অনাহত

[দুঃস্বপ্নের রোজনামচা, যা আমরা কিছুদিন আগে পার হয়ে এসেছি। কোভিড সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর ভয়াল বিভীষিকা আমাদের তাড়া করে ফিরেছে, সেই প্রতিদ্বন্দ্বী কালখন্ডের এক টুকরো দলিল।

পূর্বানুবৃত্তিঃ পৃথিবী জুড়ে একটা ভয়ঙ্কর বিপদের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। ভারতবর্ষে পুণে আর কেরালাতেও সেই অসুখের প্রকোপ ধরা পড়ল। ঠিক তখন গগন আপিসের কাজে পুণে থেকেই ফিরেছে। এক রাশ ভয় নিয়ে শুরু হয়ে গেল লক-ডাউন।]

যং লব্ধা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ।
যস্মিন্ স্থিতো ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে।।

থেমে যাওয়া পৃথিবীর, খিদে থেমে থাকে না। বাড়তে থাকে ভয়। গাড়ি চলছে না, কাজে যেতে পারছে না। অন্ততঃ কালকের বাজারটা না হলে হাঁড়ি চড়বে কী করে? লোকজন বাজারের ব্যাগ হাতে ঘরের বাইরে উঁকি দেয়। কেউ বস্তা নিয়ে আসে। একদিন নয়, এক মাসের রসদ যদি ঘরে আনা যায়!

এলাকায় বিল্টুবাবুর রেশন দোকান। রেশন ছাড়াও চাল, গম, আটা, তেল ইত্যাদি গেরস্থালির খাবারের খুচরো আর পাইকারি মুদিদোকান। ইদানিং ডেকরেটার আর ক্যাটারার হিসেবেও ভালো নাম করেছে। নিজে অবশ্য ক্যাটারিং-এর ব্যবসাতে বেশি সময় দেয়। ভাই পল্টুবাবু আর কর্মচারীদের হাতে রেশন আর মুদিখানার দায়িত্ব। এই দোকানগুলো সব পাড়ার ভেতরে। লকডাউনের ঘোষণার পরদিন, ভোরবেলা থেকে দোকানের সামনে প্রায় দেড়শো জনের লাইন। বিল্টুবাবুর ক্যাটারিং-এর কাজ আপাততঃ স্থগিত, নিজেই এসেছে রেশন দোকান খুলতে।

এ যেন পশ্চিম থেকে মারাঠা বর্গীদের মতো হাজার হাজার বর্শাধারী অশ্বারোহী ছুটে আসছে। তাদের আক্রমণে বাঙলার গ্রাম কে গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় বেরোতে সবাই ভয় পাচ্ছে। শষ্যক্ষেত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ দুটো চাল পাওয়ার জন্য রেশন দোকানের সামনে রাত থাকতে লাইন দিচ্ছে। দোকানের সামনে এত মানুষের ভীড় দেখে বিল্টুবাবুর মাথায় হাত।

ধীরে ধীরে রোদ চড়ছে, পাল্লা দিয়ে লোকের বিরক্তি। একসাথে এমন চাহিদা দেখে ভয়ে বুক দুরদুর করতে থাকে। সকলকে হাতজোড় করে বলে, “আপনারা লাইন করে দাঁড়ান, যতক্ষণ স্টক আছে, সবাইকে দেবো। কী?” ক্রমে একজন একজন করে লোক আসে রসদ নিয়ে যেতে থাকে। যে, দুই তিন কেজির বেশি মাল নিত না, সে এসে তিরিশ চল্লিশ কেজির মাল চাইছে। বিল্টুবাবু বোঝে, এভাবে চললে মুশকিল। এক দুইটি কর্মচারী আসতে পেরেছে। তাদেরই একজনকে লাইন পরিচালনা করতে বলে দেয়।

