গোপিজনবল্লভ পদরেণুপঙ্কজ শঙ্কররঞ্জনবাগচী
এর থেকে কিছু বোঝা গেলো ? বোধহয় না। তবে জানিয়ে রাখি এটা ছিলো একজনের নাম। আমরা এই নামের আসল মালিককে চিনতাম শুধু ‘ শঙ্কর রঞ্জন বাগচী ‘ হিসেবে অর্থাৎ আমাদের বড়োমামা। আমাদের জেঠিমার বড়োভাই।

মানুষটি খুব ভালো ছিলেন বড়োমামা এবং বেশ মজার। অসম্ভব সৌখিন মেজাজের এবং একজন দক্ষ অভিনেতা ছিলেন। পেশায় বেলঘোরিয়ার মোহিনী কটন মিলের কর্মী , নেশা ছিলো অভিনয়। আমি তাঁর যুবাবয়সের একটা ছবি দেখেছিলাম, রিতিমত হ্যান্ডসাম।
আমাদের শ্রীরামপুরের বাড়িতে মাঝেমাঝে আসতেন। আমার মাকে খুব স্নেহ করতেন মনে পড়ে। শুনেছিলাম তাঁদের আদি নিবাস বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় থাকার সময়ে অনেক নাটকের প্রধান ভূমিকা ওনার জন্যে বরাদ্দ থাকতো। এপারে আসার পর কর্মসূত্রে বেলঘরিয়ায় থাকতেন এবং মোহিনী মিলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাটকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করতেন এ খবর আমি জানি । একবার সেখানকার ” চন্দ্রগুপ্ত” নাটকে বড়োমামা ” চানক্য ” আর ওনার ছোট বোন অর্থাৎ আমাদের লতিমাসীমার ছেলে দীর্ঘদেহি রমুদা ( তিনি নিজেও মোহিনী মিলেরই কর্মী ছিলেন) “চন্দ্রগুপ্ত” র ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এছাড়া বড়োমামাকে মাঝেমাঝে সিনেমাতেও ছোটখাটো ভূমিকায় দেখা যেতো। সিনেমায় ওনার অভিনয় আমি একাধিকবার দেখেছি। “কেরী সাহেবের মুন্সী “তে পাঠশালার পন্ডিত বড়োমামা সুর করে পড়াচ্ছেন “এককড়ায় পোয়া গন্ডা “ইত্যাদি। একটা ছবিতে তখনকার বিখ্যাত অভিনেত্রী সন্ধ্যারানীর সঙ্গে বেশ খানিকটা সময় ধরে পর্দায় বড়োমামার উপস্থিতি দেখেছিলাম। সেই ছবিতে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া একটি সম্পূর্ণ গানে উনি লিপ দিয়েছিলেন আমার দেখা।
এহেন বড়োমামা একবার আমাদের দাদাকে অভিনয় সংক্রান্ত কিছু টিপস দেবার জন্যে আমাদের বাড়িতে এলেন। সেই ঘটনার কথা লেখার জন্যেই আমার এতো ধানাইপানাই ।

\

আমরা স্কুলে থাকতেই শ্রীরামপুর কলেজের নাটকে অনেকবার দাদার অভিনয় দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম , যেমন “বিশ বছর আগে”তে প্রদীপ, “গৈরিক পতাকা”তে শিবাজী , ” টিপু সুলতান”এ টিপু সুলতান । আমাদের কাছে দাদা তখন হিরো। অবশ্য আমার কাছে দাদা চিরকাল একজন হিরো,আজও মনের ভেতর তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি অনেক ব্যাপারেই ।

১৯৫৩ সাল। সেবারে শ্রীরামপুর কলেজে নাটক হবে ডিএলরায়ের ” শাজাহান”। যিনি শাজাহান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন যাকে সবাই ‘গনাদা’ বলে ডাকতো , শুনেছিলাম পরবর্তী সময়ে বেশ কিছুদিন ধরেই মঞ্চের শাজাহান যেমন যুগপৎ হাত ও গলা কাঁপিয়ে জাহানারার সঙ্গে কথা বলতেন, সেই একইরকম কাঁপাসুরে ব্যক্তিগত জীবনেও বাড়িতে নিজের আপনজনদের সঙ্গেও নাকি কথা বলার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল । আড়ালে কেউ হাসাহাসি করলেও ভ্রুক্ষেপ করতেননা।

