
ঈশ্বরই ধ্রুবক(পর্ব ৭)
ক্লাসের মধ্যে সহসা একটা চাপা উত্তেজনা…স্যারের হাতে একগোছা খাতা – ইতিহাসের খাতা বেরোবে। সৌম্যদর্শন স্যার পরিমিত অভিব্যক্তিসহ ক্লাসে ঢুকে খাতার বান্ডিলটিকে টেবিলের উপর রাখলেন। শান্ত সমাহিত দৃষ্টিতে ক্লাসের দিকে তাকিয়ে সহসা আমাদের এক সহপাঠীর নাম ধরে ডাকলেন। ইতস্তত সহপাঠীটি কাঁচুমাচু মুখে সাড়া দিল এবং স্যারের আদেশে বেঞ্চ থেকে বেরিয়ে এল। স্যার বান্ডিল থেকে একটি মার্কা করা উত্তরপত্র বের করে তার হাতে দিয়ে বললেন – ‘চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়…আর তোরা সবাই শোন…’। অতঃপর বিস্তর অনুনয়-বিনয়ের পরে সহপাঠীটি তার পৃথুল উত্তরপত্রটি যারপরনাই ক্ষীণ এবং অপরাধী কন্ঠে পড়তে শুরু করল…উত্তরপত্রটি শুনতে শুনতে আমরা বিভোর হয়ে গেলাম! সে যে কোনো প্রশ্নের উত্তরে প্রথম এবং শেষ লাইন ব্যতিরেকে প্রতিটি ছত্রে তার কল্পনাপ্রসূত গাঁজাখুরি গল্প লিখে রেখেছে। সবথেকে চমৎকৃত হলাম, যখন আমাদের কানে এল সম্রাট আলেকজান্ডারের সেই অমোঘ উক্তি – “মাসিমা, পুরু বাড়ি আছে?”! কী ভাগ্যিস তারপর আলেকজান্ডার মাসিমাকে “মালপো খামু” বলেনি!

এ বিষয়ে আপনারা নিশ্চয়ই একমত হবেন – মানবসমাজের ইতিহাসে যে বিষয়টি সর্বাপেক্ষা বিতর্কিত, অস্পষ্ঠ, ব্যক্তিমত প্রভাবিত, তা হল – ‘ইতিহাস’ নিজে। যুগ যুগান্তর ধরে আমরা তার ছায়াপথ ধরে হাঁটার চেষ্টা করে চলেছি, তার অবয়বকে বোঝার চেষ্টা করে চলেছি, এবং অবিরাম নির্মাণ, বিনির্মাণ আর পুনর্নির্মাণের প্রচেষ্টায় ইতিহাসের রদবদল ঘটিয়ে চলেছি। হতে পারে সেই ভাঙাগড়া খেলার পেছনে আছে নতুন কোনো আকরের সন্ধানলাভ, অথবা কোনো কল্পনা, অথবা কোনো উদ্দেশ্য, অথবা কোনো খামখেয়ালি শাসকের মর্জি। তাই ইতিহাসের এই অভিযাত্রা নিজেও কম রোমাঞ্চকর নয়, তার পরতে পরতে লেগে থাকে সমকালের উত্তাপ, যুক্তিতর্কের নক্সাদার বুনোট, কার্য-কারণের নিবিড় পরম্পরা, সম্ভাবনার আতিশয্য, অনাবিষ্কারের আঘ্রাণ এবং সর্বোপরি আবিষ্কারের অনাবিল আস্বাদ!
