
অনাহত

[দুঃস্বপ্নের রোজনামচা, যা আমরা কিছুদিন আগে পার হয়ে এসেছি। কোভিড সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর ভয়াল বিভীষিকা আমাদের তাড়া করে ফিরেছে, সেই প্রতিদ্বন্দ্বী কালখন্ডের এক টুকরো দলিল।
পূর্বানুবৃত্তিঃ পৃথিবী জুড়ে একটা ভয়ঙ্কর বিপদের পদধ্বনি ক্রমে আমাদের দেশেও ঢুকে পড়ল। শুরু হয়ে গেল লক-ডাউন। হঠাৎ আসা চাপে মানুষের ভেতরের গল্পগুলো খুলে যেতে থাকে। রেশন দোকানে লম্বা লাইন। গগন তিয়াসা-র মধ্যেকার রসায়ন নতুন করে ধরা দেয়। সমাজমাধ্যম হল একমাত্র মেলামেশার স্থান।]
পর্ব – ৩ – খেলনাবাটি
সনৎ ঘটা করে তাঁর নাতির জন্মদিন পালন করবেন। সব পরিকল্পনা হয়ে গেছে। বাধ সাধল, মড়ক। রেশন দোকানের সাথে সাথে, বিল্টুবাবু এখন এলাকার সবচেয়ে নামী এবং দামী ডেকরেটর এবং ক্যটারার। নাতির অনুষ্ঠানের জন্য তাকেই ঠিক করেছে। এইসব বিষয়ে, গগনের পরামর্শকে সনৎ বেশ গুরুত্ব দেয়।
গগনের আপিস যাওয়া নেই, ঘর থেকেই অনলাইনে কাজ করছে। সনৎবাবু ডেকে পাঠায়। কারও ঘরে ঢুকতে এখন ভয় পায় গগন। আবাসনের মধ্যে বড় পুকুর আছে, তারই পাশে সুন্দর বাগান করা, সেখানে লোহার চেয়ার পাতা। দুজনে মাঝখানে দূরত্ব নিয়ে বসে। সনৎ শুরু করে,
“দেখলে তো, দিল্লীতে কী হল?”
“কী হল?”
“আরে তুমি জানো না? তবলিঘি জামাতে কত লোক সংক্রমণ নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের ঠিক সময়ে লকডাউন হয়েছিল। এই কান্ডটার জন্য আমরা পিছিয়ে গেলাম। আজ অবধি বাঙলায় বত্রিশজনের ধরা পড়েছে, পাঁচ জন মারা গেছে। ভাবো? সারা পৃথিবীর তুলনায় কতটুকু? কিন্তু এবার আর হবে না।”
“কী জানি? সত্যিই কি তাই? তেমন ভাবলে তো আরও আগে আন্তর্জাতিক উড়ানগুলো বন্ধ করার দরকার ছিল।”
সনৎ বলে, “আরে আমাদের গরমের দেশ। এখানে ভাইরাস কায়দা করতে পারবে না। দেখো না কেমন গরম পড়বে এবার। ভাইরাস বাপ বাপ বলে পালাবে।”
সনৎ রাজনীতি, মড়ক, আবহাওয়া হয়ে, নিজের সমস্যার দিকে ঘোরে। নাতিবাবুর জন্মদিন কী করে উদ্ধার হবে, সেই ভেবেই অস্থির,
“কী করব বলো তো গগন?”
“কীসের কী করবেন?”
“জন্মদিন কি পালন হবে না?”
