“জ্যেঠিমা”র শিশুসুলভ উচ্চারণ “জাম্মা”। শুনেছিলাম আমার দিদির মুখনিঃসৃত প্রথম “জাম্মা” সম্বোধন পরবর্তীকালে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিলো। শুধু আমরাই নয়, আমাদের সব বন্ধুরা এমনকি পাড়াপড়শির কাছেও তিনি ছিলেন “জাম্মা”।
এই জাম্মা ছিলেন কিছু বিরল গুণের অধিকারী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক পরেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো যেকোনও কারণেই হোক আমাদের বিশাল পরিবার এক ভয়ঙ্কর বিপদের মুখোমুখি হয়েছিল। তার ঠিক একমাস আগে জ্যাঠামশায়ের অকালমৃত্যুর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল। পারিবারিক ব্যবসার নৌকাটি এতো বেশি টলমল করছিলো যে আরোহীদের অস্তিত্ব বিপন্ন। এই বিপর্যয় সামলাতে সদ্য স্বামীহারা আমাদের জাম্মার ভূমিকা কখনো ভোলা যাবেনা। আজ থেকে আশিবছর আগে একজন মহিলার পক্ষে এই কৃতিত্ব ছিল অকল্পনীয়। তাঁর সাহস, যেকোনও পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দেবার সহজাত ক্ষমতা ও ব্যক্তিত্বও ছিল অসাধারণ।
একবার আমাকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও একটা হেঁটে যাচ্ছিলেন । রাস্তায় দেখা গেলো অনেক লোক মিলে শতচ্ছিন্ন কাপড়পরা একজন অপ্রকৃতিস্থ প্রৌঢ়ার সাথে লাগাতার হাসিমশকরা করছে আর সেই প্রৌঢ়া চিৎকার করে গালাগাল দিচ্ছে। তাতে দ্বিগুণ উৎসাহে আরো বেশি করে তাকে সবাই ক্ষ্যাপাচ্ছে আর হেসে গড়িয়ে পড়ছে। এই দৃশ্য দেখে জাম্মা থমকে দাঁড়িয়ে হঠাৎ ছেলেদের সামনে চলে গিয়ে বললেন, “তোমাদের কারোর মা’কে এমন করলে ভালো লাগতো? ছিঃ।” এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে সবাই চুপ। আভিজাত্যপূর্ণ চেহারা ও প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী জাম্মার সামনে উপস্থিত কারো কিছু বলার ক্ষমতা ছিলোনা। এরকম ঘটনা তাঁর জীবনে অনেক ঘটেছিল যার বেশকিছু আমার নিজের চোখে দেখা।

জীবিত অথবা মৃত যেকোনো মানুষের একটা জন্মশতবার্ষিকীর অঙ্ক থাকে। সে হিসেবে আমার মা এবং জাম্মা দুজনেরই সেন্টিনারি উদযাপিত হতে পারতো । আমি নিজেও কিন্তু তাদেরই দলে পড়ে যেতে পারি অনায়াসেই । নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে বিষাক্ত বাতাস টানা আর লাগাতার ভেজাল খাদ্য খাওয়ার জন্যে আমার পরমায়ুকে যদি টোয়েন্টি পার্সেন্ট সাবসিডি দেওয়া যায় তাহলে আজই আমারও জন্মশতবার্ষিকী পালন করা যেতে পারে ।

