
নুড়ি পাথরের সঙ্গে চলতে চলতে (১৬)
শ্রীরামপুরে কলেজে তখন বায়ো ডিপার্টমেন্ট এ শুধু মাত্র বোটানিতেই অনার্স ছিল। তাই ইচ্ছে থাকলেও জুলজি বা ফিজিওলোজিতে অনার্স পড়ার সুযোগ ছিল না। অগত্যা বোটানি নিয়ে পড়া শুরুর করলেও শেষে পাসেই ধপাস হয়েছিলাম। কেটে গিয়েছিলো অনার্স। শে এক ভয়ঙ্কর কাহিনী। যাই হোক বোটানিকে পাশে নিয়েই চলা শুরু হলো। তখন আমাদের বিভাগের অধ্যাপকরা ছিলেন বিখ্যাত বোটানিতে সন্ধ্যা সুর তৎকালীন বিখ্যাত মন্ত্রী প্রশান্ত সুরের স্ত্রী। বাকিদের সব নাম মনে নেই। জুলজিতে নীতিশ বাবু শৈলেশ বাবু। ফিজিওলোজিতে রেবা দে আর সন্তোষ বাবু। আমাদের যত দুস্টুমি ছিল রেবাদির সঙ্গেই।

আমাদের চারটে গ্রুপ প্রত্যেক গ্রুপ এ তিনটে ছেলে এগারোটা মেয়ে । মোট ৫৬ জন। তার মধ্যে আমাদের গ্ৰুপ তাই বেশি ভালো ছিল। আমি গোবিন্দ আর অমিয়। বাকিরা মেয়ে। মুনমুন অনন্যা স্বাতী সুলগ্না সবার নাম মনে নেই। সে সেই ১৯৭৪৫-৭৫। অমিয় খুবই ভালো আঁকতো। একদিন ক্লাসে বিরাট ব্ল্যাকবোর্ড জুড়ে দুটো ছবি আঁকলো।
এ.আর. সি ইন ক্লাসরুম আর
এ.আর. সি ইন হাউস। প্রথমটায় অচিন্ত্যবাবু হাতে বেত নিয়ে দাঁড়িয়ে ছাত্র ছাত্রী রা কাঁপছে অন্যটায় বাড়িতে অচিন্ত্যবাবুর স্ত্রী ঝাঁটা নিয়ে দাঁড়িয়ে স্যার কাঁপছেন।
স্যার ক্লাসে ঢুকে সেই ছবি ভালো করে দেখলেন। তারপর টেবিলে বোসে জিজ্ঞেস করলেন Who is the artist of this beautiful picture?
সমস্ত ক্লাস চুপ। এবার স্যার বললেন আমি জানতাম এটা একটা co-ed ক্লাস বাট এখন দেখছি এবার পুরোটাই মেয়েদের। পুরুষের পোশাকে কিছু বৃহন্নলাও আছে। ব্যাস আমিও উঠে বললো -আমি এঁকেছি।
স্যার বললেন জানি তুমি ছরা এত ভালো ছবি কেউ আঁকতে পারবে না। এসো দাস্টার দিয়ে মুছে দাও।
অমিয় মুছে দেওয়ার পরেই স্যার বললেন আজ আর ক্লাস নেবো না। Attendance ও দেবো না। আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। বাট কেউ ক্লাস থেকে বেরোবে না। একটি শব্দ জানো আমার কানে না যায়। তাহলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।
সেই শুরু আমাদের সঙ্গে স্যারের অশান্তি। ফুল সেশনটা সেটার ফল আমরা ভোগ করেছি।
কলেজে আমি কোনো দিন প্রেম করিনি। মাঠে অনায়াসে বান্ধবীদের কোলে মাথা রেখে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকতাম।
তখন কবিতা লিখি বলে কলেজে অনেকেই জানতেন। বিশেষ করে বাংলার সুশান্তবাবু উমাদি আর পঞ্চাননবাবু। একদিন সুশান্তবাবু আমায় ডেকে বললেন তুমি তো বায়োলজির ছাত্র কলেজটাকে বৃন্দাবন বানিয়ে ফেলেছো হে। বান্ধবীদের নাকি প্রেমিকাদের কোলে মাথা রেখে যে ভাবে শুয়ে থাকো মনে হয় কুঞ্জবনে শুয়ে আছো।