“দেখুন, সরকার মড়ক ঠেকাতে বিধি নিষেধ আরোপ করেছে। তা মেনে তো চলতেই হবে।”
“বিল্টুবাবু কে অ্যাডভান্স করা হয়ে গেছে।”
“ও নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। বিল্টুবাবুকে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে বলে দেবো ”
“সে না হয় তুমি বললে, আর বিল্টুবাবুও সে কথা শুনলেন। কিন্তু ক্যালেন্ডার তো থেমে থাকবে না। নাতিবাবুর জন্মদিনের তারিখ ঠিক নিয়মে আসবে আবার চলেও যাবে।”
“তারিখ মেনে নিজের ঘরে নিশ্চই কিছু পালন করবেন। লোক খাওয়ানোর ব্যাপারে একটু রয়েসয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
সনৎএর মনঃপুত হয় না, অথচ কিছু করারও নেই। গগনকে বিচক্ষণ বলেই মনে হয়। আবাসনের কূটকাচালিতে থাকে না। চাকরির কারণে চরকিপাক কেটে চলে। এদেশ ওদেশ ঘুরলে মনের বিকাশ হয়। তাই বিভিন্ন সমস্যার সময়ে গগনের সাথে আলোচনা করতে ভালো লাগে।
গগন আলগোছে সনৎএর সমস্যার কথা শুনছিল। এর মধ্যেই ওর ফোনে মেল আসার শব্দ হয়। কথার ফাঁকে অভ্যাসবশতঃ ফোন খুলে দেখে আপিসের বড় কর্তার মেল। একটু সতর্ক হয়ে যায়। সনৎ-এর কাছে অনুমতি নিয়ে মনোযোগ দিয়ে মেল পড়ে। লম্বা মেল-এ সারা পৃথিবীর বিপদের কথা বলা, সাথে কোম্পানির বাণিজ্যিক পরিস্থিতির হাল হকিকত। এত গৌরচন্দ্রিকা দেখে গগন প্রমাদ গুণতে থাকে। নিশ্চই কোন গুরুতর ঘোষণা হতে চলেছে, না হলে এত লম্বা মেল লেখে না। পড়তে পড়তে শেষে এসে থমকে যায়। ওর মতো যারা আছে, তাদের সকলের এ মাস থেকে বেতন কাটা যাওয়ার প্রস্তাব।
সনৎ লক্ষ্য করে, মেল দেখতে দেখতে গগন হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। জিজ্ঞাসা করে, “কোন খারাপ খবর পেলে নাকি?”
গগন ফোন থেকে চোখ তোলে, তারপর হেসে বলে, “তা, খারপ খবর নিশ্চই। বড় কর্তা মেল দিয়ে জানালো, এই মাস থেকে মাইনে কমে গেল।”
“সেকী? এ তো খুব খারাপ খবর! লকডাউন হতে না হতে অর্থনীতিতে ধস!”
“অনেকে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়ে না।”
“তাহলে কী হবে?”
“জানি না, আমার ফ্ল্যাট, গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ-এর ই-এম-আই, সংসার খরচ, বাড়িতেও কিছু পাঠাতে হয়, সব কী করে সামলাবো জানিনা।”
“সরকার অবশ্য তিন মাসের ই-এম-আই মুকুব করবে বলেছে।”
“মুকুব নয় মেসোমশাই, মোরাটোরিয়াম। তিন মাসের ই-এম-আই মেয়াদ শেষে যোগ হবে, আর এর জন্য বাড়তি সুদ দিতে হবে।”
সনৎ অবাক হয়, “ও বাবা! তাই নাকি? এতো মিছরির ছুরি।”
“তাই তো ভয় হয়।”
“তুমি চিন্তা কোরো না। তুমি কর্মঠ মানুষ, তোমার ঠিক কিছু সুরাহা হয়ে যাবে।”
“আমি একা ভাবনা করে আর কী করব? সারা পৃথিবীর যা হচ্ছে, আমারও তাই হবে।”

আবাসনের ভেতরে, বাইরে থেকে কারও ঢোকা নিষেধ। পরিধির মধ্যেই বাচ্চারা খেলে বেড়াচ্ছে। একটি ছয় সাত বছরের ছেলে সাইকেল নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। মুখ মাস্ক-এ ঢাকা। স্পন্দন, সনতের নাতি, “দাদু, তুমি কি কেক-এর অর্ডার দিয়েছো?”
গগন বোঝে, ছেলেটি তার জন্মদিনের প্রস্তুতি নিয়ে চিন্তিত। হেসে জিজ্ঞেস করে, “তোমার বন্ধুরা কি আসতে পারবে?”
ছেলেটি একরাশ উজ্জ্বল হাসি হেসে বলল, “এপ্রিল ফুল!”
