
ঈশ্বরই ধ্রুবক(পর্ব ৮)
সে এক যুগ ছিল বটে… আজ থেকে প্রায় ২৪ কোটি বছর আগের কথা – পৃথিবীময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মস্ত মস্ত সব ডায়নোসরের দল। তাদের উৎপাতে পৃথিবীর বুকে বাকি জীবজগতের প্রাণ ওষ্টাগত; ডায়নোসরের দল যাকে পাচ্ছে, টপাটপ পেটে চালান করে দিচ্ছে! এমতাবস্থায়, প্রায় ২২প কোটি বছর আগে, তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য অভিনব প্ল্যান করলো একদল নব্য প্রাণীসম্প্রদায় – তারা আবার ডায়নোসরদের মত ডিম ফুটে জন্মায় না, তাদের মা’রা তাদের প্রসব করে এবং যেহেতু তারা মাতৃদুগ্ধপোষ্য – তাই তাদের নতুন পরিচয় হল – স্তন্যপায়ী বা Mammals। তা এই স্তন্যপায়ী প্রাণীর দল ঠিক করলো – দিনের বেলায় তারা লুকিয়ে থাকবে, যাতে ডায়নোসরের দল তাদের খুঁজে না পায়; আর রাতের অন্ধকারে যখন ডায়নোসরের দল বিশ্রাম নেবে তখন আকাশ জুড়ে লক্ষ কোটি গ্রহ-তারাদের সতর্ক পাহারায় সেই স্তন্যপায়ীরা বেরোবে নিজেদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের সন্ধানে। কিন্তু সুয্যিমামা পাটে গেলেই পৃথিবী নিজেকে মুড়ে নেয় শীতল চাদরে। সেই শীতল ওম মাখা রাতে খাবার খুঁজতে হলে চাই রক্তের জোর। ডায়নোসরের চেহারা বড় হতে পারে, কিন্তু তার রক্তে সে জোর নেই – তার রক্ত শীতল, তাই রাতের বেলা তাদের গায়ে দিনের বেলার মত তাগত থাকে না! স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে তাদের দেহের রক্ত প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের বাধ্যতায় হয়ে দাঁড়ালো উষ্ণ!
এখন রক্ত গরম হলেই তো শুধু চলবে না! পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রার উত্থান-পতনকে অগ্রাহ্য করে আভ্যন্তরীন উষ্ণতাকে নির্দিষ্ট সুরে বেঁধে রাখার দাবি মেটাতে গিয়েই স্তন্যপায়ীরা নিজেদের দেহের চারপাশে জড়াতে শুরু করল লোমের পশমি সোয়েটার। এভাবেই সর্বপ্রথম প্রাণীদেহের চিকন ত্বকে উদয় ঘটল কেশরাশির – বিবর্তনের সিঁড়িপথে এটি নিশ্চিতভাবেই একটি অসীম গুরুত্বপূর্ণ পয়দান। পরবর্তী যুগে সামান্য কেশবিন্যাসের তফাতেই যে প্রাণীর চেহারা–প্রজাতি আমূল বদলে যাবে – বিবর্তনের সেই ধারার নান্দীমুখ এই ঘটনা। তাহলে একদিকে সেই নতুন প্রজন্মের স্তন্যপায়ীটির মগজ ধীরে ধীরে সরগরম হয়ে উঠছে, অন্যদিকে তার দেহের রক্তেও উষ্ণতার আভাস, ফলে ডায়নোসরদের তুলনায় স্তন্যপায়ীটির দেহের ওজন অনুপাতে প্রায় দশগুণ বেশি খাবার দরকার! তার মানে একদিকে খাবারের চাহিদা বেশি, অন্যদিকে যত্রতত্র ডায়নোসরের জুজুতে চাহিদামত খাবার যোগাড়ে প্রতিবন্ধকতা – এই দুই যাঁতাকলে পড়ে আদিপর্বে স্তন্যপায়ীদের দেহ ছিল খর্বকায়।
