আজ বেশ ভিড় তারকেশ্বর লোকাল থেকে বালি স্টেশনে নেমে একটু শ্বাস নিচ্ছি , দেখি এক ভদ্রমহিলা কোলে একটি মাস পাঁচ ছয়ের বাচ্চা নিয়ে ওই ট্রেন ধরবেন বলে প্রায় ছুটে আসছেন। ডান হাতে ধরা লম্বা হ্যাঙ্গারে ঝুলছে মহিলাদের রকমারি প্রসাধনী। চুলের ক্লিপ, কানের দুল, মোজা , রুমাল এইসব। বুঝলাম উনি ট্রেনে হকারী করেন। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ওইটুকু শিশু সন্তান কে নিয়ে ওই ভিড় ট্রেনে কী করে কাজ করবেন উনি!
ক্ষয়াটে চেহারা বেঁটে খাটো ওই মহিলার চোখে মুখে এক ঝলক যে অদম্য জেদের ছবি দেখেছিলাম তাতে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বাঁচার অধিকার উনি লড়াই করে আদায় করে নিচ্ছেন ,করুণা ভিক্ষা করে নয়।
আজকাল পথে ঘাটে স্টেশনে অনেক স্বাস্থ্যবতী মহিলা কে দেখি, সবল পুরুষকে দেখি যারা হাত পেতে ভিক্ষা করাকেই তাদের পেশা করে নিয়েছে। তাদের আবার ধার্য করা আছে মূল্য। কেউ দশ টাকার কমে নেবেন না,কেউ পাঁচটাকা।
বলে দেখেছি তাদের,এমন স্বাস্থ্য খেটে খেতে পারেন না?
তাতে তারা বিরক্ত হয়,কেউ কেউ তো রীতিমত ধমক দেয়,ভিক্ষা দেবে না আবার এতো কথা কিসের?

আজ ট্রেনের ওই মহিলা কে দেখে মনে হলো জীবন বোধের পাঠ যে যেমন ভাবে পেয়ে আসে তার যাপনে তেমনই প্রতিফলন হয়। সন্তান পালনের জন্য একজন মায়ের কৃচ্ছসাধন আমাকে আবার মুগ্ধ করলো । আমার থেকে অনেক কম বয়সী ওই মহিলাকে মনে মনে প্রণাম জানালাম।
দ্বিতীয় কন্যার কথায় আসি।
বালি থেকে ওপরে উঠে নাগেরবাজার যাবার সাদা বাস ধরবো। এতো গুলো সিঁড়ি ভাঙার আগে একটু ভাঁড়ের চায়ে চুমুক দিতে ইচ্ছে হলো । আমরা ঢুকলাম একটি দোকানে । দোকান বলতে গুমটির পরবর্তী সংস্করণ। একটি যুবতী এসে এক ভাঁড় চায়ের অর্ডার দিয়ে ফস করে একটি সিগারেট ধরালো। ধরিয়ে বসলো বেঞ্চে। যার ওপরে লেখা আছে,ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর।
আমি মহিলাদের সিগারেট খাওয়া নিয়ে কিছু বলে বিতর্কে জড়াতে চাই না। আমি আমার সংস্কারের কথা বলছি। কোথাও যেন ধাক্কা খেলাম। আমার মধ্যবিত্ত মন কত বদলের সাক্ষী হয়ে থাকলো । অর্ধশতক পেরিয়ে আসা আমি নিজেকে ওই বয়সটাতে একবার বসাতে গিয়ে ভাবলাম ,না থাক, রবীন্দ্রনাথতো বলেই গেছেন, সম্ভবপরের জন্য প্রস্তুত থাকার নামই সভ্যতা। নিজেকে তো সভ্য বলেই দাবি করি। সুতরাং দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম।
দুটি পৃথক ঘটনায় ধাক্কা খাওয়া আমি বাসে বসে যখন মননে জাবর কাটছি ,তখন আমার সামনে এসে দাড়ালেন এক মহিলা। সালোয়ার পরা গর্ভবতী এক মহিলা। একটু বেশি বয়স মনে হলেও মা হবার বয়স তার পেরিয়ে যায় নি। আমি তাড়াতাড়ি উঠে তাকে বসতে দিলাম।
ডানলপে সে এবং আমার এক সঙ্গী নেমে গেল। একটু পরেই সঙ্গীর ফোন।
জানো বৌদি,তুমি যাকে প্রেগনেন্ট ভেবে বসতে দিলে সে কিন্তু প্রেগনেন্ট নয়…
মানে?
ডানলপ স্টপেজে একজন ওনার অপেক্ষায় ছিল। মহিলা নামতেই সে এগিয়ে এসে বলল,ভিড়ে খুব কষ্ট হলো তোমার?
সে বললো,না গো…
আমার ভুড়িটাকে দেখে এক মহিলা ভেবেছেন, আমি বুঝি প্রেগনেন্ট। তিনি আমাকে বসতে দিলেন। এতো এডভ্যান্স স্টেজে এত ভিড়ে ট্রাভেল করা ঠিক নয়- বলে জ্ঞান দিলেন।
তারপর পুরুষ বন্ধুর হাত জড়িয়ে বললো,জীবনে এই প্রথম ভুঁড়ির জন্য বেনিফিটেট হলাম। তারপর গদগদ হয়ে বললো,আমি যে বিধবা সেটাও বুঝতে পারে নি জানো!
আমি আবার ধাক্কা খেলাম। ফোনটা কেটে দিলাম।
বাইরে তাকিয়ে দেখি রোদ আর বৃষ্টির অনবদ্য যুগলবন্দী।
ঠিক যেন মন্দ ভালো মেশানো আমাদের জীবন।


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]