। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই কালচারাল ন্যাশনিলজম আরও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি নিয়ে জাতীয়তাবাদের ভাবনার সঙ্গে সহাবস্থান করে। কিন্তু ভারতবর্ষে মুসলিম ও হিন্দু বাদে নানা মতের ও পথের ধর্মাচারণ জড়িয়ে আছে। আলাদা আলাদা সংস্কৃতি কিন্তু সেই আদিকাল থেকে ন্যাশনালিজমের চিহ্নগুলি বিদ্যমান। Cultural Nationalism where the nation is essentially constructed as a community through a historically produced cultural identity.’
‘ বুঝলাম। হিন্দু ন্যাশনালিজম ঐতিহাসিক ভাবেই একটা সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে!’
‘দেখুন মার্গারেট নোবেল, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী ভাবনার মূলে আছে ধর্মাচরণ ও ধর্ম। যদিও খুব গভীরে নিহিত থাকে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের চিহ্নগুলি। কিন্তু বহু ধর্মের মিশ্রিত এই দেশে জাতীয় চেতনা বা নেশনহুড তৈরি করতে অক্ষম। একমাত্র রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করাই জরুরি।’
‘যে মানুষ দেশকে মাতৃভূমি বলে মনে করে এবং একটি ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চর্চা করে, সেটা জাতীয়তাবাদ নয় বলছেন!’
‘একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের আদিকাল থেকে চর্চিত সংস্কৃতি তার জাতীয়তাবাদী চরিত্রের লক্ষণ অবশ্যই। কিন্তু এই নির্দিষ্ট সীমানাযুক্ত ভূখণ্ড তো সেই দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র! সে ওই রাজনৈতিক মানচিত্র নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ, তার খাদ্যাভ্যাস, পরিচ্ছদ, ধর্মাচরণ ইত্যাদি সহ যে সংস্কৃতি সে চর্চা করে, যে অর্থনৈতিক অভ্যাসে তার জীবন জীবিকা চলে, সবকিছু নিয়েই তার আইডেন্টিটি! তার জাতীয় চরিত্র। তার জাতীয়তাবাদী চরিত্রটি তাই রাজনৈতিক। রাজনৈতিক সচেতনতা একজন নাগরিকের প্রয়োজন। ভারতবর্ষের এই চেতনা গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে। ধর্মীয় সাংস্কৃতিক চেতনা তা করতে পারবে না বলে আমি মনে করি।’
‘কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনি কি মনে করেন যে এইভাবে আবেদন নিবেদন করে কিছু সুবিধা আদায় করাটাই একমাত্র মুক্তির পথ এবং সেটা করাই জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসের একমাত্র কাজ!’
‘এটা একটা পথ, এই পর্যন্ত বলতে পারি…কিন্তু একমাত্র কি না তা বলতে পারি না। চরমপন্থীরা আবেদন নিবেদনের এই পদ্ধতিতে বিরক্ত শুধু নয়, পছন্দই করে না।’
‘ড. বোসের এই প্রবল বাধা! এটা তো পরাধীন দেশের একজন বৈজ্ঞানিক বলেই!’
‘অবশ্যই। এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। দেশ-চেতনা, দেশাত্মবোধ জনসাধারণের মধ্যে তৈরি করতে না পারলে ড. বোসের প্রতি যে অপমান হয়েছে বা হচ্ছে তা ভারতবাসীর প্রতি অপমান হিসেবে ভারতবর্ষের মানুষ ভাবতেই পারবে না। এই দেশাত্মবোধ তৈরি করতে পারে সমস্ত ধর্মীয় সাংস্কৃতিক চর্চার উপরে উঠে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ।’
‘ভারতের মাটিতে ভারতীয়দের জন্য জামশেদজি টাটাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করতে না দেওয়া… দেশীয় মানুষকে তার দেশের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করতে দেবে না? ভাবতে পারছেন!’
