
‘ শারদোৎসব’ এর উপনন্দ – ব্রতকথার নায়ক যেন
অবিশ্বাসী আর বিশ্বাসীরা
‘ চুপ কর অবিশ্বাসী, কথা বোলোনা।’— কে এই অবিশ্বাসী ? কেন বলা হল একথা। ‘ ডাকঘর’ পাঠ্যতালিকায় থাকা সকল ছাত্রকে একবার না একবার লিখতে হয় এর উত্তর। বাঁধা গতের সেইসব উত্তরের মধ্যে কি আদৌ স্থান পায় বিশ্বাসীর আলো কিংবা অবিশ্বাসীর অন্ধকার ? রাজার পাঠানো চিঠির সাদা পাতায় যখন স্পষ্ট অক্ষর দেখেন ঠাকুর্দা তখন তা নিয়ে মাধব দত্ত সংশয় প্রকাশ করলে ঠাকুর্দা তাকে ‘ অবিশ্বাসী’ বলেন। রাজা আছেন, তিনিই সেই ‘ অন্তরতম’, যিনি অনায়াসে চিঠি পাঠাতে পারেন জানালার ধারে বসে থাকা রোগক্লিষ্ট অমলকে, তাঁকে ভালোবাসতে না পারলে দেখাও যায়না তাঁর চিঠি। ‘ ডাকঘর’ এর মাধব দত্ত কিংবা ‘ শারদোৎসব’ এর লক্ষেশ্বররা যে চোখে যা দেখা যায় শুধু তাকেই বিশ্বাস করে। তাইই তো সব ‘ অলক্ষ্য রং’ কিংবা ‘ অশ্রুত’ সুর তাদের চেনাজানার বাইরে। ঠাকুর্দা যে অচিন দেশের মানুষ তাঁর কাছে তো এঁরাই ‘ অবিশ্বাসী’। অথচ ‘ গীতাঞ্জলি’র এই গান—‘ প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে / প্লাবিত করিয়া নিখিল দ্যুলোক-ভূলোকে/ তোমার অমল অমৃত পড়িছে ঝরিয়া।’ যেন ধারণ করে থাকে ‘ ডাকঘর’ এর বালক অমল, ‘ শারদোৎসব’ এর উপনন্দও।
রবীন্দ্রনাথের ‘ ডাকঘর’ ( ১৯১২) পর্বের আগেই যে লেখা হয়েছে ‘ গীতাঞ্জলি’র গান। (১৯০৮-৯) , এই গানগুলি লিখিত হবার সময়ে প্রকাশ পাচ্ছে ‘ শারদোৎসব’ ( ১৯০৮) । তার অল্প কদিন পরে প্রকাশ পাচ্ছে ‘ গীতিমাল্য’ ( ১৯১৪), ‘ গীতালি’ ( ১৯১৪)। তাই ‘ শারদোৎসব’ এর গায়ে লেগে থাকে সেই পরম বিশ্বাসের সুর। যা ধর্মীয় নয়, জীবনের প্রতি বিশ্বাস আর ভালবাসার মিশ্রণ। এই জীবন যেন বর্হিজীবন থেকে অন্তর্জীবনে প্রবেশের পথ। তাতে বাইরের প্রকৃতির সঙ্গে যোগ ঘটে বুঝি অন্তরের প্রকৃতির। ‘ শারদোৎসব’ এর উপনন্দ শরতের রোদে সোনা খুঁজে পেয়েছিল আর ‘ শারদোৎসব’ এরই লক্ষেশ্বর আবার তার লুকনো কৌটোয় সেই সোনা খুঁজতে চেয়েছিল। এই যে দুই দল, একদল পৃথিবীর আলোতে স্বর্ণ সন্ধান করে, আরেকদল জমিয়ে তোলা দ্রব্যে খোঁজে সোনার অর্থসুখ এরাই একজন ‘ বিশ্বাসী’, অন্যজন ‘ অবিশ্বাসী’। একদল দেখতে পায়, একদল পায়না। একদল বিশ্বসংসারকে ভালোবেসে মুক্তি পায়, আরেকদল পুঞ্জীভূত সোনা জমিয়ে মুক্তি খোঁজে , —বিশ্বের প্রতি বিশ্বাসী আর