রোদ চড়ছে, ভীড় বাড়ছে। পাড়ার গলি মানুষের চাপে আটক। কিছু পড়শী পাড়ার ভেতর যাতায়ত করতে গিয়ে ভীড় দেখে থমকে যায়। কেষ্টুবিষ্টু মহেশ্বর এসে বিল্টুবাবুর দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়, “আপনার দোকানের জন্য পাড়ায় কোভিড চলে আসতে বাধ্য। এতো বাইরের লোক ঢুকে গেছে!”
বিল্টুবাবু বিনয়ের সাথে বলে, “এই মানুষগুলো খাবার সংগ্রহ করার জন্য এসেছে। আমি এদেরকে ফেরাবো কী করে? আপনারাই বলুন? কী?”
কে একজন বলল, “আপনি লাইন না করে কুপন দিন। পরপর কুপন আনুযায়ী পাঁচজন পাঁচজন করে পাড়ার ভেতরে ডাকুন। বাকিরা বড় রাস্তায় অপেক্ষা করুক।”

বুদ্ধিটা বিল্টুবাবুর ভালো লাগে। সেভাবেই চলতে থাকে। দূর দূর থেকে দোকানদারেরাও আসছে। বিল্টুবাবু বাইরে নোটিশ টানিয়ে দেয়, লকডাউনে কোন পাইকারি বিক্রি করতে পারবে না। সরকারের নোটিস অনুযায়ী রেশন ব্যবস্থা চলছে, পাশাপাশি চলছে তার নিজস্ব মুদিখানা। তালাচাবির ধাক্কায় কর্মচারীরা আসতে পারেনি। ভাই পল্টুবাবুর সাথে টানা দশ-বারো দিন প্রতিদিন চোদ্দ ঘন্টা কাজ করে শরীর খারাপ লাগছে। সকাল থেকে রাত অবধি এত লোকের ঘাঁটাঘাঁটিতে সংক্রমণ আসতে কতক্ষণ!

একটু বিশ্রাম নেবে ভেবে, নোটিশ টানায়, “অনেক কর্মচারী লকডাউনে আসতে পারছে না। সামনের শনি রবি দোকান বন্ধ।”

শনিবারের পর রবিবারও দোকান খোলেনি। তার মধ্যেও খরিদ্দার আসে, বন্ধ দেখে অপেক্ষা করে, আশেপাশে জানতে চায়, কবে খুলবে? তারপর চলে যায়। ফাঁকা রাস্তা, একা শুয়ে থাকে। বিল্টুবাবুর দোকানের সিঁড়ির ধাপিতে কয়েকটি রাস্তার কুকুর লম্বা হয়ে ঘুমোচ্ছে।

সকাল দশটা নাগাদ বিল্টুবাবুর দোকানের সামনে একটা পুলিশের জিপ এসে থামে। লোকজন দেখে কুকুরগুলো উঠে যায়। অফিসার জনা দুয়েক কনস্টেবল নিয়ে বিল্টুবাবুর খোঁজ করে। এমনিতে বিল্টুবাবুর সাথে থানার যথেষ্ট পরিচয়। এই অফিসার খোদ লালবাজার থেকে থেকে এসেছে। পাড়ার লোক বিল্টুবাবুর বাড়ির ঠিকানা দিলে, অফিসার সেখানে গিয়ে পৌঁছয়।

বিল্টুবাবুর বিরাট প্রাসাদ। বেরিয়ে এসে পুলিশ দেখে অবাক! অফিসার জিজ্ঞেস করে, “রেশন দোকান খোলেননি কেন?”
“কর্মচারীরা আসতে পারছে না। রাস্তায় বেরোলে পুলিশ মারছে। আমি একা দোকান সামলাতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। তাই দুদিন বিশ্রাম নিতে বন্ধ রেখেছি। কী?”
“আপনার কতজন কর্মচারী? আর সাপ্লায়ার কতজন? আমরা পাস বানিয়ে দিচ্ছি। আপনি দোকান খোলার ব্যবস্থা করুন। আমাদের ওপরমহল থেকে চাপ আসছে। খাবারের জোগান যেন ঠিক থাকে।”
শুনে বিল্টুবাবুর ভালো লাগে। ওর কাজের ওপর সরকারের নজর রয়েছে। একই সাথে, সাধের ছুটি বরবাদ হয়ে গেল বলে খারাপ লাগে।

পুলিশ চলে গেল, ভাই পল্টুবাবু সহ অন্যান্য কর্মচারীদের ফোন করে কথা বলে। প্রত্যেককে পাসগুলোর ছবি তুলে পাঠিয়ে দেয়, যাতে পরদিন থেকে তারা অনায়াসে দোকানে পৌঁছতে পারে। এখানে এলে আসলগুলো দিয়ে দেবে।

