সে অনেককাল আগের কথা – মাত্র পঞ্চবর্ষীয় এক রাজকুমার; সংসার, সৎমা, সৎভাইয়ের প্রতি পিতার পক্ষপাতিত্ব এইসব কিছুর উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে একরাত্রে গৃহত্যাগী হল। ‘হরি হে, দীনবন্ধু…’ -র খোঁজে গভীর অরণ্যে ক্রমশ পুব দিকে এগোতে এগোতে তার সাথে দেখা হল সাত ঋষির। সেই গভীর অরণ্যে অমন দিব্যকান্তি বালকটিকে দেখে যারপরনাই বিস্মিত হলেন সপ্তর্ষি। তাঁদের সাথে প্রাথমিক পরিচয়ের পর কথায় কথায় বালকটি জানাল, সে কিছুই চায় না – অর্থ, রাজ্য – কিছুই না, সে শুধু এমন স্থানে পৌঁছাতে চায় যেখানে এর আগে কেউ কখনো পৌঁছায়নি! বালকটির সব কথা শুনে সপ্তর্ষি তাকে উপদেশ দিলেন – ‘মন দিয়ে ধ্যান করো, ধ্যানবিন্দুতে রাখো ভগবান বিষ্ণুকে’। অতঃপর বালকটি শুরু করল কঠোর নির্জলা তপস্যা। একটা সময় বালকের সাধনায় তুষ্ট হয়ে তার সামনে আবির্ভূত হলেন স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু। বালকটির তপস্যায় সন্তুষ্টি জানিয়ে যখন বর দিতে চাইলেন তিনি, অনিন্দ্যকান্তি সেই বালকটির চাওয়া বর তাঁকে মুগ্ধ করল! আত্মরহিত সেই বালকের তখন একটিই মাত্র চাওয়া – সে নাম-যশ-অর্থ-খ্যাতি এসব কিছুই চায়না, শুধু ভগবান বিষ্ণুর স্তবগান করতে করতে নিজেকে তাঁর চরণতলে নিবেদন করে দিতে চায়! সামান্য এক পঞ্চবর্ষীয় বালকের তাঁর প্রতি অমন অনাবিল আত্মনিবেদনে মুগ্ধ হলেন দীনবন্ধু। এককালে সপ্তর্ষিদের কাছে বালকটি যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, তা তাঁর অজানা ছিল না। তাই তিনি বালকটিকে দিলেন বিষ্ণুমন্ত্র আর এর সাথে তার উত্তরকালের জন্য নির্দিষ্ট করলেন উত্তর আকাশে সকল তারা ও গ্রহগণের উপরে এমন এক স্থান, যেখানে থেকে তার কোনো নড়নচড়ন হবে না! বালকটির নাম অনুসারে আকাশের সেই স্থানের নাম দিলেন ‘ধ্রুবলোক’। আজও প্রতিরাতে দিকভ্রান্ত নাবিক কিম্বা পথ ভোলা পথিক কে দিশা দেখায় সেই তারা। যে তারার স্থানে নিজের প্রিয়াকে বসাতে চান ষোড়শ শতকের ইংরেজ কবি স্পেন্সার, সেই সুরেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায় স্পেন্সারের চেয়ে বছর তিনশোর ছোট, উনিশ বছরের এক তরুণ কবির কলমে – “তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা”। হবে নাই বা কেন, এই মায়া ভরা পৃথিবীতে মানুষ চিরকাল ধরে যা কিছু অজর – অমর – অব্যয়, তাই খুঁজে ফেরে…


‘ধ্রুব’ নামে বালকটির নামে যেমন সেই তারার নামকরণ, তেমনি সেই নাম থেকে আরেকটি শব্দেরও উৎপত্তি – ‘ধ্রুবক’ অর্থাৎ যার কোনো পরিবর্তন নেই। বর্তমান লেখাটির শিরোনামে এই শব্দের ব্যবহার কিম্বা উপরের অনুচ্ছেদটি পড়ার পরে আপনার মনে সন্দেহ দানা বাঁধতেই পারে, এ লেখা নিশ্চয়ই ভক্তিমূলক ধর্মরসে জারিত। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই ধর্মতান্ত্রিক রাজনীতি নিপীড়িত জাতিকে নতুন করে অন্ধ ভক্তির বড়ি গেলানোর ইচ্ছা মোটেই আমার নেই। আমি নিজে আদপে আস্তিক না নাস্তিক, তা নিয়ে আমার নিজের মধ্যেই যথেষ্ট দন্দ্ব চলে সারাক্ষণ। সে চলুক, কিন্তু কোন ভাবনা থেকে এই শিরোনাম, কবে তার বীজ বপন হয়েছিল, তা জানাবার তাগিদে একটু পিছিয়ে যাওয়া জরুরি…