আমি খুবই গম্ভীর হয়ে বললাম ওরা কেউ প্রেমিকা নয়। নিপাট বন্ধু। বেশ আর শোবো না। সুশান্তবাবু উমাদিরা আমায় খুবই ভালোবাসতেন। এই ঘটনার পর সেটা আরও বেড়ে গেলো অজ্ঞাত কারণে।

একদিন গোবিন্দ বললো – আমরা সিগারেট খাই তুই খাসনা কেন রে? আজ একটা খাবি। আমি বললাম না রে বাবা কে কথা দিয়েছি কোনো দিন খাবো না। কিন্তু সব্বাই মিলে এমন চাপাচাপি করতে শুরু করেছিল যে আমি একটা সিগারেট গোবিন্দর থেকে নিয়ে একটানে শেষ করে দিয়ে বুঝে ছিলাম জীবনে ওটার চেয়ে খারাপ কিচ্ছু কোনো দিন খাই নি। মুখে কোনো স্বাদ ছিল না দুদিন। বাড়ি এসে বাবাকে সব বলে সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম আর কোনো দিন সিগারেট খাবো না সেই থেকে ধুমপান করিনা আজও। তবে আনুষ্ঠানিক কারণে দু একবার খুবই দামি হুইস্কি বা রাম পান করেছি।
সেদিন সবাই আমায় জোর করে সিগারেট খাওয়ানোটা একজন মেনে নিতে পারে নি। আমার ক্লাসমেট সুলগ্না। সে আমায় না বললেও অনেকের কাছে বলেছিলো – পার্থকে জোর করে খাওয়ানো টা খুবই অন্যায় হয়েছে আমাদের।
কলেজে আমায় সব্বাই আমার ডাঃ নাম ধরেই ডাকতো।
সুলগ্না বন্ধু হলেও আমায় একটু বেশি নির্ভর করতো। প্রাকটিক্যাল ক্লাসএ আমি ছিলাম ওদের কয়েক জনের সহযোগী। জুলজি প্রাকটিক্যাল এ জ্যান্ত আরশোলা ব্যাঙ অজ্ঞান করানোর আগে ওদের গায়ে দেওয়া যায় কি না বেশ গবেষণার বিষয় হলেও আমি টা হতে না দিয়ে ডিসেকশান ট্রে তে সাহায্য করতাম। এই ভাবে পার্ট ওয়ান পরীক্ষা এসে গেলো। একদিন অচিন্ত্যবাবুর সঙ্গে আমাদের খুবই ঝামেলা হলো। উনি খুবই ক্লাস অফ দিতেন। যারা ওনার কাছে প্রাইভেটে পড়তো তাদের অনেক সুবিধে দিতেন। পড়া বুঝিয়ে দিতেন ফলে তারা কেউ ওনার বিরুদ্ধে কিছুই বলতো না। যদিও তাদের কেউ আমাদের গ্রুপ এ ছিল না। ফলে আমাদের কোনো ব্যাপারে তারা এগিয়ে আসতোই না।
একদিন আমাদের এ গ্রুপের সব্বাই মিলে স্যারের ঘরে গিয়ে খুবই প্রতিবাদ করলাম। অমিয় টেবিলে কাঁচের ওপর একটা আচমকা ঘুসি বসাতেই এক কোনে একটা খুউউব ছোট্ট হেয়ার ক্রাক হয়ে গেলো। অচিন্ত্য বাবু শুধু একবার দেখলেন কিন্তু কিচ্ছু বললেন না। আমার চিৎকার চাঁচামেচি করে চলে এলাম। পরীক্ষা এসে গেলো। সব্বাই খুবই ভালো প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা দিলেও দেখা গেলো আমাদের গ্রুপ এর সব্বাই প্রাকটিক্যাল ব্যাক পেয়েছে। ৪০ পেলে পাস আমি ৩৮ পেলাম। অমিয় পেয়েছিলো ২৭। খুবই মনে খারাপ নিয়ে আমরা কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে গেলাম তারা বললো তাঁদের কিছুই করার নেই।