জ্ঞানের যেকোনো চারণভূমিতে বিচরণের ইচ্ছে যদি আপনার হয়, তাহলে অবধারিত ভাবে দেখবেন – যে কোমল ঘাসে আপনি পা ফেলেছেন, তা ইতিহাসের মাটিতে গজিয়েছে এবং যে নির্মল বায়ুতে আপনি শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন, তা দর্শনের রূপ-রস-গন্ধে জারিত। তা সত্ত্বেও দেখবেন, প্রকৃত ঐতিহাসিকরা সচরাচর দর্শনের খোলা হাওয়া নিজেদের গায়ে মাখতে অপছন্দ করেন, বোধ করি সেই মলয় বাতাসে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কায়! ইতিহাসের জমিতে তারা খুঁজে বেড়ান কারণ, প্রমাণের নানাবিধ বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যা এবং সেই বুনিয়াদের উপর গড়ে তোলেন – বয়ে যাওয়া কালের গভীরে ঘটে যাওয়া সম্ভাব্য ঘটনাবলীর রেখাচিত্র। অন্যদিকে, দার্শনিকরা স্বভাবগত কল্পনাবিলাসী, ইতিহাসের নীরস অভিকর্ষ টানে কদাচিৎ তারা ধরা দিতে চান! তাদের উড্ডীন পাখায় বাতাস যোগায় দর্শনের সীমাহীন সম্ভাবনা…প্রতি নিয়ত তারা ভেসে বেড়ান এবং নিত্যনতুন পরাগরেণুর সন্ধান করে বেড়ান। আর বিশ্বাস করুন – এই দুই জ্ঞানবিলাসী ভাবধারার মাঝে সলতে পাকানোর কাজ করেন বিজ্ঞানীকুল।

বিজ্ঞানীরা কী করেন? তারা কোনো ঘটনাকে পর্যবেক্ষন করেন, তাকে তলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন, তার মধ্যে কার্য-কারণের সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। প্রয়োজনে তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন, সেই পরীক্ষালব্ধ ফলাফল কে বাস্তবের ঘটনার সাপেক্ষে বিশ্লেষণ করেন এবং সেখান থেকে নিয়ম বা সূত্র উদ্ভাবন করেন। এবার সেই নিয়ম বা সূত্রটিকে তারা অন্যান্য ঘটনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখেন যে সূত্রটি কতদূর কার্যকর হচ্ছে। যদি তা আশাব্যঞ্জক হয়, তাহলে তারা সেই সূত্রটিকে আরো ব্যাপক প্রয়োগের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। নচেৎ তারা সূত্রটির খামতি খুঁজতে বসেন, তাকে সংশোধন এবং পরিমার্জনের গোলোকধাঁধায় পথ খুঁজে ফেরেন… এইভাবে ক্রমাগত অভিযোজিত হতে থাকে বিজ্ঞান। ইতিহাসের ক্ষেত্রেও ঐতিহাসিকরা অনেকটা একই পথ অবলম্বন করে থাকেন। তফাত শুধু একটাই – তাদের যাত্রাপথ অতীতচারী। সেই সময় অবধি প্রাপ্ত সূত্রাবলী থেকে তারা অতীতের ঘটনাবলীকে যতটা সম্ভব পুনর্নির্মানের চেষ্টা করেন এবং সেই নির্মাণকে সমকালীন অন্যান্য ঘটনাপ্রবাহের সাথে মিলিয়ে দেখেন – কোথাও ঘটনা পরম্পরায় কোনো ত্রুটি হচ্ছে কিনা। এভাবেই পরিবর্ধিত হতে থাকে ইতিহাস।
