পায়ে পায়ে বজবজ (অন্তিম পর্ব )

পরিত্যক্ত রেল ট্র্যাকের পাশেই দাঁড়িয়ে সেই শৌর্যধারী কোমাগাটামারুর ধবল প্রতীকী, যার বাইরের দেওয়ালের বাম পাশে খোদাই করা সেই সংগ্রাম-বলিদান-রক্তস্রোতের ইতিহাসলিপি যেন হৃদপিণ্ডের মতো জীবন্ত আজও —মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা। ওই লেখাটি থেকেই জানতে পারলাম আজকের বজবজ বন্দর ছিল সেদিনের “বুদগে বুদগে” বন্দর। মূলত তৎকালীন স্থানীয় মানুষদের বজবজের ইংরাজী নামের কাঠিন্য থেকেই এই “বুদগে বুদগে” সরলীকৃত নাম হয়ে উঠেছিল সেই সময়। তবে মূল নাম “বজবজ” হওয়ার কারন বন্দরের চারপাশ জলমগ্ন থাকতো, জল জমা অঞ্চল হওয়ার দরুন এই জায়গার নাম হয়ে যায় “বজবজ(Budge Budge)”।

বর্তমানে মূল বজবজ স্টেশন থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পিছনে এই বজবজ বন্দর ও বন্দর সংলগ্ন পুরানো বজবজ স্টেশন-যা আরও এক পবিত্র কাহিনী বুকে ধারণ করে বেঁচে আছে এখনও।
পূর্বে আলাপ হওয়া সেই অভিজিৎ বাবুকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম সেই রোমহর্ষক বজবজ বন্দরটি একটু কাছ থেকে দেখা যাবে কি না! মুগ্ধতার বোধহয় এটাই নিয়ম। কাছে এসেও আরও কাছ থেকে মন-চোখ ছুঁয়ে নেওয়ার প্রবণতা। তিনি জানালেন, সিকিউরিটি ইস্যুর জন্য সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সেখানে নিষিদ্ধ। তবে এরপর যা শুনলাম তা আবারও বাকরূদ্ধকর শিহরণে মুগ্ধ করলো আমাদের।

আমরা যে স্থানে দাঁড়িয়ে সমগ্র কথপোকথন চালাচ্ছিলাম, সেই স্থান মহামানব, বীর সন্ন্যাসী, বিশ্ব বরেণ্য স্বামী বিবেকানন্দের পদধূলি ধন্য। এই পথ দিয়েই একদা তিনি হেঁটে গিয়েছিলেন। কিন্তু কোথায়? কেনই বা?
আমেরিকায় শিকাগো বিশ্ব ধর্ম সম্মেলন সেরে কলকাতা ফেরার জন্যে এই বজবজ বন্দরেই তাঁর জাহাজ নোঙর করেছিল। এরপর কলকাতায় ফেরার উদ্দেশ্যে সেই বন্দর থেকে এই পথ ধরেই হেঁটে গিয়েছিলেন গেরুয়া বসনের প্রানবন্ত মহীরুহ পুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ। পৌঁছেছিলেন বন্দর সংলগ্ন বজবজ রেল স্টেশনে। তবে কলকাতা ফেরার শেষ ট্রেন চলে যাওয়ায় সেই রাতটা অপেক্ষা করেছিলেন পুরানো বজবজ স্টেশনের প্রতীক্ষালয়ে।
অভিজিৎ বাবুর কথাগুলো শুনতে শুনতে আমরা যেন সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। এমন পবিত্র পথের সওয়ারী আজ আমরাও! কথাটা যত বিশ্বাস করার চেষ্টা করছিলাম তত যেন শৈতপ্রবাহের মতো অনুভূতির অনায়াস বিচরণ চলছিল শরীর-মন জুড়ে। নিস্পৃহ না থেকে পরবর্তী গন্তব্য ছকে নিলাম তৎক্ষনাৎ- আজকের পরিত্যক্ত বজবজ স্টেশনটির সেই প্রতীক্ষালয়, যা প্রায় সকলের জানার পরিধির বাইরে বিশাল ইতিহাসে সম্পৃক্ত এক জীবন্ত ছবি!

পায়ের গতি বাড়িয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছলাম স্টেশনটির সেই স্মৃতি বিজরিত ঘরটিতে। দেখলাম বর্তমানে ঘরটি গুডস ইয়ার্ডের স্টেশন মাষ্টারের অফিস। এতক্ষণ যা বলছিলাম ঘরের বাইরে দেওয়ালে পাথর ফলকে এই ইতিহাসটির বিবৃতি লেখা দেখতে পেলাম। আরও জানলাম তৎকালীন ইস্টার্ন রেলের জেনারেল ম্যানেজার মাননীয় ঋষিকেশ বন্দোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে, রামকৃষ্ণ মিশন,ইন্সটিটিউট অব কালচার, গোলপার্কের অধ্যক্ষ স্বামী লোকেশ্বরানন্দ এই শিলান্যাস করেন।

ঘরটির বাইরে থেকে দোর বন্ধ থাকায় যথারীতি ভিতরে প্রবেশের জন্য ইতস্তত বোধ করতে থাকলাম। আমার অপেক্ষা, জড়তা ভেঙে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন স্টেশন মাষ্টার৷ অনুমতি পেলাম ঘরে প্রবেশের।
এই সেই ঘর, যেখানে স্বামীজী স্বয়ং এসে থেকেছেন! ব্যাপারটা বাকীরা কিভাবে নেবেন জানিনা তবে আমার কাছে এ যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা! থেকে থেকেই রোম কূপ জানান দিচ্ছিল আমার অ্যাড্রেনালিন ক্ষরণ সেই সময়ে তুঙ্গে! আমাদের প্রায় দীর্ঘক্ষণ সময় দিলেন বিনয়ী স্টেশন মাস্টারটি। তাঁর কথায় জানলাম এই ঘরেরই একটা কোনে যে স্থানে “ইন্ডিয়া কার্বন লিমিটেড” স্বামী বিবেকানন্দের আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করেছে সেই স্থানেই একটা ইজি চেয়ারে প্রায় সারারাত বসে কাটিয়েছিলেন স্বামীজি। আরও জানলাম এখানেই প্রতি বছর ১২ জানুয়ারি বেলুড় মঠ থেকে মহা সমারোহে পালিত হয় তাঁর জন্মদিন, এবং যে ট্রেনটি করে তিনি কলকাতায় ফিরেছিলেন সেইরকম ট্রেনের অনুকরণেই নির্মিত একটি সুসজ্জিত ট্রেনকে বজবজ থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত ওই নির্দিষ্ট দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে চালানো হয়। এমন জায়গায় এসে ঋদ্ধ হলাম আবারও।

এইবার শেষমেষ বাড়ী ফেরার পালা। বাড়ী ফেরার পথে অনিবার্য মনখারাপী ঢেউ পানসীর মতো মন্থর আমাদের পায়ে এসে লাগছিল। মনে মনে ভাবছিলাম ঘরের অনতিদূরেই ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্যের এই খনি থাকতে পারে তা হয়ত বজবজ সফরে না এলে অজানাই থেকে যেত।
আমাদের প্রাণের ঠাকুর তো বলেছেনই সেই চিরসত্য —
“দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপর
একটি শিশির বিন্দু..”
শেষ

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