কিন্তু, বলে না – জীবনের চেয়ে বিস্ময়কর আর কিছু নেই, প্রাণের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই, সমস্যার সমাধানের চেয়ে প্রয়োজনীয় আর কিছু নেই! সেই সামান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীটিকে রাতের অন্ধকারে খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়াতে হয় – তাই ক্রমশই তার নিজের অজান্তে তার ছোট্ট দেহের এক কোণায় তৈরি হতে শুরু করল স্থানের ধারণা – কোথায় যাচ্ছে, কোন পথে যাচ্ছে, সেই স্থানের স্পর্শ – গন্ধ, সেখানে কী খাবার পাওয়া যাচ্ছে – সব কিছু তথ্য জমা হতে শুরু করল তার মগজের সবচেয়ে বাইরের স্তর – নিওকর্টেক্স-এ (Neocortex)। কয়েক কোটি বছরের বিবর্তন এইভাবে স্তন্যপায়ী প্রাণীটির মধ্যে দিকনির্দেশ বা Navigation -র একটা আদল নির্মাণ করে দিল এবং তাদের অবচেতনে এঁকে দিল বাসায় ফেরার আলপনা… জীববিবর্তনের ধারাপাতে এ এক গুরুত্বপূর্ণ এবং অসীম সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের সূচক! যে অভিজ্ঞতাসঞ্জাত স্মৃতি সেই প্রথম যুগের মুষিক সম স্তন্যপায়ীদের পরিচালিত করছে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহের আলো-আঁধারি গলিখুঁজিতে, সেই অভিযাত্রারই কয়েক কোটি বছরের ছায়াপথ পেরোনোর পরিণাম – সম্ভবত জীবজগতের সবচেয়ে জটিলতম সৃষ্টি – হোমো স্যাপিয়েন্সের মস্তিষ্ক! কিন্তু সে তো অনেক পরের কথা – খর্বদেহ নিঃসহায় সেই আদি প্রজন্মের স্তন্যপায়ীদের মগজ সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সবে মাত্র কয়েক কদম অগ্রসর হয়েছে! তবে ওই যে বলে না, সময় সকলের সর্বদা এক থাকে না… স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রেও হঠাৎই ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল – তৈরি হল এক অনুকূল পরিস্থিতি। কিন্তু কীভাবে…
১৯৭৮ সাল, যে বছর মেনোত্তি মনে করেছিলেন – ছোকরা বড্ড কচি, দেশের মাঠে ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার চাপ নিতে পারবেনা, তাই তাকে বাদ দিয়ে টিম গড়েছিলেন এবং পাসারেল্লার নেতৃত্বে সেই টিম প্রথমবারের জন্য বিশ্বকাপ জিতেছিল। পরবর্তীকালে কোচ মেনোত্তিকে ক্ষমা করলেও, সেই টিমের ক্যাপ্টেন পাসারেল্লাকে কোনোদিন মাফ করেনি সে ছোকরা। এবং তার ঠিক আট বছর পরে, সারা পৃথিবীকে সেই ছোকরা, না সে তখন আর ছোকরা নেই, খ্যাতির মধ্যগগনে থাকা সেই যুবক দেখিয়ে দিয়েছিল – কীভাবে একা নিজের দেশকে আরো একবার বিশ্বকাপ জেতাতে হয়। মেক্সিকোর প্রতিটা মাঠের প্রতিটা ঘাস আজও হয়তো রোমাঞ্চিত হয় – মারাদোনার প্রতিভার সেই অবিশ্বাস্য বিস্ফোরণে! তবে সেই দেশ এর আগেও এরকম বিস্ফোরণের সাক্ষী থেকেছে, যার অভিঘাত সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল…