অবিশ্বাসীর এই দ্বন্দ্বই তো বেশিরভাগ রবীন্দ্রনাটকের প্রাণ। ‘ শারদোৎসব’ যেন এই বন্ধ আর মুক্তিরই খেলা। ১৯০৭ সালে মারা গিয়েছিলেন শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৮ এ লেখা হচ্ছে ‘ শারদোৎসব’। কনিষ্ঠ সন্তানের এই মৃত্যুর পর ১৯১২ তে ‘ ডাকঘর’ এ ‘ অমল’ এর শান্ত সমাহিত মধুর ( সম্ভবত) মৃত্যু যেন জগতের দুঃখ থেকে আনন্দের দিকে গভীর গহন পথের এক যাত্রা। দুঃখের বন্ধন থেকে আনন্দের মুক্তি। ঠিক এভাবেই মুক্তি চেয়েছে ‘ শারদোৎসব’ এর উপনন্দও , মূল্য ঋণ চুকিয়ে অমূল্য আনন্দে।

ব্রতকথার নায়ক
উপনন্দকে এক দুর্লভ যুবক মনে হয় আমার। তার গুরুর শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার। যে বীণা বাজানোর উত্তরাধিকার বহন করেও পুঁথি লেখার বিদ্যা দিয়ে গুরুর ঋণ শোধ করে যেতে চায়। আজ ক্রেডিট সোসাইটিতে উপনন্দ যতটা দুর্লভ ততটাই আকাঙ্কিত হয়ে পড়ে যেন। এক অবিশ্বাস্য মধুর হয়ে ওঠে তার ঋণশোধ। আর সেই মাধুর্য যেন সম্পূর্ণ হয় সন্ন্যাসী অপূর্বানন্দের আগমনে এবং সাহচর্য্যে। হতে থাকে ‘ শারদোৎসব’। শরত ঋতু তার আনন্দের ডালপালা বিস্তার করতে থাকে পৃথিবীতে। মিলে যায় পার্থিবতা আর অপার্থিবতা।
‘ আমি কখনো বা ভুলি , কখনো বা চলি
তোমার পথের লক্ষ্য ধরে –
তুমি নিষ্ঠুর সম্মুখ হতে
যাও যে সরে।
এ যে তব দয়া জানি জানি হায়,
নিতে চাও বলে ফিরাও আমায় ,
পূর্ণ করিয়া লবে এ জীবন
তব মিলনেরই যোগ্য করে
আধা-ইচ্ছার সংকট হতে
বাঁচায়ে মোরে। ’ ‘ গীতাঞ্জলি’ র এই গান ,এরকম একাধিক গানে যেন উপনন্দর আকুতিটাই স্পষ্ট হয়ে যায়। নিশ্চয়ই মনে রাখতে হবে ‘ শারদোৎসব’ ১৯০৮ এ লেখা, যখন ‘ গীতাঞ্জলি’র গানগুলি লেখা হচ্ছিল, বই হয়ে বেরোলো ১৯১০ এ। উপনন্দর আকুতি যেন আরও স্পষ্টতা পেলো অমলে এসে। উপনন্দ চরিত্রটির মধ্যে উপনিষদের কাঠিন্য যেন বাউল ধর্মের সহজতা পেল অমলে এসে। উপনন্দ যেন অমলের সেই খুঁজতে যাওয়া কাজের সন্ধান পেয়ে বসে আছে আগে থেকেই।
উপনন্দ কাজ করে চলে, আর অমল কাজ খুঁজতে চায়। উপনন্দর কাজের চাপে উপায় নেই বাইরের প্রকৃতির সঙ্গে মেলার , অমলের রোগের জন্যেই উপায় নেই বাইরে যাওয়ার।