এর মধ্যে একদিন একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেলো। অমিয় খুবই ভালোবাসত স্বাতীকে। দুজনের মধ্যে দারুণ বোঝাবুঝি ছিল। কিন্তু হঠাৎ কয়েক দিন সে কলেজে আসে নি। হঠাৎ একদিন আমরা মাঠে সব্বাই আড্ডা দিচ্ছি। দেখি স্বাতী ঢুকছে সঙ্গে একটা লম্বা হ্যান্ডসাম ছেলে । স্বাতীর কপালে সিঁদুর। ও এসেই পরিচয় করিয়ে দিলো। Dear gays this is my husband Soumya..আর সৌম্য এ অমিয় আমরা খুবই ভালো বন্ধু। দেখলাম অমিয় চুপ করে গেলো। কিছুক্ষন থম মেরে বোস থেকে হঠাৎ উঠে বললো চল ক্যান্টিনে। সবাই সেলিব্রেট করি। ওই খাওয়ালো। কিছুক্ষন পর ওরা চলে যেতেই আমারা সবাই অমিয়র কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। অমিয় বললো ও ঠিক করেছেরে। এটাই রিয়েলিটি। ওর কোনো দোষ নেই। আমি দেখলাম ওর চোখের কোনে একটু জল টলটলিয়ে উঠছে। পরের ক্লাস টা অফ হয়ে যাওয়ায় আমরা সব্বাই আসতে আসতে বাড়ি চলে গেলাম। পরের দিন সকালে ১০ টায় কলেজে এসে অমিয়র কাকা যিনি কেমিস্ট্রির ল্যাব আসিস্টেন্ট ছিলেন তার মুখে শুনলাম অমিয় গতদিন রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে অনন্তের পথে পালিয়েছে। আমি খুবই কাঁদলাম। মনে হলো ভবিষ্যতে স্বাতীকে এর জন্যে নিশ্চিত শাস্তি পেতেই হবে।
আমাদের ফাইনাল পার্ট টু পরীক্ষার সিট্ পড়েছিল কোন্নগর হীরালাল পাল কলেজ এ।
পরীক্ষার প্রথম দিনেই শুনলাম আগের দিন সুলগ্নার বাবা মারা গিয়েছেন। মা আগেই চলে গিয়েছিলেন। এবার বাবাও গেলেন। কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে সুলগ্না পরীক্ষা দিতে এসেছিলো। আমি ওকে অনেক বুঝিয়ে পরীক্ষায় বসালাম। সেদিন প্রথম সুলগ্না আমার কাঁধে মাথা রেখে খুবই কাঁদলো। পরীক্ষা দিলো। কিছুদিন পড়ে রেজাল্ট বেরোলো দেখলাম আমরা সব্বাই প্রাকটিক্যাল এ ব্যাক। কমবাইন্ডে আশি পেতে হবে আমি ৭৮ পেয়ে ব্যাক। সব্বাই খুবই আপসেট হয়ে অচিন্ত্য বাবুর কাছে গেলাম। তিনি দেখালেন তিনি কাউকেও ইন্টারন্যাল নম্বর টা দেননি। বললেন -অমিয় তো কেটে পড়েছে তোমাদের কেউ যদি ওই কাঁচের ক্র্যাকটা মুছে দিতে পারো নম্বর দিয়ে দেবো।
আমরা ইউনিভার্সিটি তে গেলাম তারা বললেন এটা কলেজের ব্যাপার তারা কিছুই করতে পারবেন না…
ক্রমশ:

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

অমিয়র জন্যে মন খারাপ হয়ে গেল!
লেখা খুব ভালো লাগছে।