স্থবির সংসারের উনোন জ্বলতে থাকে। ইন্ধনের যোগান চাই। সব দোকান বাজার, আপিস আদালত, স্কুল কলেজ বন্ধ। সেখানে হাসপাতাল আর শ্মশানের মতো রেশন দোকান খোলা। বিল্টুবাবু ভাবতে থাকে। একটা অন্য রকম অনুভূতি হয়। সারা দেশ যখন এমন দুরাবস্থায় পড়ে আছে, তখন মানুষকে খাবার খাওয়ানোর মতো ভালো কাজ আর অন্য কিছু হতে পারে না। ঠিক করে, নিজের ক্যাটারিংএর দলবল নিয়ে, একটা কিচেন চালাবে। এলাকার শ্রমজীবী মানুষরা, যারা এখন কাজ পাচ্ছে না, তাদের জন্য ভাত ডালের ব্যবস্থা করবে।

বিল্টুবাবুর কর্মচারীদের প্রধান প্রহ্লাদ। সে বলে, “খাওয়াবেন, সে তো খুব ভালো কথা। গাড়ি ঘোড়া সব বন্ধ, মাল কী ভাবে আসবে।”
শুনে বিল্টুবাবু বলে, “লকডাউনে আমাদের এলাকার গোল্ডেন স্টিলের কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। ওর তিন হাজার লোকের ক্যান্টিনও নিশ্চই এখন চলবে না, কী? এই ক্যন্টিনের জন্য এক মাসের মাল তোলা রয়েছে। আপাততঃ তাই দিয়ে শুরু করি। কী?”

সেদিন পায়ে পায়ে গগন গিয়ে পৌঁছয় বিল্টুবাবুদের মুদিখানায়। বেশ কিছু রসদ জোগাড় করে। ক্যাটারার বিল্টুবাবুর কথা আগে শুনেছে। এখন এসে তার অন্যান্য কর্মকান্ড দেখতে পায়। বেশ ভালো লাগল, এই দুর্যোগের মধ্যে কোন পণ্যের দাম বাড়ায়নি।

গগনের দুজনের সংসার, খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না। সপ্তাহ খানেকের মতো রসদ নিয়ে ফিরে আসে। পাঁচিলে ঘেরা কয়েকটা বহুতল নিয়ে ওদের আবাসন। বড় রাস্তার ওপর পেল্লায় লোহার গেট, সবসময় হাটপাট করে খোলা থাকে। গাড়ি ঢোকে, বার হয়। কেবল রাত বাড়লে ফটক বন্ধ হয়ে যায়। পাশে দ্বাররক্ষীরা, তাদের ছোট আপিস। আসা যাওয়ার পথে নাম লেখানোর কর্মব্যস্ততা। এখন সেই বড় গেট বন্ধ। পাশে পথচারীদের একটা ছোট গলিপথের মতো খোলা। দুয়েকজন জরুরী কাজে ফাঁক দিয়ে যাতায়াত করছে। মৃদুল বলে একটি ছেলে প্রহরীর কাজ করে। গগন জানে, সে অনেক দূর থেকে আসে। গগন তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করে, “এখন কী ভাবে আসছো?”
মৃদুল বলে, “আসছি না তো, স্যার। এখানেই থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।” গগনদের আবাসনে গেস্টহাউস আছে। সেখানেই এখন প্রহরীদের অস্থায়ী বাসস্থান।

গগনের পড়শি সনৎ বাবু। কাজ থেকে অবসর নিয়ে, এই আবাসনে ফ্ল্যাট নিয়েছে। গগন বিকেলে সনৎকে নিয়ে আবাসনের বাগানে বসে। বিল্টুবাবুর রেশন দোকানে সকালের অভিজ্ঞতার গল্প করে। সনৎ উৎসাহী হয়ে বলে, “আরে, ওকেই তো আমি আমার নাতির জন্মদিনের অনুষ্ঠানের জন্য বলেছি। এখন এই ডামাডোলে, সেই অনুষ্ঠান করা যাবে কিনা, জানি না।”

