
অর্পন
…হ্যাঁ গো মাসি, বৌদির ফিরতে নাকি আজকাল বেশ রাত্তির হয়? একলা থাকো। রাগ হয়না তোমার? আমার তো বাপু ভাবলেই পিত্তি জ্বলে যায়।
…তুই সব ব্যাপারে এত মাথা ঘামাস কেন বলতো? নিজের কাজটা মন দিয়ে কর। চাকরি করতে গেলে ফেরার ঠিক থাকে নাকি? দেখিসনি আমাদের বাবুরও তো তাই হতো। তার ওপর রাস্তাঘাটের যা হাল!
আমি দিব্যি ঘরে আছি। আমার আবার কী হবে? ওসব আমার অভ্যাস আছে …
ফ্রাইং প্যানে মাছের চপটা উল্টে দিতে দিতে উত্তর দেন মল্লিকাদেবী।
…ওই একতলার পলিবৌদি ঠিকই বলে। এসব কথা তোর মাসিকে যেন খবরদার বলতে যাসনা। তিনি তো আবার বৌমার প্রেমে গদগদ। সবই তো গেছে। বৌমাটাও চলে গেলে তো বুড়ির… বলি ভুল কী আর বলে! এত খেটেখুটে চপ কাটলেট কার জন্যে ভাজছো শুনি? কপাল করে শাউড়ি পেয়েছিল বটে!
শেফালীর কথায় রাগ হলেও তেমন আমল দেননা মল্লিকাদেবী।
…নে, হাত মুখ ধুয়ে দুটো তুইও খা চা দিয়ে। কুড়ি বছরের ওপর আছিস আমার কাছে। এসবে রাগ হতে দেখেছিস কখনও? আসলে রেশমীটা এসব খেতে বড্ড ভালোবাসে। মুখ ফুটে তো কিছু বলবেও না কখনো। অফিস থেকে ফিরলে দুজনে যখন চা নিয়ে আড্ডা দিতে বসি তখন এরকম মুখোরোচক কিছু হলে মেয়েটার মনটাও একটু খুশি হয়। আমারও বেশ লাগে। ছাড়, ওসব তুই বুঝবি না।
…চপটা বেশ ভালো হয়েছে গো মাসি। একটা খেলাম। আর একটা বাপির জন্যে নিয়ে যাচ্ছি। ছেলেটা এসব তো আর পায়না।
…ওর জন্যেও রেখেছি। এই দ্যাখ। ছোটো একটা সাদা কন্টেনার খুলে দেখান মল্লিকাদেবী। নিয়ে যা। ছেলে আর ছেলের বাপ দুজনকেই দিস। শেফালী ইতস্তত করে। ভেবে পায়না কী বলবে এই অদ্ভুত মানুষটাকে।

মল্লিকাদেবী কলকাতার একটি নামকরা স্কুলের ইংরেজির প্রাক্তন শিক্ষিকা। বছর বারো হলো অবসর নিয়েছেন। মানুষের প্রতি ওনার ভাবনা, দরদী মনটাকে সবাই ছুঁতে পারেনা। আর পাঁচজন সমবয়সী মহিলার থেকে ওনার ভাবনাচিন্তা অনেকটাই আলাদা। আর তার কারণে বহু মানুষের বহু কথা সহ্য করতে হয় ওনাকে। যদিও ওসব নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নন কখনোই। নিজের কাজ নিজের ভাবনার ওপর ওনার পূর্ণ আস্থা আছে। তাই বিয়ের তিন বছরের মাথায় যখন একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে রেশমী তার স্বামীকে হারায় সেই সময়ে একমাত্র পুত্রকে হারিয়েও মল্লিকাদেবী নিজেকে সামলে রেশমীকে বুকে আগলে রেখেছিলেন। আজ তাও প্রায় সাত আট বছর। পুত্রের পরিবর্তে এক কন্যা উপহার পেয়েছেন একথা বিশ্বাস করিয়েছিলেন নিজেকে।
রেশমীর বাবা মা গত হয়েছেন বেশ কিছু বছর হলো। একমাত্র ভাই ব্যাঙ্গালুরুতে সেটলড। রেশমী একটি বিদেশী সংস্থায় কর্মরত। সামনে সম্পূর্ণ ভবিষ্যত পড়ে। যেদিন অফিস থেকে ফিরে গল্পে গল্পে কলিগ দেবতনুর রেশমীকে পছন্দের কথা মল্লিকাদেবীকে বলে, চোখটা জ্বলজ্বল করে ওঠে ওনার। আলাপ করতে চান ছেলেটির সাথে। কিন্তু রেশমী সেভাবে কিছুতেই ভাবতে চায়না। দেবতনুর তরফেও কোনো জোরাজুরি নেই। একটা ভালো বন্ধুর মত পাশে থাকতে চায় রেশমীর। সবচেয়ে কাছের মানুষের কাছে এই গল্পটা করতে গিয়ে হেসে ফেলে রেশমী। মল্লিকাদেবী সেদিনই রেশমীর মধ্যে এক আলোর সন্ধান পান।
ডক্টর সান্যালের কাছে চেক আপ সেরে উবের নিয়ে সোজা ডি-ক্যাফেতে হাজির মল্লিকাদেবী। টেবিলে বসে এক কাপ ব্ল্যাক কফি অর্ডার করেন। একটা ফোন আসে। দু এক কথায় কথা সেরে ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখেন।
ঘড়িতে সন্ধে সাতটা। ক্যাফেতে রেশমী আর দেবতনুকে ঢুকতে দেখে মুখটা আড়াল করে নেন শাড়ির আঁচলে। কিন্তু টেবিল গিয়ে বসতেই রেশমীর চোখ চলে যায় মল্লিকাদেবীর দিকে।
…মা, তুমি যে এক্ষুনি ফোনে বললে সান্যাল আঙ্কেলের কাছে চেক-আপ করে বাড়ি পৌঁছে গেছো? এখানে হঠাৎ?