‘মিসেস অ্যানি বেসান্তকে কাশীতে তাঁর কলেজ স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি ভারতীয় স্টেট সেক্রেটারি লর্ড জর্জ হ্যামিল্টনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। অন্যায় তো হচ্ছেই।’
‘ক্রপটকিন বলছেন, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে হবে। আপনি কি তা বিশ্বাস করেন?’
‘হুম, ক্রপটকিন তো আমার ‘ফেমিন ইন ইন্ডিয়া’ পড়ে চিঠি লিখেছিলেন মতামত জানিয়ে। দাঁড়াও দাঁড়াও, আসল অংশটি পড়ে শোনাচ্ছি।’
‘পড়ুন পড়ুন। আমার ভাবনাচিন্তা পরিবর্তনের অন্যতম কারিগর মি. ক্রপটকিন। পড়ুন।’
রমেশবাবু কোটের পকেট থেকে একটি কাগজ বার করে পড়তে শুরু করেন, “The conditions of your agricultural populations are awfully, terribly similar to those of Russian peasants, and I now will often think that whatever we do in Russia, for awakening the consciousness of the agrarian evil – and anywhere in Europe as well – will be in an indirect way for hundreds of millions of people whom we cannot approach without feeling love for them.”
নিবেদিতা কিছুক্ষণ হাতের তালুতে থুতনি রেখে ভাবলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘আমি মনে করি ওঁর এই কথা প্রণিধানযোগ্য। ভারতবর্ষকে আমি এক আশ্চর্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে শিখছি মি. দত্ত! আপনিই স্বামীজির কাছে অনুরোধ করেছিলেন ড. বোসের গবেষণার কাজে সহায়তার জন্য আমাকে এখানে রেখে যেতে। ড. বোস বলেন আপনি আর স্বামীজি নাকি আত্মীয়!’
‘সত্যি কথা বলতে কী, স্বামীজিকে ছোটবেলায় কখনও দেখেছি বলে মনে হয় না!’ হেসে ওঠেন রমেশচন্দ্র।
‘এটাও শুনেছি।’ নিবেদিতাও হেসে ওঠেন।
রমেশচন্দ্র অন্য কথায় আসেন, ‘ড. বোসের শরীর নিশ্চয়ই তুলনায় ভাল। কাজে ফিরতে আর কত সময় লাগবে বলে মনে হয়?’
‘দু’মাস বিশ্রাম নিতে বলেছেন ডা. ক্রমব।’
‘বাই দ্য বাই, ওঁর গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে হবে কিন্তু এখানে থেকেই! সে বিষয়ে নিশ্চয়ই কোনও দোদুল্যমানতা নেই?’
‘সে তো আমিও চাইছি। কিন্তু বোসের মন ছুটেছে ভারতবর্ষের দিকে!’
‘আচ্ছা মার্গারেট, মিসেস বোসের ওপিনিয়ন কী?’
‘মিসেস বোস এখন ডা. বোসের শরীর নিয়ে বেশি কনসার্নড! তিনি চান সুস্থ হয়ে গবেষণার কাজ সব গুছিয়ে এখানে করাই ভাল! কিন্তু অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা একটি ইস্যু।’
‘হুম! এটাই একটা বড় প্রশ্ন। ছুটি বা ফার্লোর বিষয়টির ব্যবস্থা হয়তো করে ফেলতে পারব। কিন্তু অর্থ জোগাড় করা একটি বড় বিষয়।’
নিবেদিতা যে কথাটা এতদিন ধরে ভেবে আসছিলেন সেটাই তুললেন সরাসরি, ‘ভারতের যে দেশীয় রাজারা আছেন তাঁরা তাঁদের দেশের একজন বৈজ্ঞানিকের এমন বিশ্বজয়ের সম্ভাবনাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবেন না?’