গগন বলে, “মানুষের সত্যিই খুব দুরাবস্থা। রেশন দোকানের সামনে লোকজনের লম্বা লাইন দেখে, আতঙ্কিত লাগে। সবাই একটা ত্রাসের মধ্যে রয়েছে। পাগলের মতো জিনিসপত্র কিনছে, এমন ভাব, যেন আর পাওয়া যাবে না। দেশে দুর্ভিক্ষ লাগলে বোধহয় এমন হয়। কিন্তু আমাদের তো দুর্ভিক্ষর পরিস্থিতি আসেনি, তাই না?”
“সাধারণ মানুষ একটুতেই প্যানিক করতে শুরু করে। তুমি যেমন যুক্তি দিয়ে ভাবো, সকলে তেমন ভাবে না। যুক্তি ব্যাপারটাই এখন উঠে গেছে।”
গগন মাথা নিচু করে ভাবে, তারপর বলে, “পেটে টান পড়লে, সকলের মাথা থেকে যুক্তি বেরিয়ে চলে যায়।”

সবে লকডাউনের ক’দিন হয়েছে, এর ভেতর রাস্তা ঘাট কেমন অচেনা লাগে। গগন নিজেদের আবাসনের গেট অবধি এসে বাইরে বড় রাস্তায় তাকিয়ে থাকে। ঠাঠা নৈঃশব্দে শহর দাঁড়িয়ে আছে। বড় রাস্তায় গাড়ি নেই, মানুষ নেই, কুকুর বিড়ালগুলোও চোখে পড়ছে না। শুধু একরাশ পাখির জটলা। বুলবুলি, শালিক, টুনটুনি, পায়রা, ঘুঘু। এদের কি আগে এমনভাবে দেখা মিলতো? গগনের ভালোই লাগে, অন্ততঃ পরিবেশটা একটু পরিশ্রুত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বাতাস যেন অনেক হালকা। টিভিতে সেদিন বলছিল বায়ু দূষণের মাত্রা কতটা হ্রাস পেয়েছে।

তিয়াসা ফোন করে, “তুমি কোথায়?”
“কোথাও না। আবাসনের ভেতরেই আছি। গেট-এর কাছে। কেন?”
“বেশ ওখানেই থাকো। সুভদ্রা আসবে। ওকে তো আবাসনের ভেতর ঢুকতে দিচ্ছে না। গতমাসের মাইনে নিতে আসতে পারেনি। তুমি গেটের ভেতর থেকে দিয়ে দিও।”
কথাটা বলে তিয়াসা ফোন রাখে। অব্যবহিত পর আবার ফোন করে, “মাস্কটা পরে থাকবে, আর হাত টান করে দূর থেকে টাকাটা দেবে। ওরা সাত বাড়ি ঘুরে কাজ করে, কার ঘর থেকে কোন জীবানু নিয়ে আসবে, জানি না।”
গগন সদর্থক উত্তর করে, তারপর পকেটে হাত দিয়ে স্যানিটাইজার স্পর্শ করে দেখে নেয়। মানুষ এখন মানুষকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। কয়েক সপ্তাহ আগে পুণে-তে গগনকেই ওর ক্লায়েন্ট-এর আপিসের লোকেরা সন্দেহর চোখে দেখছিল। এখন তিয়াসা বাড়ির কর্মচারীকে সন্দেহ করছে। কী জানি কোন ফাঁক দিয়ে মারণ রোগ সিঁদ কেটে ঢুকে পড়ে!