আর দুজনেই যেন এক বিন্দুতে এসে যায় যখন দেখি দুজনেই অনাথ। তাদের পিতৃপরিচয় নেই। উপনন্দ তার গুরুর কুড়িয়ে পাওয়া। আর অমল মাধব দত্তের স্ত্রীর গ্রাম সম্পর্কের ভাইপো। তাকে দত্তক নেওয়া হয়। ( ‘ মুক্তধারা’র অভিজিতও ছিল পালিত সন্তান) । আমাদের মনে পড়ে যায় শিলাইদহ থেকে অল্প দূরে ঝিনাইদহ জেলার কুষ্ঠিয়ার লালন সাঁই এর জন্মবৃত্তান্ত। লালন এর জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে বহু মত প্রচলিত। শোনা যায় তিনি ছিলেন হিন্দু কায়স্থ। দাস বা কর তাঁর পদবী। অল্পবয়সেই পিতা মারা গেছিলেন তাঁর, বিবাহও হয়েছিল তাঁর অল্প বয়সেই। কিন্তু একদা পুরী তীর্থে পায়ে হেঁটে যেতে গিয়ে বা ফিরতে গিয়ে বসন্ত রোগাক্রান্ত হন। দলের লোকেরা তাঁকে অচ্ছুত জ্ঞান করে জলে ভাসিয়ে দেন। এক মুসলমান দম্পতি তাঁকে সুস্থ করেন, সন্তান জ্ঞানে গৃহে আশ্রয় দেন। পরে লালন সিরাজ সা*ই এর কাছে দীক্ষা নেন, বাউল ধর্মকে আশ্রয় করেন। রবীন্দ্রনাথই প্রথম তাঁর গান শিক্ষিত সমাজের কাছে পৌঁছে দেন গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ করে। বাংলার মৌখিক সাহিত্যের এই নির্যাস, এই আবেদন রবীন্দ্রনাথকে ঠিক কতটা স্পর্শ করেছিল তা গবেষণাযোগ্য , কিন্তু লালনের অনাথ পরিচয়, গুরুর আশ্রয় মনে পড়ে যায় যখন উপনন্দ সন্ন্যাসী আর ঠাকুরদাদাকে বলে নিজের জন্মবৃত্তান্ত—‘ ছোট বয়সে আমার বাপ মারা গেলে আমি অন্য দেশ থেকে এই নগরে আশ্রয়ের জন্যে এসেছিলেম। সেদিন শ্রাবণমাসের সকালবেলায় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছিল, আমি লোকনাথের মন্দিরের এক কোণে দাঁড়াব বলে প্রবেশ করছিলেম। পুরোহিত আমাকে বোধহয় নীচ জাত মনে করে তাড়িয়ে দিলেন। সেইদিন সকালে সেইখানে বসে আমার প্রভু বীণা বাজাচ্ছিলেন। তিনি তখনই মন্দির ছেড়ে এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরলেন। বললেন , এসো বাবা আমার ঘরে এসো।’ তাই উপনন্দ যেমন বলে—‘ ইচ্ছা করছে , আমার প্রভুর জন্যে আজ আমি অসাধ্য কিছু একটা করি’, লালনও তেমন গান বাঁধেন– ‘ গুরু বিনে কি ধন আছে।/ কি ধন খুঁজিস খেপা কারো কাছে।’ যে অনাথ বালককে পুরোহিত তাড়িয়ে দেয়, সেই অনাথকে বুকে করে নেয় বীণা বাজানো ভিক্ষুক। উপনন্দ যাকে বলছে এই বৃত্তান্ত সেই অপূর্বানন্দ ওরফে মহারাজা বিজয়াদিত্য নিজেও পুঁথিপত্র পুড়িয়ে দিয়ে হাল্কা হতে চায়। অমলকেও ঠাকুর্দা বলেছিল হাল্কা দেশের কথা। প্রথাগত চলন, বিদ্যা , শিক্ষার বাইরে সহজিয়া আনন্দই কি সেই হাল্কা দেশে প্রবেশের মন্ত্র ?