আবার ১৯৭৮ সালে ফিরে আসি, তবে এবার মেক্সিকোর মাটিতে। সে বছর মেক্সিকোর জাতীয় তেল কোম্পানি পেমেক্স (Petróleos Mexicanos বা Pemex) সার্ভের কাজে ইউকাটান উপদ্বীপ অঞ্চলে পাঠায় তাদের দুই ভূতত্ত্ব বিশারদ কর্মচারী – গ্লেন পেনফিল্ড এবং অ্যান্টোনিও কামারগোকে। তেল কোম্পানীগুলি মাঝে মধ্যেই সার্ভে করে দেখতে চায় – ভূস্তরে কোথায় অভিকর্ষ বল বা ভূ-চৌম্বকত্বের কীরকম হেরফের ঘটছে, যাতে তারা আন্দাজ করতে পারে – মাটির নিচে কী পরিমাণ খনিজ তেল সঞ্চিত আছে। পেনফিল্ড এবং কামারগো সরেজমিনে বিভিন্ন স্থানে জরিপ চালাতে গিয়ে দেখেন – একটি নির্দিষ্ট এবং বৃহৎ গোলাকার অঞ্চল জুড়ে অভিকর্ষ বলের অস্বাভাবিক তারতম্য। তারা সন্দেহ করেন – এটি একটি বিশালাকার উল্কাপাতের ফল এবং এই উল্কাপাতের সময়কাল কয়েক কোটি বছর আগেকার! কিন্তু তারা যে কোম্পানি দ্বারা নিয়োজিত, সেই পেমেক্স আখেরে মুনাফা লোভী কর্পোরেট সংস্থা। তারা বাণিজ্যিক কারণে এই পর্যবেক্ষনটিকে পুরোপুরি লোকসমক্ষে আসতে দিতে রাজি নয়। এর আগেও তারা এই জাতীয় আরেকটি পর্যবেক্ষনকে চেপে দিয়েছিল। তবে এবারে তারা পেনফিল্ডদের শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দিল – কিছু নির্দিষ্ট তথ্য ১৯৮১ সালে ১১ থেকে ১৫ই অক্টোবর লস আঞ্জেলেসে আয়োজিত সোসাইটি অফ এক্সপ্লোরেশান জিওফিসিস্ট কনফারেন্সে পেশ করার জন্য। সেখানে পেনফিল্ড এবং কামারগো তাদের পর্যবেক্ষণ উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য, সেবার কনফারেন্সটিতে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য ভাবে কম। কারণ তার পরের সপ্তাহেই ১৯ থেকে ২২ অক্টোবর, ১৯৮১ তারিখে উটা শহরে আয়োজিত হয়েছিল আরো একটি কনফারেন্স – স্নোবার্ড লার্জ বডি ইমপ্যাক্ট কনফারেন্স …

সাতের দশকের মাঝামাঝি, মধ্য ইটালির একটি শান্ত শহর গাব্বিও। সেখানে বিভিন্ন শিলাস্তর নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন মাঝ বয়সী এক ভূবিজ্ঞানী – ওয়াল্টার আলভারেজ। মাটির নিচে বিভিন্ন স্তর ভালো করে পর্যবেক্ষন করলে বোঝা যায় – আনুমানিক কত লক্ষ বা কোটি বছর আগে তা সৃষ্টি হয়েছিল। বিভিন্ন স্তরের জীবাশ্ম বা অন্যান্য প্রস্তরীভূত জীব অবশেষ থেকে সমকালীন পৃথিবীর জীবমন্ডলের আন্দাজ পান বিজ্ঞানীরা। আলভারেজ যে স্তরগুলি থেকে নমুনা সংগ্রহ করছিলেন সেগুলি প্রায় সাড়ে ছ’কোটি বছর আগেকার। বিজ্ঞানীরা ততদিনে সেই সময়কালকে অত্যন্ত্য গুরুত্বপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন – ক্রেটাসিয়াস-টারশিয়ারি বিলুপ্তির ঘটনাকাল (K-T Extinction Event)। কী ঘটেছিল, তা ক্রমশ প্রকাশ্য। আলভারেজ লক্ষ্য করলেন ক্রেটাসিয়াস স্তরের ঠিক ওপরেই ১ সেমি. পুরু একটি লাল স্তর। স্তরটি তার উপর কিম্বা নিচের ভূস্তরের থেকে একদমই আলাদা। আরো আশ্চর্যজনক – স্তরটিতে কোনো ধরণের কোনো জীবাশ্মের হদিশ পেলেন না আলভারেজ। কৌতুহলি আলভারেজ স্তরটির নমুনা নিয়ে সোজা উড়ে গেলেন – পৃথিবী বিখ্যাত লরেন্স-বার্কলে ল্যাবরেটরি, যেখানে গবেষণা করেন তার বাবা – লুইস ওয়াল্টার আলভারেজ, যিনি কয়েক বছর আগে, ১৯৬৮ সালে পার্টিকল ফিজিক্সে নোবেল পেয়েছেন!