কিছুক্ষণের মধ্যে গেটের বাইরে সুভদ্রা এসে উপস্থিত। মুখে রাজনৈতিক দলের চিহ্ন ছাপানো মাস্ক। অভিনব প্রচারের মাধ্যম হয়েছে, গগন মজা পায়। জিজ্ঞেস করে, “কী গো এমন মাস্ক কোথা থেকে পেলে?”
“কী করব? ওই ক্লাব থেকে দিয়ে গেল। ওরা তো আমাদের চাল, আলু, তেল, ডিম এইসবও প্যাকেটে করে দিয়ে যাচ্ছে। তোমরা চাল ডাল পাচ্ছো?”
গগন হাসে, “আমি ওই বিল্টুবাবুর দোকান থেকে নিয়ে এসেছি।”
“তোমাদের যেতে দিচ্ছে?”
“সকালটাতে কিছুক্ষণ ছাড় পাচ্ছি। সেই সময়, কিছুমিছু নিয়ে আসি। আর এই গেটের বাইরে আনাজ, মাছ নিয়ে একজন দুজন বসছে।”
সুভদ্রা বলে, “এখানে বসতে হলে, ক্লাবে মোটা টাকা চাঁদা দিতে হয়।”
“ও বাবা! তাই নাকি? জানতাম না তো।”
“তোমরা কী করে জানবে? আমাদের নতুন-পল্লীর একজন আছে তো, এখানে ফল বিইক্রী করে।” এই বলে একটি ছেলেকে চোখ দিয়ে ইঙ্গিত করে।
“তা এই লকডাউনে তোমার বরের কাজ আছে?”
সুভদ্রা চোখটা একটু অবিশ্বাসীর মতো করে, “তুমি জানো না? সে তো নেই।”
গগন অবাক হয়ে, সুভদ্রা কপালে বড় সিঁদূরের টিপ-টার দিকে তাকায়। সুভদ্রা বোঝে, “আরে! সে অন্য মেয়েকে নিয়ে ঘর বেঁধেছে, আজ প্রায় চার বৎসর। আমার সাথে কোন সম্পর্ক নেই।”
কথাটা শুনে গগনের মুখটা কেমন তেতো হয়ে যায়। সুভদ্রা বলে চলে, “তোমরা দুঃখ পেয়ে কী করবে? এ আমার কপালের লিখন। তুমি তো আপিস নিয়ে ব্যস্ত থাকতে, তাই কখনও শোনোনি, বৌদি জানে। আমি এই এত বাড়ি কাজ করি, মেয়েটাকে একটু পড়াশুনা শেখাবার জন্য।”
“মেয়ে কেমন পড়ছে?”
“গত বছর মাধ্যমিক পাশ করল। তারপর তার ডানা গজালো, পালিয়ে গিয়ে মন্দিরে বিয়ে করল। শ্বশুরবাড়ি ভালো, ওকে বুঝিয়ে আবার আমার কাছে রেখে গেছে, পড়াশুনা করানোর জন্য। এখন তো স্কুল বন্ধ, কী হবে জানি না।”
“সেকী? বিয়ে করে ফেলেছে?”
সুভদ্রা করুণ চোখে হাসে, “আমাদের গরীবের ঘরে, লেখাপড়া ঘোড়া রোগ। বাবা নেই, ওকে যে এতদিন আগলে রাখতে পেরেছি, এই অনেক! ছেলেটি আমাদের পাড়াতেই থাকে। রাজমিস্ত্রীর কাজ করে।”
“শ্বশুরবাড়ি থেকে যখন পড়াতে বলেছে, ঘরে বসে পড়া চালিয়ে যেতে বল।”
“সে কি এমনি পড়াচ্ছে? বিয়ের কথা চেপে গেছে, কন্যাশ্রীর টাকা পাবে, তাই। আর দিদিমনিদের তাগাদা না থাকলে কি পড়া হয়? ওইভাবেই টানছি। কোন রকমে মা মেয়ে-তে চলে যায়।”

টাকা নিয়ে সুভদ্রা চলে যেতে, গগন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কত সাধারণ জীবনযাত্রা। সকলেই গভীর আবর্তে জড়িয়ে থাকে অথচ তার ভেতরও উত্তরণের এক মরিয়া প্রচেষ্টা। এইভাবে মানুষ হারে, কিম্বা হারতে হারতেও কখনও জিতে যায়। সার্ভাইব্যাল অফ দ্য ফিটেস্ট, আর স্ট্রাগল ফর একজিস্ট্যান্স। ডারউইন সাহেব দুই মোক্ষম বাণী দিয়ে গেছেন। এর চেয়ে বড় দর্শন বোধহয় আর কিছু নেই। গগন নিজের ফ্ল্যাটের দিকে ফেরে।

ঘরে ফিরতে তিয়াসা বলে, তোমার মা ফোন করেছিল। তোমাকে নাকি সমানে ব্যস্ত পেয়েছে। গগন বলে, “হ্যাঁ আপিস থেকে একটা ফোন এসেছিল। হতে পারে তখন করেছে। কী বলছে?”
“তেমন কিছু না। জিজ্ঞেস করছে, আমাদের কী করে চলছে? বাজার হাট সব তো বন্ধ।” গ্রামে তো আর চাল ডাল মাছ সবজির জন্য বাজার যেতে হয় না। মায়েরা সব বাড়িতেই পেয়ে যায়। গগনের ভালো লাগে, তাও মা ঠাকুরসেবা করে ছেলের খবর নেওয়া সময় পেয়েছে। মাকে অনেকবার নিজের ফ্ল্যাটে এনে রাখতে চেয়েছে, কিন্তু ওই পুকুর, উঠোন, পুঁইমাচা ফেলে কখনও আসবে না।
গগন তিয়াসাকে জিজ্ঞেস করে, “মালবাজারের কী খবর? কথা হয়েছে?”
তিয়াসা ওর নিজের বাড়ির খবরও বলে, “আপাততঃ সবাই ঘরে বন্দী হয়ে আছে।”