‘মিস নোবেল, আপনার কাছে ভারত এক ধর্মাচরণের ভারতবর্ষ। ধর্মের যে ঐক্য চেতনার ছবি আপনি দেখেছেন — বিবিধের মধ্যে মিলনের সুর। কিন্তু অর্থনৈতিক ন্যাশনালিটি এবং রাজনৈতিক ন্যাশনালিটি ছাড়া ড. বোসের এই সাফল্যকে সমগ্র দেশের সাফল্য বলে গ্রহণ করতে শেখেনি ভারতবাসী। তাঁর পরাজয়কে সমগ্র ভারতের পরাজয় বলে মনে করে না ভারতবাসী। আসলে সার্বভৌমত্বের চেতনা তৈরি করতে হবে ভারতবাসীর ভেতরে, মিস নোবেল।’
‘কীভাবে?’
‘ক্রমাগত আলোচনা, লেখা, লিফলেট, মিটিং, শিক্ষার বিস্তার, স্কুল খোলা ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই কাজ করতে হবে।’
‘একটি সংগঠিত জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তে ড. বোসের জন্য আর্থিক সহায়তার কাজটি অত্যন্ত জরুরি মি. দত্ত।’
‘হুম। আমি জানি। সেটাই আমি ভাবছি। কতটা সময় থাকতে হতে পারে এই দেশে।’
‘আবেদন করা যায় না ভারতীয় জমিদারদের কাছে, যাঁরা ভারতবর্ষের উন্নতিতে এগিয়ে এসে সাহায্য করেন?’ নিবেদিতা অন্যমনস্কভাবে বলে যান।
‘করা যায়। তার আগে দরকার একটা বাজেট তৈরি করা। কতদিন সময় লাগতে পারে ওঁর গবেষণার জন্য, মাসিক কত খরচ দরকার?’
‘ভাবছি কবিবন্ধুকে বিশদে জানিয়ে লিখব। উনি নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন।’
‘লিখুন। আমিও রবিবাবুকে লিখব।’
‘ওই তো ড. বোস ও মিসেস বোস এসে গেছেন।’ নিবেদিতা উঠে দাঁড়ান। জগদীশচন্দ্র অবলার হাত ধরে আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকে সোফায় বসেন।
‘কতক্ষণ এসেছেন? মিস নোবেল না থাকলে তো ফিরে যেতে হত!’
‘আর মিস নোবেলকে রেখে যাবার জন্য যা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হল, বাপ রে!’
সবাই হো হো করে হেসে উঠেন। নিবেদিতা লজ্জায় অবলার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ান।
‘তারপর বলো ডা. ক্রমবি কী বলল?’ জগদীশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে রমেশচন্দ্র বলেন।
‘শরীর ঠিকই আছে! Everything is fine. কিন্তু বুঝলে আমার এখন প্রচুর কাজ। এক্ষুনি আমাকে কাজে নেমে পড়তে হবে। আনন্দধারার মতো চিন্তার নতুন ধারা নেমে আসছে, বুঝলে? গবেষণার নব নব পথ। আমার যদি ওয়ালারের মতন বা ফ্যারাডের মতন একটি গবেষণাগার থাকত! তাহলে এইসব সাদা চামড়ার বৈজ্ঞানিকদের গবেষণার অসারতা প্রমাণ করে ছাড়তাম!’ তারপরেই নিবেদিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমরা কি এক কাপ কফি পেতে পারি না? জানো মার্গারেট, ডা. ক্রমবি বলেছেন, এখন থেকে রোজ হাঁটতে বেরোবেন. আর সাইকেল চালাতেও বললেন ব্যায়াম হিসেবে।’
নিবেদিতা খুশিতে দুলে ওঠেন, ‘খুবই ভাল খবর, কাল থেকেই আমরা পাইন বনে হাঁটতে বের হব। আমি এক্ষুনি কফি করে আনছি!’