উপনন্দর এই যাত্রা যেন রূপকথা নয়, বাংলার ব্রতকথার নায়কের মত কৃচ্ছসাধনায়, ব্রতের একনিষ্ঠতায়। এই যাত্রা বাইরের দেশবিদেশ ঘুরে নয়, একজায়গায় বসে পুঁথি লিখে তবু তার এই পথ চলায় মনে পড়ে যায় ‘ ঠাকুরমার ঝুলি’ র গল্পের কিরণমালা, সাত ভাইয়ের বোন চম্পা কিংবা বুদ্ধু ভুতুমের যেভাবে ব্রত উদযাপন হয় নিজেকে খুঁজে পেয়ে। রূপকথার নায়কেরও থাকে কৃচ্ছসাধনের কষ্ট কিন্তু তাতে ঘিরে থাকে যে মাধুর্যের ছায়া ব্রতকথার নায়ক যেন সেই মধুরতাটুকুও পায়না। কাজ শেষ হলে তবে তাঁর আত্মানুসন্ধান সম্পূর্ন হয় যেন। সাত ভাইয়ের বোন চম্পা, বুদ্ধু ভুতুম, এমনকি অবন ঠাকুরের ‘ ক্ষীরের পুতুল’ এর চরিত্রও পিতৃপরিচয় পুনরুদ্ধারের মাধ্যমেই তাদের মুক্তি অর্জন করে। আর উপনন্দ ? সে পিতৃপ্রতিম গুরুকে মুক্তি দিতে চায় তাঁর ঋণ মিটিয়ে । আর এই কাজই তার নিজেকে খুঁজে পাওয়ার পথ।
আবার লোককথার একটা প্যাটার্নে যেভাবে থাকে নায়কের বেরিয়ে পড়া, অভিযানে সামিল হওয়া , ইপ্সিতের কাছে পৌঁছনো এবং সত্য উদ্ঘাটন, তার অনেকটাই কি আমরা পাইনা ডাকঘর, শারদোৎসব, রাজা কিংবা রক্তকরবীতে ? কিংবা ‘ অচলায়তন’ ‘ মুক্তধারা’ তেও ? বস্তুত যখন দেখি ১৯১০ সালে প্রকাশ পাওয়া দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ ঠাকুরমার ঝুলি’ র ভূমিকা লিখছেন রবীন্দ্রনাথ যা লোককথা নিয়ে সার বক্তব্য তুলে ধরে মাত্র দেড় পাতাতেই ? কাছাকাছি সময়ে বিভূতিভূষণ গুপ্ত সংকলন করছেন ‘ বিড়াল ঠাকুরঝি’ নামে একটি লোককথার বই, যাতেও একটি তাতপর্যপূর্ণ ভূমিকা লিখছেন রবীন্দ্রনাথ। আর ১৯০৮ সালেই লেখা হচ্ছে ‘ শারদোৎসব’। ‘ ডাকঘর’ ‘ অচলায়তন’ ১৯১২, ‘ রাজা’ ১৯১০। নাহ, শুধু সময়ের সাযুজ্যেই নয়, দর্শন আর আকারেও মাঝে মাঝেই আমাদের রূপকথা ব্রতকথার মধুর গড়নটিকে ছুঁয়ে যায় যেন রবীন্দ্র নাটকগুলি। শুধু লোককথা নয়, লালনের গান কিংবা দর্শনও যেন মাঝে মাঝে নতুন করে চেনায় ‘ ডাকঘর’ এর অমল, ‘ শারদোৎসব’ এর উপনন্দকে। তাই আমাদের নিজস্ব রূপকথার গল্পে তরোয়াল দিয়ে খলনায়ককে যুদ্ধে হারিয়ে নয়, চেতনার উন্মেষে সমাপন হয়, রাজা নিজের ভুল বুঝতে পেরে ডেকে নেন দুয়োরানিদের, রবীন্দ্র নাটকেও যেন সেভাবেই প্রকৃত রাজার মহারাজত্ব উদ্ভাসিত হয়, নকল রাজাদের মুখোশ খুলে যায় এবং মাধব দত্ত, লক্ষেশ্বরেরা অন্তত নিজের অবস্থান বুঝতে পারে।
ছদ্মবেশ
