আকাশের গাঢ় নীল চালচিত্রে দেখা যাচ্ছে নগরের সুরম্য হর্ম্যরাজি। পাথর বাঁধানো রাস্তা দিয়ে নগরের উত্তরপশ্চিম পানে হাঁটতে হাঁটতে কানে আসছে মানুষজনের কথোপকথন, তাদের অনায়াস যুক্তিতর্কের জালবিস্তার; চোখে পড়ছে – অভিজাত নাগরিকদের যাতায়াত, পশরা নিয়ে বণিক সম্প্রদায়ের আনাগোনা, অশ্বারূঢ় সৈনিকদের দৃপ্ত চলাফেরা। সমৃদ্ধির স্বাক্ষর চারিপাশ থেকে কানে কানে বলে যাচ্ছে – ‘মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে শিক্ষিত, আধুনিক, উন্নত, সচেতন নগররাষ্ট্র – এথেন্সে আপনি স্বাগত!’ ছায়াবৃত বীথিকা বরাবর আরেকটু এগোতেই বাঁ হাতে নজরে এলো – অলিভ বাগানের ঘননিবিড় প্রশ্রয়ে একটি উদ্যান, সম্মুখে একটি সাদামাটা ফলক – ‘অ্যাকাডেমি’।

এথেন্স নগর

কিছুটা কুন্ঠা নিয়েই ঢুকে পড়লাম সেখানে… ল্যাভেন্ডারের বেগুনি সোহাগ বিলোনো, বাগানবিলাসের চন্দ্রাতপ ছাওয়া পথ আমাকে নিয়ে গিয়ে হাজির করালো এক খোলা চত্বরের উপান্তে, যার মাঝখানে গোলাকার একটি সভা বসেছে…

‘মেন্টর… যে কোনো সংকট থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে গেলে কী প্রয়োজন?’

একটি বছর সতেরোর যুবার প্রশ্ন ভেসে গেল সভাকেন্দ্রে থাকা শালপ্রাংশু বৃদ্ধের উদ্দেশে। প্রশ্নকারীর দিকে একবার তাকালেন বৃদ্ধ মেন্টর।

‘রাষ্ট্রের সংকট! বড় কঠিন প্রশ্ন… এর উত্তর সরাসরি আমি দেবার আগে শুনি তোমরা কী বলো? তোমাদের কী মনে হয় – কী প্রয়োজন?’

বাকিদের দিকে প্রতিফলিত হল তার ভরাট কন্ঠস্বর…

‘বলিষ্ট নেতা? মেন্টর’…

‘বলিষ্ট নেতা – তার মানে নেতার বল থাকতে হবে, বলছো? যাতে সে গায়ের জোরে সমস্ত সংকটকে পরাস্ত করতে পারবে – কী, তাই তো?’

বৃদ্ধের কন্ঠে যে প্রচ্ছন্ন উপহাস, তা আমাদের সকলকেই কম বেশি ছুঁয়ে গেল। মধ্যবয়সী ব্যক্তিটিকে স্পষ্টতই কিছুটা বিব্রত মনে হল। আমতা আমতা জবাব ভেসে এল,

‘না…মানে…বলিষ্ট নেতা বলতে আমি মানসিক ভাবে বলিষ্ট অর্থাৎ নির্ভীক বোঝাতে চেয়েছিলাম, মেন্টর…’,

‘বেশ, নির্ভীক…মানে সাহসী, যার ভয়ডর নেই। তোমরা কী মনে করো – সংকটকে মোকাবিলা করার জন্য, তার থেকে মুক্তির জন্য কেবলমাত্র সাহসই যথেষ্ট! তাহলে তো বাপু বাইরে যেসব সৈন্যরা চক্কর কাটছে, তাদেরও তো ভয়ডর নেই…তাদেরই বসিয়ে দাও না কেন শাসকের আসনে, সেই তাহলে রাষ্ট্রকে সমস্ত সংকট থেকে উদ্ধার করে দেবে!’