তখন সদ্য শ্রীরামপুর কলেজের গণ্ডি পেরিয়েছি। মফস্বল ছেড়ে প্রথম কলকাতায় নিয়মিত যাতায়াত শুরু হয়েছে, উচ্চ শিক্ষার খাতিরে। তখনও হাওড়া স্টেশন ঢোকার মুখে কারশেডে যেদিন জল জমত না, একদল ছেলেপুলে দিব্যি লাইনের ধারে ক্রিকেট খেলত। তখনও বাসে ভাড়ার চার্ট লাগানো থাকতো আর কন্ডাকটর সেই অনুযায়ী ভাড়া নিত। তখনও সারাবছর ডিজে বাজিয়ে এত পুজোআচ্চার চল ছিল না। বাঙালি তখনও বিরিয়ানি বলতে আমিনিয়া, সিরাজ কিম্বা রয়্যাল বুঝতো আর সস আর শশা ভরা এগরোল পেলেই বর্তে যেত! স্বল্প পুঁজির জীবনানন্দ মোবাইল ফোন গিলে খেতে শুরু করেনি তখনও।
তেমনই এক শ্রাবণ মুখর দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সেমেস্টারের ক্লাস চলছে। ক্লাসের বাকি ছাত্র ছাত্রীরা আমার মত অমনোযোগী নয়। আমার মনের উড়ো ঠিকানার হদিশ সব সময় ঠিকঠাক পাওয়া যাচ্ছে না, আর যখন মাঝে মাঝে পাওয়া যাচ্ছে, তখন সামনের ডায়াস থেকে টুকরো-টাকরা কেজো, সিলেবাসের গন্ধমাখা শব্দ ধরা দিচ্ছে। হঠাৎই খেয়াল হল, স্যার পড়ার বাইরে কিছু বলছেন – কান খাড়া করতেই সেই বক্তব্যের শেষটুকুই শুধু শুনতে পেলাম। ‘যেদিন বিজ্ঞান সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারবে, সেদিন বিজ্ঞানে আর কোনো ধ্রুবকের দরকার পড়বে না!’ কেন জানিনা, কথাটা দারুণ মনে ধরল। আপাত নিরীহ সেই শব্দগুলো যে মগজের জন্য দারুণ খোরাক, বেশ বুঝতে পারলুম। সেই মুহূর্তে আফসোসও হচ্ছিল, কেন যে আগের অংশটুকু শুনলাম না!
কিন্তু যত চুলে পাক ধরেছে, তত মনে হয়েছে, সামনের অংশটুকু না শোনাই শাপে বর হয়েছে। চিন্তা, ভাবনা, কল্পনার একটা খোলা ক্যানভাস পাওয়া গেছে, যেখানে শুধু একটা আদল আছে, কোনো স্পষ্ট অবয়ব নেই, আগে থাকতে রঙ-তুলির কোনো দক্ষ আঁচড় পড়েনি সেখানে। তাই নিজের মত করে ভাবার, জারন করার সুযোগ পাওয়া গেছে। ভাবনার সেই খোলা উঠোনে মনে হয়েছে, আসলে ধ্রুবক শুধু বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নেই, মানুষের প্রতিটা অজানা পথে যখনই সে কিছু ব্যাখ্যা করতে পারেনি, সেখানেই সে ধ্রুবক খুঁজেছে, আর সেই ধ্রুবকের সন্ধানেই সে পেয়েছে তার ঈশ্বরকে! যা কিছু হিসেব তার মেলেনি, বা যেসব হিসেব সে মেলাতে চায়নি, সেখানেই মানুষ ঈশ্বরের দোহাই দিয়েছে। তার প্রতিটি অচেনা সুখ, প্রতিটি চেনা দুঃখ, প্রতিটি অবিচার কিম্বা হঠাৎ পাওয়া সুবিচার, প্রতিটি বিস্ময়, প্রতিটি কান্নার মলম হিসাবে সে ঈশ্বরকে ঠাওর করেছে। তাই তার কাছে ঈশ্বরই ধ্রুবক!
আগেই বলেছি, আমাকে যদি একান্তে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি আস্তিক না নাস্তিক?’, বিশ্বাস করুন, আমি এক কথায় এর উত্তর দিতে পারবো না। একজন সত্যিকারের নাস্তিক হবার জন্য যে চারিত্রিক দৃঢ়তা দরকার, তা আমার মধ্যে অপ্রতুল, সে কথা মানতে কোনো দ্বিধা নেই। তাই বলে আবার ভাববেন না যেন, যারা নির্ভেজাল আস্তিক, তাদের মত অকুন্ঠ সমর্পণ আমার আছে। মন্দির কিম্বা সিঁদুর মাখা শিলা দেখলেই ঢক করে প্রণাম করে নিতে কোথাও যেন আমার বাধো বাধো ঠেকে। ঈশ্বর আরাধনার নামে আড়ম্বর সর্বস্ব আচার-অনাচার-লোকাচার, বিদঘুটে নিয়মের বেড়াজাল, সংস্কারের পৌনপুনিকতা, দেব মাহাত্ম্যের আড়ালে ব্যবসা – বিভেদ – বৈষম্য – বিতন্ডা আমাকে তথাকথিত আস্তিক মার্গের বিপরীতে নিয়ে যায়। আমার বোধবুদ্ধি, যুক্তিবোধ, বিজ্ঞানবোধ আমাকে তখন হাঁটতে শেখায় অজ্ঞেয়বাদের কষ্টিপাথর বেছানো রাস্তায়। আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন অজ্ঞেয়বাদ আবার কী বস্তু!
