‘তেরো’ সংখ্যাটা লিখতেই পুরোনো ক’টা কথা মনে পড়ে গেল –এই সংখ্যাটা নিয়ে অনেকেরই অস্বস্তি আছে কিনা!

সংখ্যা আর সময় নিয়ে মানুষের হাজার সংস্কার –তিন,সাত, তেরো, এমন বহু সংখ্যার সাথেই শুভ অশুভ ধারণা, বিশ্বাস জড়িয়ে থাকলেও কখনও কখনও এইসব জটলা মানুষকে এমন জেরবার করে যে তা অনেকেরই কল্পনাতেও আসবে না।

অনেক কাল আগের কথা, প্র্যাকটিস জীবনের শুরুতে পেশায় শিক্ষিকা এক ভদ্রমহিলা এলেন আমার কাছে, সারাদিনটাই যার সংখ্যার ঝোঁকে কাটে!
দাঁত ব্রাশ করা থেকে স্নান, খাবার মুখে তোলা থেকে ঠাকুরকে ফুল দেওয়া অবদি সবটুকুই সংখ্যার চক্কর।
দীর্ঘ সাত আট বছর ধরে তিনি নিয়মিত স্কুলে যাননি। চাকরি যায় যায়!
স্কুলে যাবেন কেমন করে? সকালের টুথব্রাশ হাতেই তো কেটে যায় কয়েক ঘণ্টা! মুখের ডানদিকে কতবার ব্রাশ করতে করতে বাঁদিকে যেতে হবে, আবার উল্টোদিকে ফিরতে হবে, তার যেমন মাপজোক আছে, তেমনি কুলকুচির সংখ্যাটাও যে মনে রাখতেই হয়! আবার এর মধ্যেই দরজা খোলা, ফোন এসে যাওয়ার কারণে যদি নিয়মের ব্রেক হয়, তাহলে তো সেইই এক-এর ব্যায়াম!

এরপর স্নান। সেখানেও নিয়ম! জিগ্যেস করতে বেশ সংকুচিত ভাবেই বললেন, বাড়িতে সবার স্নান সারা হলে তবেই উনি চানঘরে ঢোকেন! আগে ঢুকলে জল ফুরিয়ে গেছে কয়েকবার,সময়টাও যে একটু বেশি লাগে! অতএব…

পুনরায় জল খরচের কথা জিগ্যেস করতে জবাব পেলাম,জল ঠিকমতো পেলে ডানদিকে একশো বালতি আর বাঁ দিকে আরও একশো বালতি জল না ঢাললে স্নান করাটাই অসম্পূর্ণ লাগে তাঁর।

ঠাকুরঘরেও একই অবস্থা — প্রতিটা মূর্তি, প্রত্যেক ছবি, এমনকি দেওয়ালের টাইলস্,যাতে ঠাকুর দেবতার ছবি আছে, তাদের সবাইকে ধূপ দীপ দেখিয়ে প্রণাম করতেই তার সাড়ে ন’টা দশটা বেজে যায়, বাকি কাজ করার মতো আর সময় থাকে না।

প্রথম দিকে সংখ্যা গুলো আয়ত্বের মধ্যে ছিল বটে, কিন্তু ইদানিং আর পারছেন না তিনি — সেই কারণেই আসা, যদি কিছু হয়!
মাস দেড়েক পর আবার এলেন তিনি, এবার সঙ্গে এসেছে ছেলে, বছর পনেরো বয়স তার। এবার দৃশ্যতই খুশি তিনি। মুখে বলতে গিয়ে বলেই ফেললেন, ডাক্তারবাবু,আগে এলে হয়ত আমাদের বিয়েটা ভাঙত না!
এ বিষয়ে আগের দিন তেমন কিছুই বলেননি তিনি।

জিগ্যেস করি, মুখ ধোয়ার সময়টা কমেছে তাহলে?
একগাল হেসে বললেন, ঘন্টা খানেকের মধ্যেই সকালের কাজ মিটছে এখন, বড়জোর সাত আট’শ বার মুখ ধুতে হয় আমায়!

-মানে!! এই যে বললেন, কমেছে অনেকটা?
আমি না বলে পারিনা আর।

— কমেছে ডাক্তারবাবু, সত্যিই কমেছে, আগের দিন বলতে পারিনি, আমাকে না,আট হাজার বার মুখ ধুতে হ’ত এতদিন -কাউকে বলিনি লজ্জায়!

এরপরও ভদ্রমহিলা বেশ কয়েকবার এসেছেন,আর কিছু না হোক, মনের জোরটা ফিরে পেয়েছিলেন, স্কুলের চাকরিটাও।
সংখ্যা তখনও ছিল, তবে সংখ্যাতত্ত্বের আনুপাতিক হিসেবে সেটা নগন্যই বলা যায়।

এবার অন্য একজনের কথা বলি। বছর বিশেকের ছেলে। ডিগ্রি কোর্সে সাহিত্য পড়ছে।
সে বড় অদ্ভুত ভাবে এসে পড়ল আমার কাছে।
মহানগর থেকে বহু দূরে তার বাসস্থান। অতএব আমার কাছে এসে পৌঁছাতে গেলে তাকে ঘন্টা চারেক ট্রেনে চড়তে হয়।
প্রথম দিন তার বাবা এলেন একা। ছেলেকে সাথে করে আনতে না পারার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে ছেলের না আসার কারণ হিসেবে যা বললেন সেটা বেশ গোলমেলে।