…কী করবো বল? তুই তো আর দেখা করাবি না দেবতনুর সাথে। তাই আমাকেই আসতে হলো। তোর আজ এখানে আসার কথাটা জানা ছিলো। তাই আমিও চলে এলাম। নে এবার তো একটু আলাপ করিয়ে দে এই বুড়িটার সাথে।
…মা, তুমিও না!
দেবতনু উঠে এসেছে ততক্ষণে। হাতটা ধরে নিয়ে গিয়ে টেবিলে বসিয়েছে মল্লিকাদেবীকে। বিয়ের কথাটা পেড়েছেন মল্লিকাদেবীই। দেবতনু যতো দেখছে হতবাক হয়ে যাচ্ছে মানুষটার আন্তরিকতা আর উদারতায়।
…বাবা, চার হাত এক করে দিতে পারলে আমি একটু নিশ্চিন্ত হই। আমি আর কদিন! রেশমীর তো গোটা জীবনটাই পড়ে। তোমার মতোই একটা ছেলে চেয়েছিলাম ঠাকুরের কাছে যে ওকে সত্যি ভালোবাসবে।
দেবতনু কী বলবে ভেবে পায়না।
অনেক ভাবনা চিন্তার পর রেশমী গ্রিন সিগন্যাল দিতেই চার হাত এক হওয়ার আয়োজন করেন মল্লিকাদেবী। বাড়িতে আত্মীয় প্রতিবেশীদের একটা ছোট্ট জমায়েতের ব্যবস্থা করেন মল্লিকাদেবী নিজের হাতে। সকলের উপস্থিতিতে রেশমীর সাথে দেবতনুর রেজিস্ট্রি ম্যারেজ সম্পন্ন হয়।
রেজিস্টার চলে যেতে আসেন অ্যাডভোকেট মি. লাহিড়ী। সকলের সামনে কোর্ট পেপারে লিখে বাড়ির সমস্ত সত্ব রেশমীকে দানপত্র করেন মল্লিকাদেবী। জানান, তার নিজের জন্য বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছেন।
দানপত্রের ব্যাপারে একেবারেই তৈরি ছিলো না রেশমী। এমন ঘটনা ঘটতে পারে ভাবতেও পারেনি সে। ঘটনার আকস্মিকতায় রেশমীর সাথে দেবতনুও দিশেহারা। রেশমী উঠে এসে জড়িয়ে ধরে মল্লিকাদেবীকে। সকলের সামনে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, মল্লিকাদেবীকে ছেড়ে সে কোথাও যেতে পারবে না। আর মাকেও কোথাও সে যেতে দেবে না। দেবতনু শান্তভাবে তার হাতটা রাখে রেশমীর কাঁধে।
শান্ত স্থিতধী মল্লিকাদেবী বুকে জড়িয়ে ধরেন অবুঝ মেয়েটাকে। সেই আনন্দসন্ধ্যায় দুই নারীর সারা জীবনের সমস্ত যন্ত্রণা বাঁধভাঙা কান্নায় ভেসে যায়।


অতি সুন্দর পারিবারিক ছবি
ধন্যবাদ দীপঙ্করদা 🙏
খুব ভালো লাগল গল্পটা 💞
খুশি হলাম 😊
সুন্দর গল্প।
ধন্যবাদ 😊