গগনের মনে পড়ে আজ পয়লা এপ্রিল। বাড়িতে থেকে থেকে, বার তারিখ সবের হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে। স্পন্দনের প্রত্য়ুত্তরে জবাব দেয়, “তাই তো খুব বোকা হয়েছি।”
স্পন্দন বলে, “হ্যাঁ, লকডাউনে কেউ খেলতে আসছে না। নেমন্তন্নেও কেউ আসবে না। খাবার বন্ধুদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেব।”
এতটা সপ্রতিভ জবাব আশা করেনি। “বেশ, তাহলে একা একা আনন্দ করতে হবে।”
“এই তো এখন, একা একাই সাইকেল চালাচ্ছি।”
সত্যিই তাই ছেলেগুলো আগে দল বেঁধে হইচই করে বেড়াতো। এখন কেমন চুপিচুপি একা একা। বেশিরভাগের বাবা মা, বাচ্চাদের নামতেই দিচ্ছেনা। দুচার জন দাদু, বাবার হাত ধরে যাও বা নামছে। কড়া পাহারায় আছে, কারও সাথে যেন মেলামেশা না করে ফেলে।
সনৎ বলে, “একবার বিল্টুবাবুর সাথে কথা বলে দেখবে?”
মেলটা পড়ার পর গগনের ছন্দ কেটে গিয়েছিল। একটু সময় নিল আগের কথোপকথনে ফিরতে। “হ্যাঁ, একবার দেখা করব।”
গগন উঠে পড়ে। মেলটা এসে সব কিছু যেন নাড়িয়ে দিয়ে গেল।
সনৎ একা বসে ভাবতে থাকে কীভাবে কী হবে? আদৌ হবে তো? কিছুক্ষণ বসে থেকে, স্পন্দনকেও ডেকে নেয়। নিজেদের ফ্ল্যাটে ফিরে যায়।
বারো তলার ওপর পাশাপাশি দুটো ফ্ল্যাট জুড়ে সনতদের ঘর। একদিকে ছেলে বৌমা, আদিত্য আর ধৃতি। অন্যদিকে সনৎ আর মানসীর সংসার। স্পন্দন, দাদু ঠাম্মি আর বাবা-মার মাঝের সেতুটা সচল রাখে। সনৎ আর স্পন্দনকে ঢুকতে দেখেই মানসী বলে ওঠে, “এই হতকুচ্ছিত সময়ে তোমাদের পাড়া বেড়ানো কমছে না?”
সনৎ উত্তর দেয় না। চুপ করে থাকে। দীর্ঘ আটত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবন অনেক কিছু শিখিয়েছে। মৌনতা তার মধ্যে অন্যতম। অবশ্য সনৎ চুপ করে গেলেই যে, মানসীও চুপ করে যাবে তা নয়। একের পর এক ঢেউ আসতে থাকবে। এও এক ধরনের পরীক্ষা। দাদু নাতি দুজনে ভালো করে হাত পা ধুয়ে আসে।
মানসীর আগের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, সনৎ খুব গাঢ় স্বরে বলে, “জানো, গগনের অফিসে বেতন কমিয়ে দিচ্ছে।”

মানসী একটু থমকে যায়। আবাসনে গুটিকয়েক পছন্দের মানুষদের মধ্যে গগন একজন। বাইরে বেরনো নিয়ে টিভিতে শোনা আরও অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। গগনের খবরটা খুবই গভীর। টিভিতে প্রায় দিন এমন সব নানা রকম ভয়ঙ্কর খবর শোনাচ্ছে। সেখানে এখন যেন, সেই সব সংবাদ একেবারে গায়ের ওপর এসে পড়ল। আঁচল দিয়ে মুখ মুছে বলে, “সেকী? ছেলেটার চলবে কী করে?”
“তাই তো চিন্তা! কেমন দিশাহারা দেখালো। এতো ই-এম-আই আর সংসার খরচ কী করে সামলাবে বুঝতে পারছে না।”
“এখনই অত চিন্তা করতে না বলো। টিভিতে বলছে, ঘরে বসে থাকলেই রোগ আটকে যাবে, তখন আবার আগের মতো হয়ে যাবে।”
“তাই হোক। সবাই সেই কামনা করছে।”
সনতের ছেলে আদিত্য রেলে চাকরি করে, নাগপুরে পোস্টেড। ধৃতি কলকাতায় একটা সফ্টওয়ার কোম্পানিতে আছে। দুজনের একসাথে থাকা মুশকিল। তার ওপর বৃদ্ধ বাবা মাকে ঠাঁই নাড়া করা সম্ভব নয়। এক দেড় মাস পর পর কয়েকদিনের জন্য বাড়ি আসে আদিত্য, তারপর আবার ফিরে যায়। স্পন্দনকে নিয়ে সনৎ আর মানসীর সময় কাটে। প্রলম্বিত অপেক্ষায় ধৃতি আদিত্যর সম্পর্কে টোল খায়, গড়িয়ে যায়, আবার চলে অথবা থেমে যায়। মানসী আঁচ পায়। সনতের মতো চোখ ঘুরিয়ে থাকতে পারে না।
ল্যাপটপ খুলে নিজের ঘরে, বিছানায় আধশোয়া হয়ে কাজ করছে ধৃতি। মানসী এসে পাশে বসে। “কী সারাদিন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকিস? চোখ ব্যথা করে না?”
