ছোটোবেলায় যেমনটি ছিল আমাদের দিনগুলো
অনেক লোকজন আত্মীয় স্বজনের মধ্যেই আমাদের বেড়ে। উঠোন, পূজোর দালান, খিলান, সদর দরজা, দেউড়ি, লম্বা দালানের পরত পরতে বহু স্মৃতি।খুড়তুতো, জাঠতুতো, পিসতুতো, মামাতো ভাই বোন নিয়েই আমাদের বেড়ে ওঠা।
খুড়তুতো দিদি এবি দি ( রুবী ব্যানার্জী চ্যাটার্জী ) চলে গেল। গত ৪.৪.২০২৪ এ।
কিছু চলে যাওয়া মনকে থমকে দেয়, অনেক স্মৃতি উসকে দেয়, ছোটো ছোটো মূহুর্ত কথা বলে।
আমাদের ছোটবেলায় , আমার দিদি ( তপু ) , এবি দি, মিন্টু দি, ছোড়দি ( বুডাই ) ছিল পিঠোপিঠি, প্রায় সম বয়স্ক… মধুশ্রী দি একটু ছোটো। এদের মধ্যে দিদি-এবি দির সখ্য ছিল দেখার মতো। আচার-আচরণ, সাফল্য – ব্যর্থতা, জীবনের পদক্ষেপ গুলোতে অদ্ভুত সামঞ্জস্য।
পাড়ার “শান্তিকামী মণিমেলা”, রাধাবল্লভের রাস, ঝুলন,
দুর্গাপূজা, বাড়ির কালীপূজো, সর্বত্র ওদের মিলমিশ গতিবিধি। ছোটবেলায় কালীপূজোর ঘরে ওরা ” পূন্যিপুকুর “পূজো করতো — ”পূন্যিপুকুর ব্রত মালা, কে পূজে রে সকালবেলা… আমি সতী লীলাবতী, সাত ভায়ের বোন ভাগ্যবতী… ” । একমাস পরে ব্রত উদযাপিত হয়ে গেলে মাটির তৈরী ঐ পুকুর ভেঙে দেবার দায়িত্ব পেতাম আমরা ছেলেরা, পরিবর্তে আমরা পেতাম এক বা দু পয়সা। তারপর পড়াশোনার নতুন কোর্সের মতো ওদের উত্তরণ হলো “শিবপূজোতে”…….. আমাদের ঘরে তাম্রকুন্ডে থাকতো শিবলিঙ্গ… বৈশাখ মাস জুড়ে ওদের পূজো।
এর পাশাপাশি ছিল খেলনা বাটি, পুতুলের বিয়ে, দুপুরে আমড়ার বউল বেটে লঙ্কা-গুড় দিয়ে আচার, উঠোনে বুড়ি-চু- কিতকিত …
দিদি- এবি দি ছিল অবিচ্ছেদ্য। পড়াশোনা দুজনের ই মাহেশ পরমেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়, বিকালে খেলাধূলা, ব্রতচারী , সাংস্কৃতিক বিকাশ সব শান্তিকামী মণিমেলায় ঝুনুদির ছত্রছায়ায়। দুজনেই একই সঙ্গে পরমেশ্বরী ছাড়লো, ঠিক হলো প্রাইভেটে ম্যাট্রিক দেবে। সেইমতো ব্যবস্থা। ঠিক করা হলো “শান্তি বাবুকে” ( খাস বাগান লেনে বাড়ি ছিল ) , পরে শেষের দিকে ” নারায়ন বাবু ” । অসীম ধৈর্য্য ও কিছু করতে হবে এই তাগিদে, গত শতাব্দীর ৬০ এর দশকের মধ্যবর্তী সময়ে ওরা উত্তীর্ণ হলো ম্যাট্রিক পরীক্ষায়। যেভাবে বলছি, এত সহজ কিন্তু ছিল না, তখনকার ম্যাট্রিকে প্রাইভেটে পাস করা। আমার আজও মনে আছে মাত্র ৮ % উত্তীর্ণ প্রাইভেটে। আজও মনে আছে, ফলাফল বেরোনোর দিন কাঁচুমাচু মুখে আমি গেলাম “বল্লভপুর হাই স্কুলে” ( ওখানেই এদের enrolement ) — গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ধুতি- পাঞ্জাবি পরিহিত নারায়ন বাবু। তিনিই জানালেন ওদের উত্তীর্ণ হবার খবর। নোটিশ বোর্ড আর দেখিনি, পড়ি মরি করে ছুটে এলাম বাড়িতে। আনন্দের বন্যা।


কতো কথা জমা হয়ে আছে এবি দিকে নিয়ে। Pre university পর্যন্ত দিদি আর এবি দি শ্রীরামপুর কলেজ। এবি দি গেল কলানবগ্রামে একটা মন্তেস্বরী ট্রেনিং সেন্টার। ওখানে শুরু হলো শিক্ষা। এদিকে দিদি, শ্রীরামপুর কলেজ থেকেই স্নাতক হয়েছিল।
মনে পড়ে একদিন, এবি দি হঠাৎ কলানবগ্রাম থেকে এলো, সঙ্গে শান্তি দি সম্ভবতঃ। কী ব্যাপার? এবি দির পক্স হয়েছে, ক’দিন বাড়িতে থাকবে।
ছোটো ছোটো বহু ঘটনা। এবি দি গিটার বাজানো শিখতো। আমাদের বাড়ির উঠোনে প্রতি বছরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সকলের সঙ্গে এবি দি থাকতো, দু একবার গানের সঙ্গে মন্দিরাও বাজিয়েছে।
বাড়ির কালী ঠাকুর বিসর্জনের দিন “দধি কর্মা” মাখতো এবি দি — এ ছিল যেন স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম, আমিও এর অন্যথা করিনি, এবি দি এসব অধিকার পেলে খুব খুশি হতো।
বিয়ে হলো এবি দির সম্ভবতঃ ১৯৭৩ সালে। পাঁচু কাকা অসুস্থ, তবুও বাড়ির সবাই মিলে হৈ চৈ রব, আনন্দ উল্লাস।
আমাদের ভেতরের উঠোনে ( তখন খুব বড় ছিল ) ভিয়েন থেকে যগ্গি বাড়ির রান্না সব ওখানে। বাবা আর কলকাতার কাকাবাবু ( গোপাল ব্যানার্জী ) দেখাশোনা করেছিলেন।
দিদির বিয়ে হলো পরের বছরই।
এবি দিকে খুব মনে পড়ে। সেই প্রাণোচ্ছল হাসি, সমস্ত ব্যাপারে এগিয়ে আসা, উঠোনের খেলা, দেউড়ির আড্ডা সব মনে পড়ে।
মিন্টু দি চলে গেছে এক বছর হলো, এবি দিও চলে গেল।
যেখানেই থাকো, তোমরা ভালো থেকো।
আমার বাকি দিদি রাও ভালো থাকুক। সব হারানোর অনিবার্যতার মধ্যেও যতদিন বেঁধে বেঁধে থাকা যায়।
ঈশ্বর সকলের মঙ্গল করুন।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]