
শেষে দিল রা- বারো

ভয় পায়না এমন মানুষ নেই। থাকলে তাকে নির্বোধ বলাটাই ভাল– কারণ বোধবুদ্ধিহীন লোকে ছাড়া ভয় পেতে একরকম বাধ্যই আমরা সবাই।
বেঁচে থাকার জন্য, টিকে থাকার জন্য হাজার রকম সংশয় নিয়েই চলি আমরা– যদি এটা না হয়, যদি হঠাৎ অমন হয়, কত রকম সংকটের কল্পনা যে আমাদের শরশয্যা তয়ের করে রেখেছে যে কী আর বলব! ভূত থেকে ভগবান, সবই যে এই ভয় থেকেই সৃষ্টি তা না হয় বোঝা গেল,তবে এর পরেও কারও কারও ভয়ের ঠাহর করা মুশকিল!
যাঁদের এমন হয়, তাঁরাও চেষ্টা করেন কিভাবে বাকিদের নজর থেকে সেসব ভয়কে লুকিয়ে রাখা যায়!
এইরকমই এক ভদ্রমহিলার ছিল “বুলাদি”র ভয়।
একটু খোলসা করেই বলি– সে সময়ে এইডস্ অর্থাৎ হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাসের গতিবিধি সম্পর্কে জোরকদমে মানুষজনকে সচেতন করার কাজ চলছে, শাড়িপরা ছোট্টখাট্ট বুলাদি হ’ল তার ম্যাসকট। তাই খবরের কাগজ খুললেই তার ছবি, সঙ্গে হেল্পলাইনের নম্বর– টিভি খুললেও তিনিই।
এদিকে এই ভদ্রমহিলার ছিল মারাত্মক এইডস্ ভীতি– এইডস্ বিষয়ে যে কোনও কিছুই এড়িয়ে চলতেন তিনি। ফলে টিভি দেখা থেকে খবরের কাগজ পড়া, সবই বন্ধ হয়ে গেল তাঁর।
শুধু সেটুকুই না, একবার বোলপুরের একটা মেলায় ঢুকেছেন, হঠাৎই দেখলেন বুলাদির মডেল! ব্যস্, আর যায় কোথা, মেলার গেটের দিকে মারলেন এক দৌড়,কেনাকাটা মাথায় উঠল।
সেখানেও ঘোটালা! বেরোনোর গেট আলো করে দু’দিকেই বুলাদি যে! অবশেষে তাঁর স্বামী পুলিশকে অনুরোধ করে এমারজেন্সি দরজা দিয়ে বেরিয়ে স্ত্রীকে প্যানিক অ্যাটাক থেকে বাঁচান।