আমাদের বাড়িতে কবিতার একটা বাতাবরণ ছিল অবশ্যই ।বাবার ছিল কাব্যসাহিত্যের ওপর আশৈশব প্রীতি। নিজে পড়তেন ও শুনতেন ।
বাবাকে শোনাবো বলে একদিন বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের ” পতিতা ” কবিতাটা বলতে শুরু করলাম । প্রথম দুটো লাইন ” ধন্য তোমারে হে রাজমন্ত্রী / চরণপদ্মে নমস্কার / লও ফিরে তব স্বর্ণমূদ্রা / লও ফিরে তব পুরস্কার ” এই পর্যন্ত বলে থেমে গেলাম । আর মনে পড়ছেনা । মা পাশেই ছিলেন । আমাকে অবাক করে মা শুরু করলেন — “ঋষ্যশৃঙ্গ ঋষিরে ভুলাতে / পাঠাইলে বনে যে কয়জনা / সাজায়ে যতনে ভূষণে রতনে, /আমি তারি এক বারাঙ্গনা ” । তারপরে গড়গড় করে আরো কুড়ি পঁচিশটা লাইন নির্ভুলভাবে বলে গেলেন ।   আমাকে অপ্রস্তুত দেখে মা বললেন — আরে তোদের ঘুম পাড়াবার জন্যে আমরা এইরকম অনেক কবিতা মুখস্থ রাখতাম। ‘ খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো ‘ এসব ছড়া আমরা সাধারণত বলতাম না । আর জাম্মা তো যথেষ্ট কবিতাপ্রেমীই ছিলেন । তখন আমি কলেজে পড়ি ।মনে আছে একবার সন্ধের সময় আমাকে বললেন , ‘ খুব ভালো করে ঐ কবিতাটা আবৃত্তি করতো শুনি । ঐ যে – শুধু থাক অন্ধকার / মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’। সেইটা এবং জীবনানন্দের আরো কয়েকটি যতক্ষণ পড়লাম জাম্মা চোখ বন্ধ করে শুনে গেলেন । অবাক হয়ে ভাবি সেইযুগে যখন মেয়েদের কোনো প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ ছিলনা , তখন স্রেফ নিজের তাগিদেই এঁরা কেমনকরে কিছুকিছু মননশীল চর্চার চেষ্টা করতেন । 

আমার বাবা খুব কবিতামনস্ক ছিলেন । নিজেও কিছু কিছু লিখতেন , ছাপাও হয়েছে। বাবার কবিতা শোনাবার সবচাইতে প্রিয় মানুষ ছিলেন তাঁর বড়োবৌদি অর্থাৎ আমাদের জাম্মা । তখন ঘরে কেউ ঢুকলে রেগে যেতেন । বাবার কথা অনুযায়ী মুখ্যু (!!)রা এসবের কী বুঝবে । ‘ মুখ্যু’ শব্দটা কথার মাত্রার মতো ছিল । বিরক্ত হলে মাঝে মাঝে অনেককেই বলে দিতেন । আমরাও বাদ যেতাম না । মুখ্যু বলতে কিন্তু মুর্খ নয়, যারা কবিতার কিছু বোঝেনা, তারা।             একটা দৃশ্য এখনো মনে পড়ে । সন্ধের দিকে একটা ঘরে  চেয়ারের ওপরে দাঁড়িয়ে বাবা , হাতে একটা বই । দেখার সুবিধার জন্যে বইটা আলোর নীচে রেখে কালিদাসের মেঘদূত খুলে বাবা উদাত্ত গলায় আবৃত্তি করছেন — ‘ তন্বী শ্যামা শিখরদশনা পক্কবিম্বাধরোষ্ঠি মধ্যে ক্ষামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভি…’ ইত্যাদি ,সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যাখ্যাও করে যাচ্ছেন আর গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনে যাচ্ছেন একমাত্র শ্রোতা জাম্মা । 

