
পঞ্চাননের হরফ থেকে আক্ষরিক: একটি প্রতিবেদন
রজত চক্রবর্তীর উপন্যাস ‘পঞ্চাননের হরফ’ অবলম্বনে অনীক নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনা ‘আক্ষরিক’। একাডেমিতে দেখলাম ৮/৬/২৫ – এ। নাটক আর উপন্যাস সাহিত্যের দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্রকরণ। উপন্যাস বর্ণনামূলক(narrative), যেখানে চরিত্র ছাড়া ঔপন্যাসিকের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকে,যা চরিত্র – কথনে বলা যায় না, ঔপন্যাসিক তা বর্ণনার মধ্য দিয়ে পাঠককে অবগত করেন। অপরদিকে নাটকে নাট্যকারের কোন প্রবেশাধিকার নেই। নাটক সংলাপধর্মী এবং সংঘাতধর্মীও বটে। উপন্যাসকে নাট্য করে তুলতে হলে প্রয়োজন অভিনয় উপযোগী সংলাপ। সেক্ষেত্রে সময় এবং চরিত্রপাত্রদের স্মৃতিশক্তির দক্ষতাও স্মরণ রাখা জরুরী।কাহিনী এখানে বর্ণিত নয়, নাট্যক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা ঘটমান। আছে মঞ্চসজ্জা,আলো সংগীত, পোশাক — ইত্যাদি। কারণ নাটক মিশ্রশিল্প। রবীন্দ্রনাথ ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসের নাট্যরূপ দিয়েছেন ‘বিসর্জন’। গ্রহণ – বর্জন ও নাট্য ঘটনার সময়কালের পরিবর্তনও ঘটিয়েছেন।পৃথিবীর সব নাটককারই কোন না কোন মঞ্চের অধীনে থেকেই নাটক রচনা করেছেন – মঞ্চের সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের মঞ্চায়নের সীমাবদ্ধ পরিসরে ‘ডাকঘর’ – এর নাট্যরূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে মঞ্চের ‘চিত্রপট’ অপেক্ষা দর্শকের ‘চিত্তপটের ‘ওপর আস্থা রাখেন। কিন্তু পরে যখন’ডাকঘর’ জোড়াসাঁকোর বিচিত্রাভবনে মঞ্চস্থ হয়, তখন যথেষ্ট জাঁকজমক আড়ম্বরপূর্ণ বাস্তবানুগ মঞ্চসজ্জা করা হয়েছিল,স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই ছিলেন নির্দেশকের ভূমিকায়। ১৩০৯ – এ প্রকাশিত ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ মঞ্চসজ্জাকে ‘স্ফীত পদার্থ’ বললেও পরবর্তীতে তার অন্য প্রতিফলন ঘটে পরিবেশের প্রভাবে। সদ্য গড়ে উঠতে থাকা শান্তিনিকেতনের অভিনয়ে যা দেখানো সম্ভব ছিল না, জোড়াসাঁকোর বৈভবপূর্ণ বাসভবনে তাই ছিল সম্ভব।
বলতেই হয় নাট্য প্রযোজনার অপরিহার্য ভিত্তিরূপ হল মঞ্চবিন্যাস। রাজা ভাঙ্গা চেয়ারে বসলে দর্শক রাজার রাজকীয়তা যথাযথভাবে অনুভব করতে পারে না বলেই আমার ধারণা। মঞ্চ পরিকল্পনায় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান দর্শককে নিয়ে যায় নাট্যে ঘটমান সময়কালে,কাহিনীর গভীরে। পোশাক,আলো,আবহ সংগীত, বিষয়ানুযায়ী বিভিন্ন উপাদান,মঞ্চের সাজসজ্জা সব মিলিয়েই মঞ্চসজ্জ। ঘটনা ও চরিত্রানুযায়ী ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান নাট্যের মূল সুরকে পৌঁছে দেয় দর্শকাসনে।আবার মঞ্চ পরিকল্পনা চরিত্রায়নকেও পরিমাপ করে। সামান্য উঁচু নীচু স্তরে বসা দাঁড়ানো দুটি চরিত্রের সামাজিক অবস্থানকে চিহ্নিত করে। ‘আক্ষরিক’-এও আমরা দেখি পঞ্চাননের সঙ্গে প্রথম হ্যালহেড, উইলকিন্সের সাক্ষাৎ – এর সময় সাহেবরা একটু উঁচুতে বসে আর পঞ্চানন একটু নীচুতে। পঞ্চানন নেটিভ। সাহেবরা তার থেকে সামাজিক মর্যাদায় উচ্চস্তরের।পরবর্তীতে যখন উইলিয়াম কেরীর সঙ্গে পঞ্চাননের সাক্ষাৎ হয় তখন দুজনে পাশাপাশি বসে। এখন শিল্পী পঞ্চানন কেরী সাহেবের সমমানের।