‘মেন্টর…আমার মনে হয় শাসক এমন নেতা হতে হবে, যাতে সে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, অনুপ্রাণিত করতে পারে…’,

ডাকাবুকো এক যুবক বলে উঠল সামনের সারি থেকে। মুচকি হাসলেন বহুদর্শী পক্ককেশি। নিজের লোলচর্ম হাতের দিকে তাকিয়ে, বৃদ্ধ যেন খানিক স্বগোতক্তির ঢঙেই বললেন,

‘প্রেরণা – কে দেবে প্রেরণা! কে যোগাবে আলো! কে জ্বালাবে মনের ভেতর মশাল! কে হবে রাষ্ট্রের কান্ডারী! আসল সমস্যা কী জানো – যে কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক অর্থাৎ জনসাধারণ হল একপ্রকার পরজীবি – নিজেদের বিচারবুদ্ধির ভার নিজেরা বইতে অক্ষম! তাই তারা সর্বদা এমন একজনকে খুঁজে ফেরে, যার কাছে তারা নিজেদের যুক্তি-বিচার-বিবেচনা-বোধ, চিন্তাশক্তি সব গচ্ছিত রাখতে পারে! দুঃখের বিষয় হল – বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাকে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলানোর জন্য তারা নির্বাচন করে, জানো? যার কথার ফাঁদে তারা আটকা পড়ে…যার মনমোহিনী, উত্তেজক বাচন ভঙ্গীতে বিমোহিত হয়ে তারা ভাবতে শুরু করে, তাদের প্রতি সকল অবিচার, সকল অন্যায়ের প্রতিকার করবে বুঝি সেই ব্যক্তি! তার সম্মোহনী শব্দের জালে তারা খুঁজে পায় নিজেদের মুক্তি! তারা একটিবারের জন্যও ভেবে দেখে না – আদৌ তাদের পরিচালনা করা, সর্বোপরি রাষ্ট্রকে সঠিক পথ দেখানোর মত ক্ষমতা, দক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা সেই ব্যক্তিটির আছে কিনা!’

একটানা এতটা বলে বৃদ্ধ একটু থামলেন। যেন তিনি কিছুটা জিরিয়ে নিতে চাইছেন এবং সেইসঙ্গে আরো একবার অতীতকে রোমন্থন করে আমাদের জন্য ছেঁচে আনতে চাইছেন সত্যের অমৃত রস! কিছু মূহুর্ত বাদে চারপাশে আগ্রহী শ্রোতাদের দিকে আরো একবার চোখ ঘুরিয়ে এইবার সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,

‘রাষ্ট্রের সমস্যাকে বোঝার ক্ষমতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাধারনের থাকে না। এই বোঝা হয় তারা চাপিয়ে দেয় তাদের অনুপ্রেরণার কাঁধে নতুবা অদৃষ্টের হাতে। এভাবেই তারা বাস্তব থেকে পার পেতে চায়। আর এই সুযোগেরই অপেক্ষায় থাকে তাদের অনুপ্রেরণা যোগানো ব্যক্তিটি!’

প্রতিটি শব্দ যেন জীবনের গভীর যন্ত্রণা থেকে উচ্চারণ করলেন বৃদ্ধ মেন্টর। কেন জানি, অস্ফুটে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল,

‘…আর সেই সুযোগে শাসক গুছিয়ে নেয় নিজের আখের… নিজের প্রিয়জনের আখের… আর খেসারত দেয় সেইসব সাধারণ মানুষ, যারা তার ওপর বিশ্বাস করতে চেয়েছিল… এজন্যই আমরা বারবার দেখি, জাতি বা রাষ্ট্রের সংকট মূহুর্তে অপরিণামদর্শী এবং অবিবেচক সেই শাসক আমাদেরকে ঠেলে দেয় সংকটের সেই চোরাবালিতে, যা থেকে আমরা তার হাত ধরে একদিন বাঁচতে চেয়েছিলাম!’