“মা, চোখ ব্যথা করলে চলবে? মাস গেলে পয়সা দেয় কোম্পানি।”
“শুধু পয়সাই কি সব? মানুষ সংসার পাতে কেন? এক সাথে থাকবে বলেই না? তোরা কেমন প্রথম থেকেই দূরে দূরে আছিস। এভাবে চললে সংসার টিঁকবে?”
ধৃতি মুখে কিছু বলে না। শুধু হাসে।
মানসী অবাক হয়ে এই প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে থাকে। বারো তলার জানলার বাইরে সন্ধ্যা নামছে। এক গুচ্ছ কাক বাড়ি ফেরার জন্য দল বেঁধে ওড়াউড়ি করছে। পাখিরাও জোটবদ্ধ থাকতে চায়, অথচ মানুষ থাকছে না। শাশুড়ি হয়ে, বৌমাকে বলতেও পারে না যে, চাকরি ছেড়ে ছেলের কাছে গিয়ে থাকো। একটা মাত্র ছেলে দূর দেশে, হাত পুড়িয়ে কী খায়, কী পরে, কেউ দেখার নেই। মেয়েরা কি এই স্বাধীনতাই চেয়েছিল? তাদের সময়, কেউ ভাবতেই পারতো না, যে বৌ থাকতেও স্বামীকে একা একা রেঁধেবেড়ে খেতে হবে। এ কেমন দিন এলো? তার সাথে এক লকডাউনের ধাক্কায় এখন তো সবাই ঘরবন্দী। ধৃতি আপিসের কাজ থেকে মুখ তুলতে পারছে না। মানসী কিছুক্ষণ থেকে “যাই, সন্ধে দিতে হবে” বলে উঠে আসে।
বাইরের ঘরে সারাদিন টিভি চলে, সনৎ আর মানসী পালা করে দেখতেই থাকে। ধৃতি ভাবে, ছেলেটাও ঠাম্মা দাদুর পাল্লায় পড়ে টিভির নেশা ধরে ফেলছে। আগে স্কুলে যেত, দিনের মধ্যে অনেকটা সময় টিভির আওতার বাইরে থাকত। এখন এই কয়দিনেই অভ্যেস সব বদলে যাচ্ছে। ভয়ঙ্কর সব খবর, সাথে আরও ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান ঘন্টায় ঘন্টায় ভেসে আসে। ধৃতির ভালো লাগে না। সারাদিন ধরে ক্রিকেট খেলার স্কোর দেখার মতো, এই অঙ্কগুলো শুনতে হচ্ছে। বড্ড বিমর্ষ মনে হয়। শ্বশুরমশাই সেই সংখ্যাগুলো সারাদিন জপতে থাকে, লোকের সাথে ফোন করে আলোচনা করে। রোগে তো মানুষ এমনিই মরছে, সেখানে দুবেলা এমন অঙ্ক কষে মরছে আরও বেশি।
স্পন্দনকে ডাকা দরকার। এবার ওদের স্কুলের নতুন ক্লাস শুরু হবে, সকাল বিকেল পড়া নিয়ে বসার অভ্যেস ফিরিয়ে আনতে হবে। অনলাইনে হবে বলে এস-এম-এস এসেছে। নিজের ল্যাপটপে তো আপিসের কাজ করে। সেটা তো দেওয়া যাবে না। ওর জন্য একটা কিছু ভাবতে হবে। একবার আদিত্যকে জানাবে। লোকটা চাকরির দোহাই দিয়ে সারা জীবন পালিয়ে পালিয়ে বেড়ালো, একটা সমস্যার আঁচ পোহাতে হল না। যাবতীয় দায়িত্ব কর্তব্য ধৃতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত। ওরই তো বাবা মা, নিজে সাথে করে নিয়ে যাক। তা নয়, ওনারা ঠাঁই নাড়া হতে চান না। ব্যাস! তাই ধৃতিকে শিকল পরিয়ে রাখতে হবে। দুবার স্পন্দনের নাম করে ডাকল। টিভি ছেড়ে আসতে, ছেলের কষ্ট হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে। কোন মতে মায়ের ঘরের দরজার কাছে এসে, পর্দাটা ধরে বলে, “কী বলছ?”