জাম্মার বিয়ে হয়েছিল এগারো বছরে আর মায়ের তেরো বছরে । আমাদের গোস্বামী পরিবারে তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন বাবাদের মেজকা অর্থাৎ ডাক্তার উপেন্দ্রনাথ গোস্বামী । তাঁর ইন্সট্রাকশন অনুযায়ী লাঞ্চ কিংবা ডিনারে মেন কোর্স ছিল আমার মায়ের ভাষায় দাদঘানি চালের ভাত আর পোনা মাছের ‘ট্যালট্যালে’ ঝোল । ডেজার্ট হিসেবে চিনি মেশানো একবাটি দুধ । এর কোনোটাই মায়েদের পছন্দ নয় । মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করতো তাদের স্বপ্নের আলুকাবলী , চানাচুর ইত্যাদি । কিন্তু সেইসব খাবারের সঙ্গে গোঁসাইবাড়ির দূরত্ব কয়েক আলোকবর্ষ । তবে যে কোনো সমস্যারই সমাধান থাকে । Necessity is the mother of invention । একটা সমাধান বেরিয়ে এলো । বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে রোজ দুপুরে একজন ঐসব আইটেম ফেরি করতো । তার সঙ্গে আঁতাত করে সবার অলক্ষ্যে শাড়ির প্রান্তে টাকা বেঁধে ওপর থেকে নীচে ঝুলিয়ে দিলেই কাজ হাসিল । 
গল্পের বইও মা আর জাম্মাকে সবসময় একসাথেই পড়তে দেখেছি । মা পড়ে যাচ্ছেন আর জাম্মা শুনে যাচ্ছেন ।  সেযুগে বাড়ির অল্পবয়স্কা বৌদের পক্ষে উপন্যাস অর্থাৎ ” নবেল ” পড়া সহজ ছিলনা । সেইসময় গোস্বামী পরিবারে নতুন-বৌদের শিক্ষাসংস্কৃতির ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন আমাদের ফুলদাদু অর্থাৎ জ্ঞানেন্দ্রনাথ গোস্বামী । নিয়ম ছিল বাড়ির নতুন বৌরা যদি কোনো নবেল পড়ার ইচ্ছে প্রকাশ করতো , তখন ফুলদাদু প্রথমে নিজে সেটা আদ্যোপান্ত পড়তেন । তারপর জায়গায় জায়গায় লেখাগুলো হালকা কালি  দিয়ে কেটে দিতেন অর্থাৎ সেগুলো adults only। তাঁর censure board থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মায়েদের হাতে যেত । তাঁরা কোনোদিন না বললেও আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে দাগ দেওয়া জায়গায় তারা আগেই চোখ বুলিয়ে নিতেন ।

মা-জাম্মা জুটিকে আমি অনেকবার একসাথে সিনেমা দেখতে যেতে দেখেছি । দু একবার আমারও সঙ্গে যাবার সুযোগ হয়েছিল । প্রত্যেকবার একটা ব্যাপার লক্ষ্য করতাম । সিনেমা শুরু হওয়ার মিনিট দশ/পনেরো পরেই কোনো অভিনেতার একটা বিশেষ সংলাপ শোনার পর জাম্মা মাকে বলতেন – বুঝলিতো , আমি নিজেও তো চিরকাল এই কথাই সবাইকে বলতে চেয়েছি ।’ তারপর নন্-স্টপ চলতো তাঁর নিজের জীবনদর্শন , মানুষের ভবিষ্যৎ এবং আরো অনেক কিছু । মাঝখানে মা দুএকবার হালকা চেষ্টা করতেন থামাতে কিন্তু কথার সে বিপুল স্রোতধারা থামতো সিনেমা শেষ হওয়ার পরে। তাও সিনেমা দুজনের একসাথেই যাওয়ার রেওয়াজ বন্ধ হয়নি ।

জাম্মার জীবনের শেষ প্রান্তে যখন তাঁর বিদায় আসন্ন বোঝা যাচ্ছে , তখন আমি মায়ের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেছিলাম । মুমূর্ষু জাম্মার বিছানায় বসে দুজন দুজনের হাতের তালু ধরে চুপকরে বসে থাকতেন ঘন্টার পর ঘন্টা। মা মাঝেমাঝে জাম্মার কপালে হাত বুলিয়ে দিতেন। নীরবতা তখন অনেক বেশি কথা বলতো।


আমাদের সবায়ের জীবনে একসাথে চলা দীর্ঘ পথে অনেক আলোছায়া , অনেক সম্পর্কের টানাপোড়েন, মাঝেমাঝে একটুআধটু বেসুরো, অনেক দুঃখ, অনেক ব্যাথা মিশে থাকে । আবার তার মধ্যেও কিছু কিছু ভালোবাসা চিরস্থায়ী আসন পেয়ে যায় । তখন জীবন আমাদের চোখের সামনে মেলে ধরে আবরণহীন এক অনাবৃত সত্য ও সৌন্দর্য আর আমরাও চেষ্টা করি আত্মানুসন্ধানের উজ্জ্বল শিকড়ের কাছে পৌঁছে যেতে । সুদীর্ঘ জীবনপথের বন্ধু বা দিদি চলে যাচ্ছে তার জন্য কষ্ট অত্যন্ত স্বাভাবিক কিন্তু মায়ের শোকের মধ্যে আরও  গভীর কিছু একটা ছিলো যেটা অন্য কেউ বুঝতে পারবে না । সেই ” কিছু একটা ” বুঝতে পেরেছিল মাত্র দু’জন , আমার মা আর জাম্মা ।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]