স্বামীর কথাটাও বলতে হবে এবার।
প্রকৃতই ভদ্রলোক তিনি, তবু একদিন রেগেমেগে ফোন করলেন আমায়,
— ডাক্তারবাবু, আর তো পারা যায়না!
ঘটনা সহজ– ভদ্রলোক দামী চাকুরে,অতএব তাঁর অফিস থেকেই একটা মোটা অঙ্কের বিমা করানোর প্রয়োজনে রক্তপরীক্ষা হবে, বাড়িতে ফ্লেবোটমিস্ট এসেছে।
অনেক পরীক্ষার মধ্যেই ছিল এইচ আই ভি টেস্টও। এখানেই কবি কাঁদলেন– রক্ত সংগ্রাহক লোকটি যে সোফায় বসেছিলেন, তাতে বসাই নিষিদ্ধ হয়ে গেল বাকিদের। সোফা সেটের চাদর বদলানো হ’ল, কাচাকাচিও হ’ল । ভুল করেও সেখানে কেউ বসে পড়লে তার স্নান না করে রেহাই নেই। এই প্রথম বেশ রাগারাগিই করলেন স্বামীটি, লাভ হ’ল না। জোর করেই একদিন ঐ সোফায় বসিয়েও দিয়েছিলেন স্ত্রীকে– অবশ্য পরক্ষণেই স্নানে ঢুকলেন ভদ্রমহিলা।
বল আমার কোর্টে আসতে অনেক বুঝিয়ে আমি ক্ষান্ত হওয়ার পথে বললাম,
ভয়কে ভয় না দেখালে ওটা চিরস্থায়ী হবেই!
অতএব যতদিন না আপনি নিজে থেকে ঐ সোফায় বসছেন, ততদিন আমি আর দেখব না আপনাকে!
মিনিট খানেক আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি, তারপর বললেন– আমায় কি করতে হবে?
বললাম, বেশি কিছু না! স্নান টান সেরে ঐ সোফায় অন্তত পাঁচ মিনিট বসে খবরের কাগজ পড়বেন! যে সময় বাড়িতে কেউ থাকবে না, অর্থাৎ আপনি স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তখনই কাজটা করবেন!
অতি অবশ্যই তারপর আর স্নান করা যাবেনা ওদিন। পারলে, তবেই আমায় ফোন করবেন, নচেৎ নয়!
আমার দিক থেকে এমন নির্মম আচরণের পর কয়েক দিন কেটেছে। ভুলেই গেছিলাম কথাটা।
হঠাৎই আবার সংযোগ।
কাজের সময় বহু ফোন ধরতে পারিনা বলে কাজ শেষ হলে মিসড্ কল লিস্ট দেখতে গিয়ে একটা নম্বর থেকে বেশ কয়েকবার ফোন এসেছে দেখে রিং ব্যাক করতেই সেই গলার আওয়াজ–
উহ্ ডাক্তারবাবু! কত্তবার যে ফোন করেছি আজ সারাদিন! আমি কিন্তু পেরেছি আজ, যেমনটা বলেছিলেন আপনি!
ভদ্রমহিলার কন্ঠে খুশি ঝরে পড়ছে যেন।
এরপর বেশ কিছুদিন চুপচাপ।
বুলাদি আর এখন সমস্যা নয়। ওষুধ পত্র অনিয়মিত। একদিন আবারও ফোন এলো–
ডাক্তারবাবু বাঁচান!
ঘটনা বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে। স্বামী স্ত্রী,দুজনেরই বেড়ানোর শখ, এবার ইজিপ্টের টিকিট কাটা হয়েছে। সব ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু হঠাৎই কু ডাকল মন– ইজিপ্ট মানে তো মমি, আর মমি মানেই ডেডবডি! সে তো আমি দেখতেই পারব না!
আবার তো সেই প্যানিক হবে আমার, হবেই, হবেই!তাহলে? কোনও ওষুধ দেবেন ডাক্তার ব্যানার্জি?
পরের দিনই এলেন ওঁরা।
বললাম, ওষুধ নিশ্চয়ই দেব, তবে ভয়কে ভয় না দেখালে তো ওষুধ কাজ করবে না!
যেতে আপনাকে হবেই, নইলে নিজেকে জিতবেন কেমন করে?
পেরেছিলেন উনি।
কয়েক মাস পর আবার দেখা হ’ল ক্লিনিকেই।
খুশিতে ঝলমল করছে ভদ্রমহিলার মুখ।
অনেক গল্পের পর ওঠার সময় ব্যাগ থেকে বের করলেন একটা ছোট্ট প্যাকেট, বললেন,
এটা আপনার জন্য!
খুলে দেখি, একটা চমৎকার সার্কোফেগাস–ঢাকনা খুললেই দেখা যাচ্ছে ব্যান্ডেজ বাঁধা একটা মমি পুতুল!
আমার ডেস্কে আজও অমনিই আছে তারা।
চোখ পড়লে কখনও মনে পড়ে যায় ওঁদের কথা– মন কী অদ্ভুত না? বুলাদি কি মমি কিচ্ছু না, ভেতরে কেবল ছেড়ে যাওয়ার ভয়, একা হওয়ার ভয়, মনোবিজ্ঞান বলে ‘ডেথ অ্যাংজাইটি’!

ভয় নিয়েই জীবন, ভয়কে ভয় না দেখাতে পারলে কি চলে?


কবিতা পড়লাম ভালো লাগলো।
“ভয়কে ভয় দেখানো” আব্যর্থ দাওয়াই!