নাট্য পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য স্থান,কাল স্পষ্ট করে দেওয়া। নাট্য ঘটনা কোথায় ঘটছে,কখন ঘটছে – গ্রাম শহর-রাস্তা-জঙ্গল ইত্যাদি বোঝাতে বিভিন্ন উপাদান বা দেওয়ালে চিত্রাঙ্কন করা হয়। আলোচ্য নাট্যে পর্তুগীজ, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এদেশে আগমন, শ্রীরামপুর, চন্দননগর,হুগলী, কলকাতায় গমনাগমনের মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে রজ্জুতে ঝুলন্ত নৌকা আর নৌকার দোদুল্যমানতা সময়ের অস্থিরতাকেই ব্যঞ্জিত করে। ব্যবহৃত উপাদানের গঠন প্রকৃতিও নির্দেশ করে সময়কালকে। ছাপাখানা বোঝাতে মঞ্চে টাঙ্গানো কাপড়, দর্শকাসনের সামনে মঞ্চের নীচে যন্ত্রের সাহায্যে অক্ষর ছাপার পরিমন্ডল তৈরি করা হয়েছে। প্রশ্ন থেকেই যায়, মঞ্চ নির্দেশ নাটককার যা দেন তাই কি পালন করবে, নাকি নাট্যক্রিয়ার প্রয়োজনে যা অনিবার্য নির্দেশক তাই করবেন? বলাই বাহুল্য ‘আক্ষরিক’ যেহেতু উপন্যাসের নাট্যরূপ, সেক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা নাট্য নির্দেশকের আছে। নাট্যক্রিয়ার স্বার্থে যা আবশ্যক, সাধ্যক্ষম তাকেই তিনি দেখিয়েছেন। ( অসাধ্য সাধন করেছেন বলা যেতে পারে) এখানেই নির্দেশকের শৈল্পিকতা ও স্বাধীনতা। সবচেয়ে বেশি বাস্তবানুগ হয়েছে কর্মকার পরিবারের কারখানায় কর্মরত ব্যক্তিবর্গের ছেনি হাতুড়ি দিয়ে কাজ করা যা দীর্ঘ অনুশীলনের ফলশ্রুতি। কর্মীদের ঘর্মাক্ত কলেবর, মুখমন্ডলের অভিব্যক্তি, একই ছন্দে চালিত হাতুড়ি নি:সৃত শব্দ তরঙ্গ কোরাসের মর্যাদা পেয়েছে। প্রথম বারে কর্মীদের মুখাবয়বে দুশ্চিন্তা আর শেষে আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে,বিশেষত পঞ্চাননের। যন্ত্রাংশের বিকট অসহনীয় শাব্দিকতা কনসার্টের রাগিনীতে পরিণত হয়েছে। কর্কশকে নান্দনিকতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া নির্দেশকের অনবদ্য মুন্সিয়ানা। আর আছে চরিত্রপাত্রদের একনিষ্ঠ অধ্যবসায়। দীর্ঘ অনুশীলন ছাড়া যন্ত্রের মানবিকীকরণ সম্ভব নয়। সেই সঙ্গে নানাবিধ আলোর বিচ্ছুরণ এক মায়াবী পরিবেশ গড়ে তোলে। ছেনি হাতুড়ি হয়ে ওঠে সাংগীতিক যন্ত্রাংশ – যার শাব্দিক কম্পন তথা মেলোডি বুঝি বা সুরের ভেলায় ভেসে যায় সুদূর ইংল্যান্ড থেকে রাইটার হয়ে আসা প্রাচ্য ভাষাবিদ হ্যালহেড আর উইলকিন্সের কাছে।