রূপকথার গল্পে কিরণমালা ছদ্মবেশ ধরেছিল পুরুষের, যাতে মায়া পাহাড়ের ডাক তাকে কাবু না করতে পারে। বুদ্ধু ভুতুমও ছিল পেঁচা আর বাঁদরের ছদ্মবেশে। আর নীলকমল লালকমল ও ছদ্মবেশে গিয়েছিল রাক্ষস মারতে। ‘ শারদোৎসব’ এ সন্ন্যাসী অপূর্বানন্দের আড়ালে থেকে যান রাজা বিজয়াদিত্য। কিন্তু কেন এই ছদ্মবেশ ? আগেকার দিনের রাজাদের ছিল এই ছদ্মবেশের আড়াল। রাজ পরিচয় লুকিয়ে সঠিক মানুষকে চিনে নিতে চাইতেন তাঁরা। প্রজাদের মধ্যে কে কতটা দেশভক্ত সেই আবিষ্কারও ছিল এর উদ্দেশ্য। ‘ কিরণমালা’ গল্পে রাজা ছদ্মবেশে বেড়িয়ে শুনে ফেলেন তিন বোনের গল্প। ছোট বোনটির সাধ ছিল রানি হবার, রাজা বড় বোনদের আকাঙ্খিত বরেদের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে নিজে বিয়ে করেন ছোটটিকে। ‘ রাজা’ নাটকে রাজা চেয়েছিলেন রানি সুদর্শনা সঠিক ভাবে চিনে নিন তাঁকে। তাঁদের অন্তরের মিল হোক আগে। তাই রানি তাকে বারবার দেখার জন্যে উৎসুক হলে রাজা গান করেন—বাহিরে ভুল ভাঙবে যখন অন্তরে ভুল ভাঙবে কী……
অপূর্বানন্দ ‘ শারদোৎসব’ এ যখন লক্ষেশ্বরের কথার উত্তরে বলেন—‘ লক্ষেশ্বর তোমাদের চেয়ে ঢের বেশি মানুষ চেনে। যেমনি দেখেছে অমনি ধরা পড়ে গেছে ! ভণ্ড সন্ন্যাসী যাকে বলে ! বাবা লক্ষেশ্বর , এত দেশের এত মানুষ ভুলিয়ে এলেম, তোমাকে ভোলাতে পারলেম না ! ’ তখন কথার শ্লেষে স্পষ্ট হয়ে যায় মানুষের আসল নকল শুধু না , তাকে চেনার আসল নকল পদ্ধতি। বাইরে ভিতরে মানুষের ভিন্ন রূপ আর সেই আড়াল ভেদ করার জন্যে বাউলের আকুতি না থাকলে যে সব সম্পর্ক কেবলই সামাজিক নামকরণে সীমাবদ্ধ। তা যে আত্মার আত্মীকরণে পরিণত হতে পারেনা। তা সে উপনন্দ আর অপূর্বানন্দের মধ্যেই হোক, রাজা আর সুদর্শনার মধ্যেই হোক। তখন এই আপাত ছদ্মবেশ মানুষের মধ্যে বিশ্বসংসারের মুক্তি আনায় আবশ্যিক হয়ে পড়ে যেন। জীবনের রূপকথা সম্পূর্ন হয় এই বেশে। জীবনে গভীর গহন যে পথ, যেখানে গিয়ে না দাঁড়ালে পাওয়া যায়না তাঁকে সেই পথ তো উন্মুক্ত নয়। তাকে খুঁজতে জানতে হয় ভিতরের চলন। ‘ রাজা’ নাটকে ‘ সুরঙ্গমা’ গান গেয়েছিল—‘ উৎসবরাজ কোথায় বিরাজে–/ কে লয়ে যাবে সে ভবনে,/ কোন নিভৃতে রে, কোন গহনে ।।’ আর রাজা স্বয়ং সুদর্শনার জন্যে গান করেন –
আমি রূপে তোমায় ভোলাব না/ ভালোবাসায় ভোলাব।
আমি হাত দিয়ে দ্বার খুলব না গো,/ গান দিয়ে দ্বার খোলাব।
এই ভালোবাসাই যে রূপকথা। এই ভালোবাসা যে প্রাপক আর দাতাকে এক বিন্দুতে এসে দাঁড় করায়। এক আনন্দে সামিল করে। তখন ছদ্মবেশ উন্মোচিত হয়। অবন ঠাকুরের সুও দুও গল্পের ক্ষীরের পুতুল প্রাণ পায়। তখনই হয় ‘ ছুটি’।
ছুটি
