
ছাতা
আমাদের গ্রামে খুব দুষ্টু ডানপিটে এক ছেলে আমাদের খেলার দলে ভিড়ে গিয়েছিল। অবশ্য ভিড়ে গিয়েছিল না বলে এখনকার ভাষায় নিঃসংশয়ে বলা যেতে পারে অনুপ্রবেশ করেছিল। তাকে খেলতে না নিলে সে সমস্ত ভণ্ডুল করে দিত। প্রত্যেকটা খেলাতে চোট্টামি করত। আমি তখন নিতান্তই উবু ছাড়ার দলে । দাদা কিঞ্চিৎ বড়ো। আমার পার্থিব চাওয়া পাওয়া তখন দাদার বড়ো হওয়ার নিরিখে বিচার্য ছিল। সেই দাদা পর্যন্ত কুঁকড়ে থাকত সেই দস্যি ছেলে তাড়নায়।
সেই সময় প্রয়দিন বাবার মস্ত বড় ছাতাটা খুলে আমি আর দাদা ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী খেলতাম। রাজপুত্র অনেক দূরে চলে গেছে, তাকে তেপান্তরের মাঠ পেরতে হবে, তারপরে কোন রাজপুরীর ভিতরে এক রাজকন্যা ঘুমিয়ে আছে, তার মেঘ বরন চুল …এইসব গল্প শোনাত দাদা।
একদিন ,আমরা দুটিতে গা ঘেঁষাঘেঁষী করে ছাতার রডটা আঁকড়ে ধরে বসে আছি। বাইরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। খোলা বারান্দায় ছাট আসছে। আমরা যত ভিজে যাচ্ছি তত দুজনে গায়ে সেঁটে বসছি। দস্যি ছেলে কালু তখন সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, আমাদের দেখতে পেয়ে ভিজতে ভিজতে ঢুকে এলো। লক্ষ্য করলাম দাদার মুখ পাংশু হয়ে গেল। ছাতার রডটা আরো জোরে টিপে ধরলো।
এই বৃষ্টিতে তোরা কি করছিস রে?
আমি সাগ্রহে জবাব দিলাম আমরা বেঙ্গমা- বেঙ্গমী খেলছি । সে তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল, বেঙ্গমা বেঙ্গমী তো বর বউ আর তোরা তো ভাই বোন- বলে দুয়ো দিতে দিতে আবার ভিজতে ভিজতে চলে গেল।
মা বাইরে এসে আমাদের দুটিকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। সারা জীবনে আর কোনদিন ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী খেলেছি কিনা মনে আসে না। ছাতার লম্বা বাঁটটা পরে আমাদের সংসারে বহু বছর ধরে আঁকশী হিসাবে ব্যবহৃত হতো।
সেদিন সুসজ্জিত অডিটোরিয়ামে হস্তশিল্পের এক্সিবিশনে দাঁড়িয়ে বাবার বয়সী দাদার হাতে উপহার পাওয়া ছাতাটা হাতে ধরে থমকে গেলাম। মনে হল ঠিক সেই শৈশবের দাদা আজ প্রবীণ দাদা হয়ে আমার হাতে ফিরিয়ে দিলেন মুঠো মুঠো রংবেরঙের স্মৃতি।
ছাতা আমার জীবনে নানা ভাবে নানা রূপে, ফিরে ফিরে এসেছে। মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হবার পরে বাবা আমাকে একটা লাল বাঁটের কালো লেডিস ছাতা কিনে দিয়েছিল। লম্বা সেই ছাতা ডান হাতে দোলাতে দোলাতে স্কুলে যেতাম। সবারই তখন লম্বা লম্বা ছাতা। পাছে কারো সাথে হারিয়ে যায় সেই জন্য সাদা ক্রচেড সুতোয় বোতাম স্টিচ দিয়ে বড় বড় করে নিজের নামের প্রথম অক্ষর খোদাই করে দিয়েছিলাম। প্রথম অক্ষর দুটি ছিল এন ডি। কিন্তু এই দুটি অক্ষর থেকে রকে বসা আড্ডার ছেলেরা যে ছড়া বানিয়ে ফেলবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি। আমাকে দেখলেই তারা বলতে শুরু করতো,