বাপ-বেটা দু’জনে মিলে পরীক্ষা করে যা দেখলেন – তাতে তাদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবার জোগাড়। স্তরটিতে মাত্রাতিরিক্ত ইরিডিয়াম (Iridium) উপস্থিত! এমনিতে পৃথিবীতে ইরিডিয়াম নামক মৌলটি অত্যন্ত্য দুষ্প্রাপ্য – যে কারণে এটিকে বিরল মৃত্তিকা মৌল বা Rare Earth Element বলে। অথচ পরীক্ষাধীন এই স্তরটিতে এমন পরিমাণে ইরিডিয়াম মৌলের উপস্থিতি স্পষ্টতই জানান দেয় – এই স্তরটি সৃষ্টির পিছনে আছে কোনো বহির্জগতের উল্কাখন্ড। উল্কাপাতের অভিঘাতে যে ধুলো ওড়ে, সেই ধুলোর সাথেই উড়তে থাকে উল্কার মধ্যে থাকা এই ধরণের বিরল মৃত্তিকা মৌলরাশি। কালের নিয়মে সেই ধুলো থিতু হয় পৃথিবীর বুকে, তৈরি হয় নতুন স্তর; সময় বয়ে চলে এবং তার স্বাক্ষর রয়ে যায় স্তরের ‘পরে জমা স্তরগুলিতে। আলভারেজরা হিসেব করে দেখেন, বিবেচনাধীন স্তরটিতে যে পরিমাণ ইরিডিয়াম আছে, সেই পরিমাণ ইরিডিয়াম জমতে হয় অনেক সময় লাগবে, নতুবা প্রচুর পরিমাণ ইরিডিয়ামের ধুলো বাতাসে ভেসে বেড়াতে হবে। প্রথম সম্ভাবনাটি বাস্তবে ঘটে থাকলে বিবেচ্য ১ সেমি স্তরটির আরো পুরু হওয়া উচিত ছিল। অতএব দ্বিতীয় বিকল্পটিরই এক্ষেত্রে ঘটার সম্ভাবনা জোরালো। তারা অনুমান করলেন – এই স্তরটি নির্মাণ হতে সময় লেগেছে বড়জোর হাজার পাঁচেক বছর। কিছুদিনের মধ্যেই পৃথিবীর অন্যান্য স্থান থেকেও একইরকম স্তরের খবর তাদের কাছে আসতে শুরু করল। শেষমেশ ১৯৮০ সালে আলভারেজ বাপ-বেটা বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো দু’জন – নিউক্লিয়ার রসায়নবিদ ফ্রাঙ্ক আসারো এবং জীবাশ্মবিদ হেলেন মিচেলের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে বিখ্যাত ‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশ করলেন তাদের যুগান্তকারী মতবাদ।

তারা বললেন – প্রায় ৬.৬ কোটি বছর আগে, ক্রেটাসিয়াস-টারশিয়ারি যুগের অন্তিম লগ্নে পৃথিবীর বুকে প্রায় দশ কিলোমিটার ব্যাসের একটি উল্কাখন্ড আছড়ে পড়েছিল, যে কারণে পৃথিবীর বুক থেকে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জীবপ্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই বিশালাকার উল্কাপিন্ডটি যখন পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে, তখন তার ফলস্বরূপ যে উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছিল, তা বর্তমান পৃথিবীর প্রত্যেকটি যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে যত পারমাণবিক বোমা সঞ্চিত আছে, সেগুলোকে একসাথে ফাটালেও তার ধারেকাছে পৌঁছুতে পারবে না! সে এক এমন অবিশ্বাস্য তাপমাত্রা, যাতে নিমেষে বাষ্পে পরিণত হয় উল্কাখন্ডটি! বাদ যায় না অভিঘাত সংলগ্ন অঞ্চলের আশেপাশের মাটি… সেই অস্বাভাবিক তাপমাত্রায় তার কিছুটা বাষ্পে, কিছুটা গলে তরলে পরিণত হয় এবং