“সারা দিন শুধু খেলা করে আর টিভি দেখে কাটালে হবে?”
“কী করব? নতুন বই আসেনি তো।”
সেটা ঠিকই, নতুন ক্লাসে উঠেছে, কিন্তু বইপত্র দেবার আগেই তো দেশ স্থির হয়ে গেল। বাচ্চাগুলো যে পড়াশুনা করবে, তার উপায় কী?
“তোমার গত বছরের বইএর থেকেই পড়বে।”
“লকডাউনে তো আন্টিও আসছে না”
পাপড়িদি নামের একজন গৃহশিক্ষিকা আছে, কাছেই থাকে। ওদের আবাসনে এখন বাইরের কাউকে ঢুকতে বেরতে দেওয়া হচ্ছে না।
“হ্যাঁ আন্টি আসছে না। আর তুমিও সাপের পাঁচ পা দেখেছো। তোমায় আমিই পড়াবো।”
“তোমার অফিস আছে না?”
“তা তো আছে। তুমি তো দাদুর কাছেও পড়তে পারো?”
স্পন্দন বলে, “রাতে দাদু চোখে দেখে না”
ঠোঁটের কাছে সব জবাব যেন তৈরী। ধৃতি আর কিছু বলে না। বুঝতে পারে, ব্যক্তিগত অসহয়তার চাপ ছেলে ওপর দিয়ে ফেলছে। নিজের মনে ল্যাপটপে কাজ করে যেতে থাকে।
মা-কে তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যেতে দেখে, স্পন্দন খুব বাধ্য ছেলের মতো বলে, “তাহলে আমি যাই?”
“কোথায়?”
“ও ঘরে?”
ধৃতির মুখে কথা যোগায় না। স্ক্রীন থেকে চোখ না সরিয়ে ঘাড় নেড়ে অনুমতি দেয়।

স্পন্দন চলে যেতে দরজার পর্দাটা কিছুক্ষণ দুলতে থাকে। যদিও ছেলের সামনে খুব কাজ দেখাচ্ছিল, মনের ভেতর কোথাও যেন একটা চোরাবালি তৈরী হয়েছে। সেখানে সারি সারি মুখ ক্রমাগত তলিয়ে যাচ্ছে। শুধু ধৃতি একা এক বিরাট বালিয়ারিতে দাঁড়িয়ে। সকালে সমুদ্র কাছেই ছিল, এখন ভাটার টানে অনেক দূরে চলে গেছে। ইতস্ততঃ বালির কোটরে জলের দাগ রেখে দিয়েছে। ধৃতির সংসারের মতো। সব যেন থেকেও নেই। আপিসে থাকলে, দিনের অনেকটা সময় সহকর্মীদের সাথে কেটে যায়। ফাঁকটা বোঝা যেতো না। মার্চের পঁচিশ থেকে ঘরেই রয়েছে। গোটা ঘরই যেন গিলে খেতে চাইছে। ধৃতি পালাতে চায়। শ্বশুর, শাশুড়ি, ছেলে সবার কাছ থেকে, পারে না। ‘কর্তব্য’, ‘দায়িত্ব’ এই সব প্রাচীণ শব্দগুলো বেঁধে ফেলে। ল্যাপটপ পার করে জানালা দিয়ে তাকায়। উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। অনেক নিচে হলুদ আলোয় মোড়া রাস্তা। দূরে দূরে আলোকিত জানালা মানুষের জীবনের খেলনাবাটি জানান দেয়। ধৃতি বুকে বালিশ চেপে ভাবতে থাকে। অনর্গল চোখ দিয়ে জল কাটতে থাকে। বিকেলের রোদ চলে যাওয়ার পর, ঘরের আলো জ্বালানো হয়নি।
[ক্রমশঃ]