চারিদিক বড্ড শান্ত। আধুনিক মানুষ হট্টগোলেই অভ্যস্থ হয়ে গেছে। কেউ যদি তাকে হঠাৎ প্রশান্তি উপহার দেয়, সবকিছু গুলিয়ে যায়। এ যেন নতুন কিছু। প্রকৃতির সাথে নাড়ীর যোগ বুঝতে সময় লেগে যায়। আজ থেকে দুতিনশো বছর আগে পৃথিবী কি তাহলে এমনই ছিল? রাস্তায় মোটর গাড়ির দাপট ছিল না, মানুষে মানুষে ধাক্কাধাক্কি লাগত না। কোথাও দ্রুত পৌঁছানোর তাড়া ছিল না। সব যেন পূর্ব নির্ধারিত ছন্দে চলেছে।

ল্যাপটপটা খুলে, সেদিকে না তাকিয়ে জানালার বাইরে দৃষ্টি মেলে দেয়। দূরে নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে কয়েকটা চিল ভেসে যাচ্ছে। তাদের প্রসারিত ডানায় সেই তাগিদ নেই, যা থেকে শিকার করে বেঁচে থাকার আগ্রহ প্রকট হবে। অথচ এই টান করা নৈঃশব্দের ভিতর জন্ম নেয় চোরা স্রোত, আবহমানের সততঃ প্রবহমান জীবন, মৃত্যুও। মৃত্যু যে জীবনেরই অঙ্গ, আজ সেই উপলব্ধি মানুষের দুয়ারে। বিশ্বজোড়া মৃত্যুর চলন, এতো সেই নশ্বরতাকে ডেকে নিয়ে আসে অমৃতর পারে। বুঝিয়ে দেয় প্রতিটি প্রাণ, জীবন মৃত্যুর উর্দ্ধে এক অবিনশ্বর সত্য, যাকে সুন্দর অনন্ত জ্ঞানের অস্তিত্বের অংশ ছাড়া অন্যকিছু মনে হয় না। গগনের মন হাল্কা হয়ে ওঠে, কোথাও এক বিন্দু আলো যেমন হাজার বছরের অন্ধকার ঘরকে মুহূর্তে আলোকিত করে তোলে, তেমনি গগনের মনে যেন আলোর সেতু রচনা হয়েছে। সেই অদ্ভুত সেতুসঞ্চারী ভালো লাগায়, আজ আর কাজ করতে ইচ্ছা করে না।

গগনদের স্কুলের সহপাঠীদের একটা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে। সেখানে দিন ভর নানা খবরাখবর আসতেই থাকে। প্রশান্ত ডাক্তার, মাঝে মাঝে অনেক জ্ঞানগর্ভ লেখা দেয়। অতিমারিতে কী ভাবে চলতে হবে? কেন চলতে হবে? আবার সুমন নানা চটুল চুটকিতে ভরিয়ে দেয়। বিকাশ, অলক, দীপ্তেশ প্রভৃতির পিছনে লেগে গম্ভীর আবহাওয়াটা লঘু করে দেয়। স্থির হয়ে বসে সেইসবই পড়ছিল; যতক্ষণ না পিছন থেকে তিয়াসা এসে বলে, “স্নান করে এসো। খাওয়ার পাট শেষ করি।” গগন বলে, “শোনো সুমন কী লিখেছে? বলছে নিয়মিত ঘর ঝাঁড় পোঁছ করে কী শিখেছে? ঝাঁট দিতে দিতে এগিয়ে যেতে হয়, আর মুছতে মুছতে পিছোতে হয়।”

[ক্রমশঃ]

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পরম্পরায় প্রকাশিত রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, এপ্রিল ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]