পরবর্তীকালে তা ঠান্ডা হয়ে টেকটাইট শিলার জন্ম দেয়। স্বাভাবিকভাবেই সেই উত্তাপ সহ্য করার ক্ষমতা আশেপাশের জীবকুলের ছিল না, নিমেষে নিকেশ হয়ে যায় তারা। সেই প্রবল সংঘর্ষের পরেপরেই পৃথিবী জুড়ে শুরু হয় ভূমিকম্প, খুলে যায় আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ, আছড়ে পড়ে পর্বতপ্রমাণ সুনামি। সেই প্রলয়কালে উদ্ভুত বিষবাষ্প সারা পৃথিবীর আকাশ জুড়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য ছড়িয়ে পড়ে, ঢেকে দেয় সূর্যকিরণ, সালোকসংশ্লেষ করতে না পেরে বহু উদ্ভিদকুল চিরতরে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এর অবশ্যম্ভাবী প্রভাব পড়ে বাকি বাস্তুতন্ত্রের উপরেও। মহাপ্রলয়ের এই সাংঘাতিক লীলা সেখানেই শেষ হয় না, এরপর শুরু হয় পৃথিবী জুড়ে অ্যাসিড বৃষ্টি। ফলত অধিকাংশ জীবপ্রজাতির কাছে অবলুপ্তি ব্যতীত আর কোনো পথ খোলা ছিল না…
জীবাশ্মবিদরা ততদিনে মোটামুটি একমত ছিলেন যে ক্রেটাসিয়াস-টারশিয়ারি যুগের শেষের দিকে পৃথিবীর বুক থেকে সত্যি সত্যিই কোনো এক আশ্চর্য কারণে দুই-তৃতীয়াংশ জীব বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কারণ তারা দেখেন সেই যুগের শিলাস্তরে যেসব জীব দেহের প্রস্তরীভূত নমুনা পাওয়া যাচ্ছে, তা তার পরবর্তী শিলাস্তরে অনুপস্থিত। কিন্তু তাদের মত ছিল – এই বিলুপ্তি ক্রমে ক্রমে কয়েক লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য হয়েছিল, যার পিছনে উল্কাপাতের মত কারণ থাকলেও থাকতে পারে। স্বভাবতই তারা আলভারেজদের এই তাৎক্ষণিক বিলুপ্তি তত্ত্বে অনৈক্য প্রকাশ করলেন। বস্তুত, সায়েন্স পত্রিকায় পেপার পাবলিশ হবার পরে পরেই ১৯৮১ সালের ১৯ থেকে ২২ অক্টোবর উটা শহরে আয়োজিত স্নোবার্ড লার্জ বডি ইমপ্যাক্ট কনফারেন্সে আলভারেজদের দলকে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়। ছিদ্রান্বেষী বিজ্ঞানীরা গম্ভীরমুখে প্রশ্ন ছুড়লেন – সবই তো বুঝলুম, কিন্তু এত বড় উল্কা পড়লে পৃথিবীর বুকে কোথাও না কোথাও তো তার ছাপ থাকবে? সে তো আর ভোজবাজির মত ভ্যানিশ হয়ে যাবে না…! আলভারেজদের দল যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করলেন – উল্কাখন্ডটি সম্ভবত মহাসাগরের মাঝে পড়েছিল, তাই সেই ক্রেটার অর্থাৎ গর্তটিকে খুঁজে পেতে গেলে মহাসাগরগুলির তলদেশগুলিতে নজর দিতে হবে। এছাড়াও আরেকটি সম্ভাবনার কথাও তারা ভাসিয়ে দিয়েছিলেন – যেহেতু ঘটনার পর প্রায় সাড়ে ছ’কোটি বছর অতিক্রান্ত, যে সময়ে ভূপৃষ্ঠের আমূল বদল হয়ে গেছে, তাই সেই সংঘর্ষস্থলটিকে খুঁজে পাবার সুযোগ কম! ইস, ওনারা যদি একটু চোখ, কান এবং সর্বোপরি মনের দরজা-জানলাগুলো খোলা রাখতেন…
