‘তিনি’ তখন গত হয়েছেন, কিন্তু তাঁর সোসাইটির অনুগামীরা আছে। তারা তাঁকে ঈশ্বরতুল্য মনে করে।

আধো-আঁধারি পাথুরে ঘরটার দরজায় বাইরে থেকে কান পাতলে শোনা যেত চাপা অথচ উত্তেজনাপূর্ণ কথাবার্তা।

‘না, না… এ মেনে নেওয়া যায় না…’

‘তাঁর বাণীকে অবিশ্বাস! এ পাপ…অনাচার…’

‘তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন – ‘দুই’ মত থাকতেই পারে, কিন্তু কারণ সর্বদা ‘এক’ই হবে…আর হিপ্পেসাস যা করেছে, তার একটাই কারণ – সে উচ্চাকাঙ্ক্ষী… সে নিজেকে ‘তাঁর’ থেকেও জ্ঞানী প্রমাণ করতে চায়! ওর মত একটা তুচ্ছাতিতুচ্ছ কীট, যে কিনা দু’দিন আগেও কিস্যু জানতো না… আমাদের থেকে ‘তাঁর’ সমস্ত অমূল্য শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণ করে, এখন সর্বসমক্ষে ‘তাঁর’ই তত্ত্বের ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে!’

‘অথচ আমাদের ‘অ্যাক্যুমাটিচি’ তে ‘তিনি’ পরিষ্কার নিদান দিয়ে গেছিলেন – এ কথা যেন বাইরে না বেরোয়! তা সত্ত্বেও এত বড় সাহস ও পায় কোথ্‌ থেকে!’

এইসব কথোপকথনের মধ্যেই ভেসে এল এক দৃঢ় মন্দ্র স্বর…

‘তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন – ‘চার’ মানে জাস্টিস – ন্যায় বিচার… ‘অ্যালগন’ কে সর্বসমক্ষে তুলে ধরে যে অন্যায় সে করেছে, তা আমাদের সোসাইটির, সর্বোপরি যাঁকে আদর্শ ধরে আমরা চলি, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন – কীভাবে জীবনের পথে আমাদের চলা উচিত, কীভাবে চললে আমরা মোক্ষলাভ করতে পারবো এবং আমাদের মৃত্যুর পরে আমাদের আত্মা মুক্তি পাবে – তাঁর প্রতি গভীর অশ্রদ্ধা প্রদর্শন, বিশ্বাসঘাতকতা! এবং এই তঞ্চকতার দন্ড শুধু একটাই …’

পরেরদিন ক্রোটনবাসী আবিষ্কার করল হিপ্পেসাসের দেহ ভেসে এসেছে সমুদ্রতীরে। ক্রোটন – ম্যাগনা গ্রেসিয়া অর্থাৎ দক্ষিণ ইটালির সমুদ্র তীরবর্তী শহর। পিথাগোরাসের জীবনের শেষভাগ কেটেছিল এখানে, এখানেই ‘তিনি’ তাঁর অনুগামীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সোসাইটি’।

পিথাগোরাস যে জিনিয়াস ছিলেন, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মিশরে থাকাকালীন তিনি শুধু জ্যামিতি শিখে ক্ষান্ত থাকেননি; তিনি শিখেছিলেন সেখানকার লোকাচার, ধর্মাচার। মিশরীয় সভ্যতায় পুরোহিতদের গুরুত্ব এবং মহিমা ছিল প্রশ্নাতীত। বস্তুত, মিশরীয় সমাজে ফারাওদের পরেই ছিল তাদের স্থান। মিশরীয়রা পরজন্মে বিশ্বাসী ছিল এবং সেই কারণেই তাদের পিরামিড, মমি – এত সব আয়োজন; এই সব বিপুল আয়োজনের পুরোধা হতেন পুরোহিতরা। যদিও বহিরাঙ্গে এ উদ্যোগ ছিল বিপুল, কিন্তু আসল প্রক্রিয়াটি ছিল একইসাথে পবিত্র এবং গোপনীয় এবং সেই প্রক্রিয়া পৌরহিত্য করতেন যিনি, তাকে মিশরীয়রা ডাকতো ‘হেরি সেশেতা’, যা ইংরেজি করলে দাঁড়ায় ‘লর্ড অফ দ্য সিক্রেটস’। ভাবতে পারেন, একজন বিদেশি এহেন একটি গোপন এবং আদ্যন্ত একচেটিয়া প্রক্রিয়ায় পুরোহিত হিসাবে দায়িত্ব পালন করছে! পিথাগোরাস করেছিলেন, বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় তিনি থিবসের পুরোহিত সম্প্রদায়ে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এবং সেই দায়িত্ব পালনের অনুষঙ্গে নিঙড়ে নিয়েছিলেন প্রাচীন সেই সভ্যতার সমস্ত জারক রস, যা পরবর্তীকালে তার চিন্তাভাবনা – মতবাদকে বহুলাংশে প্রভাবিত করে।