এবার বিশ্লেষণ করা যাক উপন্যাসের বিষয়ভাবনা। উপন্যাসের সময়সীমা তিনশো বছর ১৫০৫-১৮০৪। এই দীর্ঘ সময়কালকে তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি-(নাট্যে দুটি ভাগে)। (১) ১৫০৫ – ১৭৫০ – বাংলা বিশেষত হুগলী চন্দননগরে বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে পর্তুগীজ থেকে শুরু করে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আগমন অচলায়তন অনাটকীয় নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ জীবনে প্রভাব বিস্তার করে। পরিবর্তন হতে থাকে সমাজ – আর্থ – রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তথা গৃহস্থ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। পর্তুগীজদের লুঠ তরাজ,দস্যুবৃত্তি,অবাধ খুন,জলপথে পণ্যবাহী জাহাজ আক্রমণ -হুগলী, সপ্তগ্রাম,ত্রিবেণীর সাধারণ মানুষ ও অন্যান্য বণিককুলের ত্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।” ধন -সম্পদ-শস্য-নারী-পুরুষ -শিশু কোন কিছুই তাদের লুঠের তালিকার বাইরে ছিল না।” এরাই শুরু করে দাস ব্যবসা। এছাড়া পাই নবাবদের প্রশাসনিক কার্যবিধির ঐতিহাসিক তথ্য। থিয়েটারে এই অস্থির সময়কে বাস্তবানুগ করে তোলা হয়েছে আলো আর যন্ত্রশব্দের মেলবন্ধনে। নাট্যক্রিয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে মঞ্চে পদচারণরত প্রাপ্তবয়স্ক পঞ্চাননের একক সংলাপের মধ্য দিয়ে। ফ্লাসব্যাকের মাধ্যমে বলে যায় অতীত অর্থাৎ তার ছোটবেলা।
উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব কর্মকার পরিবারে চতুর্থ পুরুষে পঞ্চাননের জন্ম থেকে হ্যালহেডের ব্যাকরণের প্রকাশকাল পর্যন্ত (১৭৫০-১৭৭৮)। ১৭৫০ – এর অস্থির সময়ে শম্ভু কর্মকারের গৃহে জন্ম নেয় উত্তরসূরী পঞ্চানন,যে কর্মকার পরিবারের ঐতিহ্যকে বহন করে নিয়ে যাবে বিশ্বের দরবারে। ইতিমধ্যে উপন্যাসে আমরা দেখবো নবাব আলীবর্দীর দ্বারা ‘মল্লিক’ উপাধিপ্রাপ্ত হয়েছে পিতামহ নিমাই কর্মকার।পঞ্চানন কর্মকার পরিবারের চতুর্থ পুরুষ। তিন পুরুষে কুড়ুল,কোদাল কাস্তে হাতুড়ি বানানোর কারিগর থেকে খোদাইকর শিল্পী হয়ে ওঠার যে বর্ণনা উপন্যাসে পাই,তাতে অনুমান করা যায় উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধির পারম্পর্যে বংশগরিমা গ্রামের সীমায়িত চৌহদ্দি ছাড়িয়ে আরো অনেক দূর ছড়িয়ে পড়বে। বিশেষত যে অঞ্চলে বিদেশীদের পদার্পণ ঘটেছে। নাট্যে সেই আগাম পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য মাতৃক্রোড়ে সদ্যজাত শিশু হয়ে ওঠে হাতুড়ি। একে অপরের অল্টার ইগো। দর্শক মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যায় যে কর্মকার পরিবারের ঐতিহ্য তথা পারিবারিক ব্যবসা চতুর্থ পুরুষেও টিকে থাকবে। কিন্তু টিকে থাকতে গেলে প্রয়োজন বিবর্তন, নতুন চিন্তা ভাবনা। ছেনি হাতুড়ির শাব্দিক পরিবার চতুর্থ প্রজন্ম সৃজনশীলতা , বৈদেশিক পরিমন্ডল ও সাহেবদের সাহচার্যে বাংলা হরফ তৈরির স্থপতি হয়ে উঠবে অদূর ভবিষ্যতে। নবাব আলীবর্দীর সময়ে বর্গীর আক্রমণ বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়।