ঠিক এর আগের সপ্তাহেই মাত্র ৭০০ মাইল দূরে আয়োজিত আরেকটি কনফারেন্সে বিখ্যাত তেল কোম্পানীর দুই অখ্যাত কর্মচারী আলভারেজদের মতবাদের পক্ষেই সবুত দাখিল করেছিল। তারা বলেছিল – ‘আমাদের অনুমান – মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপ অঞ্চলে খোঁজ পাওয়া আলোচ্য এই স্থানটির গঠনকাল ক্রেটাসিয়াস – টারশিয়ারি যুগের শেষবেলায় এবং যে উল্কাপাতের জন্য সারা পৃথিবী জুড়ে ইরিডিয়াম সমৃদ্ধ শিলাস্তরটির খোঁজ মিলছে বলে বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিককালে দাবি করছেন, তার সাথে এই স্থানটির প্রত্যক্ষ্য সম্পর্ক আছে…তাই আমরা এই ক্ষেত্রে আরো অনুসন্ধানের জন্য সকলকে আহ্বান জানাচ্ছি’। আলভারেজদের দাবির সপক্ষে একেবারে স্পষ্ট সওয়াল! বস্তুত, পেনফিল্ড ১৯৮০ সালে আলভারেজদের পেপার বেরোনোর সাথে সাথেই এ বিষয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য চিঠি লেখেন। কিন্তু কে না কে, কী ছাইভস্ম লিখেছে – সেসব নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বোধ করেননি কৌলিন্যের ঠুলি পরা নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী এবং তার বিজ্ঞানীদল। দুর্ভাগ্য বিজ্ঞানের! অবশ্য এর’ম বিজ্ঞানের অতীতপৃষ্ঠায় একাধিকবার ঘটেছে…
শেষমেশ ‘মেলাবে সে মেলাবে’ -র দায়িত্ব পালন করেন কানাডার এক ভূত্তাত্ত্বিক অধ্যাপক হিল্ডেব্রান্ড। ১৯৮৯ সাল নাগাদ তিনি ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের হাইতি দ্বীপে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে এক টেকটাইট শিলাস্তরের খোঁজ পান যার চরিত্র বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় – এটি সেই ক্রেটাসিয়াস – টারশিয়ারি পর্বের শেষ লগ্নজাত এবং তখনো অব্দি ‘অধরা মাধুরী’ উল্কাটির সম্ভাব্য সংঘর্ষস্থলের কাছেই অবস্থিত। এই সময়ে তার এক পরিচিত কার্লোস বায়ার বছর দশেক আগেকার একটি আবিষ্কারের দিকে হিল্ডেব্রান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। হিল্ডেব্রান্ড কালক্ষেপ না করে সরাসরি যোগাযোগ করেন সেই আবিষ্কারক পেনফিল্ডের সাথে। পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে তারা একসাথে আরেকটি পেপার পাবলিশ করেন যেখানে আলভারেজ বর্ণিত উল্কাপাতের আঘাতস্থানটি চিহ্নিত করতে তারা সমর্থ হন এবং সেই সাথে ক্রেটাসিয়াস – টারশিয়ারি যুগের অন্তিমলগ্নে জীবজগতের হন্তারক হিসাবে উল্কাপাতের তত্ত্বটিকে প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ৩০০ কিলোমিটার চওড়া এই ক্রেটারটির তারা নাম দেন এর কেন্দ্রস্থিত ছোট্ট মেক্সিকান শহর – চিক্-সুলুব পুয়েব্লো-র (Chicxulub Pueblo) নামে চিক্-সুলুব ক্রেটার। পরবর্তীকালে পেনফিল্ড একবার বলেছিলেন – যেসব বুদ্ধিজীবি তার প্রাথমিক আবিষ্কারকে বিদ্রূপ করেছিল, তারা যাতে প্রতিবার ক্রেটারটির নামোচ্চারণে হোঁচট খায়, তা নিশ্চিত করতেই এই নামটির আশ্রয় নিয়েছেন তিনি!

