এ কোন সকাল ? রাতের চেয়েও অন্ধকার ! বাঙালি শুধু কাব্য করে যাব ? নাহলে তো ফার্মাকোলজিটাই নিয়ে আজ লেকচার নাববো লেকচার নাববো…। বিষয় বড় গম্ভীর। হিন্দি আগ্রাসিত মনে বললাম। সিরিয়স বিদেশি। গম্ভীর স্বদেশী। বাংলা প্রতিশব্দ তো আগে লিখব। নাকি ? অজ্ঞাতে ট্রয়ের ঘোড়া ঢুকেছে আমার আঁতুড়ঘরে। আমাকে উৎপাটন করেছে আমার ভাব প্রকাশের মায়ের ভাষা থেকে। আমি কী অসহায় ! যদিচ এমন হবার কোনও সিদ্ধ সমর্থ যুক্তি বুদ্ধি নেই আমার চৌহদ্দিতে। প্রাণাঃ শরীরে। তবু আমি বৈশাখী। মহোদয় মহোদয়া, এ বৈশাখ কলুষমুক্ত হোক। পৃথিবী যখন রসাতল চায়, মানুষ তাকে বাঁচায়। কয়ামতের দিন, কাব্য যাকে রাত বলেছে, আমরা তার স্মরণে অরণি হয়ে জ্বলি। সেই আবার হিন্দির পরাভব। বৈশাখী মানে ক্রাচ। পায়ে জোর নেই। তাই কাঠের নির্ভরে ভর দিয়ে চলি।
অথচ আমি তো স্বয়ম্ভর। আমি নিজের ভাষায় বলতে পারি, চলতে পারি, গান গাইতে পারি, সইতে পারি সময়ের সব উপাচার, অনাচার, অনায়াসে অস্থির বিচার। হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান। এটাই কি বাঙালির বাংলার স্লোগান হতে পারে ? তাহলে আমরা কোথায় ? কোন বায়ুভূতে নিরাশ্রয় আমরা দাঁড়াবো তোমার পক্ষপুটের আবডালে‌ ! তোমাকে আমি আমার পথপ্রদর্শক বলে ভাবিনি। চেয়েছি আমার রবি ঠাকুরের সুবর্ণ গোলক।
তবে ? বাসন্তী পুজো। দুর্গাপুজোর মতো এতে শারদোৎসব নেই। এ তো বসন্ত ! আয়রে বসন্ত , তোর মিলনমাখা পাখা তুলে। তবু কোনোও বসন্তের কোকিল কোকিল কাকের বাসাকে ফাঁকা ছেড়ে দেয়। এখন সোজা চলে যাই মা দুর্গার সঙ্গে রামের সংবাদে।
শুধু রাম রাম, আর রাম রাবণ হবে ? আর বাসন্তী পুজোর পাঁচটা দিন ভেসে যাবে ? এটাই তো আদি দুর্গাপূজা। সুরথ ও সমাধী এই বাসন্তী দুর্গাপূজার প্রচলন করেছিলেন। আর রামনবমী সেই পুজোর শেষ দিন। রামের জন্মতিথি। রাজীব লোচন রাম তো মা দুর্গার পুজো করেছিলেন শরৎকালে, রাবণবধের পর। পুজোর উপাচার ১০৮ টা পদ্মের মধ্যে একটিকে মা লুকিয়ে রেখেছিলেন ঘটের নীচে। রামের পরীক্ষা নিতে। রাম রাজীব মানে পদ্মলোচন বলে নিজের একটি চোখ উপড়ে ফেলে ১০৮ করার জন্যে নিজের চোখে বাণ তাক করেন। এবং মা তার হাত চেপে ধরে ঘটের নীচে রাখা পদ্মটি দেখান। পারবেন কোনও হিন্দুত্বের গলা কাঁপানো কিলিপকান্ত মানে দিলীপ বা সুকান্ত এবং তাঁদের অপূর্ব প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলার শাসকদলের সিপাহীগণ ? দানে ধ্যানে সমুজ্জ্বল যাঁরা। শাসকের সমাদৃত নৃতাত্ত্বিক, পৌরাণিক বা পুরাণের তত্ত্ববিদ যত আরোহী বা অবরোহী বিদ্বজ্জন তাঁরাই বলুন, আমাদের তো অনাদি অনন্ত কাল থেকে বাসন্তী পুজো ছিল। দুর্গা ষষ্ঠী বীরাষ্টমীর ব্রতের মতো আমাদের মা মানে মায়েরা বাসন্তী পুজোর ষষ্ঠীতে অশোক ষষ্ঠী ব্রত করতেন। কেউ কেউ অশোক ষষ্ঠীর মতো অশোক অষ্টমীও করতেন। কিন্তু রাম নবমীর ব্রত উপবাস আপামর বাঙালি রমণীকুলের কাছে অনুকরণীয় ছিল না। ওটা ওদের সংস্কৃতি। আমাদের বাঙালিদের নয়। এর পর কীসের ব্যাংলা পীড়িতি ? আমার বাসন্তী নেই মানে বাংলা নেই। তার নীলপুজো নেই। নীলের ঘরে দিয়ে বাতি জল খাও পুত্র ( কন্যাসহ ) বতী নেই। আছে মরচে পড়া তলোয়ার, কাঁথির রাজনীতির কাঁথা সেলাইয়ের অধিকারে স্বঘোষিত পয়গম্বর হওয়া বিচিত্রবীর্য ভব অবতার। তার হার আছে হাড় নেই, গড় আছে গোড় নেই, তিনি এক ত্রিকাল তান্ত্রিক।