গোবিন্দপুর,সুতানুটি,কলকাতা নিয়ে ওয়ারেন হেস্টিংসের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠতে থাকে কলকাতা। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরেই শম্ভুচরণ দুই পুত্র গদাধর আর পঞ্চাননকে নিয়ে জিরাট ছেড়ে চলে আসে বংশবাটিতে। বাড়িতে ছেনি হাতুড়ির শব্দ শুনতে শুনতে দুই ভাই বড় হয়ে ওঠে।রাণীমার রূপোর থালায় বাবার আঁকা নকশার ফাঁক ডুমুর ফুল এঁকে ভরাট করে দেয় ছোট্ট পঞ্চা। শুরু হয় তার পথচলা।
প্রাচ্যবিশারদ হ্যালহেড আর উইলকিন্সের রাইটার হয়ে এদেশে আগমন ঘটে। উইলকিন্স খোদাইকরও বটে। তারা দেখে বোল্টসের ব্যঞ্জনবর্নে একই অক্ষরের একাধিক ফন্ট। একটি নির্দিষ্ট আকার দেওয়ার চেষ্টায় মেতে ওঠে দুই প্রাচ্যবিশারদ। এ ব্যাপারে বাঙালী লিপিকার পঞ্চাননই সাহেবদের স্বপ্নকে সার্থক করে তোলে। জন্ম হয় চলমান বাংলা হরফের কর্মকার বাড়ির কারখানা রূপ আঁতুড়ঘরে। নতুন কিছু সৃষ্টির নেশায় পঞ্চানন বিভোর হয়ে থাকে। শিল্পীর তকমা পায় সে। কালজয়ী সৃষ্টির মুহূর্ত উপন্যাসে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে,নাট্যে তা প্রাপ্তবয়স্ক পঞ্চাননের সংলাপ আর সমবেত ব্যক্তিবর্গের উচ্ছ্বাস উদ্দীপনায় দেখানো হয়েছে। বিশেষত যুবক পঞ্চাননের অভিনয় দক্ষতা প্রশংসনীয়। ১৭৭৫- এর এই দিনটি শিল্পী পঞ্চাননের জীবনে তথা বাংলা হরফের ইতিহাসে তা অনুল্লেখ থেকে গেছে। এনগ্রেভার উইলকিন্সের কাছেই পাঞ্চ কাটা ইত্যাদি শিখে চলমান বাংলা হরফ তৈরি করে পঞ্চানন। মঞ্চে ছাপাখানায় হ্যালহেডের ব্যাকরণ বই ছাপার দৃশ্যে অদ্ভুত এক বাতাবরন সৃষ্টি হয়।পঞ্চানন সাহেবদের কাছে শিল্পী হয়ে উঠলেও,গোরাদের সংস্পর্শে আসায় শুদ্ধিকরণের জন্য স্ত্রী সুধা গঙ্গাজল ঢেলে স্নানও করায়। বেদনার্ত এই যে অক্ষর তৈরির কারিগর শিল্পী পঞ্চানন, হয়তো বা পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করার কারণে হ্যালহেডের বইয়ের আঠাশ পাতার ভূমিকায় নিজের নামের অক্ষর স্থান পেল না। নিজের তৈরি অক্ষরে নিজের নাম লিখতে পারল না। শিল্পীর ট্রেজেডি এখানেই! শিল্পী মন ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। সুধা যোগ্য সহধর্মিণীর মতই স্বামীর ভেঙে যাওয়া শিল্পীমনকে পুনরুজ্জীবিত করে। পিতৃত্বের অনুভূতি ভগ্নহৃদয় শিল্পীমনকে জাগিয়ে তোলে নতুন উদ্দামে। উপন্যাসে এই অংশের বিস্তারিত বর্ণনা নেই। কিন্তু নাট্যে দেখানো হয়েছে চিরন্তন পিতৃসত্তাকে, যার মধ্যে মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়। সন্তানের জন্য মানুষ সব দু:খ বেদনা ভুলে থাকতে পারে।পঞ্চাননের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। নাট্যের প্রথম পর্বের সমাপ্তি এখানেই (উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব)। উল্লেখ্য যে এরপর দশ মিনিটের বিরতি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কোন পর্দা পড়ল না। দেখা গেল পরবর্তী মঞ্চসজ্জায় সকলে ব্যস্ত। আসলে পর্দা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের সঙ্গে চরিত্রপাত্রদের যে দূরত্ব তৈরি হয় এক্ষেত্রে তা হয়নি। সম্মুখাসনে উপবিষ্ট দর্শকমন্ডলী নাট্যেরই অংশবিশেষ।