একটু আগে ভাগ্যের চাকা ঘোরার কথা বলছিলাম না, সেখানেই আবার ফিরে আসা যাক – চিক্-সুলুব ক্রেটারে যে উল্কাখন্ডটি প্রায় ৬.৬ কোটি বছর আগে আছড়ে পড়েছিল, তার অভিঘাতেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় সমসাময়িক অধিকাংশ জীবকুল। তা সত্ত্বেও, মহাপ্রলয়ের সেই যুগ সন্ধিক্ষণে পেরিয়ে রয়ে যায় প্রাণের চিহ্ন। বসন্তের কচি পাতার মত আবার তারা গজিয়ে ওঠে পৃথিবীময়। প্রাণ সম্ভাবনার নতুন বীজপত্র ফুটে বেরিয়ে আসে নানান প্রজাতি – যে স্তন্যপায়ীরা একসময় ডায়নোসরদের ভয়ে ছিল প্রায় অসূর্যম্পশ্যা, ডায়নোসরদের অনুপস্থিতিতে তারাই পালে হাওয়া পায়। জীবজগতের মহাবিলুপ্তির পরে প্রকৃতিতে যে অবশ্যম্ভাবী শূণ্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, তাকে পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগায় নবযুগের প্রাণীকুল, বিশেষত স্তন্যপায়ীরা। দিনের আলোয় নতুন খাবারের সন্ধানে তারা ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিভিন্ন দিকে। ফলে তাদের মস্তিষ্কে দেশ-কালের ধারণা আরো সুস্পষ্ট হতে থাকে। মস্তিষ্কবিকাশের সেই ধীর অথচ সাবলীল স্রোতে ভাসতে ভাসতে স্তন্যপায়ীরা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নতুন প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে… এবং একসময় বিবর্তনের পর্যায়সারণিতে আবির্ভাব ঘটে হোমো ইরেকটাস এবং তার পরবর্তীতে হোমো নিয়ানডারথ্যালের…
আমার পাঁচ বছরের জন্মদিনে এক পরিচিত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে লেখা ছোট একটি বই আমায় উপহার দেন, কিছুদিনের মধ্যেই সেটাকে প্রায় আদ্যোপান্ত মুখস্ত করে ফেলেছিলাম। সেখানে বাঘা যতীনের চরিত্রটি আমার শিশুহৃদয়ে সবথেকে বেশি রেখাপাত করেছিল। ঘুষি মেরে বাঘ মেরে ফেলার ঘটনা যে নিছক সাধারণ মানুষের কম্মো নয় – আমার শিশুমন বেশ বুঝতে শিখে গিয়েছিল তখনই। আমার যখন বছর ছয়েক বয়স, তখন আমরা একবার দল বেঁধে চাঁদিপুর বেড়াতে গিয়েছিলাম। এখনো মনে পড়ে – বুড়িবালাম নদীর তীরে কী অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ অনুভব করেছিলাম। আরেকটা ঘটনাও বেশ মনে পড়ে – সেই আমার প্রথম সমুদ্র দর্শন, সমুদ্রের ধারে বালিয়াড়িতে সারি সারি ছটফটে লাল কাঁকড়া লুকোচুরি খেলছে, ঢেউয়ে ভেজা বালুরাশির মসৃন ত্বকে নানান আকৃতির অসংখ্য বাহারি ঝিনুক এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, আর তার মাঝে একটি অদ্ভুত দর্শণ ছোট্ট প্রাণী। বাপী চিনিয়েছিল – সেটি একটি সামুদ্রিক ঘোড়া বা সি-হর্স (Sea Horse)।