বিজ্ঞানের ব্যাপ্তি অবশ্য শুধু পরীক্ষালব্ধ সূত্র আবিষ্কারেই থেমে থাকে না; বিজ্ঞান চায় সেই সূত্রকে অন্যান্য আরো সূত্রের সাথে একত্রিত করে আরো বৃহত্তর কোনো সত্যে পৌঁছুতে। সেখানে হয়তো সরাসরি পরীক্ষা পদ্ধতির কোনো সুযোগ থাকে না। তা সত্ত্বেও, প্রত্যক্ষ্য প্রমাণের সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করে সে পৌঁছুতে চায় মহাবিশ্বের শেষতম নীহারিকায় কিম্বা পরমাণুর অভ্যন্তরে ক্ষুদ্রতম কণিকায়! সামান্য থেকে অসামান্যে পৌঁছুনোর এই প্রয়াসে জ্বালানি যোগায় বিজ্ঞানীদের চিন্তাক্ষমতা, কল্পনাশক্তি, এবং সৃষ্টিশীলতা। এই যে নতুন ধারণা কিম্বা তত্ত্ব সৃষ্টির উদ্দেশে বিজ্ঞানের অভিযাত্রা, তা বোধহয় দর্শন-জাত; অদেখাকে মানস চোখে দেখার বিশেষ ক্ষমতার নামই তো আসলে দর্শন।

প্রথমদিকের কয়েকটি পর্বের পর হঠাৎ গত পর্বে কক্ষচ্যুত হয়েছিলাম বলে পাঠককুল আশা করি আমায় ক্ষমা করবেন। যে ধারাবাহিক আলোচনা চলছিল গ্রীক দার্শনিকদের নিয়ে, প্লেটোর মত মহান দার্শনিক যেখানে গত পর্বের প্রতিপাদ্য হবার কথা ছিল, তখন কেন খামোকা আদিম মানুষদের কথা পাঠকদের প্লেটে পরিবেশন করলাম – সেই বিষয়ে কৈফয়ৎ দেবার জন্যই উপরের এতগুলো কথা… প্রথমত, অনুমিত ছকের বাইরে যাওয়ার একটা তাগিদ তো ছিলই, কারণ খুব বেশি পূর্বানুমেয় হয়ে গেলে পাঠকদের মধ্যে একধরণের এক ঘেয়েমি চলে আসে, আর দ্বিতীয়ত যেটা আরো গুরুত্বপূর্ণ কারণ, তা হল – বিজ্ঞানের গোঁজামিল বুঝতে গেলে বিজ্ঞানের ইতিহাস, বিজ্ঞানের দর্শন বোঝাও আবশ্যিক। তেমনি সমাজের গোঁজামিল বুঝতে গেলেও মানুষের বিবর্তন, ইতিহাসের বিভিন্ন পাতায় তার চেতন-মননের অভিমুখ পরিবর্তনের ধারাপাত জানাটাও আবশ্যিক। তাহলেই কিছুটা আন্দাজ করা যেতে পারে কোন পরিস্থিতিতে, কেন সে আশ্রয় নিয়েছে কোন লৌকিক, অলৌকিক বা দৈব অস্তিত্বের কাছে, কীভাবে না জানা কোনো কিছুকে ব্যাখ্যা করার তাড়নায় অবতারণা করেছে তার ইষ্ট দেবতাকে, ঈশ্বরকে…কীভাবে গড়ে উঠেছে তার ধর্মচেতনা…
কিছুদিন আগে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছি। ভিড় ঠেলে কোনোমতে লোকাল ট্রেনে তিন কলিগ পাশাপাশি বসার জায়গা পেয়েছি। হঠাৎ শুনি সামনের সিটে এক ভদ্রলোক তার পাশের ভদ্রলোক বলছেন – “এই যে চারদিকে এত পাপ, এর কারণ কী জানেন?”। গোবেচারা অন্য ভদ্রলোকটির চোখে জিজ্ঞাসা চিহ্ন ফুটে উঠল। আমরাও উৎকর্ণ – সত্যিই তো, পাপে, অন্যায়ে যে চারিদিক ভরে গেছে, তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই! দেখা যাক, কী কারণ বাতলান ভদ্রলোক, তাহলে তা সংশোধন চেষ্টা করা যাবে খন… “শুনুন…গুরুদেব (কবিগুরু ভাবেন না যেন!) বলছিলেন, এই যে চারিদিকে এত মাংস খাবার ধুম…এই জন্যই এতো অনাচার – আসলে তো মানুষ মাংস খেতো না, দেখেন না, মানুষ কেমন ঢোঁক গিলে জল খায়…কারা ঢোঁক গিলে জল খায়, বলুন দিকিনি – গরু, ছাগল…এরা সব দেখুন নিরামিষভোজী। ওদিকে কুকুর, বেড়াল, বাঘ, সিংহ…লক্ষ্য করে দেখবেন – এরা সব জিভ দিয়ে চেটে জল খায়… সব আমিষভোজীরাই তাই। মানুষ যদি এই মাংস খাওয়া না ছাড়ে, তাহলে কোনোদিনও পাপ কমবে না!”