মিশরে তখন তার প্রায় তেরো বছর কেটে গেছে, এমন সময় পারস্য মিশর আক্রমণ করে এবং তাকে বন্দী অবস্থায় ব্যাবিলনে নিয়ে যায়। কিন্তু তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ এতই সহজাত ছিল যে এক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ইউফ্রেটিসের কোলে বহমান সেই প্রাচীন সভ্যতার ঢেউয়ে অচিরেই গা ভাসিয়েছিলেন পিথাগোরাস এবং সেই উন্নত সভ্যতার খাত ছেঁচে তুলে এনেছিলেন বহু রসদ!

মিশর এবং ব্যাবিলন – উভয় সভ্যতাতেই অতীন্দ্রিয়বাদ নিয়ে যথেষ্ট চর্চা ছিল সেকালে এবং বলা বাহুল্য, সেই সভ্যতার নিবিড় সান্নিধ্য পিথাগোরাসের মননে যথেষ্ট রেখাপাত করেছিল। তার প্রমাণ আমরা পাই পিথাগোরাসের চিন্তা ভাবনার আলো-আঁধারি গলিখুঁজিতে। সংখ্যার যে পরম ধারণাকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সেই ধারণাকেই তিনি আবার নিজস্ব কল্পনায় জারিত করেছিলেন। আগের পর্বে আলোচনা করেছিলাম – কীভাবে পিথাগোরাস সংখ্যাকে তার সাংখ্যমান অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু তিনি যদি সেখানেই থেমে থাকতেন, তাহলে হয়তো বা পরবর্তী যুগে বিজ্ঞান এবং অবিজ্ঞানের এই হাত ধরাধরি করে পথ চলা এতটা পালে হাওয়া নাও পেতে পারতো!

সংখ্যার যে সুনির্দিষ্ট মান আছে এবং তা যেকোনো স্থান ব্যতিরেকে অপরিবর্তনীয় – এ বিষয়ে পিথাগোরাস আমাদের ধারণা দেন। সেই ধারণা ছিল যুক্তিশাসিত। নুড়ি-পাথর সাজিয়ে সংখ্যা গুনতে গুনতে বস্তুবাদের সাথে গণিতশাস্ত্রের সরাসরি সাঁকো বাঁধার কাজ শুরু করেন তিনি। সেই সাঁকোকেই আরো মজবুত হতে দেখি যখন তিনি কোনো তার বা String থেকে প্রস্তুত শব্দের কম্পাংকের সাথে সেই তারটির দৈর্ঘ্যের সম্পর্ক স্থাপন করেন। শোনা যায়, একদিন পিথাগোরাস আপন মনে হাঁটছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার খেয়াল হল পাশের কামারশাল থেকে নানারকম শব্দ ভেসে আসছে। কী ব্যাপার, শব্দের এমন তারতম্য হচ্ছে কেন – বিষয়টাকে কালটিভেট করতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন তারের দৈর্ঘ্যের সাথে শব্দের কম্পাংকের সরাসরি ব্যাস্তানুপাতিক সম্পর্ক। বলা বাহুল্য, এই প্রথম কোনো ঘটনাকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হল এবং পরীক্ষালব্ধ ফল গাণিতিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকাশ পেল। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এ এক নতুন দিকপ্রবাহের হদিশ দেয় – যেকোনো দৈনন্দিন ঘটনা বা প্রক্রিয়াকে Subjective বা বিষয়গত ভাবে ব্যাখ্যা করার বদলে Objective বা বস্তুগত ভাবে বুঝতে চাওয়ার ঢাকে কাঠি পড়ে।