উপনন্দ কাজের মধ্যে মুক্তি চেয়েছিল। মিলে যেতে চেয়েছিল এই বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গেই। কিন্তু তার পথটা ছিল ভিন্ন। তার ‘ ছুটি’ র সংজ্ঞা ছিল স্বতন্ত্র। সে নাটকের ছেলের দলের মত খেলে নেচে গান গেয়েই ছুটি উপভোগ করতে চায় কিন্তু তার ঋণের ভার তাকে অন্যত্র এই আনন্দ দেয়। তাই মেঘের কোলে রোদ এলে , সবাই যখন গান গেয়ে ওঠে ‘ আজ বিনা কাজে বাঁজিয়ে বাঁশি কাটবে সকল বেলা’ , আর সেই ‘ ছুটি’ কাটায় যখন সবাই—‘ রাখাল ছেলের সঙ্গে ধেনু, চরাবো আজ বাজিয়ে বেণু, মাখব গায়ে ফুলের রেণু, চাঁপার বনে লুটি’— তখন উপনন্দ এই ছুটির আনন্দে মেতে উঠতে পারেনা, তাকে ছুটি দেয় কাজ। তার পুঁথি লেখা যত হতে থাকে, তার গুরুর ঋণ তত কমতে থাকে আর তার মন ছুটির আনন্দে মেতে ওঠে। বীণার তারের মত মধুর সুরে পৃথিবী ধরা দেয় তার কাছে। এই ভিন্নতর ‘ ছুটি’ আমাদের কাছেও ‘ ছুটি’ শব্দের একটা সম্পূর্ণ নতুন অর্থ নিয়ে আসে যেন। কাজ থেকে ছুটিই শুধু নয়, কাজের মধ্যে ছুটি আমাদের নতুন করে ভালোবাসায় উপনন্দকে, ঠিক যেভাবে সন্ন্যাসী তাকে ভালোবেসেছিল, চিনেছিল আমরাও উপনন্দের দিকে, উপনন্দদের দিকে ফিরি। যে কাজ ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জন আর সঞ্চয়ের কথা বলেনা, তার চেয়ে বড় ছুটি আর হয় না কি ?
ঋতু
আরেকটা কথা , বেশিরভাগ ব্রতের গল্পেই এই মুক্তি মিশে যায় ঋতুর উদযাপনে। মনে পড়ে যায় ‘শারদোৎসব’ এ মিশে থাকে শরত, ‘ রক্তকরবী’ তে মিশে থাকে পৌষের শীত কিংবা ‘ রাজা’ তে বসন্তের আনন্দ। এবং অদ্ভুতভাবে লক্ষ্যণীয় এই নাটকগুলিতে দেশি নাটকের যাত্রাপালার আকৃতি থাকে , থাকে এই উদযাপন নাচ গান মিলিয়ে আনন্দের বান ডেকে দিয়ে সর্বত্র। আর তখনই স্পষ্ট হতে থাকে ব্রত উদযাপনের মত শরতের এক অন্য ধারার উদযাপন। ঋতুর বহিরঙ্গ নয়, তার অন্তরের আনন্দকে স্পর্শ করে নিজেকে নতুন করে তোলাই যে সঠিক উদযাপন। আমাদের বাংলার পল্লীর ঘরে ঘরে যে আজও ঋতুর উৎসব হয় মনে পড়ে তা। শরতের ভাদ্র মাসের ভাঁজো কিংবা ভাদুগান, পৌষের টুসু লক্ষ্মী থেকে নবান্নের পুজো, বিশেষত বীরভূমের ‘ লবাণ’ এ যে আনন্দ তা তো ঋতুকে বাইরে ভিতরে আত্মস্থ করে নিজেকে নতুন করে নেবার। এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে প্রবেশের সঙ্গীতই তো ‘ দে তোরা আমায় নূতন করে দে নূতন আভরণে’। এই ঋতুকে কেন্দ্র করে চরিত্রদের আবর্তন আমাদের আবার যেন মনে পড়িয়ে দেয় ব্রতকথার আভাস।
[শিক্ষক। বাংলা বিভাগ। শ্রীরামপুর কলেজ]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