ওর’ম মহান এক ব্যক্তিত্বের সামনে কোথা থেকে এতগুলো কথা আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল – নিজের প্রগলভতায় নিজেই কেমন কুন্ঠিত হয়ে গেলাম! কিন্তু একই সঙ্গে এ কথাও আমার মনে হল যে – এই কথাগুলো একান্তই আমার অভিজ্ঞতাসঞ্জাত।

আমার প্রতি সপ্রশংস দৃষ্টি হেনে সৌম্যকান্তি, প্রবীন প্লেটো আবার সবার প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,

‘আবার তাহলে যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, সেখানে ফিরে যাই – এবার বলো, রাষ্ট্রের সংকট অর্থাৎ রাষ্ট্রের নাগরিকদের সংকট থেকে মুক্তির জন্য প্রথম কী প্রয়োজন?’

‘প্রথম প্রয়োজন – সেই সংকটটিকে চেনা, তার কারণ যাচাই করা… আমার মনে হয় মেন্টর – এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা… আসল শিক্ষা ছাড়া কখনোই কোনো সংকটকে সম্যকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তিই পারবে যে কোনো সংকটকে যথাযথ চিহ্নিত করতে…’

যে সতের-আঠারো বছর বয়সী যুবকের প্রশ্ন দিয়ে এই বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল, সেই যুবকটিই এবার বলে উঠল।

যুবকটির মধ্যে একটা সহজাত দীপ্তি রয়েছে যা অনায়াসে তার প্রতি প্রত্যেককে আকৃষ্ট করে! নাম জানতে কৌতুহল হল, পাশে যে দাঁড়িয়েছিল, তাকে জিজ্ঞাসা করতে জানলাম, যুবকটির নাম – অ্যারিস্টটল।

‘এইতো… এতক্ষণে সঠিক পথের হদিশ পেতে শুরু করেছ… আরও একটু ভাবো… ভাবা অনুশীলন করো…তাহলেই বুঝতে পারবে – “জ্ঞানেই ধর্ম, জ্ঞানেই মুক্তি” । কে বলতেন জানো একথা, আমার মেন্টর – এই এথেন্সের সবচেয়ে জ্ঞানীপুরুষ – সক্রেটিস, যাকে শাসক এবং জনগণ রাষ্ট্রের সংকট হিসাবে শনাক্ত করেছিল! জনগণ নির্বোধ, তাদের যা বোঝাবে শাসক, তারা তাই বুঝবে! এজন্যই একজন আদর্শ শাসকের ভূমিকা এত গুরুত্বপূর্ণ। সে নিজে যতক্ষণ না সৎ, নির্লোভ হচ্ছে, যতক্ষণ না তার মধ্যে ঠিক-বেঠিক, ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, যতক্ষণ না তার মধ্যে কোনো আদর্শবোধ তৈরি হচ্ছে, যতক্ষণ না তার মধ্যে দর্শণ ক্ষমতা জাগ্রত হচ্ছে…যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের অন্তরকে শিক্ষার আলোকে আলোকিত করছে, ততক্ষণ তার দ্বারা রাষ্ট্রের প্রকৃত হিত অসম্ভব!’

প্লেটোর জলদমন্দ্র কন্ঠ চারিপাশের অলিভবাগানে বারবার প্রতিফলিত হয়ে যেন পবিত্র মন্ত্রের মত শোনালো।

‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন – শাসক দার্শনিক হবে!’