\

কিন্তু ওই যে যাকে বলে না বিধি বাম – পিথাগোরাস আসলে তো ছিলেন একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। আর সেই মানুষ সম্পর্কে নৃতত্ত্ববিদরা বলেন, জীবকুলে শ্রেষ্ঠ আসনে বসার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে মানুষ নামক প্রজাতিটির মগজাস্ত্রে। চিন্তাশীল মানুষরা একমত হবেন – আমাদের মগজাস্ত্রের আসল বারুদটি হল চিন্তাশক্তি – যা আমাদের ভাবতে শেখায়, কল্পনা করতে শেখায়, বুঝতে শেখায়। এর মধ্যে কল্পনা করার বিশেষ গুণাবলিটি অত্যন্ত্য গুরুত্বপূর্ণ! এ বিষয়ে পরবর্তীকালে আরো বিশদে আলোচনা করা যাবে খন, আপাতত কল্পনাপ্রবণ এই অনুষঙ্গটির আলোচ্য পরিসরে সামান্য হলেও স্বাদ পাওয়ার সুযোগ মেলে। যে পিথাগোরাস মানুষকে সংখ্যা চেনালেন জ্যামিতিক ছন্দে, সেই পিথাগোরাসই আবার সংখ্যার মাহাত্ম্য বোঝাতে গিয়ে আশ্রয় নিলেন কল্পনার খাস বুনোটে! এবং এর মাধ্যমে আশ্চর্য বৈপরীত্যের সন্ধান দিলেন তিনি – বিজ্ঞান এবং অবিজ্ঞান। এই দুই পরস্পরবিরোধী ভাবধারার সহাবস্থান, তাও আবার আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার একেবারে প্রাকলগ্নে, স্বভাবতই এক দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করল বিজ্ঞানচর্চার পরবর্তী নাটমঞ্চে! বলা বাহুল্য, সেই প্রভাবমুক্ত হবার চেষ্টা আজও করে যাচ্ছে বিজ্ঞান…

পিথাগোরাস তার অনুগামীদের বোঝালেন – ‘তোমরা জেনে রেখ – এ বিশ্বব্রহ্মান্ডকে বুঝতে গেলে আগে তোমাদের বুঝতে হবে সংখ্যা। একমাত্র সংখ্যাই হল সবকিছু বোঝার চাবিকাঠি। তোমাদের আমি দেখিয়েছি – কীভাবে সংখ্যা দিয়ে বিভিন্ন জ্যামিতিক আকার তৈরি করা যায়, কীভাবে তারের নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যে আঘাত করে স্বরগ্রাম তৈরি করা যায়। তোমাদের আমি বুঝিয়েছি – কীভাবে পৃথিবী – চন্দ্র – সূর্য – অন্যান্য গ্রহরা নির্দিষ্ট ছন্দ অনুপাতে একটি পবিত্র রহস্যময় অগ্নিগোলকের চারপাশে ঘুরছে… এবং তা থেকে প্রস্তুত হচ্ছে সর্বজনীন সঙ্গীত – ‘Musica Universalis’… মনে রাখবে, সঙ্গীতই বলো আর জ্যোতির্বিদ্যা – সব ছন্দে বাঁধা – আর ছন্দ মানেই – সংখ্যা! অতএব তোমরা নিশ্চই বুঝতে পারছো – সংখ্যা দ্বারাই একমাত্র এ বিশ্বব্রহ্মান্ডের সবকিছুকে সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। তোমরা মনে রাখবে – যে কোনো দৈর্ঘ্যকে তোমরা সংখ্যার সাহায্যেই পরিমাপ করবে…এটাও তোমরা জেনে রেখ – যে কোনো দুটি দৈর্ঘ্যের অনুপাতকে নিশ্চিত ভাবেই তোমরা সংখ্যার অনুপাত হিসাবে প্রকাশ করতে পারবে… ’