তৃতীয় পর্বে কথক যুবক পঞ্চানন। ঘটমান নাট্যক্রিয়ায় অংশ নেয় প্রাপ্তবয়স্ক পঞ্চানন। কলকাতার খিদিরপুরে কোম্পানীর ছাপাখানায় কাজ করতে থাকে দীর্ঘ চোদ্দ বছর। উইলিয়াম কেরীর শ্রীরামপুরে মিশন প্রতিষ্ঠা, বাংলা ভাষায় বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের প্রকাশের জন্য প্রেসের কাজে পঞ্চাননকে নিয়ে আসে। অর্থ নয়,শিল্পীর যথাযোগ্য সম্মানই পঞ্চাননকে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের মোহ ত্যাগ করে নিয়ে যায় শ্রীরামপুরের অস্বাস্থ্যকর অনিশ্চিত জীবনে। কেরী সাহেবের দেওয়া শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মান পঞ্চাননের বেদনার্ত শিল্পীসত্তাকে শ্রান্ত করে। কেরী -পত্নী ডরোথির সন্তানহারা মার্তৃত্বের হাহাকার একদিকে যেমন দর্শককে ভারাক্রান্ত করে ঠিকই ,অপরদিকে প্রাচ্য সংস্কৃতির টানে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে জীবনহানিকর অস্বাস্থ্য পরিবেশে উইলিয়াম কেরীর আসা অভিভূতও করে। নিষ্ঠাবান কর্মীকে কুর্ণিশ না জানিয়ে থাকা যায় কি? এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশই ডরোথিকে সন্তানহারা করেছে।সন্তানের হত্যাকারীর তকমা নিয়েও কেরী সাহেব নিজ লক্ষ্যে অবিচল থেকেছে। শ্রীরামপুর থেকে বাইবেলের প্রকাশে নিজের তৈরি হরফে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখতে পেরেছে বাংলা ভাষার স্থপতি পঞ্চানন কর্মকার। আসলে যেকোন সফলতার পিছনেই যে কত সাধনা,ত্যাগ থাকে নাট্যে সেটাও তুলে ধরা হয়েছে – সব আলোর নীচেই আছে অন্ধকার!!
পঞ্চানন জামাতা মনোহর কর্মকারকে যোগ্য উত্তরসূরী করে রেখে যায়। ১৮০৪ জীবনাবসান হয় ব্যক্তি পঞ্চাননের। কালজয়ী হয় তার শিল্পীসত্তা। যে ভাষা পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা,আধুনিক যুগের অভ্রের ইউনিক কোর্ড গড়ে উঠেছে পঞ্চাননের আবিষ্কৃত চলমান (moveable) হরফের ওপর ভিত্তি করেই সেই বার্তাই ঘোষিত হয় । নাট্যের শেষ দৃশ্যে মঞ্চে শয়নরত বালক – যুবক – প্রাপ্তবয়স্ক পঞ্চানন বর্তমানের অতীতকে উপস্থাপিত করেছে। অতীত ছাড়া বর্তমান ভিত্তিহীন। পিতারও পিতামহ আছে, প্রতিটি ব্যক্তিসত্তার এই সত্য জ্ঞাত হওয়া অনিবার্য নয় কি? নাট্যে বারংবার ব্যবহৃত লোকসংগীত “এখনো সে বৃন্দাবনে বাঁশি বাজে রে —” গানটি বাংলা ভাষার জন্মলগ্নকে প্রতীকায়িত করে। বৃন্দাবন আমাদের তীর্থক্ষেত্র, তেমনি জিরাট গ্রামও তাই,যা একটি জাতির ভাষাভাষী মানুষের অস্তিত্বের পীঠস্থান। যাত্রাপালায় বিবেকের মত এই গান আমাদের অস্তিত্বের শিকডে টান দেয়। হ্যালহেড বাংলা হরফের স্থপতিকে ইতিহাসের পাতায় স্থান না দিলেও সত্য ম্লান হয়ে যায় না। বর্তমানের ভিড়ে চাপা পড়ে গেলেও সে অবিকৃতই থেকে যায়,তা কোন কালসীমায় আবদ্ধ নয়