‘রয়্যাল ইনস্টিটিউটে বক্তৃতার দিন কবে ধার্য হয়েছে? ওটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট ইভেন্ট আই থিঙ্ক!’ রমেশচন্দ্র কথা ঘুরিয়ে দিলেন।
‘ইস্টারের পর। মানে বসন্ত কালে, ধরা যাক এপ্রিল মাস নাগাদ। তখন আমার ছুটি শেষ এবং এইসব লেখালেখি ট্রাঙ্কে বোঝাই করে নিয়ে যাব দেশে।’
‘ছুটির বিষয়টি আমি দায়িত্ব নিচ্ছি। ওটা নিয়ে অত না ভাবলেও চলবে। কিন্তু সম্পূর্ণ গবেষণার কাজ শেষ না করা পর্যন্ত ভারতবর্ষে ফিরে যাওয়ার কথা মন থেকে মুছে ফেলাই শ্রেয়।’ রমেশচন্দ্র বেশ গম্ভীর ভাবে কথাটা বলে দিলেন।
জগদীশচন্দ্র হাসলেন, ‘বন্ধু, আর কতদিন তোমাদের এমন গলগ্রহ হয়ে থাকব বলতে পারো?’
রমেশচন্দ্র হেসে বললেন, ‘কেউ কারও গলগ্রহ হয়ে নেই। তুমি আমি সবাই আমাদের দেশ ভারতবর্ষের জন্য কাজ করছি ড. বোস! ভারতবর্ষের গৌরবকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করতে এই সংগ্রাম আপনার একার নয়, আমাদের সবার। সবাইকে সবার মতো করেই করতে দিন ড. বোস। মিসেস বোস, প্লিজ এই সংগ্রাম এই যুদ্ধ নিজেদের একক বলে মনে করবেন না। আমাদের সমষ্টির এই যুদ্ধ পরাধীন দেশের দেশবাসীর লড়াই।’
রমেশচন্দ্র থামলেন।
নিবেদিতা কফি নিয়ে এসেছেন। নিবেদিতা তাকালেন জগদীশচন্দ্রের দিকে। একটু কি ভেঙে পড়েছেন তিনি আবার?
‘প্রিয় বেয়ার্ন এবং প্রিয়তমা বো, আজ কিন্তু বিকেলে পাইন বনে টি-পার্টি! আমরা কিন্তু সাইকেলে যাব! খুব মজা হবে। চলুন না আপনি মি. দত্ত আমাদের সঙ্গে!’
রমেশচন্দ্র হেসে ওঠেন, ‘না না, আমার একটা মিটিং আছে হাউসের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে। আপনারা উপভোগ করুন সুন্দর রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেল। আজকের মতো এলাম। আবার আসছি শীঘ্রই। বাই!’
ফেব্রুয়ারি মাসে জগদীশচন্দ্র বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
চমকে উঠেছেন নিবেদিতা। হাতে কফির কাপ থেকে চলকে কফি পড়ল দু-এক ফোঁটা গাউনে। হইহই করতে করতে রিচমন্ড ঢুকল। তার পিছনেই সারা বুল। সুন্দর ফুলেল কাজ করা লং কোটে তাঁকে খুব ভাল লাগছে। হঠাৎ এক লাফে সকালের রোদ ঝলমল করে উঠল এই ঘরে।
‘চলো চলো সবাই বাইরে। এমন ঝলমলে দিনে ঘরে বসে থাকার দিন নয়।’ সারা বুল খুশিতে উচ্ছ্বসিত।
‘ওহ্ গ্র্যানি, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে! আমার মিষ্টি গ্র্যানির জন্য একটি দারুণ খবর আছে!’ নিবেদিতা উঠে গিয়ে সারা বুলের হাত ধরে এনে বসালেন।
‘কী খবর! কী খবর! তোমার এই বিজ্ঞানী পুত্রকে উইলিয়াম ক্রুক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন রয়্যাল ইন্সটিটিউটে বক্তৃতা দিতে!’ নিবেদিতা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন থেমে গেলেন সারা বুলের উচ্ছ্বাসে।