নবীন ছাত্রটির সরস প্রত্যুত্তরে যে একটা সুক্ষ্ম খোঁচা আছে – তা না বোঝার মত বোকা প্লেটো নন! মুচকি হেসে, অ্যারিস্টটলের দিকে তাকিয়ে প্লেটো জবাব দিলেন –

‘অথবা দার্শনিকও শাসক হতে পারে…’

ছাত্রটির দিকে চোখ মটকে হাসলেন বৃদ্ধ মেন্টর।

যেকোনো গভীরতর বিষয়ে যাবার আগে কিছুটা বিরতি যে শ্রোতাদের প্রয়োজন, তা বেশ বোঝেন প্লেটো। কিছুটা থেমে আবার তিনি আমাদের উদ্দেশে বলতে শুরু করলেন…

‘একজন প্রকৃত শিক্ষকই পারে ব্যক্তি হৃদয়ে সত্যের আলো জ্বালাতে। আর একবার সেই আলো যদি জ্বলে, সে আলো হবে অনির্বাণ… সেই আলোকে ব্যক্তির মধ্যে ভালো-মন্দের ধারণা এতটাই স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে তার দ্বারা কোনোরকম অন্যায়, অধম কার্য সাধন সম্ভব হবে না… এরপর সেই শিক্ষিত ব্যক্তিটি যখন শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, তখন রাষ্ট্রশাসনই হোক কিম্বা বিচার বা আইনব্যবস্থা, কোনো বিষয়েই আর কোনো চিন্তা থাকবে না…’

নিজের মনে মনে বললাম – আহা, এমন শাসকের জন্যই তো যুগ যুগান্তর ধরে প্রতীক্ষায় আছি! একথা যেন শুধু আমার একার কথা নয়, কোনো শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষই এই কথার বিরোধিতা করবে না! সভাস্থলের প্রত্যেকেই মনে হল প্লেটোর কথায় মন্ত্রমুগ্ধ! এমন সময় পাশ থেকে ঠেলা! এমন প্রশান্ত পরিবেশে এই রকম ঠেলা যাকে বলে ‘বাবাজীর হাতের উল্কি’র মতই বেমানান! বিরক্তি চেপে পাশে চোখ মেলতেই দেখি লোকাল ট্রেনের মুখচেনা সহযাত্রী, ঠেলা মেরে আমায় ডাকছেন,

‘দাদা, উঠে পড়ুন…হাওড়া এসে গেছে…’

প্লেটোর অ্যাকাডেমির বর্তমান অবস্থা


অফিস যাওয়ার পথে জানলার ধারে সিট মানে লটারি পাওয়ার সামিল! আশপাশ হালফিলের ভোটবাজারের তর্ক-বিতর্কে সরগরম। একদিকে এই দুর্ভাগা দেশ নেতা-নেত্রীদের পারস্পরিক স্খলনের প্রতিযোগিতায় ধুঁকে মরছে, অন্যদিকে মানুষ দিন বদলের চিরন্তন আশায় প্রহর গুনছে, মধ্যিখানে আমি – জানলার আদুরে পরশ গায়ে মেখে, ট্রেনের বেতালা দুলুনির অভ্যস্ত ছন্দে কখন যে ইহজগতের মায়া কাটিয়ে খানিকক্ষণের জন্য স্বপ্নজগতে প্রবেশ করেছিলাম! সমকাল যখন শাসক সম্প্রদায়ের সামাজিক সুধাহরণের বহু উদাহরণ দ্বারা জর্জরিত, তখন ক্ষণিকের এই স্বপনচারী বিরাম – যেখানে যুক্তির বুনোটে সুষ্ঠু মত বিনিময় সম্ভব হচ্ছিল, যেখানে আদর্শ শাসকের সাথে প্রকৃত শিক্ষা, নৈতিকতা, সততার মত জরুরী প্রবৃত্তিগুলির স্বাভাবিক সম্পর্ক রচনা হচ্ছিল; বড় বেশি মায়াময় অথচ দরকারি বলে মনে হচ্ছিল!
ভাবলে পরে দেখবেন – চাওয়া-পাওয়ার হিসেব মেলাতে বসে আমরা আকছার বাস্তবের চেয়ে স্বপ্নকেই বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করি। অবচেতনের সেই অসম্ভব সম্ভাবনাময় উর্বর জমিতে আবাদ হয় – বহু চাওয়া, বহু না পাওয়া। তাই, দৈনন্দিন রাজনীতির আকালগ্রস্ত জীর্ণচেহারা থেকে নিষ্কৃতি পেতে আমি স্বপ্নে পাড়ি দিই প্রায় ২৪০০ বছর অতীতে, শিক্ষা-দর্শন-রাজনীতির আকর – প্লেটোর ‘অ্যাকাডেমি’-তে, সামান্য সময়ের জন্য হলেও সেখানে সঙ্গ করতে চাই – প্লেটো, অ্যারিস্টটলের মত দর্শনবিদের! আসলে এর কারণ – আমার এখনো অবধি যৎসামান্য বৌদ্ধিক সঞ্চয়, যা আমার অবচেতনে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে এক রোদ্দুরময় অনিরূদ্ধ জগত। এ জগত আমার একান্ত নিজস্ব, যেখানে কোনো বাধা-বিধি-নিষেধের চোখরাঙানি নেই, ওজর-আপত্তির বেড়াজাল নেই, কার্য-কারণের ঘনিষ্ঠতা নেই, কর্তব্য-দায়িত্বের গুরুভার নেই! মনোময়, মায়াবী সে কল্পজগত সমকালীন রিক্ত-রুক্ষ্ম-রূষ্ট বাস্তবের নাগাল থেকে সাময়িক নিস্তার…