গানের পৌন:পুনিকতা আমাদের জাতিসত্তাকে জাগ্রত করে। কণ্ঠশিল্পীর সুরের জাদুতে সকলেই অভিভূত। এটা নাট্যের অভিনব সংযোজন।
অক্ষরসমষ্টি (হরফ) দ্বারা সৃষ্ট অর্থপূর্ণ শব্দের সাধারণ অর্থই হল আক্ষরিক।আবার আক্ষরিক কথাটা অবিকল অর্থেও ব্যবহৃত হয়। আমাদের বাংলা ভাষা তথা হরফ সৃষ্টির অবিকল ইতিহাসকে
(উপন্যাস অবলম্বনে) তুলে ধরা হয়েছে নাট্যে। সেই অর্থে আক্ষরিক। আবার প্রতিটি অক্ষর সৃষ্টি এক একটা মাইলস্টোন। প্রতিটি অক্ষর হয়ে ওঠে অর্থপূর্ণ – শব্দের থেকেও বেশি কিছু বলে – এক্ষেত্রে সৃষ্ট চলমান অক্ষরের ব্যঞ্জিত অর্থই আক্ষরিক। ‘পঞ্চাননের হরফ’ অনুসরণে অনীকের নাট্যরূপ ‘আক্ষরিক’ উপন্যাসের মৌলিকতাকে অক্ষুণ্ণ রেখেই নতুন সৃষ্টি হয়ে উঠেছে। বাস্তবানুগ মঞ্চ বিন্যাস, চরিত্রপাত্রদের একনিষ্ঠ অধ্যবসায়,সাবলীল অভিনয়,মাধুকরী সুরেলা কণ্ঠ সর্বোপরি নির্দেশকের শৈল্পিকতার মেলবন্ধনে ‘আক্ষরিক’ হয়ে উঠেছে “creation within a creation”.

নাট্য প্রযোজনা দেখে সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গীতে তুলনামূলকভাবে দুটি ভিন্নতর সাহিত্য প্রকরণকে দেখার চেষ্টা করেছি সীমিত পরিসরে। এ প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা না বললে মন মানছে না। তাই প্রাসঙ্গিক দু- এক কথা বলি। প্রথমেই সাধুবাদ জানাই রজত চক্রবর্তী মহাশয়কে। যিনি মূল উৎস, যিনি ছাড়া নাট্য হতো না। পঞ্চানন কর্মকারের নাম কজন বাঙালীই বা জানে? আমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী হয়ে এবং ক্লাসে পড়াবার সুবাদে পঞ্চানন কর্মকার সম্পর্কে কিছুটা জানলেও এত বিস্তারিতভাবে জানতাম না। উপন্যাসটা আমি দুবার পড়েছি। জানলাম ঐ অঞ্চলের ইতিহাসও। এ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এবং ইতিহাসে খুব বেশি কাজ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। রজতবাবুর সঙ্গে পরিচয় করার ইচ্ছা রইল। প্রত্যাশা রইল আরো কিছু পাওয়ার। সর্বোপরি বিস্মিত হলাম নাট্য প্রযোজনা দেখে। এরকম একটি অ -রোমান্টিক বিষয়কে প্রাণবন্ত করে, কর্কশকে মধুরে পরিণত করা যায়? সাহিত্যের সব শাখার মধ্যে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা নাটক তথা নাট্যেরই বেশী। এটাই হল উপযুক্ত সময়, যখন বাংলা ভাষার অস্তিত্বের সংকট দেখা দিয়েছে, ঠিক তখনই বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে তথা সমাজকে চিনিয়ে দেওয়া আবশ্যক জাতির তথা ভাষার তথা অক্ষরের আঁতুড় ঘরকে। অনুভব করানো প্রয়োজন সন্তানসম – অক্ষর প্রসবের প্রানান্তকর যন্ত্রণাকে। যে ভাষায় সৃষ্ট সাহিত্য বিশ্বজয়ী,সেই ভাষাকে প্রগতিশীল করার নৈতিক দায়িত্ব ত আমাদের প্রত্যেকেরই।অনীক নাট্যগোষ্ঠী সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করেছে ‘আক্ষরিক’- এর প্রযোজনার মাধ্যমে। অনেক শুভেচ্ছা অভিনন্দন রইল অনীকের জন্য।