‘কনগ্রাচুলেশন কনগ্রাচুলেশন মাই সন! এখন চলো সবাই সাইকেলে ঘুরে আসি এই রোদে! রিচমন্ড আমার সাইকেল-শিক্ষক! আমি শিখে গেছি। চলো চলো চলো সবাই! মিসেস বোস গেট রেডি কুইক!’ সারা বুল শিশুর মতো আনন্দ করছেন।
নিবেদিতা বলতে চাইছিলেন যে রয়্যাল ইনস্টিটিউটে বক্তৃতার আগেই ছুটি শেষ হয়ে যাচ্ছে, তবে কী করে… ইত্যাদি। কিন্তু থেমে গেলেন।
ঝলমলে রোদে সবাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছেন। নিবেদিতা সাইকেল চালানো রপ্ত করেছিলেন এই অবলা বসু ও জগদীশচন্দ্রের পাল্লায় পড়ে কলকাতায়। অবলা জগদীশ বেশ তরতর করে এগিয়ে চলেছেন সাইকেলে। খুব সুন্দর লাগছে। সারা বুলের পাশে পাশে চলেছে রিচমন্ড। বেশ লাগছে। জগদীশচন্দ্র মাঝে মাঝে এক হাত উপরে তুলে সবাইকে ডাকছেন। খুব রিল্যাক্স লাগছে। বিশাল লেকের পাড় দিয়ে সুন্দর রাস্তা। পাইন গাছের সারি সারি ছায়া। সাইকেল চালাতে আত্মমগ্ন নিবেদিতা। স্বামীজি বিশ্বাস করতেন, ধর্মের সত্যতা বিজ্ঞানের দ্বারা পরীক্ষিত হয়ে সত্য প্রমাণ করে। ধর্ম তো দর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়। তার মানে দর্শনের সত্যতা বিজ্ঞান দ্বারা পরীক্ষা করে সত্য প্রমাণ করার পথ তৈরি করে দিচ্ছেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র। অদ্বৈতবাদ দর্শনের জড় ও জীব সকলের মধ্যে আছে চৈতন্য, চেতনা, প্রাণ। একমাত্র চেতনাই সাড়া দিয়ে থাকে প্রযুক্ত উত্তেজনায়। বিশ্বের দরবারে বিজ্ঞানের পরীক্ষার মাধ্যমে জগদীশচন্দ্র তো এটাই প্রমাণ করতে চাইছেন!
রাস্তা দিয়ে কিছুটা গেলেই কুইন্স লেকের ধারে পাইন বনের পাশ দিয়ে সুন্দর ঘাসের রাস্তা। ওইখানে সাইকেল চালানো বা হেঁটে বেড়ানো খুব মনোরম। নিবেদিতার সাইকেল রাস্তার গড়ান দিয়ে হঠাৎ গড়াতে শুরু করে। নিবেদিতা অতটা পটু নয় সাইকেল চালানো বিষয়ে। সাইকেল থামাতে বা আস্তে করতে পারছে না। ক্রমশই গতি বেড়ে চলেছে। পিছন থেকে রিচমন্ড চিৎকার করছে, ‘সাইকেল থামাও সাইকেল থামাও’। কিংকর্তব্যবিমূঢ় নিবেদিতা। কী করবেন বুঝতে পারছেন না। সাইকেল তাঁকে নিয়ে তীব্র গতিতে চলেছে। সারা বুল চিৎকার করছেন, ‘মার্গট স্টপ স্টপ থামো থামো অ্যাক্সিডেন্ট হবে। থামো।’ নিবেদিতার সাইকেল চলেছে এক বৃদ্ধ মিস্ত্রির দিকে দুরন্ত গতিতে। চিৎকার চেঁচামেচি। জগদীশ-অবলা নেমে পড়েছেন সাইকেল থেকে। নিবেদিতা প্রাণপণ চিৎকার করে মানুষটাকে পথ থেকে সরে যেতে বলছেন। সে বুঝতে না বুঝতেই নিবেদিতার সাইকেল গিয়ে ধাক্কা মারল বৃদ্ধ মিস্ত্রিকে। মিস্ত্রি ছিটকে পড়ল। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল তার ব্যাগ ও যন্ত্রপাতি ঠং ঠং ঠং। নিবেদিতাও রাস্তার ধারে লুটিয়ে পড়লেন। সাইকেল ছিটকে পড়ল আরেক দিকে। দৌড়ে এল রিচমন্ড। তাড়াতাড়ি করে নিবেদিতাকে ধরে দাঁড় করাল। নিবেদিতা ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। অবলা ও জগদীশচন্দ্র এগিয়ে এসেছেন। অবলা হাত ধরে জিজ্ঞ্যেস করেন উৎকণ্ঠায়, ‘লাগেনি তো!’