আর এমনটা নয় যে, অমন মরমি পরিসর শুধু আমার একার আছে! প্রত্যেকের আছে। অবচেতনের সেই নিকোনো উঠোনে প্রত্যেকে এমন একটি মাচা বেঁধে রাখেন, যার ওপরে তার সাধের স্বপ্ন-লতাটি অনায়াসে চারিয়ে যেতে পারে। আসলে, স্বপ্ন আছে বলেই আমি আছি, আপনি আছেন… কারণ – স্বপ্ন আছে বলেই কল্পনা আছে, কল্পনা আছে বলেই ভাবনা আছে, ভাবনা আছে বলেই বোধ আছে, বোধ আছে বলেই আবেগ আছে, আবেগ আছে বলে প্রয়োগ আছে, প্রয়োগ আছে বলে উদ্যোগ আছে, আর উদ্যোগ আছে বলেই শিল্প আছে, সভ্যতা আছে… আমরা আছি!

বিবর্তনের প্রাকলগ্নে মেরুদন্ডী প্রাণীদের মধ্যে পাখিদের ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত বৈশিষ্ঠ্যের উদ্ভব হয়। ঘুমের সময় যেকোনো প্রাণীদের শারীরবৃত্তীয় কাজগুলি মন্থর বা কিছুক্ষেত্রে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে। চোখের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হবার কথা নয়। ঘুমন্ত চোখের তাই সম্পূর্ণ স্থির হয়ে পড়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে পাখিদের চোখ ঘুমন্ত অবস্থায় ক্রমাগত দ্রতগতিতে নড়াচড়া আরম্ভ করে দিল। কোন পথে, কোথায়, কী কী খাবার সংগ্রহ করেছে সারাদিন, তা বারবার যেন বন্ধ চোখের পর্দায় ভেসে বেড়াতে লাগলো। কিন্তু সেই দ্রুত নড়াচড়ার স্থায়িত্ব ছিল ক্ষণিকের তরে। আধুনিক কালে বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াটির নামকরণ করেছেন – Rapid Eye Movement বা সংক্ষেপে REM। স্বপ্ন দেখার প্রথম সোপান হল এই REM।