শৈশব কৈশোর কেটেছে হিন্দি জগতে। কিন্তু সেখানেও বাসন্তীপুজো ছিল। চারদিন ধরে পুজো হত। অবিকল দুর্গাপুজোর মত। নবমীর দিনে হনুমানের জন্যে কিছু আয়োজন। কিন্তু মাতৃভক্ত হনুমান জানেন বাসন্তী পুজোর মতো দুর্নিবার দিন আর মন্তাজের রাত। রাম জানেন, এটা তাঁর বিনত মাতৃভাষার মাতৃগর্ভ, বিষন্ন সংলাপ। প্রভু আমরা যে নষ্ট হয়ে গেলাম। সংস্কৃতির সঙ আছে, কৃতি নেই। মন্তাজের তাজ আছে মন নেই। বাংলার বাঙালির আদি উৎসবের অন্তর্গত শিবের গাজন নেই, চড়ক পুজোয় সন্ন্যাসীর পিঠে তিতিক্ষার তীব্র হুকে বিঁদ্ধ সন্ন্যাসীর নিবেদন নেই শুধু রামনবমী আছে। এই ছিন্ন সংস্কৃতি বাঙালির বৌদ্ধিক মনন নয়। নিছক রাজনীতির রহস্য ভূম, বাংলার প্রবুদ্ধ সংস্কার বৃত্ত নির্বিচারে ভুলে যাক বাঙালি। তার অনিত্য অশ্রুত অদ্ভুত কিছু গর্জন আসুক চর্যায়। বিসর্জন হোক নবজাগরণ। ঊনিশ শতক পুড়ে যাক। জাগরণের বিসর্জন আর একুশ শতকের বিভাজন। রাম নবমীর এটাই প্রকরণ।
শারদোৎসবের সময় উত্তর ভারতের রামলীলা সরকারি উৎসবের আয়োজনে যথেষ্ট সমাদৃত। বাঙালিরা হিন্দি বলয়ের যে যেখানে আছেন, তাঁদের সংস্কৃতিতে একটুও অবাঙালি মিশেল পড়েনি। দিল্লি বলুন, মুম্বই বলুন, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, বিহারে তো কথাই নেই, দুর্গাপুজো কলকাতার চেয়ে কম নয় বেশি ধার্মিক রীতিনীতি মেনে হয়ে থাকে। ধর্ম থেকে মর্মে লেগে থাকে সেই শারদীয় মহোৎসবের সংস্কৃতির বহুবর্ণিল বাহার। বাঙালি তো বঙ্গে শুধু নেই, বহির্বঙ্গে বহির্বিশ্বে স্থিত। যদি আঙ্গার দেশে বাঙলা মায়ের মন্ত্রে এত সমাগম এত অপূর্ব অর্জন, তবে সামান্য ভোটের এই রাম হনুমান গর্জনে কিংবা আসে যায়!

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মে ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Dr Dipak Banerjee
Dr Dipak Banerjee
1 year ago

আপনার মতের সঙ্গে একমত। সুন্দর ভাবে লিখেছেন!
অশোক ষষ্ঠী ও অষ্টমী, বাঙালি মায়েরা পালন করেন!
এই রাম নবমীর হোল্লোরি বোধকরি বছর চারেক শুরু হয়েছে!