‘না না!’ অত্যন্ত লজ্জা ও সঙ্কোচে ধুলোবালি ঝেড়ে নিজেকে গুছিয়ে নেন নিবেদিতা।
অবলা ওয়াটার বটল্ থেকে জল দেন নিবেদিতাকে। নিবেদিতা জল মুখে চোখে দিয়ে ধাতস্থ হন। তারপর লেকের ধারে বসে সবাই মিলে তাস খেলা শুরু হয়। ‘হুইস্ট’ খেলতে জগদীশচন্দ্র পছন্দ করেন। জগদীশ ও সারা বুল একদিকে, অপরদিকে অবলা আর নিবেদিতা। সারা বুল তাস সাফল্ করে ডিস্ট্রিবিউট করেছেন তাস। ট্রাম্পকার্ড ডায়মন্ড। জগদীশ তাস মেলে দেন সবার সামনে। ছ’টি ট্রাম্পকার্ড পেয়েছেন জগদীশ। নিবেদিতা চেঁচামেচি শুরু করে দেন— এই রকমভাবে একজনে ছ’টি ট্রাম্পকার্ড পেলে খেলা হবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। সবাই হেসে ওঠে নিবেদিতার ছেলেমানুষিতে। নিবেদিতা জগদীশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকেন। প্রাণখোলা শিশুর মতন হাসি দেখেন প্রিয় বেয়ার্নের চোখে -মুখে। এমনিই হাসিখুশি থাকতে হবে বৈজ্ঞানিককে। বলা ভাল, এমনই হাসিখুশি রাখতে হবে তাঁকে। মাঝে মাঝেই উইম্বলডনের সিনেমা হলে কমেডি বা হালকা গোয়েন্দা গল্পের সিনেমা এলে দলবেঁধে যাওয়া হচ্ছে। সারা বুল সব ব্যবস্থা করে রাখছেন। জগদীশচন্দ্র পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। নতুন নতুন যন্ত্র বানিয়েছেন। রয়্যাল ইন্সটিটিউটে তিনি হাতে কলমে প্রমাণ করে দেখাবেন — বৈদ্যুতিক সাড়া দেওয়াই যদি জীবনের মূল লক্ষণ হয়, তা জড় পদার্থের মধ্যেও বর্তমান। ফিজিয়োলজিস্টদের বিশ্বাসের মূল ধরে টান দেবার জন্য পেপার তৈরি করছেন জগদীশচন্দ্র — On the Electrical Response of Inorganic Substances. পেপারের ছত্রে ছত্রে লেগে আছে নিবেদিতার সাহিত্য রস, জ্ঞান, বোধ, ত্যাগ, তিতিক্ষা, নিষ্ঠা, ভালবাসা। ভালবাসা বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের প্রতি, তাঁর কাজের প্রতি আর তাঁর দেশ ভারতবর্ষের প্রতি।
এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে বেলুড় মঠে লোকজন ভিড় করেছে। শেষবারের মতো দেখে নিতে চাইছেন সবাই তাঁদের প্রিয় মানুষটিকে। নিবেদিতাদের নিয়ে নৌকো চলেছে স্রোতের বিপরীতে। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন নির্লিপ্ত। শোকাতীত এক আশ্চর্য অনুভূতির মধ্য দিয়ে নিবেদিতা চলেছেন। ‘অপ্রতিহত মহাশক্তি তোমাতে জাগ্রত হোক’ — ভেসে আসছে তাঁর লেখা শেষ চিঠির ( ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯০২, বেনারস থেকে লেখা স্বামীজির চিঠি) শব্দগুলি। “সর্বপ্রকার শক্তি তোমাতে উদ্বুদ্ধ হোক! মহামায়া তোমার বাহুতে ও হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হোন। অপ্রতিহত মহাশক্তি তোমাতে জাগ্রত হোক। এবং সম্ভব হলে সঙ্গে সঙ্গে অসীম শান্তিও তুমি লাভ কর – এই আমার প্রার্থনা।” নিবেদিতার মনে তাঁর চিঠির শব্দবন্ধগুলি জেগে আছে। কিন্তু আজ কেন এমন দুর্বল হয়ে পড়ছেন! ভারতবর্ষ এবং ভারতবর্ষের মুক্তির বিষয়ে স্বাধীন ও সুষ্পষ্ট চিন্তা তাঁর গড়ে উঠেছে। তবুও তিনিই তাঁর পথপ্রদর্শক, চিন্তনের তৃষ্ণাবারি তিনিই, তিনিই পিতা, তিনিই স্বামী। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন বেলুড় মঠের দিকে। লোক সমাগম হচ্ছে। ধীরে ধীরে নিবেদিতার হাত দু’টি করজোড়ে উঠে নিজের বুকের উপর। থুতনি স্পর্শ করে দুই হাতের মধ্যমা। চোখের কোণ দিয়ে নেমে আসে গঙ্গা, যমুনা, ভাগীরথী। নৌকোয় ভাসতে ভাসতে দুলে ওঠেন নিবেদিতা।


মানসিক দোলাচল নিবেদিতার জীবনে কত ভাবে যে এসেছে , এবং বিবেকানন্দ প্রকৃত শিক্ষকের মত কোনো সিদ্ধান্তই যে তাঁর উপর চাপিয়ে দেননি ! কি কঠিন পরীক্ষা নিবেদিতার! জীবনে চলার পথে এক একজন মহান ব্যক্তিত্ব তাঁকে কি ভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন , তা এই গবেষণা মূলক লেখা পড়ে জানতে পারলাম, নিবেদিতার বিবেকানন্দ নিরপেক্ষ স্বাধীন চিন্তা! জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া , নতুন ভাবনা নিয়ে ভারতবর্ষ কে সম্মানের সঙ্গে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার চেষ্টা ! খুবই মনোগ্রাহী হয়ে উঠেছে লেখাটি ।
অনেক ধন্যবাদ। সঠিক জায়গাটি ধরেছেন। এই লেখা বা পাঠ কোনো জীবনকাহিনী নয় একটা জার্নি বোধ থেকে বোধে।
নিবেদিতা,জগদীশ চন্দ্র বসু ও রমেশ চন্দ্র দত্ত- এই ত্রয়ীকে একসঙ্গে পেয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছি।এক সাঁকোর পাশে আরো অনেক সাঁকো দেখতে পাচ্ছি।এগিয়ে চলুক পানসি!
সত্যিই তো সাঁকো তৈরি হতেই থাকে বারবার। সঙ্গে থাকুন
কত নতুন কথা জানতে পারছি l মন দিয়ে পড়ছি প্রতিটি পর্ব l