দিন যত যেতে লাগলো, স্তন্যপায়ী প্রাণীরা তত বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠতে শুরু করল, এবং এই বিশেষ লক্ষণটি ক্রমশঃ জাঁকিয়ে বসতে শুরু করল তাদের মধ্যে। ইতিমধ্যে তাদের মগজ আরো বেশি পরিণত হতে শুরু করেছে। নিওকর্টেস্ক এবং হিপ্পোক্যাম্পাস, যা নিয়ে আগের পর্বে আলোচনা করেছিলাম, তা নিজ নিজ কার্যকারিতা আরো দক্ষভাবে সম্পাদন করতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায়, ঘুমন্ত চোখের এই দ্রুত নড়াচড়া বা REM হোমো ইরেকটাস, নিয়ানডারথাল জাতীয় আদিম মানুষদের মধ্যে এক নতুন এবং আরো গভীর বিক্রিয়া ঘটালো – যে স্মৃতিগুলি সে তার মস্তিষ্কে এতদিন রোপণ করে আসছিল, সেগুলিই ধীরে ধীরে পরিণত হতে শুরু করল এবং বাস্তবতার বৃন্ত মোচন করে স্বপ্নকল্পনা তার রঙবাহারি পাপড়ি মেলতে শুরু করে দিল…

REM বা স্বপ্ন দেখার এই শারীরবৃত্তীয় পদ্ধতিটি সম্পূর্ণভাবে অনৈচ্ছিক। আপনি যদি ভাবেন, আপনি কী স্বপ্ন দেখবেন – তার আলা-কার্টে পাবেন, তা হবে না। পংক্তি ভোজের পাতে যা পড়বে, তাই আপনাকে খেতে হবে। স্বপ্নের তুলি আপনার মনোজগতের ক্যানভাসে যে কোনো ছবি আঁকতে পারে – সেই ছবিতে আপনি এমন স্থানে, এমন কালে নির্দ্বিধায় পৌঁছে যেতে পারেন, যেখানে বাস্তবে আপনার থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই! সেখানে আপনি এমন বহু ঘটনার সাক্ষী হতে পারেন, যা গল্পের গরু গাছে ওঠার চেয়েও দড়! বিজ্ঞানীরা মনে করেন – মানুষের বৌদ্ধিক বিবর্তনের বীজ লুকিয়ে ছিল তার স্বপ্ন দেখতে পারার ক্ষমতায়। এর আগে তার মস্তিষ্ক স্মৃতিকে ধরে রাখতে জানতো, প্রয়োজনে সেই স্মৃতিকে প্রকোষ্ট থেকে বার করে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগের কৌশল সে শিখে নিয়েছিল। কিন্তু এবার ছিল সেই স্মৃতিকে আরো সৃষ্টিশীল করে তোলার পালা…

আগুন আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত গাছের ডালেই ঘুমোত মানুষ। কিন্তু আগুন আবিষ্কারের পরে যেমন তার খাদ্যচর্চায় পরিবর্তন এল, যা নিয়ে ষষ্ঠ পর্বে আলোচনা করেছিলাম, তার সাথে সাথে তার জীবনচর্চাতেও পরিবর্তন এলো। গাছের ডালে ঘুম কখনোই স্বস্তিদায়ক নয়, কারণ গাছ থেকে পড়ে যাবার ভয়ও যেমন থাকতো, তেমনই অন্য প্রাণীদের আক্রমণের আশঙ্কাও সেখানে কিছুটা হলেও ছিল। আগুন সেই শঙ্কাগুলি থেকে অনেকটাই রক্ষাকবচের কাজ করল। আগুনের ঘেরাটোপে সে নেমে এল নীচে, নিশ্চিন্ত ঘুমের সজ্জা পাতলো মাটির উপরে। ফলতঃ তার ঘুমের স্থায়িত্ব এবং গাঢ়ত্ব বেড়ে গেল। পাল্লা দিয়ে বাড়লো REM -র প্রভাব, যার পিছনে হাত ছিল মস্তিষ্ককান্ডের পনস অঞ্চলের নিউরনগুলির (Pontine Brainstem Neurons)। ফল যা হবার তাই হল, স্বপ্ন হংসপাখা মেলে পাড়ি জমালো নীল কল্পলোকের অবাধ আসমানে… আর মানুষ চাঁদের কিরণে স্নান সেরে, কেতকী সুবাস মাখা সজ্জায় শুয়ে শুয়ে, মলয় বাতাসে তুরীয় মেজাজে ভেসে যেতে শুরু করল।

আমরা যখন জেগে থাকি, আমাদের সচেতন সেই অবস্থায় চারপাশ থেকে নানাধরণের উপাদান আমাদের ভাবনা এবং আবেগের তন্ত্রীগুলিতে নানাধরণের স্বর বাজাতে থাকে। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় পারিপার্শ্বিক সেইসব ইন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হবার সুযোগ মেলে। সেই কারণে আমাদের স্বপ্নের রৈখিক সঞ্চারপথ আরো সংযত থাকে। আমাদের ভাবনার স্তর আরো প্রসারিত হবার সুযোগ পায়, সে হোক না যতই কল্পনাবিলাসী! স্বভাবতই সচেতনতা এবং স্বপ্নময়তার মধ্যে দ্বিতীয়টির একাগ্রতা এবং প্রাবল্য বেশি। এই কারণে অনেক সময়েই এমন হয়, সচেতন মস্তিষ্ক যে উপায় বা উত্তর বা সমাধান হাতড়ে ফেরে পারিপার্শ্বিক বিবিধ প্রভাবের মাঝে, অনেক সময়েই অবচেতন মস্তিষ্ক স্বপ্নের শান্ত-সমাহিত পরিবেশে তার সন্ধান দিয়ে যায়!

অনেক নৃতত্ত্ববিদ মনে করেন, আজ থেকে সত্তর হাজার বছর আগে, এই স্বপ্নকে ব্যাখ্যা করার তাগিদেই মানুষের মধ্যে ভাষাচেতনার উদ্ভব ঘটে। বাস্তবে যা সে দেখেনি, তাকেই সে যখন নিদ্রামগ্ন অবস্থায় চাক্ষুস করে, স্বাভাবিক ভাবেই সে অবাক হয়ে যায়। সেই বিস্ময়কে প্রকাশ করার জন্য তার দরকার পড়ে একটি মাধ্যম। অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সেই বিমূর্ত সূক্ষ্মতাকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না! সেই তাগিদে তাদের স্পিচ জিন এবং অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তন আরো প্রকট এবং কার্যকরী হতে শুরু করল এবং মানুষের মধ্যে মৌখিক ভাষার আমদানি হল। তাই মনে রাখবেন, যতই আপনার বিজ্ঞানগর্বী যুক্তিবাদী মস্তিষ্ক আপনাকে বোঝাক যে স্বপ্নাদেশ একপ্রকার বুজরুকি ছাড়া কিছু নয়, কিন্তু আধুনিক নৃতত্ত্ববিজ্ঞানীরা ক্রমশঃ অনুধাবন করছেন – মানবসভ্যতার রূপায়নে স্বপ্ন আসলে অন্যতম প্রধান অনুঘটক…

আপাতত এইটুকু থাক। এই লেখা প্রকাশের ক’দিনের মধ্যেই আমাদের রাজ্যের আগামী পাঁচ বছরের ভাগ্য নির্ধারিত হতে চলেছে। যে স্বপ্নের ছবি গত ক’মাসে রাজনৈতিক ফেরিওয়ালা আমাদের দেখিয়েছে, তা কতখানি বাস্তবে প্রতিফলিত হবে, তা দেখার পালা এবার…

সাল্ভাদোর দালির আকাঁ ‘আমেরিকান ড্রিম’

সবাই ভালো থাকবেন।

অলমিতি।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মে ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]