এন ডি ভেন্ডি
সবজির মন্ডি
তুই যাবি পথ দিয়ে
সব কাজ পন্ডি
এই পন্ডি কথার মানেটা উদ্ধার করতে পারতাম না।এখনো যে পেরেছি তা নয়,তবে মনে হয় পণ্ড করে দেওয়া কে পন্ডি বলে ছন্দ মেলানোর চেষ্টা করত।
আমি তখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। গার্লস স্কুল থেকে কো-এডুকেশন স্কুলে ভর্তি হয়েছি। একটু জড়োসড়ো লাজুক আমি একটু একটু করে বড় হওয়ার আস্বাদ নিচ্ছি।
আমরা মাথা হেঁট করে ক্লাসে ঢুকি যেন অত্যন্ত সুবোধ বালিকা। কিন্তু চোরা চাউনি ছড়িয়ে পড়ে ক্লাসরুমে । হয়তো বা একটা ঝলক মাত্র। তখন কখনো কখনো কারো সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে মুখ, তাড়াতাড়ি দৃষ্টি নামিয়ে নিই। আমরা বসতাম সাইড বেঞ্চে । মাঝেমাঝে ক্লাসে পড়ার ফাঁকে মাথাগুলো একটু সরে গেলে তৈরি হওয়া সরলরেখাটা ভেঙে যেত। হঠাৎ চোখে পড়ত তখন একজোড়া নবীন চোখ অপলক দৃষ্টি ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে। কখনো ভয়, কখনো ভাললাগা, কখনো বিরক্তি মাখামাখি হয়ে যেত আমার মুখমন্ডলে।
এইভাবে হঠাৎ একদিন টের পেলাম সরলরেখা ভেঙে দেখতে পাওয়া মুখটা আকৃষ্ট হচ্ছে আমার প্রতি।
সচেতন হই, সাবধান হই। নিজেকে শামুকের মতো খোলসের মধ্যে আত্মগোপন করিয়ে রাখি।
এরপর একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় আকাশ ভেঙে তুমুল বৃষ্টি। ছাতা নিতে ভুলেছি সেদিন। হঠাৎ একটা সাইকেল পাশে এসে দাঁড়ালো। এগিয়ে এলো একটা লম্বা ছাতা। বলল,এটা নিয়ে যা। অসময়ের বৃষ্টি ভিজিস না…
মাত্র তিন চারটি শব্দে বুকের মধ্যে যেন বৃষ্টির ফোঁটা গুলো সরাসরি বিঁধে গেল। কেঁপে গেলাম,ভিজে গেলাম। হাত বাড়িয়ে ছাতাটা নেওয়া ছাড়া কিছুই বলতে পারলাম না। দেখলাম মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে তার সাইকেল আবঝা হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে।
বাড়ি ফিরে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে ছাতাটাকে দরজার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখলাম। ভেবেছিলাম পরদিন বাবা স্কুল বেরিয়ে গেলে আমি ছাতাটা নিয়ে স্কুলে চলে যাব। কিন্ত দুখানা বড় ছাতা কি করে হাতে নিয়ে মায়ের চোখ এড়িয়ে স্কুলে বেরিয়ে যাব সেই ভাবনাটাও ভাবিয়েছিল খুব।
তখন ফোল্ডিং ছাতা আসেনি বাজারে কিংবা এলেও আমাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারে এবং গ্রামাঞ্চলে তার আবির্ভাব ঘটেনি। স্কুলে যাবার আগেই ঘটে গেল অঘটন। দরজা বন্ধ করতে গিয়ে ছাতাটি গেল পড়ে, বাবা তখন খেতে বসেছেন ।
এটা কার ছাতা? এভাবে দরজার আড়ালে কেন? মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন।
কেউ কি এসেছিল বাড়িতে ? এটা তো ছেলেদের ছাতা। কাল প্রদীপের কোন বন্ধু এসেছিল?