আপনি নিশ্চই ভাবছেন – কোথা থেকে অযথা এই সি-হর্সের প্রসঙ্গ এসে পড়ল! আসলে এই গৌড়চন্দ্রিকার কারণ হল – গ্রীক ভাষায় হিপ্পো (Hippo) শব্দটির মানে ঘোড়া, ক্যাম্পো (Kampo) মানে দৈত্য; দুইয়ে মিলে হিপ্পোক্যাম্পাস (Hippocampus) অর্থাৎ সি-হর্স। আমার আপনার প্রত্যেকের মস্তিষ্কে অনেকটা সি-হর্সের আকৃতি বিশিষ্ট একটি অংশের নাম হিপ্পোক্যাম্পাস। নিওকর্টেক্স-র মধ্যে যেমন লক্ষ কোটি নিউরন প্রতিটি তথ্যকে সযত্নে জমিয়ে জমিয়ে স্তন্যপায়ীদের মস্তিষ্কে স্মৃতি বা মেমরি (Memory) -র মহাফেজখানা গড়ে তুলতে শুরু করেছিল, তেমনই পরিস্থিতি এবং প্রয়োজন মোতাবেক সেই স্মৃতিকে পরিবেশন করার গুরু দায়িত্বটি পালন করার জন্য এই হিপ্পোক্যাম্পাস অংশটির উদ্ভাবন। একবার ভাবুন, একটি লাইব্রেরিতে লক্ষ লক্ষ বইয়ের মাঝে আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু আপনি জানেন না – আপনি যে বইটি হাতড়ে বেড়াচ্ছেন, সেটি কোথায় পাওয়া যাবে। এইখানেই আপনার দরকার একজন ভালো লাইব্রেরিয়ানের, যে আপনাকে বাতলে দেবে – কোন সম্ভাব্য র্যাকে আপনি বইটি পেতে পারেন। তাই মনে রাখবেন, আইনস্টাইন যা একবার কথায় কথায় বলেছিলেন – ‘সবকিছু জানবার আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই, আমার শুধু জানা দরকার – লাইব্রেরিটা কোথায়’; সেটি আংশিক সত্য। কারণ আপনাকে শুধু লাইব্রেরিটি জানলেই চলবে না, সেই লাইব্রেরিতে একজন দক্ষ লাইব্রেরিয়ানকেও থাকতে হবে, তবেই আপনার কার্যসিদ্ধি হবে! আমাদের মস্তিষ্কে সেই লাইব্রেরিয়ানের ভূমিকাটি পালন করে এই হিপ্পোক্যাম্পাস অংশটি…
এই হিপ্পোক্যাম্পাস আর নিওকর্টেক্স একসাথে সেই আদিম মানুষ অর্থাৎ হোমো ইরেকটাস, হোমো নিয়ানডারথালের মধ্যে ক্রমশঃ স্মৃতি সুধারসের সঞ্চার ঘটালো। কিন্তু নিয়ানডারথাল থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স হয়ে উঠতে গেলে যে শুধু স্মৃতি নির্ভর হলে চলবে না! সেখানে কল্পনার জারক রসকে মিশতে হবে… তবেই তো সে শিখবে অজানাকে জানতে, অচেনাকে চিনতে, অধরাকে ধরতে, অদেখাকে দেখতে, অমানুষ থেকে মানুষ হতে। কল্পনাই হল আসলে সেই যাদুকাঠি যার ছোঁয়ায় মানুষ শিখল কীভাবে মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তোলা যায় এক নতুন মর্মজগৎ, যে জগতে যে কোনো অজানার উওরে সৃষ্টি হয় ঈশ্বর, যে কোনো গরমিলের হিসেব মেলে ধ্রুবকের গোঁজামিলে… আপাতত সেই আলোচনা তোলা থাক আগামী পর্বগুলির জন্য…
এবারকার মত বসন্তের এই পড়ন্ত বেলায় আগামী নববর্ষের জন্য রয়ে যাক পলাশরাঙা শুভেচ্ছা… যা কিছু রিক্ত, জীর্ণ, মলিন – তাতে পূর্ণচ্ছেদ নামুক, যা কিছু ভালো – তা চিরজীবি হোক…
অলমিতি।