। আমরা তিনজনেই নিরামিষ খাবার খাই না – এমনটা নয়। কিন্তু আমাদের তিনজনেই নিজ নিজ আরাধ্য গুরুর আদেশ অনুসারে একমাত্র ফেব্রুয়ারী মাসের পঞ্চম বিষ্যুদবার নিষ্ঠা ভরে সাত্ত্বিক নিরামিষ আহার ভক্ষণ করি! আমাদের তিনজনেই ঢোঁক গিলে একে অপরের দিকে তাকালাম। আমাদের মধ্যে যে কলিগ একটু ফাজিল, সে থাকতে না পেরে বলে উঠল – “না না… এ অনাচার হতে দেওয়া যায় না…কাল থেকে আমরা সবাই জল চেটে চেটে খাবো…”
এই জন্যই এইসব গুরু এবং গুরুবাদীদের থেকে একটু দূরত্ব মেনে চলাই ভালো। আচ্ছা ভাবুন দিখিনি – গরুর মত অমন সুন্দর দাঁতকপাটিতো ওই গুরুর নেই, তার তো দিব্যি দু’জোড়া ক্যানাইন টিথ বা শ্বদন্ত, যাকে বলে – যথাস্থানেভ্য এবচ। এই দু’জোড়া দাঁত তো সেই কস্মিনকাল থেকে মানুষের আমিষশাসী হবার সাক্ষ্য বহন করছে! আসলে এই নিরামিষভোজী মনুষ্যকুলের আবির্ভাব মানবজাতির ইতিহাসে অপেক্ষাকৃত নবজাতক তুল্য বলা চলে। নতুবা মানুষের খাদ্যাভাস আগাগোড়াই আমিষ নির্ভর, ওই যে আপনার ওই কুন্দসন্নিভ দু’জোড়া শ্বদন্তগুলি তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
মানুষ যবে থেকে দু’পায়ে দাঁড়াতে শিখল, তবে থেকে যদি আমরা মানবজাতির গোড়াপত্তন বিবেচলা করি, তাহলে দেখব – সেই প্রথম যুগের মনুষ্যকুল কিন্তু খাদ্যের ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীল ছিল। তারা থাকত আফ্রিকাতে, আজ্ঞে হ্যাঁ, আমরা সব্বাই সেই আদিম আফ্রিকার কুলোদ্ভূত। অন্য প্রাণীর ধরা শিকারের উচ্ছিষ্ট খেয়েই অধিকাংশ সময়ে তাদের দিন গুজরান হত। ধীরে ধীরে তাদের হাত আগের তুলনায় কর্মদক্ষ হতে শুরু করল, হাতের ব্যবহার করে তারা গাছের ডাল, পাথর ধরতে শিখল। এবং কালে কালে সেই পাথরই হয়ে উঠল তাদের সহায়। পাথর ঘসে ঘসে তাকে ধারালো বানাতে গিয়েই একদিন তারা আগুন আবিষ্কার করে ফেলল, আর সেই আগুনে পুড়িয়ে খেলো – সেই ধারালো পাথর দিয়ে শিকার করা মৃত প্রাণীটিকে। পাথরের মধ্যে যে এক অপার শক্তি লুকিয়ে আছে, তা তাদের বুঝতে দেরি হয়নি। আর বুঝতে দেরি হয়নি বলেই তার প্রথম আরাধ্য হয়ে উঠল পাথর। আজও আমরা আমাদের অবচেতনে সেই ধারা বহন করে চলেছি। আজও শিলাখন্ডের দেবমাহাত্ম্যের প্রতি আমাদের বিশ্বাস অটুট। আজও শিলাখন্ডের ওপর সামান্য সিঁদুর লেপা আছে দেখলে তাকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করি।

কীভাবে মানুষের জীবনচর্যায় দেবতা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল – তার জন্য আরো কিছুটা আলোচনা জরুরী। শিকারী থেকে কৃষক হয়ে ওঠার যে সময় সারণি, সেই সিঁড়িপথেই ধীরে ধীরে উঠে এসেছে প্রকৃতিপূজা, সর্বপ্রাণবাদ, অ্যানিমিজম…টোটেম…আমাদের ঈশ্বরবাদের প্রথম ধাপ… সেই বিষয়ে আলোচনা আপাতত তোলা থাক আগামী পর্বের জন্য। সবাই ভালো থাকবেন।