যাইহোক, দাদা করছেন ” ঔরঙ্গজেব ” । কঠিন চরিত্র, ইতিহাসের খলনায়ক। পরিচালক মুরলীধর গোস্বামী এবং কিছু অধ্যাপক মিলে ঘোষণা করলো যে এ চরিত্র নিখিলেশ ছাড়া কেউ করতেই পারবেনা। অতএব দাদা মনপ্রাণ ঢেলে মহড়া দিতে শুরু করে দিলেন। কলেজ ছাড়াও বাড়িতেও চলতো মহড়া। সংলাপ শুনতে শুনতে কিছু কিছু আমারও মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় একদিন বেলঘোরিয়া থেকে বড়োমামা এসে হাজির। দাদা ঔরঙ্গজেবের ভূমিকায় অভিনয় করছে শুনে নিজেও উত্তেজিত । বললেন ,
আমার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু ডায়লগ
বলতো শুনি । ভালো করে বলবি ।

দাদা মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করলেন,

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন । ঝড় উঠবে । একটা নদী পার হয়েছি ।এ আর এক নদী –
ভীষন কল্লোলিত তরঙ্গসঙ্কুল । এত প্রশস্ত যে , তার ওপার দেখতে পাচ্ছিনা তবু পার হতে হবে-
এই নৌকা নিয়েই , হাঃ হাঃ হাঃ…

দাদার প্রচণ্ড মুডের সেই সিরিয়াস হাসি বড়োমামা বাঁচোখের ভুরুটা ছবি বিশ্বাসের মতন ওপরে তুললেন এবং একটি অঙ্গুলিহেলনে থামিয়ে দিলেন।

কিস্যু হচ্ছে না । ঔরঙ্গজেবের রোল
অতো সোজা নয় বুঝলি । পরিস্থিতি অনুযায়ী এক একটা সংলাপের সঙ্গে এক একরকম হাসতে হবে । ঠিক আছে, সামনের রবিবার সকালে নটায় আমি আসছি । সব শিখিয়ে দেবো ।

নির্ধারিত রবিবার সকাল নয়টায় বড়োমামা আমাদের বাড়িতে এলেন । পরনে গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি , ধবধবে সাদা ধুতি চুনোট করা , পায়ে চকচকে কালো পামশু , চোখে হালকা সোনালী ফ্রেমের চশমা, ব্যাকব্রাশ করা চুল আর হাতে একশিশি ত্রিফলার জল । হাবভাব গম্ভীর এবং ততোধিক গম্ভীর গলায় আমার মাকে বললেন,

সুনীতি মা , এটা তোমার কাছে রাখলাম । পরে আমার লাগবে ।

বড়োমামা সময় নষ্ট করলেন না । একেবারে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ , right on the business । দাদাও প্রস্তুত । আমরাও দল বেঁধে সেখানেই।
শুরু হলো । বিভিন্ন সংলাপের সঙ্গে যেখানে প্রয়োজন সেখানে হাসিটা ঠিক কেমন হবে উনি দাদাকে শেখাতে লাগলেন । অনেকক্ষন ধরে চললো। দিনের শেষে আমরা গুনেছিলাম সবসুদ্ধ তেরো রকমের হাসি ঔরঙ্গজেবের সিলেবাসে ঢোকানো হয়েছিল । তেরো রকমের হাসি দাদা হাসতে পেরেছিলেন কিনা মনে নেই তবে এটা মনে আছে সেবার ঔরঙ্গজেবের চরিত্রে দাদার অভিনয় ফাটাফাটি হয়েছিল ।

Shakespeare এর কথায় ” All the world’s a stage , and all the men and women are merely players ; they have their exits and their entrances “

দাদাকে তেরো রকমের হাসি শিখিয়ে দিয়ে অনেকদিন পরে অভিনেতা বড়োমামা এবং পরবর্তীকালে আমাদের দাদা জীবন রঙ্গমঞ্চের কোন উইংসের ফাঁক দিয়ে এক্সিট করলেন জানিনা । এখন শূন্য রঙ্গমঞ্চ, দর্শকহীন অডিটোরিয়াম আর বাতাসের ফিসফাস। মহাকাল এগিয়ে চলেছে আপন ছন্দে।


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ডিসেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Shipra Maitra
Shipra Maitra
8 months ago

খুব মনোগ্রাহী লেখা। চরিত্রটি অল্প কথায় সুন্দর ফুটে উঠেছে। এইরকম হারিয়ে যাওয়া ছোট ছোট চরিত্র আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায়। তাদের এই ক্যানভাসে ধরে রাখার প্রচেষ্টা খুব প্রশংসনীয়।

Nandita Sinha
Nandita Sinha
8 months ago

বাঃ ভালো লাগলো