
হার্দিক
কি রে নোটন কখন থেকে ফোন করছি। ধরবি তো? উত্তেজিত স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়লেন অশীতিপর বৃদ্ধ নিশীথ কমল সান্যাল।
ধরব কী করে? নেপুদের আমবাগানে ছিলাম তো।মাঞ্জার ধরতাইতে ছিলাম। দু’হাত বন্ধ।একটু থেমে বলতে শুরু করল নোটন – নেপু, ডিস্কো, রাজু, পান্তাই, ঘোল সবাই ছিল তো ওখানে।জানো আজ বহুদিন পর মাঞ্জা দিলাম।খুব কড়া মাঞ্জা হয়েছে।কাঁচ গুঁড়ো হলেও একটু মোটা গুঁড়ো হয়েছে।হামান দিস্তায় দুবার ফেলেও পাতলা তুষের মতন করা গেল না জানো।টিউব লাইট কম এলে এটাই হয়।সুতোয় মাঞ্জা টানতে এত অসুবিধা হচ্ছিল কি বলব? একনিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল নিশীথবাবুর আদরের নাতি নোটন ওরফে অরিত্র।সদ্য কলেজে ঢুকেছে।
নাতিকে পৌষপাব্বন বা বিশ্বকর্মা পূজার দিন ঘুড়ি ওড়ানো বা মাঞ্জা দেওয়ার নেশা ধরানো দাদু মিটিমিটি হাসছেন – শোন, আমাদের সময় একটু মোটা কাঁচের গুঁড়ো হলে প্রবলেম হত না, কারণ আমরা ছাগলের কান দিয়ে মাঞ্জা টানতাম,ফলে হাতে লাগবার চান্স থাকত না।
আরিব্বাস! এটা তো জানা ছিল না, ইউ আর জাস্ট গ্রেট, দাদু।কোন কথা হবে না। আসলে গতবার পৌষসংক্রান্তির মাঞ্জাটা যা হয়েছিল না, যাকগে যে কথাটা জিজ্ঞেস করব ভাবছিলাম – ঘুড়ি এনেছো তো? কটা আনলে? মাইকের রঞ্জন এসেছিল।আজ রাতেই ছাদে ফিট করবে বলে গেছে।হেব্বি মজা হবে দাদু।তুমি কটায় উঠবে ছাদে? গতবার কত ঘুড়ি কেটেছিলে মনে আছে?
দেখি দাঁড়া।হাওয়া বুঝে উঠব।প্লাস দাঁতটা খুব ভোগাচ্ছে রে।খুব যন্ত্রণা উঠছে মাঝে মাঝেই।উত্তেজিত দাদুর কণ্ঠ – শোন, এক তে তিন ডজন পেয়ে গেলাম খুব সস্তায়। চাদিয়াল খুব ভাল পেয়েছি কটা। কিন্তু মাঞ্জা কড়া হয়েছে বলছিস?
ইয়া, জোরে চেঁচাচ্ছে নোটন।অসাম দাদু।জাস্ট অসাম।কড়া মাঞ্জাই ভাল।তবেই তো খেলা হবে – দাদু কি বলো?
না রে, এই কাটাকাটির খেলায় আঙুলের হয় দফারফা।
কিচ্ছু হবে না। তিনটে আঙুলের জন্য ব্যাণ্ড এড আনা হয়েছে অনেক।নো চিন্তা বস।
হাসছে মিটিমিটি করে বুড়ো নিশীথ কমল।তারপর হাতের ইশারায় নাতিকে কাছে ডেকে নিয়ে আস্তে আস্তে বললেন – কড়া মাঞ্জায় শুধু আঙুল কাটে না,গলাও কাটে জানো তো।আজই কাগজে আছে,গলসিতে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে সুতোয় গলা কাটল তরুণের, আরো কত কী কাটে।
গলায় দৃঢ়তা এনে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে নোটন বলল – বাদ দাও ওসব। আমরা চার তলার ছাদে ওড়াব।ওসবের চান্সই নেই।রাস্তা থেকে ওড়ালে ওসবের ভয় থাকে। এছাড়া আর কী কাটে গো?
নাতির কাঁধে হাত রেখে মাথাটা নামিয়ে এনে বললেন বুড়ো সান্যাল মশাই-দাদুভাই, আর কাটে বুক।

থতমত খেল নোটন- বুক মানে?
বুক গো বুক। হৃদয়।হৃদয়ও কাটতে পারে মাঞ্জা।
সে আবার কী?
হ্যাঁ গো হ্যাঁ।তোমার ঠাম্মিকে জিজ্ঞেস কর না ঠিক বলে দেবে।দাদুর কড়া মাঞ্জার জোর।তার নাতিও তো কম যায় না বলেই মনে হচ্ছে – বলেই হাসিটাকে ঠোঁটের কোণায় ঝুলিয়ে ডান হাতের ইশারায় নাতির পাঞ্জাবী আর কুর্তাটা নির্দেশ করে বলল- তা এই কড়া মাঞ্জায় আজ কোন ঘুড়ি লুটতে চললে দাদু ভাই।
এবারে লাজুক হাসিটা মুখে ছড়িয়ে আদরের নোটন বলল- ও পাড়ার সুবোধদার বিবাহ বার্ষিকীর একটা খাওয়া দাওয়া আছে আজ।
কে সুবোধ? চিনতে পারছি না তো?
আরে আমাদের বান্ধবী পাখি মানে রঞ্জাবতীর দাদা।
ও, বেশ।তা দাদুভাই, আমি আর তোমার ঠাম্মি কড়া মাঞ্জায় হাত, গলা আর হৃদয় কাটলেও; তুমি যেন আবার পাখি শিকার করতে যেও না।
দাদু, তুমি না? আমি চললাম।বলে এক লাফে একতলার ল্যাণ্ডিং এ।
নিশীথ কমল একটু গলা তুলেই বললেন – মনে রেখো দাদুভাই, কড়া মাঞ্জা হাত সুতোয় থাকলেই অস্ত্র আর শরীরে আসলেই বস্ত্র।বস্ত্র এমন এক অস্ত্র যা অহিংসভাবেই শিকারে পটু।
দমবার পাত্র নয় নাতিও। নীচ থেকে চেঁচাল- জানি ঠাম্মিও বলেছে – দাদু গান্ধীবাদী। অহিংস পদ্ধতিতে শিকার কত ভাল হয় তার বড় প্রমাণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝে নিও।
নাতির ফাস্ট বলে ওরাল ব্যাটিং দেখে মুখ টিপে হাসছে আহ্লাদিত দাদু- শুধু স্বগতোক্তি করল- কড়া মাঞ্জা তো! একটু রক্ত ঝড়বেই।তবে ঘুড়ি কাটবেই।গ্যারান্টি!