পিথাগোরাস যেমন জিনিয়াস ছিলেন, তেমনই ছিলেন ক্যারিশ্ম্যাটিক। ব্যাবিলন থেকে নিজের জন্মভূমি সামোসে ফিরে তিনি নিজের ঘাঁটি গাড়তে উদ্যোগী হলেন। কিন্তু অচিরেই তিনি বুঝলেন, শুধুমাত্র অংক দিয়ে বেশি লোক ভজবে না। তাই তিনি গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যামিতি চর্চার সাথে জীবনচর্চাকেও মেশাতে চাইলেন। ততদিনে সামোসের লোক জেনে গেছে – পিথাগোরাস মিশরের দুর্বোধ্য হায়ারোগ্লিফস জানে, মিশরের অভিজাত পুরোহিত সম্প্রদায়ের একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সদস্য, তাঁর নানান অলৌকিক ক্ষমতা আছে – তিনি জল, বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, জলের উপর দিয়ে দিব্যি হেঁটে যেতে পারেন এবং তাঁর উরুতে একটি সোনালি জন্মদাগ আছে, যা অব্যর্থ রূপে প্রমাণ করে – তিনি আসলে দৈবপ্রেরিত! পিথাগোরাস সামোসবাসীকে জীবন ধারণের পথ বাতলালেন – আত্মা অমরণশীল, মৃত্যুর সাথে সাথে তা কেবল এক দেহ থেকে আরেক দেহে স্থানান্তরিত হয় মাত্র এবং হতে পারে সেই নতুন স্থানান্তরি দেহ কোনো মনুষ্যেতর প্রাণীর; তাই সমস্ত আমিষ খাদ্য পরিত্যাজ্য। একই ভাবে সমস্ত রকম ভোগবিলাস পরমসত্যের পথে অন্তরায় স্বরূপ, অতএব বর্জনীয়। যৌনতা কিম্বা মূত্র বিসর্জন সর্বসমক্ষে করণীয় নয়, সভ্য সমাজে তা গোপনীয়। সে যুগে গ্রীক রোজনামচায় নিয়মিত আড্ডা বসতো। সেইসব আড্ডায় যেমন জ্ঞানচর্চাও চলতো, তেমনই চলতো জীবনের উদ্দাম উদযাপন, ছুটতো সুর এবং সুরার ফোয়ারা… স্বভাবতই পিথাগোরাসের অমন নীরস জীবনশৈলিতে বেশি আগ্রহ দেখালেন না সামোসবাসী। চিঁড়ে ভিজলো না যখন, তখন নিরূপায় পিথাগোরাস পা বাড়ালেন অপেক্ষাকৃত সহজ জমিতে – ক্রোটন, দক্ষিন ইটালির সমুদ্র তীরবর্তী শহর। এখানে জমে উঠলো তাঁর সোসাইটি…

পিথাগোরাস যদি উপরোক্ত জ্ঞানপ্রবচন অবধিই সীমাবদ্ধ থাকতে পারতেন, তাহলে হয়তো ভাবীকাল তাঁর থেকে কেবলমাত্র সঠিক পথেরই সন্ধান পেতো! কারণ যে যাপনশৈলির চালচিত্র তিনি এ যাবত এঁকেছিলেন তা তাঁর অধিগত বস্তুবাদী জ্ঞানচর্চার সাথে কোথাও তেমনভাবে ছায়াপাত করেনি। একদিকে তিনি যেমন তাঁর অনুগামীদের বিলিয়েছেন বস্তুবাদী জ্ঞান, আরেকদিকে তিনি তাদের দিব্যজ্ঞান লাভের জন্য পালন করেছেন আচার-অনুষ্ঠান যার নাম ছিল orgy। কিন্তু সময়ের পেরোনোর সাথে সাথে একসময় তিনি মিলিয়ে দিলেন এই দুই বিপ্রতীপ স্রোতদের, ভাবীকালকে দিকভ্রান্ত করলেন তিনি…