মা তো আকাশ থেকে পড়লেন ।
কই না তো, কেউ তো আসেনি, আমি তো কিছু জানি না।
একে একে দাদাকে এবং আমাকে বাবার সামনে হাজির করানো হলো। দাদা তো বিষয়টা জানেই না সুতরাং কিছু বলার নেই ওর। আমি পড়ে গেলাম ফ্যাসাদে। সত্যি কথাটা স্বীকার করে নিতে হলো। বন্ধু বিধর্মী শুনে বাড়িতে যেন বিস্ফোরণ ঘটলো। বাবা খাবারের থালা ফেলে উঠে এসে প্রচন্ড বকলেন আমাকে। সেই শাসনের রেশ মায়ের উপরেও আছড়ে পড়ল আর ও দশগুণ তীব্র হয়ে।
বাবা বেরিয়ে যাবার পর মায়ের কাছে জবানবন্দী দিতে হলো জীবনে আর কোনদিনও তার সঙ্গে একটি কথা ও বলবো না। কিছুতেই মা কে বিশ্বাস করাতে পারলাম না যে সেইদিন অব্দি একটা কথাও আমি তার সাথে বলিনি।
এই ঘটনার কথা বাবা আমাদের স্কুলের এক শিক্ষককে বললেন। সেই জেঠু প্রত্যেকদিন স্কুল ছুটির পরে আমাদের বাড়ি আসতেন। তিনি শুনে চুপ করে গেলেন, কোন কথা বললেন না।
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়া হয়েছিল। আমার সেই শিক্ষক জেঠু তখন তার ছেলের হাত দিয়ে একটা ফোল্ডিং ছাতা আনিয়েছিলেন আমার কথা ভেবে। ছাতাটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা সব সময় সাথে রাখিস’।
আমি যে কী আপ্লুত হয়েছিলাম! জেঠুকে সেই প্রথম নতুন করে আবিষ্কার করেছিলাম । তাঁর শাসনের অভিঘাতে আমি প্রায়শই বকুনি খেতাম ক্লাসে,বাড়িতে। কিন্তু সেই দিন আমি তার মনের স্নেহের ফল্গুধারাটা অনুভব করেছিলাম।
তুঁতে আর সাদা রঙের চেক কাটা কাটা সেই ছাতাটা আমার কাছে তখন সাত রাজার ধন মানিক। সুইচ টিপলেই সেটা খুলে যায়। ছাতাটা হাতে নিয়ে আনন্দে আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গিয়েছিল। কি মজা আর আমাকে বিরাট বড় ছাতা নিয়ে স্কুলে যেতে হবে না! ছাতার সাথে সাথে ইংরেজী গ্রামার কেও ভালোবেসে ফেললাম।
এখন অনেক ছাতা আমার। টু ফোল্ড থ্রি ফোল্ড নানা রঙের। কিন্তু সেই সময়ের সেই ছাতাটির কথা আমি জীবনে ভুলতে পারবো না।
আমার বড় হবার পথে যখন কোন কারণে বাড়িতে অবাধ্যতা করতাম, মা রেগে গিয়ে বলতেন, বাবার ছাতার তলায় আছো তো কিছু গায়ে লাগছে না। বাবা যেদিন চলে যাবেন সেদিন বুঝবে। আজ নানা সমস্যা সংকুল পরিস্থিতিতে বাবার অভাব খুব অনুভব করি। কোন সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ভাবি আমার জায়গায় বাবা থাকলে এই সময় বাবা কি করতো?
আমার বিয়ের দেড় বছর পর আমার হাজব্যান্ড মার্চেন্ট নেভিতে জয়েন করলেন। আমার সন্তান তখন গর্ভে। যেদিন উনি চলে যাচ্ছেন কলকাতায় শিপিং কর্পোরেশন অফিস থেকে হলদিয়ায় জাহাজে জয়েন করতে সেদিন ওনার সাথে আমি গিয়েছিলাম সি অফ করতে । আমার দিদি তখন আন্দুল রোড হাউজিং এ থাকে। আন্দুল রোডে দিদিদের আবাসনে ঢোকার রাস্তার মুখে গাড়িটা দাঁড়ালো। সেদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। আকাশ যেন ভেঙে পড়েছিল। আমাদের বুকের ভিতর ভেঙে পড়েছিল অন্য আরেকটা আকাশ । আমি তার হাত ছাড়িয়ে গাড়ি থেকে রাস্তায় নামলাম। আকাশ ও যেন আমার সাথে কেঁদে চলেছে সমানে। আমরা দুই ক্রন্দসী পরস্পরকে তখন জড়িয়ে ধরেছি গভীর আশ্লেষে। আমার চোখের সামনে দিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে যাচ্ছে ওর সাদা এম্বাসেডর। আমি দেখতে পাচ্ছি পিছনের কাঁচটা ও ব্যথিত দুটো হাত দিয়ে মুছবার চেষ্টা করছে ,যদি আরেকবার দেখতে পায় আমাকে। হঠাৎ একটা বাঁকে গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমি কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়েছি রাস্তায়। আমার সাথে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার জামাইবাবু। তিনি দুটো হাত দিয়ে তুলে ধরলেন আমাকে।
সেই থেকে আজ পর্যন্ত দিদি জামাইবাবুর ছাতার আড়ালের অভাব হয়নি কখনো। মাঝে মাঝে শিক ভেঙেছে, ছাতার কাপড়ও বদলিয়েছি, কিন্তু আশ্রয় দেবার বা পাবার চরিত্র বদল হয়নি।
আমাকে নিজেই আমি সৌভাগ্যবতী বলে মনে করি। কেননা আমার সংসার আমার মাথার উপর রাজছত্র হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই সীমাস্বর্গের আমিই ইন্দ্রাণী।আর বহির্জগতে আছে একটা দুটো বন্ধু। তাদের ছাতার নিচে আমি দুদন্ড জিরিয়ে বাঁচি।