ভদ্রলোকের কথায় বাইরে থেকে ছেলে মুখচোরা, শান্ত এবং মেধাবী হলেও ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত জেদী, একবার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে সেটা থেকে আর সরতে পারেনা।
বাপ মায়ের পক্ষে তার সেসব জেদের কারণ খুঁজে বের করাও দুঃসাধ্য।
সম্প্রতি সে ঘড়ি ধরে “পটি” করতে যায়। আর সেই নির্দিষ্ট সময়টি না এলে সে কিছুতেই পটি করতে পারেনা! আজ যে সে আসেনি, তার কারণ হলো যদি সকাল ছয়টা বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিটে সে বাহ্যে করতে না যেতে পারে, তবে তাকে আবার একঘন্টা পরে সাতটা পঁয়ত্রিশে যেতে হবে সেখানে। যত কষ্টই হোক না কেন, তার আগে কিছুতেই সে পটি করতে পারবেই না।
এদিকে বিপদ হলো, আমার কাছে দেখাতে হলে ঐ সময়েই ট্রেনে চড়তে হবে তাকে — লোকাল ট্রেনে বাথরুম পায়খানা কোথায়? অতএব,আজ তার কিছুতেই আসা হলোনা।
বাবা হাজার বুঝিয়েও ছেলেকে বশে আনতে না পেরে নিজেই চলে এসেছেন।

এমন সমস্যার কথা কখনোই শুনিনি। তবু বললাম, সেক্ষেত্রে লোকাল ডাক্তারবাবুকেই তো দেখাতে পারতেন!
তাতেও রাজি হয়নি ছেলেটি, চেষ্টা নাকি হয়েছে।
সপ্তাহ দুয়েক পর এলো সে।
আগের দিন সন্ধ্যায় কলকাতায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠে তবেই পরের দিন আসতে পেরেছে আজ।
ছেলেটি ইন্ট্রোভার্ট, তবে আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তায় ওর কষ্টটা পরিস্কার হয়ে এলো। মনের মধ্যে অদ্ভুত সব চিন্তা ঢোকে ওর, সেগুলো কাটাতে নিজের মন থেকেই আরও কিছু নিয়ম বের করেছে সে। সেসবের যে কোনো মানে নেই, সেটা কি জানেনা ও? খুব জানে,অথচ থামতে পারেনা, সরতে পারেনা।
বেশ ডিপ্রেসড দেখলাম ছেলেটাকে।
ডিপ্রেশন বা মনের অবসাদ নিয়ে লোকজনের ধারণা আজও স্পষ্ট নয় – দীর্ঘস্থায়ী যে কোনো স্ট্রেসেরই অবশ্যম্ভাবী ফল বাইরে থেকে অবসাদের মতোই দেখায়।
শুরু হলো চিকিৎসা।
ছেলেটি এখন অনেক নরম, তার রুটিনের বদল হয়েছে, বিশেষ করে তার শুরুর দিকের রিজিডিটির।
একদিন জানলাম,সে কবিতা লেখে, লেখার মান বেশ ভালো।
মনের উপর নিয়ন্ত্রণ এলে অবান্তর চিন্তা কমে যায়, সে সময়টা এবার কাজে লাগতে শুরু করল অমলের।
এতক্ষণ যার নাম বলিনি, এখন বলছি কেন?
আসলে এতদিন ও রোগী ছিল, এবার মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশের রাস্তায় চলতে শুরু করল কিনা!

অমল এখন দিব্যি আছে, আপাতত একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজে ব্যস্ত সে। তার ফাঁকেই কবিতা লেখে,গান গায়।

এও এক আশ্চর্য!
কেমন করে এমন হয়?
যাকে রোগী সাব্যস্ত করলাম,তার তো যাবজ্জীবন হয়েই গেছে। সে আবার মানুষের মতো হয়ে উঠছে কিভাবে?
হয়,হয়, সবই হয় ,Zaন্তি পারেন না ক্যাবল!
জন্ম ইস্তক আমাদের হাজারটা ভয় আর লাখো টেনশন! কেউই জানিনা,কি করলে ঠিক কী হয়! অতএব চারপাশে যে যা করে তাইই করে চলি আমরা! অমলের মতোই করি বটে, তবে কিনা আমরা তো সংখ্যায় বেশি,তাই নিজেদের-টা আর দেখতে পাইনা।
পয়সা খরচ করে গাড়িতে লাকি নাম্বার প্লেট লাগাই, সপ্তাহের বিশেষ বিশেষ বারে নিরামিষ খাই, কেরিয়ারে লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রের প্রভাব এড়াতে দামি দামি পাথরের আংটি পরি হাতের আঙ্গুলে।
অমলেরা মলত্যাগের সময় নিয়ে জেদ ধরলেই “তারকাঁটা”, একঘরে হয়ে যায় — আর আমরা?
আমরাও কি একদিন সব ভয় কাটিয়ে মানুষ হয়ে উঠতে পারব?

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, এপ্রিল ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 2 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Nandita Sinha
Nandita Sinha
2 months ago

আপনার লেখার অপেক্ষায় থাকি। ভারি ভালো লাগে