পিথাগোরাসের কল্পভাবনায় জারিত হয়ে ‘এক’ হল কারণের প্রতীক, ‘দুই’ – মত, ‘চার’ যা একটি বর্গক্ষেত্রকে প্রকাশ করে – এমন একটি ক্ষেত্র যার প্রতিটি দিক সমান, স্বভাবতই সে হল ন্যায়বিচার বা জাস্টিসের প্রতীক। পিথাগোরাসের কাছে ‘তিন’ হল সবচাইতে সুন্দর সংখ্যা – যার শুরু আছে, মাঝখান আছে এবং শেষ আছে। তাই তিনি ‘তিন’কে সূচিত করলেন পুরুষ হিসাবে যা প্রমাণ করে – সমকালীন পুরুষতান্ত্রিক প্রভাব তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অপরপক্ষে নারীদের সূচিত করলেন জোড় সংখ্যা – ‘দুই’-র মাধ্যমে। স্বভাবতই বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটি যখন নারী পুরুষের মিলন ইঙ্গিত করে, তখন তা ‘পাঁচ’ দিয়ে সূচিত হল। প্রথম ত্রিভুজাকার এবং বর্গাকার সংখ্যাদ্বয় অর্থাৎ তিন এবং চার–র সমষ্টি ‘সাত’ হল বিশেষভাবে পবিত্র একটি সংখ্যা। পরবর্তীকালে তাই বিভিন্ন অনুষঙ্গে আমরা সাতের দেখা পাই – সে সপ্তঋষিই হোক, সাত সুরই হোক বা সাত দিনে ঈশ্বরের পৃথিবী সৃষ্টির গল্পেই হোক!

আসলে কী জানেন, মানুষ কল্পনাশীল হলেও সব মানুষ সৃষ্টিশীল নয়। তাই তারা সেইসব সৃষ্টিশীল মানুষদের মুখাপেক্ষি থাকে যারা তাদের কল্পনাশক্তিকে একটু উসকে দেবে, একটু জ্বালানি দেবে। সেই কারনেই তারা বারবার ভাববাদী, অতীন্দ্রিয়বাদী, কাল্পনিক ভাবধারার প্রতি আকৃষ্ট হয় – তা দিয়ে তাদের মগজ জাবড় কাটে এবং পালকতুল্য প্রাসাদ বানায়! পিথাগোরাস সেই জায়গাটিকেই হয়তো ধরতে চেয়েছিলেন এবং বিমোহিত করতে চেয়েছিলেন শ্রোতাসাধারণদের, তাঁর অনুগামীদের, যাদের অতশত ভাবার ক্ষমতা ছিল না! কিন্তু তিনি জানতেন – এক না একদিন যে তত্ত্বের বনেদে তিনি তাঁর ইন্দ্রপ্রস্থ রচনা করেছেন, তার বুনিয়াদি ত্রুটি বা বলা ভালো, সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে যাবে!

তিনি বলেছিলেন, বিশ্বব্রহ্মান্ডের সবকিছুকে সংখ্যা দিয়েই বোঝা যাবে। কিন্তু সংখ্যাই যদি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে – তাহলে তো চিত্তির! পিথাগোরাস নিজের উপপাদ্যটি যখন একটি সামান্য একক দৈর্ঘ্যের বাহুবিশিষ্ট বর্গক্ষেত্রে প্রয়োগ করলেন, তখন তিনি আবিষ্কার করলেন – সেই বর্গক্ষত্রটির কর্ণের দৈর্ঘ্য কিছুতেই তিনি সঠিক ভাবে নির্ণয় করতে পারছেন না! আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা জানি, এক্ষেত্রে সেই কর্ণটির দৈর্ঘ্য হবে √২। এই যে সামনে আমরা একটা বর্গমূলের চিহ্ন বসিয়ে সংখ্যাটিকে কত সহজে প্রকাশ করতে পারলাম, সেই সমাধানের চাবিকাঠি পিথাগোরাসের কাছে ছিল না। তিনি হন্যে হয়ে খুঁজে বেরিয়েছিলেন সেই কর্ণের দৈর্ঘ্য। কিন্তু যতবার তিনি সেই সংখ্যাকে ধরতে চেয়েছেন, ততবার তিনি আবিষ্কার করেন এ যেন এক মরীচিকার সন্ধান। বস্তুত, উপরোক্ত সংখ্যাটি একটি অমূলদ রাশি, যার কোনো সসীম মান পাওয়া যায় না। আর পাওয়া যায় না বলেই পিথাগোরাস আশঙ্কিত হয়ে পড়েন – এই বুঝি সবাই জানতে পেরে গেল তার তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা, ত্রুটি! হতে পারে পিথাগোরাস এই ত্রুটির আভাস পাবার পরই সংখ্যা নিয়ে বিকল্প ভাবধারার আশ্রয় নেন।