অজ্ঞেয়বাদ বা Agnosticism – একপ্রকার সংশয়ী জীবন দর্শন, যা নিশ্চিত করে বলতে পারে না, ঈশ্বর আদপেই নেই অথবা আছে। হ্যামলেটের সেই বিখ্যাত অস্তিত্বের দোলাচল – “to be or not to be” -র নির্যাসটুকু যেন শুষে নিতে চায় সেই দর্শন। আদপে প্রাচীন এই জীবন দর্শন, ঋগবেদেও যার উল্লেখ মেলে, তাকেই আধুনিকতার মোড়কে প্রথম পেশ করেন থমাস হাক্সলে। হাক্সলে ছিলেন ইংরেজ জীববিজ্ঞানী। বন্ধু চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ সর্বসমক্ষে তিনিই প্রথম সোচ্চারে সমর্থন করেন। স্বভাবতই যুক্তিবাদী হাক্সলে সাহেব ঘোরতর বিরোধী ছিলেন সেইসব অনুমান, ধারণার যা প্রমাণ সাপেক্ষ নয়। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্টান দ্বারা প্রচারিত মতবাদগুলির সারবত্তা তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি খুঁজে পাননি। বরং তাঁর কাছে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল ড্যানিশ চিন্তাবিদ কেরেকগার্ডের ১৮৪৪ সালে লেখা বই ‘ফিলোসফিক্যাল ফ্র্যাগমেন্টস’ এর একটি অংশ যেখানে কেরেকগার্ড বলছেন, “Let us call this unknown something: God. It is nothing more than a name we assign to it.”
ভেবে দেখুন, অজানা কোন কিছুকে যে সত্যিই ঈশ্বর বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, শৈশব থেকে আমরা তার সাক্ষী। প্রতিটি শিশুর সরল প্রশ্ন “আমি কোথা থেকে এসেছি?” -র প্রত্যুত্তরে সাড়ে নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে সে উত্তর পায়, তাকে নাকি ঈশ্বর মায়ের কোলে রেখে গেছে। প্রতিটি শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল কিংবা চাঞ্চল্য নিবৃত্তির সবচেয়ে সহজ পন্থাই হল, ভগবানের সতর্কবাণী শোনানো। অধিকাংশ গরীব মুটেমজুর তার রুক্ষ ফাটা কপালের জন্য ভগবানের উপর দায় চাপায়, দিন বদলের জন্য চেয়ে থাকে ভগবানের দিকে, আর শেষে ফৌত হয়ে যাবার সময় মনে মনে ভগবানকে বলে, পরের জন্মে যেন রাজার ব্যাটা হয়ে জন্মায়! পাচার হওয়া সেই মেয়েটা রাতের অন্ধকারে যখন খদ্দের নিয়ে ঘরে ঢোকে, তখন মনে মনে ভগবানের কাছে মিনতি করে, যেন সবকিছু ভালোয় ভালোয় মিটে যায়, আর পরের দিন ভোরবেলা স্নান সেরে ভগবানের ছবি সাঁটানো ফ্রেমে ধূপ দেখাতে দেখাতে ভগবানের উপরই অভিমান উগড়ে দেয়, তার এই নিয়তির জন্য। এ এক আশ্চর্য প্রপঞ্চময় জগৎ সংসার!
আসলে আমরা যুক্তি – ভক্তি, সত্য – অসত্য – অর্ধসত্য, বিজ্ঞান – সংস্কার, আশা – নিরাশা, বিশ্বাস – অবিশ্বাস, ঠিক – বেঠিকের কুয়াশা ঢাকা যাত্রাপথে নিরন্তর হেঁটে চলেছি। সেই যাত্রাপথের বিভিন্ন মোড়ে কখনো এই বিশ্বের ইতিহাস, কখনো পৃথিবীর ইতিহাস, কখনো মানবজাতির ইতিহাস, আবার কখনো বা বিজ্ঞান কিম্বা শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস আমাদের জন্য পথনির্দেশ রেখে গেছে…আমাদের কাজ হবে সেইসব নির্দেশগুলিকে যতটা সম্ভব নির্মোহ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করা। যাতে একদিন আমরা সেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি যেখানে বিজ্ঞানে যেমন আর কোনো ধ্রুবকের প্রয়োজন পড়বেনা, তেমনই আমাদের জীবনের প্রতিটা অচেনা অন্ধকারময় গলিপথ হবে রোদ্দুরময়, আলোকিত।
আপাতত অলমিতি।


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 3 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
গৌতম দাশ
গৌতম দাশ
9 months ago

চমৎকার লেখা। সাবলীল গদ্য। পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা রইলো।
আপনাদের কেমন লাগছে একটু এখানে জানাতে পারেন। প্রিয়জনদের শেয়ার করতে ভুলবেন না।