কিন্তু তার চেয়েও বিপজ্জনক যে কাজটি তিনি করেন – তিনি তাঁর নিকটতম অনুগামীদের বোঝান যে এই ধরণের সংখ্যাগুলি হল alogon অর্থাৎ অনুপাত নয় (not a ratio)। এই alogon শব্দটির আবার আরেকটি অর্থ আছে – not to be spoken বা কাউকে বলা যাবে না। তিনি তাঁর অনুগামীদের কাছে এই বিষয়ে লোকসমক্ষে সম্পূর্ণ গোপনীয়তার নিদান দেন। এইখানেই তাঁর মিথ্যাচারিতা…এইখানেই তাঁর স্খলন! তিনি অনায়াসেই নিজের তত্ত্বের যে স্ববিরোধিতা – তার উত্তর খোঁজার জন্য ভাবী প্রজন্মকে উৎসাহী করে তুলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না, তিনি আশ্রয় নিলেন মন্ত্রগুপ্তির। বিজ্ঞানের প্রারম্ভিক রঙ্গমঞ্চে শঠতা কন্ঠরোধ করলো সততার! আসলে তো বিজ্ঞান একপ্রকার জীবনচর্চা – বিজ্ঞান শেখায় প্রশ্ন করতে, সত্য অনুসন্ধান করতে, নির্মোহ দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করতে, খুঁজে পাওয়া সত্যকে সকল সংস্কারের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে পরিবেশন করতে এবং ভবিষ্যতে অন্য কেউ সেই সত্যকে আরো পরিশীলিত করবে – এই আশায় বাঁচতে। বিজ্ঞানকে ধারণ করার এই কষ্টিপাথরেই নিজেকে অকৃতকার্য প্রমাণিত করলেন পিথাগোরাস…

কিন্তু প্রমিথিউসের সন্ধান তো সবক্ষেত্রেই পাওয়া যায় – যারা বারবার দেবলোক থেকে সাধারণের জন্য চুরি করে আনে আগুন… যার পরশে আঁধারে আসে আলোর আঁচ, গোচরে আসে যাবতীয় খুটিনাটি! তেমনই একজন ছিলেন হিপ্পেসাস। তিনি মনে করেন পিথাগোরাসের মতবাদের সীমারেখা মানুষের সামনে তুলে ধরা দরকার। এবং তারই মূল্য তাকে চোকাতে হয় নিজের জীবনের বিনিময়ে…

এইভাবেই জ্ঞান–বিজ্ঞান–অবিজ্ঞান, প্রচার–অপ্রচার-অপপ্রচার, সত্য–অর্ধসত্য–অসত্য ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে একে অপরের সাথে বিচিত্র ক্রিয়া-বিক্রিয়ার খেলায় মেতে ওঠে…চলতে থাকে ভাঙাগড়ার খেলা।

(উদ্ধৃতি কাল্পনিক)


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ডিসেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Satrajit Goswami
Satrajit Goswami
5 months ago

অসাধারণ লিখনভঙ্গি! বিজ্ঞানের এমন সরস আলোচনা আমাদের যেন এক বিশ্বভুবন পরিক্রমায় নিয়ে চলেছে দক্ষ প্রদর্শকের মতো! সেই সঙ্গে চেনাজানা হয়ে যাচ্ছে বিজ্ঞান-ইতিহাসের নানা খুঁটিনাটি কূটকচাল, তার সীমা ও সীমালঙ্ঘনের গল্পগাথা। কেবল মুদ্ধতা নয়, দর্শন ও বিজ্ঞানের সম্মিলিত অভিযাত্রায় কত-না গলিঘুঁজি, কত না রহস্যময় পদপাত আর আঘাটায় পা রাখার বিপজ্জনক সংকেত!
এমন লেখা ভবিষ্যতে স্থায়ী আসন করে নেবে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে।